মাহিরা — পর্ব ৫
ইয়াছিন নাইম২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫৪ মিনিট পড়াউমেদ হাত ঝেড়ে উঠানে এসে দাঁড়াল। একদম আতিকুর রহমানের মুখোমুখি। তিনি বললেন, 'বাড়িতে কবে এলে?'
উমেদ বিরক্তিকর ভঙ্গিতে বলল, 'কাল রাতে।'
'রাতে? এসেই এত বড়ো কান্ড ঘটিয়েছ! মাথা এত গরম করা ঠিক না, উমেদ।'
উমেদ যেন একটু রাগ হলো। আতিকুর রহমানের চোখ বরাবর চেয়ে বলল, 'কত বড়ো কান্ড ঘটিয়েছি? সে কী করেছে, জানেন না? তার কপাল ভালো শুধু মাথা ফাটিয়েছি। আমার তো ইচ্ছে ছিল, তার শরীর থেকে মাথাটাই আলাদা করে ফেলি।'
আতিকুর রহমান উমেদের কাঁধে হাত রাখলেন, 'জানি। জানি বলেই তোমাকে কিছু বলছি না।'
'আপনি কিছু বললেই কী আর না বললেই কী?'
'এভাবে বোলো না। শত হোক, আমি এখানকার চেয়ারম্যান। সবার ভালো মন্দ দেখা আমার দায়িত্ব।'
'কাল রাতে সেই দায়িত্ব কোথায় ছিল আপনার? যখন আমার মা-বোনদের অত্যাচার করা হলো, তখন কোথায় ছিল আপনার বোধশক্তি?'
'তুমি চলে এসেছিলে, তাই আসিনি। না হলে ঠিকই আসতাম।'
'হ্যাঁ, আসতেন। আমার মা-বোনকে কবর দেওয়ার পর। হা হা!' উমেদ তাচ্ছিল্য করে হাসল। আতিকুর রহমান তার কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে বললেন, 'মাথা অত গরম করা ঠিক না। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করো। তুমি নাহয় গ্রামে থাকো না। কিন্তু তোমার মা-বোন? তারা তো থাকে! গ্রামের মানুষদের সাথে মিলমিশ না থাকলে কীভাবে হবে? এই ধরো, আল্লা না করুক, যদি আবার তাদের উপর কেউ ঝাঁপিয়ে পড়ে। তুমি তো ছেলে মানুষ, তোমার কিছু হবে না। কিন্তু ওঁরা? ওঁরা তো মেয়ে মানুষ। ওঁদের...'
পুরো কথা বলে ফেলার আগেই উমেদ ভড়কে গেল। আতিকুর রহমানের কলার চেপে ধরে বলল, 'আর একটা কথা বললে...'
চেয়ারম্যানের লোকজনের গায়ের জোর অনেক। কয়েকজন মিলে উমেদকে চেপে ধরল। উঠানে জমে থাকা ময়লা পানিতে উমেদের মুখ চেপে ধরল। উমেদ ধস্তাধস্তি করল। পেরে উঠল না। উঠে দাঁড়ানো তো দূর, নড়াচড়া করতেও কষ্ট হচ্ছে। আতিকুর রহমান বললেন, 'আরে আরে, কী করতেছো! ছাড়ো, ছাড়ো ওরে। ও এসব বোঝে নাকি! বাচ্চা মানুষ। রক্ত গরম। এই বয়সে আমরা কম করেছি নাকি! ছাড়ো।'
উমেদকে ছেড়ে দেওয়া হলো। সে উঠে দাঁড়িয়ে আবিষ্কার করল, চোখে কিছু দেখা যাচ্ছে না। দুটি চোখেই কাদা ঢুকে জ্যাম হয়ে গেছে। চোখের পাতা অবধি বন্ধ করা যাচ্ছে না। আতকুর রহমান বললেন, 'সাবধানে থেক। তোমার মা'কে আমার সালাম দিও। বড়ো ভালোমানুষ তিনি।'
বাড়ি থেকে বাইরে বেরোনোর সময় আতিকুর রহমান থমকে দাঁড়ালেন। দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা কলাগাছের একটি পাতা তার মুখে লেগেছে। তিনি পাতাটা বারবার হাত দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছেন। সেই পাতা আবার তার মুখে এসে লাগছে। পেছনে আট দশজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। চারজন তার নিজের। বাকিরা গ্রামের সাধারণ মানুষ। তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে সবার দিকে তাকালেন। তারপর আবার হাঁটতে শুরু করলেন। হাঁটতে হাঁটতে বললেন, 'কলাগাছের একটি ইতিহাস আছে। অনেক পুরনো ইতিহাস।'
একজন বলল, 'কী ইতিহাস, চেয়ারম্যান সাব?'
'বলছি বলছি। আমি তখন খুব ছোটো। আট দশ বছর বয়স। আমরা ছয় ভাইবোন। বাবা দিনমজুর। তখন আমাদের খুব অভাব ছিল। গ্রামে এক লোক ছিল মনফর আলী। এ গ্রামেই। তার একটা সমস্যা ছিল। খুব জোরে পাদ দিত। তা-ও কী পাদ! যেমন শব্দ তেমনি তার গন্ধ। পৃথিবীতে মনফর আলীই হয়তো একমাত্র মানুষ, যার স্ত্রী পাদ দেওয়ার অপরাধে তাকে ছেড়ে চলে গেছে। যাহোক, একদিন দেখলাম মনফর আলীর বাড়ির কলাগাছে কলা পেকেছে। পাকা কলা দেখেই লোভ হলো। ভাবলাম রাতেই কলাগুলো সরিয়ে ফেলব।'
'রাতে গেছিলেন নি চেয়ারম্যান সাব?'
