মিশন ফেয়ার প্লে — পর্ব ২
ইয়াছিন নাইম৩০ জানুয়ারি ২০২৫৬ মিনিট পড়ারহিমের পায়ের কাছে রনি কাপড় রেখে গিয়েছিল। এখন কাপড়গুলো নেই। সে চোখ কচলে ভালো করে তাকাল। নাঃ, সত্যিই নেই। কাপড় গেল কোথায়?
রহিম ভাঙা গলায় চেঁচাল, 'রনি!'
শব্দটা বেশি দূর গেল না। রহিমের চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। হাত-পা থরথর করে কাঁপছে। দু'হাত দিয়ে চোখের জল মুছে শেষ করা যাচ্ছে না। রহিম শেষবার ঘোলাটে চেখে জলের দিকে তাকাল। এবার যদি রনি উঠে না আসে, তবে সে দৌড়ে পালাবে।
'ভয় পেয়েছিস?' রনির কণ্ঠ।
রহিম দ্রুত বাঁ দিকে তাকাল। রনি নিশ্চিন্ত মনে ঘাসের বুকে বসে আছে। যেন কিছুই হয়নি।
রহিম বলল, 'তুই এখানে এলি কীভাবে? তুই তো পানিতে ছিলি!'
'এক ডুবে ওপাড়ে গিয়েছিলাম। তারপর বিলের পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে এসেছি। এসে দেখলাম তুই কাঁদছিস। ভাবলাম, আরো একটু কাঁদ। ততক্ষণে আমি কাপড় পরে নেই।'
'তুই সত্যি তুই তো?' রহিম হাত কচলাতে কচলাতে বলল।
'নয়তো কি ভূত?'
'তাইতো মনে হচ্ছে।'
'ওদিকে তাকা, দেখ আমার ছায়া দেখা যাচ্ছে। ভূতের তো ছায়া থাকে না। তবুও যদি বিশ্বাস না হয়, তুই আমাকে ছুঁতে পারিস।'
ছোঁয়া তো দূর তার কাছে ঘেঁষল না। দূর থেকেই বলল, 'চল বাড়ি যাই।'
'আমরা কি বাড়ি যাবার জন্য এসেছি? যে কাজে এসেছি, সেটা করেই যাব। যা, ডুব দিয়ে আয়।'
'এখন কাপড় ভেজালে সারা রাতেও শুকাবে না। সকালে ধরা খেয়ে যাব। এরচে' আমরা কাল যাই। কাল পাক অবস্থায় থাকব।'
'না। আজকেই যাব। তুই এখনি পানিতে নাম। কাপড় এখানে রেখে যা।'
'যাঃ! কী যে বলিস! কাপড় রেখে যাব আমি? আমার কি লজ্জাশরম নেই নাকি?'
'এত রাতে তোকে কে দেখতে আসবে? ভূত?'
'কেন, তুই?'
'আমি? আমি দেখব না। এই দেখ, চোখে হাত রাখলাম। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। কিচ্ছু না।' বলে ডান হাত দিয়ে চোখ আড়াল করল রনি।
এই ফাঁকে রহিম কাপড় ছেড়ে বিলের জলে নেমে গেল। গা হীম করে দেওয়া জল। মনে হচ্ছে পানিতে বরফকুঁচি দেওয়া হয়েছে। কাঁপতে কাঁপতে এগোতে এগোতে একসময় বুক সমান পানিতে নেমে গেল। পায়ের অনেকটা অংশ কাদার ভেতর চলে গেছে। সেদিকে খেয়াল না করে দ্রুত ডুব দিয়ে উঠে এল।
আরু মহল।
রহিম শুনেছিল মহলটা নাকি চারশো বছরেরও বেশি পুরনো। চোখের দেখা দেখেনি কখনো। ছোটোবেলা থেকেই এদিকে আসা সাফ মানা। এই প্রথমবার এসেছে। তা-ও আবার এত রাতে। প্রায় আট ফুট উঁচু দেয়াল ঘেষেঁ বিশাল গেট। অর্ধেকটা খোলা ছিল। রনি আগে আগে চলে গেল। রহিম ভয়ে ভয়ে তার পিছু করতে লাগল৷ এদিক ওদিক তাকিয়ে অন্ধকারে যতদূর বুঝা গেল, চারপাশে ঝোপঝাড় ভরতি। মাঝখান দিয়ে সরু রাস্তা বয়ে গেছে। সেই রাস্তা ধরে এগোতে এগোতে একসময় আরু মহলের মূল দরজার সামনে উপস্থিত হলো।
তবে এখানের দরজাটা বোধহয় কেউ খুলে নিয়ে গেছে। দরজার অংশটুকু ফাঁকা। সেই ফাঁকা অংশ দিয়ে সতর্ক পা ফেলে রনি এগিয়ে গেল। রহিমও গেল। মনে হয়েছিল, মহলের ভিতর একেবারে অন্ধকার হবে। কিন্তু না। ভেতরেও বাইরের মতো আবছা আলো আছে। রহিম মাথা উঁচু করে তাকাল। আকাশের চাঁদ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মাথার উপর ছাদ নেই। চারপাশের দেয়ালগুলো ভাঙা ভাঙা।
'এই রনি, দাঁড়িয়ে আছিস কেন? আয়।' রহিম ফিসফিস করে বলল।
একটা ব্যাপার মাথায় ঢুকলো না। আশপাশে তো কেউ নেই। তাহলে রনি ফিসফিস করে বলছে কেন? জোরে বললেওতো পারে!
