এক আকাশের চাঁদ — পর্ব ৭
ইয়াছিন নাইম৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫৫ মিনিট পড়াছাদের উপর চাঁদের আলোয় চায়ের আসর বসেছে। জাবেদ আলী একটা গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ নিয়ে এসেছেন। কিন্তু সংবাদটা কী তা এখনও বলছেন না। কলমদর আলী তিনবার জিজ্ঞেস করেছেন, 'কী হলো! বলো কী বলতে এসেছো?'
জাবেদ আলী ইতস্তত করে বলেছেন, 'হ্যাঁ, বলছি দুলাভাই।' এটুকু বলেই আবার থেমে গেছেন। কলমদর আলী এবার বিরক্ত হয়ে বললেন, 'তুমি তাহলে বলবে না?'
'বলব।'
'কখন?'
'এইতো এখন।'
'তাহলে বলো।'
'একটু পরে বলি, দুলাভাই?'
কলমদর আলী বিরক্ত। তিনি মুখে কিছু বললেন না। লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে উঠে গিয়ে ছাদের এক কোণে দাঁড়ালেন। রাতের আবহাওয়াটা এমনিতেই শীতল। তার উপর ধু ধু বাতাস বইছে। আকাশ থমথমে। শেষ রাতে বৃষ্টি নামতে পারে।
জাবেদ আলী ডাকলেন, 'দুলাভাই, এখন বলব।'
কলমদর আলী এগিয়ে এলেন। চেয়ারে বসে মনোযোগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, 'বলো।'
'আগে বলুন, হাসবেন না।'
'আচ্ছা, হাসব না।'
'আমি ঠিক করেছি বিয়ে করব।'
কলমদর আলী ফিকফিক করে হেসে ফেললেন। জাবেদ আলী অসহায়ের মতো বললেন, 'আগেই বলেছিলাম, হাসবেন না। তবুও আপনি হাসলেন। এটা কিন্তু ঠিক না দুলাভাই।'
'স্যরি স্যরি। আর হাসব না। কিন্তু চিরকুমার থাকার পণ ভেঙে শেষমেশ বিয়ে করার ইচ্ছে হলো কেন?'
'আর বলবেন না। যেখানেই যাই, লোকে শুধু বলে বয়স নাকি অনেক বেড়ে গেছে। এখনি বিয়ে না করলে... সেদিন জুলিদের বাসায় গেলাম। বড়ো ভাই একই কথা বললেন, কীরে, ভাগ্নীর বিয়ে হয়ে গেল। এবার অন্তত একটা বউ নিয়ে আয়। আচ্ছা দুলাভাই আপনিই বলেন, বউ কি হাতের ইয়ে যে চাইলাম আর পেয়ে গেলাম?'
'না না, তা তো অবশ্যই নয়।'
'সেটাই তো! বিয়ে মানে যতসব ঝামেলা। এইসব আমার ভালো লাগে না। তাই এগোইনি। কিন্তু এবার লোকজনের কথায় আমি বিরক্ত। এবার একটা বিয়ে করাই লাগবে।'
'বিয়ে তো করবে। কিন্তু এ বয়সে তোমাকে পছন্দ করতে যাবে কে? পঞ্চান্ন বছরে পা রেখেছো তুমি...'
'পঞ্চন্ন নয় দুলাভাই। চুয়ান্ন।' জাবেদ আলী লজ্জায় মাথা নিচু করলেন।
নুরী বেগম চা নিয়ে এসেছেন। সঙ্গে হৃদিও। হৃদির পরনে হালকা গোলাপি শাড়ি। হাতে চুড়ি পরেছে। হাত নাড়লে হাতের চুড়ি একটার সঙ্গে আরেকটা বারি খেয়ে ঝুনঝুন শব্দ হয়। সেই শব্দ শুনে জাবেদ আলী ফিরে তাকালেন। অবাক হয়ে বললেন, 'হৃদি মামুনি যে! আসো আসো। তোমাকে একটা সারপ্রাইজ দেব বলে এসেছি। বলো তো, সারপ্রাইজটা কী?'
