মাহিরাঅতিপ্রাকৃত

মাহিরা — পর্ব ৬

ইয়াছিন নাইম২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫৪ মিনিট পড়া

ঘরে শুনশান নীরবতা। একটি মাত্র বাতি জ্বলছে। সেই টিমটিমে আলোয় তামিমা বেগম শুয়ে আছেন। তিনি শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে কী যেন ভাবছেন। মাহিরা ধীর পায়ে গিয়ে মা'র পাশে শুয়ে পড়ল। বিড়বিড় করে বলল, 'আর কতকাল, মা?'

তামিমা বেগম মুখে কিছু বললেন না। কৌতূহলী ভঙ্গিতে মাহিরার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মাহিরা বলল, 'এবার অন্তত ভাইয়াকে ক্ষমা করে দাও!'

তামিমা বেগম মুখ ফিরিয়ে নিলেন। মাহিরা বলল, 'সে হয়তো একটি ভুল করেছে। তার জন্য তো শাস্তিও পেয়েছে। তাই না, মা?'

তামিমা বেগম উল্টো পাশ ফিরলেন। মাহিরা গলার স্বর আরো বাড়াল। বলল, 'সে তো বিয়েই করেছে। এটা তো ভুল কিছু না...'

পুরো কথা বলার আগেই তিনি মাহিরার দিকে তাকালেন। বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, 'ভুল না? এমপির মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া ভুল না? এক রাতে এলাকা ছাড়তে হলো। তারপর আমরা কোথায় আশ্রয় নিলাম, কীভাবে ছিলাম এসব কিছু জানার চেষ্টা করেছে সে?'

মাহিরা একটু থেমে ঢুক গিলল। বলল, 'এর জন্য তো শাস্তিও পেয়েছে। তা ছাড়া, ভাবিওতো... বড়ো ঘরের মেয়ে হয়েও ভাইয়ার সঙ্গে ভাড়া বাড়িতে থাকছে। পালিয়ে আসার পর থেকে একটি বারের জন্য বাড়ির কারো সাথে যোগাযোগ হয়নি। এও কি কম? বলো মা? এবার কি তাদের ক্ষমা করে দেওয়া যায় না?'

তামিমা বেগম কথা বললেন না। বিরক্ত হয়ে ওপাশ ফিরলেন। মাহিরা গুনগুন করে অনেক কথা বলল। এসবের কিছুই তিনি কানে নিলেন না। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় ঘুম লেগে এল।

রাতে হঠাৎ তামিমা বেগমের ঘুম ভাঙল। তার মনে হলো, এ ঘরে ঘাপটি মেরে কেউ একজন বসে আছে। মানুষটা তার কাছেই। খুব কাছে। তিনি মনে মনে আয়াতুল কুরসি পড়লেন। তারপর ভয়ে ভয়ে চোখ খুললেন। সত্যি সত্যি কেউ একজনকে দেখা গেল। তামিমা বেগম ধড়ফড় করে উঠে বসতে যাচ্ছিলেন। শেষমেশ তা করলেন না। শান্ত হয়ে শুয়ে রইলেন। যেন তার ঘুম ভাঙেনি। তিনি এখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।

ঘরের নিভু নিভু আলোয় চোখদু'টো একটু ফাঁক করে তামিমা বেগম তাকালেন। উমেদ তার পায়ের কাছে বসে আছে। তার চোখ দু'টো জলে ভেজা। গাল বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। উমেদ হঠাৎ তামিমা বেগমের পা দু'টো জড়িয়ে ধরল। তামিমা বেগমের ভেতরটা মুহূর্তেই ফাঁকা হয়ে গেল। এতদিন ভেতরে ভেতরে জমিয়ে রাখা পাথর যেন মুহূর্তেই জ্বলন্ত মোমের মতো গলে পড়তে লাগল। তামিমা বেগম উঠে বসলেন। এক বুক কান্না আড়াল করে থমথমে গলায় বললেন, 'কী হয়েছে?'

উমেদ দ্রুত মা'র পা ছেড়ে চোখ-মুখ মুছে নিল। বলল, 'কিছু হয়নি, মা।'

'কাঁদছিস কেন?'

