এক আকাশের চাঁদ — পর্ব ৪
ইয়াছিন নাইম২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫৪ মিনিট পড়াওয়্যারড্রোবের এক কোণে ছবিটা পড়ে ছিল।
ছবিতে পনেরো-ষোলো বছরের একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে টকটকে লাল টি-শার্ট। মাথায় এক ঝাকড়া চুল। হাতে ক্রিকেট ব্যাট। হৃদি ছবির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। তবে হাসিটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। চিৎ হয়ে শুয়ে দু'হাত দিয়ে চোখের সামনে ছবি ধরে রাখল।
ছবির ছেলেটা তার কেউ নয়। তবু মনে হয় বড়ো আপন। বড়ো প্রয়োজন তাকে এ জীবনে। কিন্তু এসব ভাবনার কোনো মানে হয় না। হৃদি তাকে বহু বছর আগে দেখেছিল। তখন সে ক্লাস সিক্সে পড়ে। স্কুলে যাওয়ার সময় ছেলেটাকে দেখা যেত। রাস্তার পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে মনমরা হয়ে বসে আছে। প্রতিদিন একা একা বসে থাকত। কোনো দিকে তাকাত না। কারো সাথে কথাও বলত না। কয়েকদিন দেখার পর হৃদির কৌতূহল জাগল। একবার সে সাহস করে ছেলেটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল, 'সব সময় এভাবে চুপ করে বসে থাকো কেন?'
ছেলেটা মুখ ভার করে বলল, 'আমার মা নেই।'
হৃদির তখনই বুঝে ফেলা উচিৎ ছিল। কিন্তু সে বুঝল না। বোঝার বয়স তার ছিল না। সে দ্বিতীয় বার প্রশ্ন করল, 'কোথায় তোমার মা?'
ছেলেটা কিছু না বলে হাত তুলে আঙুল দিয়ে আকাশের দিকে ইশারা করল। হৃদি ভাবল, হয়তো প্লেনে করে কোথাও গিয়েছেন। তাই সে বলল, 'কোন দেশে গিয়েছেন?'
ছেলেটা এবার মুখ তুলে তাকাল। বলল, 'না ফেরার দেশে। যেখান থেকে কেউ কখনো ফিরে আসে না। কিন্তু আমি আমার মা'কে চাই। মা'কে ছাড়া আমি ঘুমাতে পারি না।' বলে পাগলের মতো হয়ে গেল। কেমন যেন হাঁসফাঁস করতে লাগল। হৃদি তখন ভয় পেয়ে গেল। সে দ্রুত ছেলেটার সামনে থেকে চলে গেল।
তখন সে জানত না, ছেলেটার সাথে এই তার শেষ দেখা। এরপর আর তাকে খুঁজে পাবে না।
পরদিন যখন হৃদি স্কুলে যাচ্ছিল, দেখল রাস্তায় ছেলেটা নেই। তার বাসা চিনত। সোজা চলে গেল সেখানে। স্থির করল, বাসায় গিয়ে খোঁজ নেবে। কিন্তু বাসার গেটে তালা ঝুলে থাকতে দেখে তার সব আশা নিরাশায় পরিণত হলো। এরপর দিনের পর দিনের পর দিন গেল। মাসের পর মাস। ছেলেটাকে আর দেখা গেল না। এলাকায় তার আত্মীয় স্বজন বলতেও কেউ ছিল না। ছিল শুধু তার বাবা। হৃদি পরে জানতে পেরেছিল, ছেলের পাগলামো অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় তার বাবা নাকি সেদিন রাতেই বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। কোথায় গিয়েছিলেন, তা সে আজ পর্যন্ত জানতে পারেনি।
জুলি আসতেই হৃদি ছবিটা আড়াল করে নিল। জুলি হৃদির পাশাপাশি বসে বলল, 'আপা, তোদের বিয়ে হয়নি?'
হৃদি হকচকিয়ে উঠল, 'কী বলছিস?'
'আমি জানি, তোদের বিয়ে হয়নি।'
'কীভাবে জানিস?'
'তুই যখন ফোনে কথা বলছিলি তখন শুনেছি।'
'তোকে কে বলেছে লুকিয়ে লুকিয়ে আমার কথাবার্তা শোনার জন্য?'
'আপা, ধমক দিলে কিন্তু আমি সবাইকে বলে দেব।'
'তুই কি চাস, এ বাড়িতে আবার গন্ডগোল হোক?'
'না।'
'তা হলে?'
'কিন্তু তুই আমাকে ধমক দিবি না।'
'আচ্ছা, দেব না।'
'আপা, একটা কথা বলি?'
'বল।'
'প্লাবন ভাইয়াকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। দুলাভাই হিসেবে আমার তাকেই চাই।'
'পাকামো করছিস কেন? যা এখান থেকে।'
'আমি কিন্তু সবাইকে বলে দেব।'
'আচ্ছা, আর ধমক দেব না। তুই যা। আমাকে একটু একা থাকতে দে।'
'যাচ্ছি। ভেবে দেখিস কিন্তু।'
'কী ভেবে দেখব?'
'দুলাভাইয়ের ব্যাপারটা।'
'তুই যাবি?'
