এক আকাশের চাঁদঅতিপ্রাকৃত

এক আকাশের চাঁদ — পর্ব ৫

ইয়াছিন নাইম৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫৬ মিনিট পড়া

অফিসকক্ষটা বিশাল বড়ো। পায়ের নিচে মেরুন কার্পেট বিছানো। বাঁ দিকে কাচের জানালা। পরদা সরিয়ে দিলেই আটতলার উপর থেকে পুরো শরহটাকে এক নজর দেখে নেওয়া যায়। প্লাবন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ধীর পায়ে জানালার কাছে এগিয়ে গেল। তবে পরদা সরাল না। পরদার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে হঠাৎ উদভ্রান্তের মতো ছুটে এল। চেয়ারে বসে টেবিলের পেপার ওয়েট এদিক সেদিক করল। হাতের কাছের ড্রয়ার টান দিয়ে খুলল। ড্রয়ার থেকে সাদা খাম তুলে নিতেই খামের নিচে থাকা পিস্তল চোখে পড়ল। প্লাবন সেদিতে মনোযোগ দিলো না। খামটা হাতে নিয়ে টেবিলের উপর রাখল।

টেবিলের ওপাশে ওসি সাহেব বসে আছেন। তিনি ইতস্তত করতে করতে খামের দিকে তাকালেন। যেন তিনি সেটা নিতে চাচ্ছেন না। অসুবিধেয় পড়ে নিতে হচ্ছে। প্রতিবারই তিনি এমন করেন। শুধুমাত্র এই খামের জন্য মাসের শুরুতে অফিসে চলে আসেন। প্লাবন টাকার খাম এগিয়ে দিতেই তিনি কাঁচুমাচু হয়ে হাতে তুলে নেন। তারপর কৃতজ্ঞতা স্বরুপ হেসে চলে যান। কিন্তু আজ তিনি যাচ্ছেন না। খামটাও হাতে তুলে নিচ্ছেন না। মনে হচ্ছে তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে প্লাবনকে দেখছেন।

'ভাই, কী হয়েছে আপনার বলেন তো?' ওসি সাহেব বললেন।

প্লাবন বলল, 'কিছু হয়নি।'

'বেয়াদবি নিবেন না। আপনাকে এতদিন যেমন দেখেছি, আজ কিন্তু তেমন লাগছে না। একটু অন্যরকম লাগছে।'

'কীরকম?'

'সত্যিটা বলব?' ওসি সাহেব ভ্রু কুঁচকালেন।

'হ্যাঁ, সত্যিটাই বলুন।'

'আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, আপনি প্রেমে পড়েছেন।'

প্লাবন কিছু বলল না। গম্ভীর ভাব নিয়ে বসে রইল। ওসি সাহেব বললেন, 'আমি ভুলও হতে পারি।'

'ভুল নন। আমি বোধহয় প্রেমেই পড়েছি।' প্লাবন চিন্তিত ভাব নিয়ে বলল।

ওসি সাহেব খুশিতে গদগদ হয়ে বললেন, 'সে তো ভালো খবর! মিষ্টি খাওয়ান।'

'ভালো খবর না ছাই! সে তো আমাকে পাত্তাই দিচ্ছে না।'

'কী বলেন!' ওসি সাহেব ভড়কে গেলেন। 'আপনার মতো মানুষকে পাত্তা দিচ্ছে না! কী নাই আপনার? টাকা-পয়সা, বাড়ি-গাড়ি সবই তো আছে। তাছাড়া, আপনি কি দেখতে কম সুন্দর? আপনার কাছে তো সিনেমার নায়কেরাও হার মানবে।'

'বলছেন?'

'হ্যাঁ, বলছি। শুধু আমি কেন, যে কাউকে জিজ্ঞেস করেন। সবাই একই কথা বলবে। তবে আমার একটু খটকা লাগছে।'

'খটকা? কীরকম?'

'আপনার মতো একজন মানুষ প্রেমে পড়তে পারে, তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। না মানে, আপনার সাথে আমার পরিচয় কম করে হলেও পাঁচ বছরের হবে। সব সময় গম্ভীর ভাব নিয়ে থাকতে দেখেছি। প্রয়োজনের বেশি একটা কথাও বলতেন না। আর সেই আপনি...' তিনি কথাটা শেষ করলেন না। ইচ্ছে করেই অসম্পূর্ণ রেখে দিলেন।

'সবকিছু পরিকল্পিত ভাবে হবে, তা তো নয়।'

'এইটা ঠিক বলেছেন।'

'আচ্ছা, ওসি সাহেব...'

'বলেন, ভাই।'

'আপনি তো বিবাহিত। তাই না?'

'হ্যাঁ।'

'তাহলে তো এ ব্যাপারে আপনার অভিজ্ঞতা আছে?'