'কী হলো? আয়!'
একসময় রনি কিছু একটা এগিয়ে দিলো। রহিম সেটা হাতে না নিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কী এটা?'
'দেখ ভালো করে।'
'স্যান্ডেল?'
'হ্যাঁ, তোর বোনের স্যান্ডেল।'
'রিতার স্যান্ডেল! রিতার স্যান্ডেল এখানে এল কী করে?'
বলার পরপরই রনি তার মুখ চেপে ধরল। এত জোরে ধরল, কথা বলা তো দূর নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। হাত ছেড়ে ইশারা করে চুপ থাকতে বলে এদিক ওদিক দেখে নিল। তারপর বলল, 'রেখে দে।'
'কী রাখব?'
'স্যান্ডেলটা রাখ।'
'এটা আমার বোনের স্যান্ডেল। আমি বাড়ি নিয়ে যাব।'
'চেঁচাবি না। রাখ এখানে। চলে আয়।' বলে পা চালাল রনি।
রহিম পেছন থেকে নিচু গলায় আওয়াজ দিলো, 'চলে যাবি? তাহলে এখানে এসেছিলি কেন?'
'নেই।'
'নেই মানে? কী নেই? বুঝিয়ে বল।'
'এত কথা বলিস কেন? চলে আয়। তাড়াতাড়ি আয়।'
'না, আসব না। আগে বল, কী নেই? কী খুঁজতে এসেছিলি?'
রনি প্রশ্ন এড়িয়ে বলল, 'আসবি না? বেশ। বসে থাক। বসে বসে সাপের কামড় খা। আমি গেলাম।'
সাপের কথা শুনতেই রহিমের গা কেঁপে উঠল। বলল, 'এ বাড়িতে সাপ আছে?'
'আছে কী! ধরে নে এটা সাপের বাড়ি। বড়ো বড়ো বিষাক্ত সাপ আছে এখানে।'
'এই রনি দাঁড়া। আমিও যাব।' বলে দ্রুত এসে রনির পাশাপাশি হাঁটতে লাগল রহিম।
পরদিন রহিমের গা কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এল। বাবা রহিমের সামনে দাঁড়িয়ে মাওলানা সাহেবকে বললেন, 'মৌলানা সাব, রহিমকে কাল জ্বিন নিয়ে গেছিল। রাতে আমি নিজ চোখে দেখেছি, সে বিছানায় নাই। পুরো ঘর খুঁজলাম। কোত্থাও নাই। তারপর তার মা'রে ডাকলাম। আমরা দুইজন আইসা দেখি, সে ঘুমায়া আছে। আমি তখনই আন্দাজ করছি, বিপদ আছে।'
মাওলানা সাহেব মুখে কিছু বলেননি। শুধু সামনের দিকে মাথা ঝাঁকিয়েছেন কয়েকবার। সুরা পড়ে ফুঁ দিয়েছেন। পানি পড়া দিয়ে গেছেন। যাবার সময় বাবা মাওলানা সাহেবের রাস্তা আটকে বললেন, 'মৌলানা সাব, বিপদ কাইটা যাইব তো? আর কিছু লাগব না তো?'
'আর কিছু লাগবে না। আল্লাহর রহমতে এমনিতেই সুস্থ হয়ে উঠবে।' বলে প্রস্থান করলেন।
ঠিকই সুস্থ হয়ে উঠল। সেদিন বিকেলেই। দুপুরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিল। বিকেলে ঘুম থেকে উঠে দেখে শরীরে জ্বর নেই। মাথাব্যথাও নেই। এখন সে হাঁটতে পারছে। ইচ্ছেমতো দৌড়ঝাঁপ করতে পারছে। একটুও দুর্বলতা নেই। একটুও কষ্ট হচ্ছে না তার।
সুস্থ শরীর নিয়ে ঘরে বসে থাকা যায় না। শত ইচ্ছে করলেও না। রহিমও পারল না।
রনিকে দেখা গেল বটতলায়। মনমরা হয়ে বসে আছে। গালে হাত। মাথায় ব্যান্ডেজ। কনুইয়ে ব্যান্ডেজ। চোখের নিচে কিছুটা অংশ থেঁতলে গিয়ে নীল বর্ণ ধারণ করেছে।
রহিম বলল, 'আবার কার হাতের মার খেয়েছিস?'
রনি ক্রুদ্ধ হয়ে বলল, 'খেয়েছি কে বলেছে? দিয়েছি। ইচ্ছেমতো মেরেছি। এমন মার দিয়েছি না...'
'হ্যাঁ, তা তো দেখাই যাচ্ছে।'
'কী দেখছিস? এসব ব্যান্ডেজ দেখে লাভ নেই। ওরা তো উপরে উপরে মেরেছে। আমাকে তো চেনে না। কিলঘুসি সব জায়গামতো বসিয়েছি। রাতে যখন ব্যথা উঠবে তখন বুঝবে আমি কী জিনিস।'
'কয়জন মিলে মেরেছে তোকে?'
