মিশন ফেয়ার প্লে — পর্ব ৪
ইয়াছিন নাইম২৯ জানুয়ারি ২০২৫৫ মিনিট পড়া'চলো আমাদের সাথে।' বিশালদেহী লোকটা আবারও বলল।
আব্দুর রহিম ঝাঁজালো কণ্ঠে বলল, 'যাব না। যা করার করো, আমি কোথাও যাব না। গুলি করবে? করো গুলি। এখনি করো। তবুও যাব না।'
রনি বলল, 'পাগলামো করিস না। আমরা যা করছি, তোর ভালোর জন্যই করছি। ভালো চাস তো আমাদের কথা শোন। তোকে আমরা একটি সেইফ জায়গায় রাখব। যাতে করে লুৎফরের ভাড়াটে খুনিরা তোকে খুঁজে না পায়।'
'পেয়ে গেলে পাক। আমিও দেখি তার কত শক্তি।'
বিশালদেহী লোকটা বলল, 'আমি কিন্তু তোমাকে আঘাত করতে বাধ্য হব।'
'আচ্ছা তাই? আমি কি তাহলে বসে থাকব? চিৎকার করব না? চিৎকার করলে তোমাদের এই সিক্রেট মিশন আর সিক্রেট থাকবে?'
আব্দুর রহিমের কথার জবাব কেউ দিলো না। সে সোজা হাঁটতে হাঁটতে চলে এল। রনি একবার পিছন থেকে ডাকল, 'রহিম, ফিরে আয়। বড়ো রকমের বিপদ হবে কিন্তু।'
সে কথা কানে নিল না। মাথা নিচু করে চলতে লাগল। বিকেল পড়ে এসেছে। কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যা নামবে। রাতের নিঃস্তব্ধতায় সাড়া দিয়ে সবাই যখন ঘুমের রাজ্যে গা এলিয়ে দেবে, ঠিক তখনই আব্দুর রহিম বদলা নিতে বেরিয়ে পড়বে। সমস্ত ঘৃণা মিটিয়ে একসময় সে কাঁদতে বসবে। বহুদিন সে মন খুলে কাঁদে না। আজ চোখের জলে সব দুঃখ কষ্ট দূর করে দেওয়া যাবে।
বাবা জরুরী কাজে ঢাকা গিয়েছেন। দু'দিন বাদে ফিরবেন। আব্দুর রহিম তার ঘরে একা। অন্ধকারে বিছানার উপর বসে আছে। হাতে রিতার একটি ছবি।
আব্দুর রহিম দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। স্কুল টিচার তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'বড়ো হয়ে কী হতে চাও?'
সে স্বাভাবিক ভাবেই জবাব দিয়েছিল, 'একজন আদর্শ খুনি হতে চাই, স্যার।'
মুহূর্তেই শ্রেণীকক্ষ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। স্কুল টিচার সোজা হেড স্যারের নিকট নালিশ করে বসলেন। আব্দুর রহিম অনেক্ষণ ভেবেও বুঝতে পারল না, সে তো খারাপ কিছু বলেনি। একজন আদর্শ খুনি হতে চেয়েছে। যে খুনি পাপিষ্ঠদের বধ করবে। তা হলে স্যার তার বিরুদ্ধে নালিশ করলেন কেন?
রাতের এগারোটা। আঁধারে ঢাকা আরু মহলের নিস্তব্ধতায় আঁচড় কেটে কারা যেন ফিসফিস করে কথা বলছে। আব্দুর রহিম এক পা এক পা ফেলে এগিয়ে যেতে লাগল। ভাঙা দেয়ালের ওপাশে তিন জন লোক। একজনক লুৎফর। বাকি দু'জন অচেনা। তারা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে শুনছে। আর লুৎফর তাদেরকে উদ্দেশ্য করে কী যেন বলছে। কথাগুলো অস্পষ্ট। তবে হাত পা নাড়াচাড়া দেখে বোঝা যাচ্ছে, লুৎফর তাদের ধমকাচ্ছে।
রহিম ঠিক করল, সে আরো একটু এগিয়ে যাবে। যাতে ওদের কথা শোনা যায়। মহলের ভেতরেই বিশাল বড়ো গাছ। সেই গাছের আড়ালেই লুকাতে চাচ্ছিল। কিন্তু গাছের গোড়ায় একটা ব্রিফকেস রাখা ছিল, সেটা অন্ধকারে খেয়াল করেনি। যার ফলে ব্রিফকেসটা পায়ের আঘাতে দুম করে মাটিতে আছড়ে পড়ল। লুৎফর এবং বাকি লুকদু'টো তখনই আব্দুর রহিমকে দেখে ফেলল। একজন পকেট থেকে কী যেন একটা বের করল। সেটা হাতে তুলে নিতেই ঘটল আশ্চর্যজনক ঘটনা। চোখের পলকে ধারালো ছুরি বেরিয়ে এল। একজন লোক সেই ছুরি নিয়ে এগিয়ে আসতে লাগল। ঠিক সেই সময় রহিম দু'হাত দিয়ে শক্ত করে পিস্তল ধরে লোকটার বুক বরাবর গুলি চালিয়ে দিলো। লোকটা ধপাস করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ভাগ্যিস, রনির দেহরক্ষীর পকেট থেকে পিস্তলটা চুরি করে এনেছে সে। না হলে তো এখনই লোকটার হাতে মারা পড়তে হত!
