এক আকাশের চাঁদঅতিপ্রাকৃত

এক আকাশের চাঁদ — পর্ব ৩

ইয়াছিন নাইম১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫৪ মিনিট পড়া

'তুমি কি আমার উপর রেগে আছো, বাবা?'

'কেন বল তো?'

'এই যে, আমি তোমার অবাধ্য হয়েছি। তোমাকে কষ্ট দিয়েছি। সবার কাছে তোমাকে ছোটো করেছি।'

'ও কী বলছিস! পছন্দের মানুষকে বিয়ে করেছিস, এ তো ভালো খবর। সবার এমন করা উচিৎ। একটা মানুষের সাথে সারা জীবন থাকবি। সেই মানুষটা পছন্দের না হলে জীবন তো এখানেই বরবাদ!'

'কিন্তু তোমাদের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল।'

'তা ছিল অবশ্য। তবে আমি খুশি। তোর সুখেই তো আমার সুখ।'

'আমাকে ক্ষমা করে দাও, বাবা।'

'ধুর। পাগলী মেয়ে আমার। এখানে চুপ করে বোস তো। এই চেয়ারটায় বোস। আমি আসছি।'

হৃদিকে চেয়ারে বসিয়ে কলমদর আলী ঘরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বললেন, 'এই নে। সোনার চেন। মা পরতেন। তার মৃত্যুর পর যত্ন করে রেখে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তোকে যখন বিয়ে দিয়ে দেব, শ্বশুর বাড়ি পাঠানোর সময় এটা দেব। এখনই রেখে দে। প্লাবন যখন তোকে নিয়ে যাবে, তখন পরিস।'

'এখন পরি?'

'না। এখন পরলে মা'র কথা মনে পড়বে।'

'তুমি কি কাঁদছো, বাবা?'

'না।'

'আমি কি তোমার মা না?'

'হ্যাঁ। তুই আমার মা। আমার এক মা চলে গেছে। যাবার আগে আরেক মা রেখে গেছে। এখন তুই-ই আমার মা।'

'তা হলে মা বলে ডাকো।'

'মা, মাগো!'

'কী?'

'তুই ডাকতে বলেছিস। তাই ডাকলাম।'

'জানি।'

'আমার পাকা চুলগুলো ছিঁড়ে দিবি?'

'আবার? তোমাকে না কতবার বলেছি, চুল কালো করার জন্য। তোমার মাথার চুল তো অর্ধেকটাই পেকে গেছে। এভাবে ছিঁড়তে থাকলে টেকো হয়ে যাবে তো!'

'ও নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। মেয়ে বিয়ে দিয়েছি। ক'দিন পর দাদা হব। এখন কি আর চুল কালো করার বয়স আছে?'

'বাবা!'

'আচ্ছা আচ্ছা। আর বলব না। হে হে হে!'

'মনে থাকে যেন।'

জাবেদ আলী বারান্দায় উঁকি দিয়ে বললেন, 'দুলাভাই আপনি এখানে! আর আমি সারা বাড়ি খুঁজেছি। আরে, হৃদি মামুনি যে! কী খবর?'

'এইতো মামা, ভালো।'

'মামুনি, এক গ্লাস পানি এনে দাও না। গলাটা শুকিয়ে গেছে।'

হৃদি পানি আনতে চলে গেল। জাবেদ আলী মুখ ভার করে চেয়ারে বসলেন। কলমদর আলী বললেন, 'কী ব্যাপার? এতক্ষণ তো হাসিখুশি ছিলে। হঠাৎ এমন হুতুমপ্যাঁচার মতো মুখ করে ফেললে কেন?'

'দুলাভাই, আপনার মেয়ের জামাই আমাকে অপমান করেছে।'

'কীঃ! কালকেই তো বিয়ে হলো। এক দিনের মাথায় মামা শ্বশুরকে অপমান?'

'হ্যাঁ। আমাকে বলেছে, আমি নাকি মিস্টার বিনের মতো দেখতে।'

'তা অবশ্য মন্দ বলেনি। আর কী বলেছে?'

'বলেছে, আমার মাথায় নাকি বুদ্ধি একটু কম আছে।'

'ঠিকইতো বলেছে। তোমাকে পাঠিয়েছিলাম গোপনে ছেলেটার ঠিকানা জেনে আসতে। আর তুমি কিনা তার সাথে দেখা করে এসেছো!'

'আমার কী দোষ? আমি কি জানতাম নাকি বাড়ির বাইরেও সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে?'

'আচ্ছা বাদ দাও। এটা বলো, ধরা খাওয়ার পর তাকে কী বলেছো?'

'বলেছি, দুলাভাই পাঠিয়েছেন। আপনার ঠিকানা জানার জন্য।'

'আহাম্মক। এ কথা বলতে কে বলল? আর কিছু বলার মতো ছিল না?'

'সবকিছু গুলিয়ে ফেলেছিলাম, দুলাভাই।'

'এজন্যই। এজন্যই বলেছে তোমার মাথায় বুদ্ধি কম। আমি তো বলি, তোমার মাথায় বুদ্ধি জিনিসটাই নেই। যাও। যাও আমার চোখের সামনে থেকে।'

'সত্যিই যাব, দুলাভাই?'

'হ্যাঁ, সত্যিই যাও।'

'পানিটা খেয়ে যাই?'

