মাহিরা — পর্ব ৪
ইয়াছিন নাইম২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫৪ মিনিট পড়ারাত যত বাড়ে, নিঃশ্বাস ততই ভারী হয়। তামিমা বেগম শুয়ে শুয়ে নানান ভাবনায় ডুবে যান। সে কী ভয়ঙ্কর ভাবনা! কখনো ভাবেন, যদি এই এখন হারুন চলে আসে! কখনো ভাবেন, যদি আড়াল থেকে ঘরে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়! যদি তাদেরকে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়!
তামিমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখ বন্ধ করেন। এই স্থির হয়ে থাকা সময়, এই কালো আঁধার, কিছু গা শিওরে ওঠা ভয়ঙ্কর ভাবনা, সবকিছু যেন তাকে আষ্টেপৃষ্টে ধরে রেখেছে। শত চেষ্টা করলেও মুক্ত হওয়া যাচ্ছে না।
উঠানে জমা হওয়া কাদাপানিতে চপাড় চপাড় শব্দ করে কয়েক জোড়া পা এগিয়ে আসার শব্দ শোনা যাচ্ছে। তামিমা বেগম সতর্ক হয়ে গেলেন। বিছানার পাশে রেখে দেওয়া দা'টা হাত দিয়ে স্পর্শ করে রাখলেন। যে কোনো মুহূর্তে সেটা হাতে তুলে নিতে হবে।
দরজায় দুড়ুম দুড়ুম শব্দ হলো কেবল। তারপর হুড়মুড় করে চার পাঁচজন ভেতরে ঢুকল। তামিমা বেগম তাড়াহুড়ো করে দেশলাই জ্বালাতে যাচ্ছিলেন। লোকগুলো সে সুযোগ না দিয়ে টর্চ মারল সোজা তামিমার চোখে। একজন এসে শক্ত হাতে তামিমা বেগমের চুল মুষ্টিবদ্ধ করে নিল। বলল, 'এই যে, খুনির বউ।'
তামিমা বেগম বুঝলেন, ওটা আর কেউ নয়, স্বয়ং হারুন। অসহ্য যন্ত্রণায় তিনি চিৎকার দিলেন। শব্দে আরুহীর ঘুম ভেঙে গেল। ও-ঘরের শাহেরা আর হুমায়রা মা মা বলে কান্নায় ভেঙে পড়ল। হারুন তামিমার চুল টেনে ঘরের বাইরে নিয়ে গেল। মাহিরা সহ তার দু'বোন হাউমাউ করে মা'কে অনুসরণ করল। হারুন তামিমা বেগমকে উঠানে ফেলে দিয়ে ঘরে এক বোতল কেরোসিন ঢেলে দিলো। আগুন দিতেই তামিমা আর্তনাদ করে উঠলেন। কেউ শুনল না তার কথা। তামিমা বেগমকে তার ছোটো দুই মেয়ের সঙ্গে গাছে বেঁধে ফেলা হলো। পাঁচজন শক্তপোক্ত পুরুষের কাছে তারা হার মানল। তবুও আর্তনাদ করতে ছাড়ল না। মাহিরা মায়ের পায়ের কাছে পড়ে রইল।
লোকে বলে, যার কেউ নেই, তার আল্লা আছে। হলো-ও তাই। হঠাৎ আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। এমন বৃষ্টি আগে হয়নি। যেন আকাশটা ক্রোধে, আক্রোশে গর্জন করে করে জল ঢেলে দিচ্ছে। সেই জলের কাছে আগুন যেন নস্যি। নিমিষেই দপ করে নিভে গেল। হারুন সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল, 'এরা এখানে বাঁধা থাক। কিন্তু এই জোয়ান মেয়েটাকে তো রাতের বেলা ফেলে রেখে যেতে পারি না! একে আমার ঘরেই রাখি। কী বলেন আপনারা?'
সবাই হ্যাঁ, হ্যাঁ বলে সম্মতি জানাল। তামিমা বেগম কত করে না করলেন। কেউ শুনল না তার কথা। শুনবেই বা কেন? সবাই তো হারুনের লোক। এ গ্রামের প্রায় সবাই-ই তার আত্মীয়। অপর দিকে তামিমা বেগমের স্বামী সন্তান ছাড়া কেউ নেই। তারা এ গ্রামে এসেছে পাঁচ বছরেরও কম।
হারুন মাহিরার হাত ধরে হেঁচকা টান দিলো, 'আয়, আয় আমার সাথে।'
মাহিরা শক্ত হয়ে বসে থাকার চেষ্টা করল। কিন্তু এরকম তাগড়া জোয়ান লোকের শক্তির কাছে সে যে অসহায়! লোকটার কাছে তার গায়ের জোর যে কিছুই না!