অন্য লোকটা বলল, 'এই ছোকরা, পিস্তল পেলি কই? দেখি এদিকে দে।' বলে এগিয়ে আসতে লাগল। আব্দুর রহিম জানে, কাছে এসেই সে পিস্তল ছিনিয়ে নেবে। তারপর সেই পিস্তল দিয়েই তাকে নির্দ্বিধায় হত্যা করবে।
লোকটা কাছে আসার আগেই আব্দুর রহিম দ্বিতীয় বার গুলি চালাল। এই লোকটার কপাল খারাপ। বুকে গুলি করতে চেয়েছিল। হাত কেঁপে গিয়ে মাথায় লেগেছে। এবার শুধু বাকি আছে লুৎফর। কিন্তু তাকে সহজ মৃত্যু দিলে চলবে না। তাকে নির্মম ভাবে মারতে হবে। যেন সে মরতে মরতে পস্তাতে পারে, নিজের কৃতকর্মের জন্য।
'এই ছেলে, কী চাস? কী চাস তুই, বল আমাকে।' লুৎফর বলল।
'আমি চাই তোর লাশ। তোর রক্তাক্ত লাশ চাই শয়তান।'
'আমার লাশ? আমি তোর কী ক্ষতি করেছি?'
'তুই আমার বোনকে মেরেছিস। এবার আমি তোকে মারব।'
'আমাকে মেরে ফেললে তোর বোন ফিরে পাবি? ফিরে পেলে মার। আমি বাধা দেব না।'
'সেটা কোনোভাবে সম্ভব?'
'সম্ভব না তো? এজন্যই বলছি, আমার কথা শোন। আমি তোকে অনেক টাকা দেব। অনেক। তুই শুধু আমার হয়ে কাজ করবি। পারবি না?' বলে লুৎফর দু'পা এগিয়ে এল।
'এগোবি না। এগোবি না বললাম। নাহলে কিন্তু এখনই গুলি করব।'
'আচ্ছা আচ্ছা। এগোব না। আমাকে শুধু এটা বল, তোর বোন কোনটা? আমি তো অসংখ্য মেয়েকে খুন করেছি।'
'কয়েক মাস আগে যাকে হত্যা করে পানিতে ফেলে দিয়েছিলি।'
'সেই বাচ্চা মেয়েটা?'
'মাত্র নয় বছর বয়স ছিল। কেন মারলি তাকে? সে তো কারোর ক্ষতি করেনি..'