আতিকুর রহমান দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, 'গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি, গাছে কলা নেই। মনফর আলী হয়তো আগেই বুঝে ফেলেছিল। তখন দেখলাম, মনফর আলী পুকুরে ওজু করছে। এই সুযোগ। চুপি চুপি ঘর চলে গেলাম। গিয়েই দেখি ঘরের এক কোণে কলাগুলো ঠেস দিয়ে রাখা। পাকা কলা। আহা! সেখানে বসেই খেলাম। একটা, দুইটা, তিনটা। আটটা কলা খাওয়ার পর মনফর আলী ঘরে চলে এল। মাগো, তখন কী যে ভয় পেয়েছিলাম! মেজাজি মানুষ। টের পেলে কিল একটাও মাটিতে পড়বে না। আমি চুপচাপ ঘরের কোণে লুকিয়ে রইলাম৷ সুযোগ পেলেই কলা নিয়ে পালাব। এইদিকে মনফর আলী দোয়া দুরুদ পড়ে ঘরে এসে দরজা আটকাল। তারপর কী যে এক পাদ দিলো, বাবাগো বাবা! সে যে এক পাদ! যেমন শব্দ তেমনি গন্ধ!' আতিকুর রহমান কুৎসিত ভঙ্গিতে নাক চেপে ধরে বলতে লাগলেন, 'পাদের গন্ধে দম যায় যায় অবস্থা। মনফর আলী আবার ওজু করার জন্য বেরিয়ে গেল। আর আমি কলা ছেড়ে জান নিয়ে পালালাম। এরপর আর কখনো কলা খাইনি।'
ঝকঝকে পরিষ্কার আকাশ। অজস্র তারার মেলা। তুলার মতো একখন্ড সাদা মেঘ। মেঘের কোলে ভেসে আছে জোছনার চাঁদ। উমেদ উঠানে দাঁড়িয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে কী এক ভাবনায় ডুবে গিয়েছিল। ঘোরের মতো। যেন সে পৃথিবীতে নেই। হটাৎ কেউ একজনের পায়ের শব্দে ঘোর কাটল। মাহিরা। তারই আপন ছোটো বোন। পাশাপাশি এসে দাঁড়াল। সে-ও আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো ওই চাঁদটার দিকেই!
মাহিরা বলল, 'আমার খুব ভয় লাগছে, ভাইয়া!'
উমেদ মাহিরার দিকে তাকাল। তাকিয়েই যেন একটু শক খেল। মাহিরা তার থেকে লম্বা হয়ে গেছে কি! সেদিনই তো তার জন্ম হলো। ছোট্ট, ফুটফুটে, কোমল এক বাচ্চা মেয়ে। সারাক্ষণ ওঁয়া ওঁয়া করে কাঁদে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে পা ছোড়াছুড়ি করে। আর ঘুমায়। উমেদ আহ্লাদিত হয়ে কোলে নিল। সঙ্গে সঙ্গে তার কান্না থেমে গেল। কী আশ্চর্য! উমেদ উৎফুল্ল হয়ে ডাকল, 'মাহি-ইরা! মাহি-ইরা! ও মাহিরা!'
'তুই বাড়ি ছেড়ে চলে যা, ভাইয়া।'
উমেদ ভ্রু কুঁচকাল, 'কোথায় যাব?'
'যেখানে খুশি, সেখানে। ভাবির কাছে যা।'
'কেন?'
'ভয় লাগছে। যে কোনো সময় হারুনের লোকজন বদলা নিতে আসতে পারে।'
উমেদ কথা বলল না। লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। বলল, 'তোর জন্য একটা সুখবর আছে।'
মাহিরা কথা বলল না। প্রবল আগ্রহ নিয়ে কান পেতে রইল। উমেদ বলল, 'তুই ফুপু হবি।'
মাহিরা চেঁচাল, 'সত্যি!'
'হ্যাঁ, সত্যি।'
'ভাবি কেমন আছে?'
'ভালো নেই। ক'দিন ধরে জ্বরে ভোগছে। মাথা ব্যথায় কাতরায় প্রতিদিন।'
'আর তুই আমাদের এখানে এসে বসে আছিস! এখন তো ভাবির কাছে থাকা দরকার!'
'তাকে তার বাবা মা'র কাছে রেখে এসেছি।'
'তবুও। ভাবি যে অসুস্থ।'
'আচ্ছা, যদি তোর ভাবি মারা যায়। সঙ্গে তার বাচ্চাও। তাদের সঙ্গে যদি আমিও মরি?' উমেদ চট করে বলল কথাটা। মাহিরা উত্তেজিত হয়ে বলল, 'কী আবুল তাবুল বলছিস! মাথা খারাপ হয়েছে নাকি তোর!'
তারপর আর তাদের মাঝে কথা হলো না। একসময় মাহিরা ঘরে চলে গেল। উমেদ উঠানে কান পেতে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হচ্ছে, বাড়ির বাইরে কারা যেন হাঁটছে। মাঝে মাঝে ফিসফিস করে কথা বলছে। কথাগুলো অস্পষ্ট, ধোঁআশা।
(চলবে)
মো. ইয়াছিন
গত পর্বের লিংক : https://www.facebook.com/100054727422264/posts/300572155110363/?app=fbl