'কোন ব্যাপারে?'

'এই ধরুন, মেয়েদের মন বোঝা, তাদের খুশি করা, তাদের চাওয়া না চাওয়া আন্দাজ করতে পারা এইসব।'

'মেয়েদের মন কোনো পুরুষের পক্ষেই বোঝা সম্ভব না। এসব বিষয়ে আমি একদম কাচা। হে হে হে!'

'তবুও। একটু হলেও তো ধারণা আছে!'

'তা আছে।' ওসি সাহেব হাত কচলাতে কচলাতে বললেন।

'একটু হলেই চলবে। আপনি আমাকে বলুন, ওঁকে খুশি করি কীভাবে? সে আমার উপর রেগে আছে। তার রাগ ভাঙাতে কী কী করতে পারি?'

ওসি সাহেব একটু ভাবলেন। তারপর ধীর গলায় বললেন, 'মেয়েরা ফুল আর চকোলেট ভালোবাসে। আপনি ফুল আর চকোলেট দিয়ে স্যরি বলতে পারেন।'

'এতে কাজ হবে?'

'হবে, ইনশাল্লাহ।'

'থ্যাংকস্।'

ওসি সাহেব বিনীত ভঙ্গিতে হাসলেন। টেবিলের উপর থেকে সাদা খাম হাতে নিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বেরিয়ে যাবার আগে একবার ফিরে তাকিয়ে বললেন, 'বেয়াদবি মাফ করবেন। সেদিন রাতে বখাটেদের হাত থেকে যে মেয়েটিকে বাঁচিয়েছিলেন, তিনিই আমাদের ভাবি?'

প্লাবন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'হুঁ।'

রুবেল কাচের দরজা ঠেলে বলল, 'স্যার, আপনার ফোন বাজছে।' সে অফিসের কর্মচারী।

প্লাবন বলল, 'আমার ফোন তোমার কাছে গেল কী করে?'

'বাথরুমে ফেলে এসেছিলেন, স্যার। সেখান থেকে নিয়ে এলাম।'

'ওঃ, দাও।'

রুবেল ফোন দিয়ে চলে গেল। তেত্রিশ মিসড্ কলস্। বাবা এতগুলো কল দিয়েছেন! এনি ইমার্জেন্সি? ফোন বাজার সাথে সাথেই বাবা রিসিভ করলেন। চেঁচিয়ে বললেন, 'কই থাকিস তুই? এতগুলো ফোন দিলাম, কানে যায় না?'

'ফোন বাথরুমে ফেলে এসেছিলাম, বাবা...'

'হ্যাঁ, এবার তো কত বাহানা বানাবি! থাক, বাদ দে। আসল কথায় আসি। আমি দেশে ফিরছি। এবার কিন্তু তোর বউ না দেখে আমার নিস্তার নেই। বয়স তো আর কম হলো না। কখন কী হয়, বলা যায় না। আমার তো এই একটাই ছেলে। ছেলেবউ আর নাতি-নাতনি না দেখেই যদি মরতে হয়?'

প্লাবন বাবাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, 'কী বলছো বাবা!'

'ঠিকই বলছি। এবার দেশে ফিরেই কনে দেখতে যাব। মোটকথা তোকে বিয়ে করতেই হবে। কোনো রকম বাহানা চলবে না।'

প্লাবন হাসল, 'আচ্ছা আচ্ছা, তোমার যা ইচ্ছে তাই হবে।'

'সত্যি বলছিস তো?'

'হ্যাঁ, সত্যি। আর শোনো, মেয়ে দেখতে হবে না। মেয়ে আমার দেখাই আছে। তুমি শুধু পছন্দ করবে।'

'কী বলিস! সত্যিই মেয়ে দেখে রেখেছিস? না কি আমাকে বোকা বানাচ্ছিস?'

'না বাবা, সত্যিই।'

'যাক, শান্তি পেলাম। আমি তবে কালকেই আসছি।'

'কাল!' প্লাবন চমকে উঠল।

'কেন, কাল এলে তোর সমস্যা হবে?'