'পাঁচজন। একলা একজনকে মারার জন্য পাঁচজন একসাথে আসে। একা আসতে পারে না? ভীতুর দল।' বলেই রনি হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। রহিম তাকে সান্ত্বনা দেবার আগেই সে চোখ-মুখ মুছে চলে গেল।
সেদিন রাতে ওদের কিছু হোক বা না হোক রনির ঠিকই হলো। এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়ল যে তাকে শেষমেশ হাসপাতালে ভর্তি করতে হলো। খবর পেয়ে রহিম ছুঁটে গেল রনির খালার বাসায়। ওখানেই সে থাকে।
রনি বিছানায় শুয়ে আছে। কথা বলতে পারছে না। চোখ খুলতেও পারছে না। শক্ত হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। খালা চোখের জলে গাল ভাসাচ্ছেন। খালু গাড়ি আনতে গিয়েছেন। রনিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে।
খালু রনিকে কোলে করে গাড়ি পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। তখন রনি এক মুহূর্তের জন্য চোখ খুলল। ভাঙা ভাঙা গলায় বলল, 'ভাবছিস আমি মরে যাব? তোকে অনেক কিছু বলার আছে। সেগুলো না বলে আমি মরব না।'
রাতের তখন সাড়ে এগারো। রহিম ঘুম থেকে কেঁপে উঠল। তখনই মনে হলো, সেদিন আরু মহলে কিছু একটা দেখেছে সে। হতে পারে বিষাক্ত কোনো সাপ। সাপটির গা থেকে আলো ছড়াচ্ছিল।
সব ভুলে বালিশে মুখ গুঁজল। ঘুম এল না। বারোটা বাজল। তারপর সারে বারো। একসময় সে স্থির করল, আরু মহলে যাবে। এক্ষুনি যাবে।
রহিম জানালার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এল। সঙ্গে ধারালো ছুরিটা নিলে ভালো হত। কিন্তু বালিশের নিচে সেটা নেই। কোথায় রেখেছে তা-ও মনে পড়ছে না। তবে হাতঘড়ি সঙ্গে এনেছে। ঘড়িতে বোতাম টিপলে লাল-নীল আলো জ্বলে। সেটা অন্ধকারে কাজে দেবে।
হঠাৎ রহিমের মনে হলো সামনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছেন। এতক্ষণ সে মাথা নিচু করে হাঁটছিল। সামনে কারোর উপস্থিতি বুঝতে পেরে মাথা উঁচু করে তাকাল।
সামনে ভূত থাকলেও হয়তো অতোটা ভয় লাগত না, যতটা ভয় বাবাকে দেখে লাগছে। তিনি চোখ বড়ো বড়ো করে রহিমের দিকে তাকিয়ে আছেন। বাঁ হাতে লম্বা টর্চ। সেটা জ্বালাচ্ছেন নিভাচ্ছেন। জ্বালাচ্ছেন নিভাচ্ছেন।
'হারামজাদা কই যাচ্ছিলি?' বাবা বাজখাঁই কণ্ঠে বললেন।
রহিম জবাব দিলো না। মাথা নিচু করে চুপ করে রইল। বাবা এদিক ওদিক খুঁজে একটা কাঠের টুকরো নিয়ে এসে বললেন, 'বল, এত রাতে কই যাচ্ছিলি?'
রহিম বুঝতে পারল জবাব না দিলে মার খেতে হবে। তাই হাত পা শক্ত রেখে চুপ করে রইল। বাবা আরো একবার জিজ্ঞেস করেই কাঠের টুকরো দিয়ে পা বরাবর এক ঘা বসিয়ে দিলেন। রহিম উঁঃ পর্যন্ত করল না। দাঁতে দাঁত চেপে রেখে চুপ করে রইল। পায়ের ব্যথায় চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল।
বাবা আরো কয়েক দফা বসিয়ে দিলেন রহিমের পায়ে। রহিম এবার মাটিতে পড়ে গেল। বাবা তার কলার ধরে টেনে তুলে গাল বরাবর চড় বসিয়ে বললেন, 'বল কই যাচ্ছিলি?'
তখন বাবার হাতের টর্চ রহিমের গালে এত জোরে লাগল, গাল থেকে টকটকে লাল রক্ত বেরিয়ে এল।
একটা দাঁত ভেঙে পড়েছে কি?
রহিম কাঁদোকাঁদো গলায় বলল, 'আর মের না, বাবা।'
বাবা তবুও মারলেন। কাটা গালে। সেই ভাঙা দাঁতের ওখানে। চড় খেয়েই রহিম চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
(চলবে)
মো. ইয়াছিন
গত পর্বের লিংক : https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=268548608312718&id=100054727422264
আমার একটি ছোট্ট গ্রুপ আছে। সেখানে যুক্ত হবার আমন্ত্রণ রইল।
লিংক : https://www.facebook.com/groups/505083747151714/?ref=share