হৃদি কোনো কিছু না ভেবেই জিজ্ঞেস করল, 'কী?'
'তোমার খুব প্রিয় জিনিস সাথে করে নিয়ে এসেছি। এবার বলো তো?'
হৃদি ভাবল কিছুক্ষণ। তারপর ঠোঁট উল্টে বলল, 'উম্, তুমিই বলো।'
তিনি হেসে বললেন, 'দাঁড়াও, নিয়ে আসি।' বলে উঠে গেলেন। নুরী বেগম টি-টেবিলে চায়ের কাপ সাজিয়ে রাখছেন৷ হৃদি চেয়ারে বসল। কিছুক্ষণ পর জাবেদ আলী ফিরে এলেন। তার পাশাপাশি হেঁটে এল প্লাবন। জাবেদ আলী বললেন, 'জামাইকে বলেছি, হৃদির খুব জ্বর। এক্ষুণি যেতে বলেছে। এই কথা বলে জোর করে নিয়ে এসেছি। ভালো করিনি হৃদি মামুনি? তুমি তো তাই চাইতে, না?'
হৃদি মৃদু হেসে বলল, 'হ্যাঁ।'
হৃদির ঘরে বিছানায় বসেছে প্লাবন। মাথা নিচু। মুখটা কেমন যেন শুকনো। হৃদি চেয়ার টেনে এনে তার সামনাসামনি বসল। বলল, 'সেদিনের ব্যবহারের জন্য আমি স্যরি। সেদিন একটু বেশিই বলে ফেলেছিলাম।'
প্লাবন বলল, 'আপনি স্যরি বলছেন কেন? স্যরি বলব তো আমি। আমিই শুধু শুধু আপনাকে বিরক্ত করেছি। আপনি তো আমার কেউ নন। সেটা না বুঝেই এতটা চেয়ে বসাটা আমার উচিৎ হয়নি। ক্ষমা করবেন। আসি।'
'দাঁড়ান। যাবেন তো। আটকে রাখব না। এত তাড়াহুড়ো করছেন কেন? বোসোন। আগে বলুন, আপনার বাবা দেশে এসেছেন?'
'হ্যাঁ, এসেছে।'
'আপনি তো বলেছিলেন, আপনার পছন্দের মানুষের সাথে দেখা করাবেন। সেটা না করতে পারায় কিছু বলেননি তিনি?'
'বলেছে।'
'কী বলেছে?'
'বলেছে, আমি জানতাম তোর কোনো পছন্দের মানুষ নেই। কিন্তু তুই আমাকে মিথ্যে আশ্বাস না দিলেও পারতি।'
'এ নিয়ে আপনার মন খারাপ হয়নি?'
'মন খারাপ হবে কেন? যা সত্যি, তা-ইতো বলেছে।'
'আমি সত্যিই স্যরি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি অপারগ ছিলাম৷ একজনকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। তাকে ছাড়া অন্য কাউকে আমার বর হিসেবে কল্পনাও করতে পারি না৷ আপনি তো অভিনয় করতে বলেছিলেন। সেটাও আমার দ্বারা সম্ভব নয়।'
'আপনার বাবা-মা'কে খুশি করার জন্য আমরা কিন্তু বর বউ সেজে অভিনয় করেছি। এখনও করছি। এখানে আপনি পেরে উঠছেন কীভাবে, বুঝতে পারছি না।'
হৃদি কিছুটা সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সত্যিই তো! তারা তো বর বউ সেজে অভিনয় করেছে। সবাই জানে প্লাবন বর আর হৃদি তার বিয়ে করা বউ। নিজের জন্য সবার কাছে মিথ্যেটা বলে বেড়াতে পারলে আরো একজনকে সেই মিথ্যে শোনালে কী হত!