'যাচ্ছি যাচ্ছি।'
হৃদি পুরনো ছবিটা যত্ন করে ওয়্যারড্রোবের কোণে রেখে দিলো। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজেকে চেয়ে দেখল। কত বড়ো হয়ে গেছে সে। কতটা বছর কেটে গেছে। অথচ, অচেনা অজানা একটা মানুষকে এখনও ভাবতে হচ্ছে। এখনও তার কথা মনে হলে মনের ভেতর তীব্র হাহাকার শুরু হয়। বুকে গভীর নিঃশ্বাসের ঢেউ উঠে। মানুষটাকে এক নজর দেখার জন্য প্রবল তৃষ্ণা পেয়ে বসে। কিন্তু কেন? কেন এমন হয় তার? ছেলেটা তো তার কেউ ছিল না! তবে কেন?
এইসব প্রশ্নের কোনো মানে নেই। তবু ভাবতে হয়। না চাইতেও অচেনা মানুষটা বারবার মনের আঙিনায় উঁকি দেয়। হৃদির চারপাশ তখন বিষাদের দেয়ালে ঢেকে যায়। আচ্ছা, কখনো কি তার সাথে দেখা হবে? মন খুলে দু'টো কথা বলার সুযোগ হবে? নির্জন রাস্তায় দু'জন পাশাপাশি হাঁটার বিন্দুমাত্র সৌভাগ্য হবে? হৃদি তা জানে না। শুধু জানে, অচেনা সেই মানুষটির প্রতি সে একটু দূর্বল। একটু নয়, একটু বেশিই দূর্বল। এই দূর্বলতার অবসান কবে, কে জানে!
বাবা হৃদির ঘরে উঁকি দিয়ে বললেন, 'হৃদি, তোর ফোন নাকি বন্ধ?'
'হ্যাঁ, বাবা।'
'কেন, কী হয়েছে?'
'কিছু হয়নি। চার্জ শেষ।'
'ওঃ, আচ্ছা। এই নে, জামাই।'
হৃদি ফোন হাতে নিল, 'আবার কী সমস্যা?'
ওপাশ থেকে, 'সমস্যা নয়। সুখবর দেবার জন্য ফোন করেছি। সুখবরটা শুনুন।'
'বলুন।'
'মিনি ফিরে এসেছে।'
'মিনি কে?'
'মিনি, আমার বেড়াল। পরশু হারিয়ে গিয়েছিল। আজ আবার ফিরে এসেছে। আমি ওকে কত খুঁজেছি, জানেন?'
'এই আপনার সুখবর?'
'হ্যাঁ।'
'এটা জানানোর জন্য ফোন করেছেন?'
'অবশ্যই।'
'আচ্ছা, আপনার কি আর কাজকাম নেই? শুধু শুধু বারবার ফোন দিয় বিরক্ত করছেন কেন বলুন তো?'
'আহা, আপনি বুঝতে পারছেন না।'
'কী বুঝতে পারছি না?'
'নতুন বিয়ে হয়েছে। এখন বর তো তার বউকে ফোন দিয়ে জ্বালাবেই। এটাই তো স্বাভাবিক। সে যদি ফোন না দেয়, সেটা হবে অস্বাভাবিক।'
'কিন্তু আমাদের বিয়ে হয়নি।'
'ও তাই বুঝি? সেটা আপনার মা বাবা জানেন?'
'না।'
'তাদের চোখে ব্যাপারটা স্বাভাবিক রাখার জন্যই বারবার ফোন দিচ্ছি। আপনি কোথায় আমাকে ধন্যবাদ জানানোর দরকার উল্টো ধমক দিচ্ছেন।'
'রাখছি।'
'না না, এখনই রেখে দেবেন না।'
'কেন?'
'দেখুন তো, আপনার বাবা আশেপাশে আছেন কি না?'
'নেই। বাবা চলে গেছে।'
'দেখেছেন? বাবাও জানেন, আমাদের কথোপকথন লম্বা সময় চলবে। এখন যদি আপনি ফোন রেখে দেন, বাবার মনে সন্দেহ জাগবে না?'
'জাগতেও পারে।'
'এজন্যই। এজন্যই বলছি, ফোন রাখবেন না। আরো কিছুক্ষণ কথা বলি।'
'কিন্তু আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।'
'আপনি শুধু ফোন কানের কাছে ধরে রাখুন। আমি বলছি।'
'বলুন।'
'আপনি গান গাইতে পারেন? কী হলো, বলছেন না কেন? আপনি গান গাইতে পারেন?'
'আপনিইতো বললেন, আমাকে কিছু বলতে হবে না।'
'তা তো বলেছি। শুধু হাঁ না'তে জবাব দিলেই চলবে। এবার বলুন আপনি গান গাইতে পারেন কি না।'
টুট টুট টুট করে ফোন কেটে গেল। মুখের উপর ফোন রেখে দেওয়া আর অপমান করার মাঝে পার্থক্য নেই। অপমানিত হয়েও প্লাবনের মন খারাপ হলো না। সে ঠোঁট ফাঁক না করে মুচকি হাসল। লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে ফোন টেবিলের উপর রাখল। এয়ার কন্ডিশন চালু করে রিভলভিং চেয়ারে গা এলিয়ে দিলো।
(চলবে)
মো. ইয়াছিন
গত পর্বের লিংক : https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=279595460541366&id=100054727422264