'মারতে চাইনি। সত্যিই মারতে চাইনি। দড়ি দিয়ে শক্ত করে মুখ বেঁধে ফেলেছিলাম। যাতে চেঁচাতে না পারে। কিন্তু সে নাছোরবান্দা। মুখ বাঁধা অবস্থায় চিৎকার করতে লাগল। আমার মাথায় রাগ চেপে গেল তখনই। হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলাম। বাচ্চা মানুষ। বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারেনি। আমার একটু মায়া হলো। ততক্ষণে সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। মৃত মানুষকে তো আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব না। প্রমাণ মিটিয়ে পুকুরের জলে ফেলে দিয়ে এলাম।'
'মায়া হয়েছিল? তোর মতো জানোয়ারের মায়া হয়?' আব্দুর রহিম লুৎফরের কপাল বরাবর পিস্তল তাক করল।
লুৎফর বুলেট গতিতে ছুটে এসে থাবা মেরে আব্দুর রহিমের হাত থেকে পিস্তল ফেলে দিলো। কিছু বুঝে উঠার আগেই হাতের ধারালো ছুরি গলা বরাবর চালিয়ে দিলো। আব্দুর রহিম তৎক্ষণাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। দু'হাত দিয়ে গলা চেপে ধরেও রক্ত আটকানো গেল না। হাতের আঙুল বেয়ে টপটপ করে টলটলে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল।
লুৎফর রহিমের মাথার কাছে হাঁটু গেঁড়ে বসে বলল, 'আমাকে মারবি বলেছিলি? মার এবার। মার না। দেখি কতটা সাহস তোর। বড়ো বড়ো রাঘব বোয়াল আমার চুল ছিঁড়তে পারেনি। আর তুই পুঁচকে ছেলে আমাকে মারবি? এতই সোজা, অ্যা?'
আব্দুর রহিম কিছু বলতে পারল না। তার পুরো শরীর কাঁপছে। ধীরে ধীরে চোখদু'টো ঝাপসা হয়ে আসছে। তাকিয়ে থাকার মতো শক্তি তার নেই। তবুও গলার কেটে যাওয়া অংশে দু'হাত চেপে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করল।
লুৎফর তার হাত টেনে নিয়ে ধারালো ছুরি দিয়ে একটি আঙুল হাত থেকে আলাদা করে ফেলল। আব্দুর রহিম প্রতিবাদ করতে পারল না। চিৎকার করতেও পারল না। নীরবে চোখের দু'ফোঁটা জল ফেলল।
লুৎফর খিকখিক করে হেসে বলল, 'আমাকে মারবি বলেছিলি না? এবার আমি তোকে দেখাব, মৃত্যু কাকে বলে।'
আব্দুর রহিমের আরো একটি আঙুলে ছুরি চালাল। ঠিক তখনি একদল সশস্ত্র বাহিনী চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল। একজন লুৎফরের হাত থেকে ছুরি কেড়ে নিল। তারপর তাকে টেনে দাঁড় করিয়েই পিস্তল দিয়ে মাথায় আঘাত করল। লুৎফর মাটিতে পড়ে গেল। কেউ একজন টর্চ লাইট নিয়ে এগিয়ে এসে আব্দুর রহিমের মুখোমুখি বসল। রহিম শেষবারের মতো চোখ খুলে দেখল, তার সামনে টর্চ হাতে রনি বসে আছে। তার চোখে জল টলোমলো করছে।
আনন্দপুর গ্রামে কিশোরী ধর্ষণ।
পত্রিকায় হেডলাইন পড়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল আব্দুর রহিম। রনির দিকে একবার ফিরে তাকাল। সে ঘাসের বুকে বসে আকাশের চাঁদে দৃষ্টি রেখেছে।
আব্দুর রহিম বলল, 'মেয়েটার কী অবস্থা?'
রনি উদাসীন ভাবে বলল, 'বেঁচে আছে। তবে ভালো নেই।'
'কোথায় আছে?'
'হাসপাতালে।'
'দেখতে যাবি?'
'হ্যাঁ, চল।'
'পরে যাব। মেয়েটির এই অবস্থার জন্য যারা দায়ী, তাদের সব ক'টাকে মেরে তারপর যাব।'
'তাদের অ্যারেস্ট করা পর্যন্তই আমাদের কাজ। বাকিটা আদালত দেখবে।'
'তুই আমাকে এসব শোনাচ্ছিস, রনি? লুৎফরের কথা মনে আছে? তুই নিজ হাতে তাকে গুলি করেছিলি। পরপর চারটা গুলি একদম বুক বরাবর বসিয়ে শান্ত হয়েছিলি, মনে নেই?'
'আছে। সব মনে আছে।'
'তা হলে?'
'চল।'
'কোথায়?'
'খুন করতে।'
'অ্যারেস্ট করবি না?'
'না।'
'সত্যি বলছিস? সত্যি খুন করবি তো?'
'হ্যাঁ, একটাকেও বাঁচতে দেব না।'
'কিন্তু কেন?'
'কারণ, ধর্ষকের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।'
(সমাপ্ত)
মো. ইয়াছিন
গত পর্বের লিংক : https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=276158774218368&id=100054727422264