'যাই হোক, আমি আর আপনাকে বিরক্ত করব না।'
প্লাবন ছাদে এসেছে। তাকে দেখে কলমদর আলী এবং জাবেদ আলী দু'জনেই উৎসুক ভঙ্গিতে তাকালেন। নুরী বেগম তাদের কাছেই দাঁড়িয়ে। প্লাবন একটু দূর থেকে বলল, 'আপনারা এতদিন যা ভেবেছেন, সব ভুল। আমরা বিয়ে করিনি। হৃদি আমার কেউ না। সে আদিলকে বিয়ে করতে চায়নি বলেই এমন নাটক করতে হয়েছে। আপনারা আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।' বলে চলে যেতে লাগল। তার এক নিঃশ্বাসে বলা কথাগুলো সবাই অবাক হয়ে শুনলেন। তারপর কেউ কিছু বললেন না। প্রবল নিঃস্তব্ধতা ঘীরে ফেলল চারপাশ। যেন কিছুক্ষণ আগেই ঝড় এসে সবকিছু তছনছ করে দিয়ে গেছে। অবশিষ্ট রয়ে গেছে কেবল দীর্ঘশ্বাস।
হৃদি আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল। প্লাবন তার কাছাকাছি যেতেই সে খপ করে তার হাত ধরে ফেলল। নিচে নিয়ে গিয়ে কাঁদোকাঁদো গলায় বলল, 'এভাবে প্রতিশোধ নিলেন? কিছুদিন পরে ওতো কথাগুলো বলা যেত, তাই না? কেন এমন করলেন? আপনি এতটা স্বার্থপর কেন? কেন এতটা?'
প্লাবন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, 'যত দেড়ি হত, বিশ্বাস করতে ততই কষ্ট হত। দেড়ি না করে বলে দিয়েছি, দেখবেন সবকিছু সহজেই স্বাভাবিক হয়ে যাবে।'
স্বাভাবিক হবে কি না কে জানে! তবে রাতে বাবা মা হৃদির সাথে একটি কথাও বলেননি। ছোটো মামাও গাল ফুলিয়ে চলে গেছেন। এ নিয়ে হৃদি রাতের খাবার খায়নি। ভেবেছিল, মা এসে ডাকবেন খাবার খাওয়ার জন্য। তিনি না এলেও বাবা অন্তত! কিন্তু কেউ এলেন না। মা না। বাবাও না। হৃদি চোখ নাকের চল এক করে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে। চোখের জলে ভিজেছে বালিশ। একসময় সবকিছু অন্ধকার করে দিয়ে তলিয়ে গেছে ঘুমের রাজ্যে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে হৃদি ঠিক করল বড়ো মামা জামিলুর রহমানের বাসায় যাবে। তিনি অন্তত হৃদিকে ফিরিয়ে দেবেন না! হৃদি কাঁদবে, আকুতি মিনতি করবে, 'মামা তুমি একবার বাবা মা'কে বোঝাও। ওঁরা আমার সাথে কথা বলে না।'
তারপর ভাগ্নীকে নিয়ে জামিলুর রহমান আসবেন। কোনো এক ভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে দিয়ে যাবেন। এই ভেবে হৃদি ঘর ছেড়ে বেরোল। বাসার গেটে আসতেই কেউ একজন পথ আটকে দাঁড়ালেন। বললেন, 'এটা কি হৃদিদের বাসা?'
হৃদি লোকটার দিকে তাকাল। একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। পরনে ঢিলেঢালা শার্ট। মাথায় এক ঝাঁকড়া পাকা আধা পাকা চুল। মুখটা হৃদির চিরচেনা। বহু বছর আগে সে দেখেছিল তাকে। তখন বয়স একটু কম ছিল। হৃদি স্কুলে যাবার পথে তাকে দেখতে পেত। পথের ধারে বসে থাকা ছোট্ট ছেলেটির পাশে বসতেন। ছেলেটি তাকে তাড়িয়ে দিত। তিনি একটু দূরে গিয়ে বসতেন। তার সেই ছোট্ট ছেলেটাকেই হৃদি ভালোবাসে।
(চলবে)
মো. ইয়াছিন
গত পর্বের লিংক : https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=283305186837060&id=100054727422264