এক আকাশের চাঁদঅতিপ্রাকৃত

এক আকাশের চাঁদ — পর্ব ৬

ইয়াছিন নাইম৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫৫ মিনিট পড়া

'হ্যালো, প্লাবন ভাই?'

'জি ওসি সাহেব, বলুন।'

'ভাই আপনার জন্য একটা সুখবর আছে। আপনি কি একটু থানায় আসতে পারবেন?'

'কেন? হঠাৎ থানায় কী দরকার?'

'দরকার মানে ভাই, আপনার মক্কেলগুলোকে আমরা ধরতে পেরেছি। এবার আপনি যদি একবার এসে দেখে যেতেন... আপনি চাইলে ওদেরকে নিয়ে আপনার অফিসে চলে আসি। কী বলেন?'

'আসবেন? আসুন।'

'আচ্ছা ভাই। আসতেছি তাইলে।'

আকাশটা আজ কেমন যেন থমথমে হয়ে আছে। রোদ নেই। বৃষ্টিও নেই। বাইরে তাকাতেই যেন মন খারাপ হয়ে যায়। প্লাবন এয়ার কন্ডিশন বন্ধ করে কাচের জানালা খুলে বাইরে দৃষ্টি রাখল। এক পশলা শীতল বাতাস গায়ে লাগল। একটু একটু শীত লাগছে। এই মুহূর্তে এক কাপ কফি হলে মন্দ হয় না! তবে টেবিলের কাছে গিয়ে কলিং বেল চাপার আলসেমিতে তা আর পাওয়া হলো না। প্লাবন কিছুটা সময় জানালার কাছেই দাঁড়িয়ে রইল। মাঝে মাঝে মনে হয়, তার জীবনটা এই অফিস আর ঘরের মধ্যে আটকে আছে। এই বন্দিদশা থেকে বের হবার একটাই পথ। সেই পথ এখনও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চাইলেই সে পথ ধরে চলে যেতে পারবে। খুব একটা কষ্ট হবে না। জানালার ফাঁক দিয়ে আটতলা থেকে নিচে পড়তে যতটা সময়। তারপর ধীরে ধীরে সব অন্ধকার হয়ে আসবে।

ওসি সাহেব দরজা ঠেলে বললেন, 'শুভ সকাল।'

'সকাল নয়। বারোটা বেজে গেছে।'

ওসি সাহেব হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ও তাইতো! আজকাল ক্রিমিন্যালদের পিছন ছুটতে ছুটতে সময় কখন চলে যায় বুঝে উঠতে পারি না। হে হে হে!'

'বোসোন।'

'হ্যাঁ, বসব। তার আগে আপনার মক্কেলদের চাঁদমুখ একবার দেখিয়ে নেই। দেখেন তো চিনতে পারেন কিনা। এই ওদের নিয়ে আসো তো।'

দু'জন রোগা টাইপের বয়স্ক কনস্টেবল চারটা তাগড়া যুবককে দড়ি বাঁধা অবস্থায় টেনে টেনে প্লাবনের কক্ষে নিয়ে এলেন। ছেলে চারটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ওসি সাহেব ধমক দিয়ে বললেন, 'এখন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছিস ক্যান? অপরাধ করার সময় মনে থাকে না? মাথা উঁচা কর। দেখ কার মানুষরে বিরক্ত করছস।'

ছেলেগুলো তবুও চোখ তুলে তাকাল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। প্লাবন একটু ভালো করে চেয়ে দেখল। সব ক'টাকে চিনতে না পারলেও একজনকে ঠিকই চেনা যাচ্ছে। যে হৃদির শাড়ি টেনেছিল। তাকে প্লাবন কখনোই ভুলবে না। কখনোই না।

ছেলেটার সামনে দাঁড়িয়ে প্লাবন হুংকার দিলো, 'সেদিন তো খেলনার পিস্তল ঠেকিয়ে খুব বাড়াবাড়ি করছিলি। আসল পিস্তল দেখবি? দেখবি আসল পিস্তল? দাঁড়া।'