হারুন মাহিরার চুল ধরল। টেনে টেনে নিয়ে গেল তার ঘরে। ভেজা জবজবা কাপড় নিয়ে নেতিয়ে পড়া মাহিরা তখন শুধু মরে যাওয়া বাকি। অন্ধকার ঘরের এক কোণে কাঁচুমাচু হয়ে বসল সে। এ ছাড়া লুকোনোর আর কোনো জায়গা নেই। তবু শেষ রক্ষা হলো না, দরজা আটকে এসে হারুন টর্চ মারল। আলোকিত ঘরে খুব সহজেই সে মাহিরাকে খুঁজে নিল। মাহিরা দ্রুত চোখ বন্ধ করল। খুব দ্রুত। এত নির্মম, নৃশংস অন্যায় চোখে দেখার নয়। হারুন নেশালো চোখে তাকাল তার দিকে। একদম কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, 'খুব দেমাগ তোর, না রে?'
তারপর কী হলো কে জানে! মাহিরার তো চোখ বন্ধ। জোরে একটা শব্দ হলো। দরজা ভাঙার মতো আওয়াজ। তারপর হারুন চিৎকার দিলো। মাহিরা যখন চোখ খুলল, হারুন তার পায়ের কাছে পড়ে আছে। মাথা থেকে গড়িয়ে পড়ছে তাজা লাল রক্ত। কেউ একজন টর্চ হাতে দাঁড়িয়ে আছে। মাহিরা একবার তাকিয়ে দেখল। বলল, 'ভাইয়া!' তারপর কান্নায় ভেঙে পড়ে উমেদকে জড়িয়ে ধরল। উমেদ মাহিরার হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেল। মা-বোনদের বাঁধন খুলে দিলো। শাহেরা, হুমায়রা তো বেজায় খুশি। এতদিন পর ভাই পেয়েছে। সব দুঃখ বিষাদ ভুলে উমেদকে জড়িয়ে ধরে বলল, 'ভাইয়া ভাইয়া, বাবাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। আমাদেরকে অনেক অত্যাচার করা হয়েছে। ঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।'
উমেদ বোনদের মাথায় হাত রাখল। বলল, 'জানি। আমি এসে গেছি। এখন সব ঠিক হয়ে যাবে।'
তামিমা বেগম নির্লিপ্ত ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। উমেদ বলল, 'মা, ভাত দাও। খিদেয় মরে যাচ্ছি।'
তামিমা বেগম কড়া গলায় বললেন, 'মাহিরা, একে চলে যেতে বল। চলে যেতে বল আমার চোখের সামনে থেকে।'
উমেদ সে কথা গায়েই মাখল না। দ্রুত ঘরের ভেতর চলে গেল। দেশলাই জ্বালিয়ে মোমবাতি'তে আগুন দিলো। রান্নাঘরে গিয়ে হাঁড়ি-পাতিলের ঢাকনা সরিয়ে প্লেটে ভাত তরকারি নিল। সেই প্লেট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গপাগপ মুখে পুরতে লাগল।
দিনের আলোয় হারুনকে সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তার অবস্থা খুব একটা ভালো না। মাথা থেকে অনেক রক্ত ঝড়েছে। জখমটাও খুব গভীর। যে কোনও সময় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। হারুনের বড়ো চাচা হারিস আলী বাড়ির উঠানে এসে লুঙ্গি হাঁটুর উপর তুলে গজরাতে গজরাতে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করতে লাগলেন। বললেন, 'খুনির বেটা খুনি, তোর বাপ খুন করে জেলে গেছে। এবার তুই যাবি। আমার হারুনের যদি কিছু হয়, আমি তোকে ছাড়ব না। তোকে জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়ব।'
উমেদ এসব কথা কানেও তুলল না। সাড়াও দিলো না। যেন এসব কোনো ব্যাপারই না। এগুলো কানে নেওয়ার মতো কথাই না। সে ঝিম মেরে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর আবার ভাঙা দরজা ঠিক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মাহিরা পানির গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাত কেঁপে জল উপচে পড়ছে। হারুনের চাচা একনাগাড়ে গালাগাল করেই যাচ্ছে।
উমেদ এক নিঃশ্বাসে পানি খেল। উঠে দাঁড়িয়ে উঠানে দৃষ্টি রাখতেই লোকটার গলার আওয়াজ থেমে গেল। উমেদ মানুষটাই এমন। গ্রামের সব মানুষেরাই তাকে মনে মনে ভয় পায়। অথচ, এই উমেদ কখনো কারোর ক্ষতি করেনি। কাউকে কষ্ট দেয়নি। কারোর সাথে উঁচু আওয়াজে কথা বলেনি। অবশ্য এখনও তাই আছে। সব সময় মাথা ঠান্ডা থাকে। যা-ই করে, মাথা ঠান্ডা রেখেই করে।
উমেদ আবারো দরজা ঠিক করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। বাড়ির উঠানে একদল লোক এসে উপস্থিত হলো। সবার সামনে এলাকার চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান। তার পরনে সাদা পাঞ্জাবি। তিনি ডাকলেন, 'উমেদ নাকি?'
উমেদ মাথা তুলে তাকাল। তামিমা বেগম বিছানায় শুয়ে ছিলেন। চেয়ারম্যানের গলা শুনে ধড়ফড় করে উঠে বসলেন। লোকটা অতটা ভালো না। সব সময় পিস্তল সাথে রাখে। গুন্ডা টাইপের লোকজন তো আছেই!
(চলবে)
মো. ইয়াছিন
গত পর্বের লিংক : https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=299876525179926&id=100054727422264