'আচ্ছা।'

সতেরো শতক ভূমির উপর দাঁড়িয়ে আছে একতলা বাড়িটা। চারপাশে উঁচু দেওয়াল। বাড়ির সামনের দিকে গুটিকয়েক ফুলের টব। টবের গাছগুলো চুপসে গেছে। বাঁ দিকে পার্কিং ব্যবস্থা আছে। সেখানে দু'টো মোটরবাইক রাখা।

রান্নাবান্না থেকে শুরু করে বাড়ির ছোটো বড়ো সব কাজ করে দেওয়ার জন্য একজন পরিচারিকা আছেন। তিনি প্রতিদিন সকাল দশটায় আসেন। হাতের কাজ শেষ করে দুপুর বারোটার মধ্যেই চলে যান। আবার বিকেলে আসেন। রাতের খাবার রান্না করে দিয়ে যান। এভাবেই চলছে প্লাবনের। পুরো বাড়িতে সে একা থাকে। অবশ্য একা থাকার মাঝেও আলাদা একটা স্বাদ আছে। যা সে ঠিকমতো উপভোগ করে। তবে মাঝে মাঝে মনে হয় এবার বুঝি কেউ একজনকে পাশে দরকার।

গত দু'দিন ধরে পরিচারিকা কাজ করতে আসছেন না। ফোন করে জানিয়েছেন, তিনি অসুস্থ। সপ্তাহ খানেক আসতে পারবেন না। এদিকে এই দু'দিনে পুরো বাড়ির চেহারা পাল্টে গেছে। সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে আছে। খাবার দাবার কিছু নেই। আছে শুধু কলা আর ব্রেড। সেগুলো এখন খেতে ইচ্ছে করছে না।

প্লাবন ফোন কানে লাগাল, 'হ্যালো, হৃদি?'

'হ্যাঁ।'

'প্লাবন বলছি।'

'বলুন।'

'একটা বিপদে পড়ে ফোন করেছি।'

'আবার কী বিপদ?'

'বিপদটা অনেক বড়ো রকমের। তবে আপনি সাহায্য করলে আমি বেঁচে যাই।'

'বিপদটা কী, তা তো আগে শুনি!'

'বাসার পরিচারিকা যিনি ছিলেন, তিনি আজ দু'দিন ধরে অসুস্থ। আসতে পারছেন না। এদিকে ঘরে খাওয়ার মতো কিছু নেই। রান্না করতে হবে। ঘরের অবস্থাও নাজেহাল। সবকিছু এলোমেলো হয়ে আছে।'

'তো আমি কী করতে পারি?'

'আপনি যদি কষ্ট করে আমার বাসায় আসেন। বেশি কিছু না। একটু খাবার রান্না করে দেন। ঘরটা একটু গুছিয়ে দেন। আর এঁটো বাসনগুলো একটু...'

'মিস্টার কী যেন নাম?'

'প্লাবন।'

'ওঃ, হ্যাঁ। মিস্টার প্লাবন, এই বিষয়গুলো একটু বাড়াবাড়ি রকমের হয়ে গেল না?'

'বাড়াবাড়ি হবে কেন? একবার ভাবুন তো, যদি সত্যি আমাদের বিয়ে হত। যদি সত্যি আপনি আমার বউ হতেন, তা হলে তো এইসব কাজ আপনাকেই করতে হত। সংসারের দায়িত্ব বলে একটা কথা আছে না?'

'কিন্তু আমি আপনার বউ নই।'

'সেটা আমি জানি। কিন্তু ভাবতে তো আর দোষ নেই। যদি আপনি আমার বউ হতেন, তা হলে তো করতে হত। তাছাড়া একটা গোপন কথা বলি, আপনি আমার বউ হলে, এখন ঘাড় টিপে দেওয়ার কাজে লাগিয়ে দিতাম। ও বাবা, কী ব্যথা। কাল রাতে বালিশ ছাড়া ঘুমিয়ে ঘাড়টা একেবারে গেল বুঝি।'

'আপনার কথা শেষ?'

'না, এখনও শেষ হয়নি। শুনুন, আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে...'

'সে কথা তো আগেও বললেন।'

'আবারও বলছি। আপনি খাবার কিছু নিয়ে আসুন। না খেলে আমি মরে যাব।'

'পারব না।'

'তা হলে আমি আপনাদের ওখানে চলে আসি?'

'আচ্ছা ত্যাঁদড় তো আপনি!'

'তাহলে কি আমি আসব?'

'না।'

'তার মানে আপনি আসছেন?'

'দেখুন, আপনার সাথে মাত্র একদিনের পরিচয়। ঠিকমতো চিনিও না। আপনার সাথে আমার কোনো সম্পর্কও নেই। তাই আমার মনে হয়, শুধু শুধু কথা না বাড়ানোই ভালো।'

'বুঝেছি, উপোস থাকতে বলছেন।'

'সেটা আপনার ইচ্ছে।' বলে হৃদি ফোন রেখে দিলো।

ডেলিভারি বয় একটি প্যাকেট দিয়ে গেছে। প্যাকেট খুলে এক টুকরো পিৎজা মুখে পুরে নিল প্লাবন। পানি খেয়ে উঠে দাঁড়াল। জানালার পরদা সরিয়ে বাইরে দৃষ্টি রাখল।

(চলবে)

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক :

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=278895580611354&id=100054727422264

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া