বলে ড্রয়ার টান দিয়ে পিস্তল বের করে আনল। ছেলেটার কপাল বরাবর তাক করে বলল, 'এখন যদি তোকে গুলি করে দেই? বল, যদি গুলি করি? তোর কি মনে হয় আমি গুলি করব না? ওসি সাহেব তোর সামনে দাঁড়িয়ে। জিজ্ঞেস কর আমি কী করতে পারি। জিজ্ঞেস কর। এই হাতেরটা দিয়ে তোর মতো তিনজনকে ঘুম পাড়িয়েছিলাম৷ তা-ও কেন জানিস? একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করেছিল। তুই ওতো একই ভুল করতিস। বল, করতিস না?'

ওসি সাহেব প্লাবনের হাত থেকে পিস্তল কেড়ে নিয়ে বললেন, 'ভাই, কী করতেছেন। আপনাদের মতো মানুষের এমন পাগলামো মানায়? এইসব বিষয় আপনি আমার উপর ছেড়ে দেন।'

প্লাবন ফুঁসতে ফুঁসতে ছেলেটার গালে চড় বসিয়ে দিলো। মুহূর্তেই তার চোখ টলোমলো করে উঠল। প্লাবন তবুও শান্ত হলো না। আরো দু'টো চড় বসিয়ে বলল, 'জীবনে আর কখনো কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাবি না।'

ছেলেটা ডানে বাঁয়ে মাথা নাড়াল। প্লাবন বলল, 'মনে রাখিস, সত্যিকারের পুরুষ কখনো কোনো মেয়েকে অসম্মান করে না।'

ওসি সাহেব বললেন, 'এইসব কারণেই আপনাকে এত ভালো লাগে৷ আপনি সত্যিই ভালো মনের একজন মানুষ।'

প্লাবন ছেলেগুলোকে সাবধান করে দিয়ে বলল, 'যে মেয়েটিকে অপদস্ত করেছিলি, সে আমার বউ। তার থেকে এক হাজার ফুট দূরত্ব বজায় রাখবি।'

দূর থেকে একজন ফিসফিস করে বলল, 'শুধু আমাদেরকেই শোনতে হবে। বাকি যারা করে, তারা দুধভাত।'

প্লাবন বলল, 'আর কে কী করে?'

'আপনার বউকে উত্যক্ত করে। তার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। আমরা তো ফোন দিয়ে জ্বালাই না৷ সে ফোনও দেয়। রাত একটায় বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আপনার বউয়ের সাথে ফোনে কথা বলে।'

সবাই তার সাথে সম্মতি জানাল। প্লাবন সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, 'সত্যি বলছিস? যদি মিথ্যে হয়?'

'মিথ্যে হলে গুলি করে দিয়েন।'

ছবির ছেলেটা। যাকে হৃদি ছোটোবেলায় ভুল করে মনে ধরেছিল। সেই ছোট্ট ভুল থেকে যাকে আজও খুঁজে বেড়ায়। তাকে মস্তিষ্ক থেকে মুছে ফেলার জন্য আরো একবার ভুল পথে পা বাড়িয়েছিল সে। একটি ছেলেকে বন্ধু হিসেবে চেয়েছিল। ছেলেটির নাম মাহাদ। খুবই সাধারণ একটা মানুষ। দেখতে খুব একটা ভালো না। আবার মন্দও বলা যায় না। তাদের বন্ধুত্ব ভালোই চলছিল। কিন্তু বছরখানেক যাবার পর হৃদি বুঝল তাদের বন্ধুত্বটা আর বন্ধুত্বে সীমাবদ্ধ নেই। মাহাদ তার চেয়েও বেশি কিছু ভাবছে। কিন্তু হৃদি তো তা চায়নি। সে শুধুমাত্র একজন ভালো বন্ধু চেয়েছিল। মাহাদকে সে বন্ধু হিসেবেই নিয়েছিল। এর বেশি কিছু না।