'না বাবা, সমস্যা হবে কেন! তুমি কালকেই এসো।'

সন্ধ্যের পর থেকে হৃদির মন খারাপ। কারণ ছাড়াই মন খারাপ। আজকাল প্রায়ই এমন হয়। বিনা কারণে মন খারাপ হয়ে যায়। হৃদি দরজা আটকে আলো নিভিয়ে নিজের ঘরে শুয়ে ছিল। জুলি দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, 'আপা, দরজা খোল। দুলাভাই এসেছে।'

এতক্ষণ তার মন খারাপ ছিল। জুলির কথা শুনে মেজাজটাও খারাপ হয়ে গেল। সে চেঁচিয়ে কিছু একটা বলতে চাইছিল। শেষমেশ বলল না। উদাসীন ভাবে উঠে দাঁড়াল। টলতে টলতে গিয়ে দরজা খুলল। ওপাশে প্লাবন একগাদা ফুল আর চকোলেট হাতে নিয়ে শক্ত পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। একটুও নড়ছে না। তার ন্যাকামো দেখে হৃদি আরো ক্ষেপে গেল। তার কলার ধরে টেনে ঘরের ভেতর নিয়ে দরজা আটকে দিলো। ফিরে তাকাদেই দেখল, প্লাবন হাঁটু গেঁড়ে মাটিতে বসে ফুল আর চকোলেট এগিয়ে দিয়েছে। হৃদি সেগুলো কেড়ে নিয়ে ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলল। ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, 'সমস্যা কী আপনার? কী সমস্যা?'

'কই? কোনো সমস্যা নেই তো!'

'তাহলে এভাবে বাসায় চলে আসার মানে কী?'

'কী করব বলুন? আপনি তো ব্লক করে রেখেছেন। ফোন দিতে পারছিলাম না। তাই সরাসরি চলে এলাম।'

হৃদি লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস নিতে লাগল। প্লাবন বলল, 'সোজা কথায় আসি। আমি আবার ঘুরিযে পেঁচিয়ে কথা বলতে পারি না। আমার একটা হেল্প লাগবে।'

'এবার বলবেন, খুব বিপদে পড়ে এসেছেন। এক্ষুণি কিছু টাকা দিতে হবে। এইতো?'

'এক্সাক্টলি! এটাই বলতাম, যদি আমার টাকার দরকার হত।'

প্রথমে হৃদি একটু ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু পুরো কথা শুনে সে কেমন যেন চুপসে গেল। নিচু গলায় বলল, 'তা হলে?'

'শোনো বউ, আমি একটা ভুল করে ফেলেছি। এই ভুলের মাশুল এখন তোমাকে দিতে হবে।'

কথাটুকু শুনে হৃদি যেন আকাশ থেকে পড়ল। বলল, 'কী যা তা বলছেন! মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি আপনার?'

'মাথা ঠিক আছে। রিহার্সেল করছিলাম।'

'মানে কী!'

'মানে বলছি। আপনি এভাবে উত্তেজিত হয়ে থাকলে বলতে পারব? স্বাভাবিক হোন, বলছি।'

'বলুন।'

'বাবা কাল দেশে ফিরবেন। তিনি বায়না করেছেন, এবার আমার বিয়ের জন্য পাত্রী ঠিক করে তবেই ফিরে যাবেন। অথচ আমি মুখ ফসকে বলে ফেলেছি, পাত্রী দেখে রেখেছি। এবার কী হবে বলুন তো?'

'আপনার কথার মানে হলো, আমাকে পাত্রী সেজে আপনার বাবার সামনে হাজির হতে হবে?'

'ঠিক ধরেছেন। এত বুদ্ধি রাখেন কোথায়, বলুন তো? আমি শুনেছিলাম, সুন্দরী মেয়েরা বোকাসোকা হয়। কিন্তু আপনি দেখছি সুন্দরীও আবার টেলেন্টেডও। আপনাকে তো...'

হৃদি রুষ্ট কণ্ঠে বলল, 'ভেবেছেন কী আপনি? যখন যা খুশি করবেন আর আমি চুপচাপ সহ্য করব? বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন বলে এখনও সম্মান করছি। না হলে...'

প্লাবন বিনয়ের সঙ্গে বলল, 'বাবাকে কখনো মিথ্যে বলিনি। এবার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। এবারের মতো আমাকে উদ্ধার করুন। এই শেষ বার। কথা দিচ্ছি, আর কখনো আপনাকে জ্বালাব না।'

হৃদির কণ্ঠের পরিবর্তন হলো না। সে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, 'এক্ষুণি অপমান হতে না চাইলে বেরিয়ে যান। বেরিয়ে যান বলছি।'

প্লাবন সত্যি সত্যি বেরিয়ে এল। সে ভেবেছিল, হৃদি শেষমেশ একটু নরম হবে। বিগলিত হয়ে কোমল গলায় সে বলবে, 'দাঁড়ান।'

কিন্তু এমন কিছুই ঘটলা না। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাবল, আবার সে ফিরে যাবে। হাত জোর করে বলবে, 'এই শেষবার আমাকে সাহায্য করুন। আমি বাবার কাছে ছোটো হতে চাই না।' কিন্তু পরে আর ফিরে গেল না। কেন যাবে সে? কী কারণে? কোনও মানে হয় এসবের?

(চলবে)

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক : https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=281050477062531&id=100054727422264

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া