কিন্তু মাহাদের ধারণা, হৃদি তাকে ঠকিয়েছে। সে প্রায়ই বলত, 'জানো হৃদি, আজকাল আমার মনে হয় তুমি আর আগের মতো নেই। কেমন যেন বদলে গেছ।'

হৃদি হেসে উড়িয়ে দিত, 'কই? আমার তো মনে হয় না! তুমিই বেশি বেশি ভাবছো।'

তারপর মাহাদ আর কিছু বলত না। সত্যি বলতে সবকিছু বুঝেও চুপ থাকত। হৃদিকে সে প্রথম থেকেই একটু একটু ভয় পায়। সেই ভয় থেকেই অনেক কথা বলা হয়নি। তবে হৃদির বিয়ের আগের দিন কিছুটা সময়ের জন্য শক্ত হয়েছিল। বলেছিল, 'যদি এমনই করবে, তা হলে শুধু শুধু আমার জীবনটা কেন অন্ধকারে ঠেলে দিলে? আমার তো কোনো ভুল ছিল না। বলো, ছিল কি?'

সে কথার জবাব হৃদি দিতে পারেনি। ফোন রেখে অনেক্ষণ কেঁদেছে। সে আজও কাঁদে। মনে মনে অনুশোচনায় ভোগে। নীরবে চোখের জল ফেলে।

বাবা ঘরে এসে হৃদির পাশে বসলেন৷ তার মাথায় হাত রেখে বললেন, 'কীরে মা, সব ঠিক?'

হৃদি কোনো রকম হেসে বলল, 'হুঁ।'

'একটা কথা বলি?'

'বলো।'

'আমার মনে হয় তুই প্লাবনের সাথে ভালো নেই।'

হৃদি কিছু বলল না। মুখ তুলে তাকাল শুধু। বাবা বললেন, 'আমাদের জীবনে অনেক কিছুই অ্যাক্সিডেন্টলি হয়। সেইসব ভুলে গিয়ে নতুন করে বাঁচার নামই তো জীবন। তাই না বল?'

হৃদি হেসে বলল, 'কীসব বলছো বাবা? আমি তো খুশি। এই দেখো।'

কলমদর আলী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, 'বুঝিরে মা। সব বুঝি। খোঁজ নিয়েছিলাম। প্লাবন দেশে আছে। নিয়মিত অফিস করছে। শুধু আমাদের এখানে আসছে না। কিছু একটা না হলে এভাবে নতুন বউ ফেলে রেখে যায় কেউ?'

'তুমি বেশি বেশি ভাবছো, বাবা। অত চিন্তা করো না তো।'

'চিন্তা না করলেও চিন্তা হয় রে মা। শত হোক, বাবা তো!'

'এবার মা বলে ডাকো না।'

'মা, মাগো!'

হৃদি হাসল, 'আরো একবার ডাকো তো।'

'মা, ওমা!'

'হি হি হি! তুমি এভাবে ডাকলে সত্যি সত্যি মনে হয় তুমি আমার ছেলে আমার আমি তোমার মা।'

কলমদর আলী উঠে দাঁড়ালেন। যেতে যেতে বললেন, 'তোর মা'কে চা বানাতে বলেছি। ছাদে আয়। আড্ডা হবে। তোর মামাও এসেছে।'

বলে বেরিয়ে গেলেন। হৃদি দরজা আটকে জানালার কাছে গেল। বাইরে উঁকি দিতেই ল্যাম্প পোস্টের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে স্পষ্ট দেখতে পেল। হাতে সিগারেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এদিক ওদিক হাঁটছে আর ঘন ঘন সিগারেটের ধোঁয়া ফুঁকছে।

(চলবে)

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক : https://www.facebook.com/100054727422264/posts/282417126925866/?app=fbl

এক_আকাশের_চাঁদ

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া