'কই কাঁদছি? কাঁদব কেন, মা?' উমেদ আবারো মুখ মুছল। কাঁপা গলায় বলল, 'তোমাদের একটা খবর দিতে এসেছিলাম।'

তামিমা বেগম উদ্-গ্রীব হয়ে তাকিয়ে রইলেন। উমেদ ভাঙা ভাঙা গলায় বলল, 'মেহরিন। তোমার বউমা। তার একটা ছেলে হবার কথা ছিল। সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চা ছেলে। কী যে খুশি ছিলাম আমরা। কত খুশি ছিলাম..' এতটুকু বলে উমেদের কান্না আরো বেড়ে গেল। তামিমা বেগমের চোখদু'টো অজান্তেই জলে ভরে গেল। উমেদ ধরা গলায় বলল, 'অপারেশনের সময় কী একটা গন্ডগোল হয়ে গেল। যার ফলে আমাদের ছেলেটা পৃথিবীতে আসার আগেই মরে গেল, মা। মেহরিনও আর নেই। তাদের মা ছেলেকে আমি এই হাতে কবর দিয়ে এসেছি, মা।'

উমেদ কাঁদতে কাঁদতে হাতদু'টো উঁচু করে মা'কে দেখাল। তামিমা বেগম কান্নাভেজা কণ্ঠে নিচু আওয়াজে বললেন, 'তোর হাতদু'টো এমন কেন? তোর হাত এত লাল কেন? কী হয়েছে তোর, বাবা?'

বহুদিন পর তিনি উমেদকে স্পর্শ করলেন। দু'হাত দিয়ে উমেদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। গালে, কপালে হাত বুলিয়ে দিলেন। চোখ মুছে দিলেন। একসময় তার পিঠের দিকে হাত দিয়ে হাহাকার করে উঠলেন, 'তোর, তোর পিঠে কী, উমেদ?'

উমেদ তার হাত দু্'টো উঁচু করে মায়ের চোখের সামনে তুলে ধরল। শ্বাস টেনে টেনে বলল, 'রক্ত, মা। কে যেন পেছন থেকে ছুরি মেরে গেছে। তাইতো তোমার পায়ের কাছে এসে বসেছি। যেন তোমার পায়ে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে মরে যেতে পারি।'

তামিমা বেগম অসহ্য রকমের চিৎকার করে বিছানা ছেড়ে নামলেন। উমেদকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন, 'উমেদ, চোখ খুল। তোর কিছু হবে না, বাপ। এই মাহিরা, শাহেরা, হুমায়রা দেখ তোদের ভাই কেমন করছে।'

তিন বোন দৌড়ে এল। ভাইয়ের নিঃস্পন্দ দেহ জড়িয়ে হাউমাউ করে উঠল। এই বাড়ি, গ্রামের এই একটি বাড়িতে রাতের অন্ধকারে কান্নার রোল পড়ে গেল। বুক ফাটিয়ে কাঁদল তারা। কেউ তাদের কান্না শুনতে এল না। কেউ না।

কবরের পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। অন্ধকারে মেয়েটির মুখ ঠিকঠাক দেখা না গেলেও একটা মায়া মায়া ভাব ঠিকই আন্দাজ করা যাচ্ছে। মারওয়ান দূর থেকে ঢিল ছুঁড়ল। ছোট্ট একটি ঢিল। সে ভেবেছিল, ঢিলটা কবরস্থানের পাশের আম গাছের পাতার গিয়ে পড়বে। তখন শব্দ হলে হয়তো মেয়েটা ফিরে তাকাবে। কিন্তু ছোট্ট ঢিলটা যে সরাসরি মেয়েটার গায়ে লাগবে, তা ভাবনার বাইরে ছিল। তা-ও পড়েছে মেয়েটার মাথায়। মারওয়ান জিভ কামড়ে দাঁড়িয়ে রইল। মেয়েটা মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে এগিয়ে এসে বলল, 'আপনি ঢিল মেরেছেন?'

মারওয়ান তাৎক্ষণিক কিছু বলতে পারল না। মেয়েটা বলল, 'বলছেন না কেন? আপনি ঢিল মেরেছেন?'

'হুঁ।' মারওয়ান অসামির মতো মাথা নিচু করে ফেলল।

'কেন মেরেছেন?'

'আমি ভেবেছিলাম, ভূত। মেয়ে মানুষ রাতের বেলা একা একা কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে, এ আমার কল্পনার বাইরে ছিল।'

'এখন কী মনে হচ্ছে? মানুষ না ভূত?'

'ছোটোবেলা শুনেছিলাম, ভূতেদের ছায়া থাকে না। আপনার ছায়া দেখা যাচ্ছে। তার মানে আপনি মানুষ। কিন্তু আপনি ভয় না পাবার কারণ ঠিক মেলাতে পারছি না। এত রাতে কবরের পাশে...'

'এটা আমার ভাইয়ের কবর। ভাইকে দেখতে এসেছিলাম।'

'এখনি দেখতে এলেন কেন? সকালে আসতে পারতেন। দুপুরে কিংবা বিকেলেও আসা যেত।'

'এমনি এমনি আসিনি। দেখতে এসেছি, কেউ কবর খুঁড়ে লাশ নিতে এসেছে কি না।'

মারওয়ান আঁতকে উঠল, 'কবর খুঁড়ে লাশ নিয়ে যাবে কেন!'

'শত্রুতা। এ গ্রামের মানুষেরা বড়ো অদ্ভুত। তাদের শত্রুতাও বড়ো অদ্ভুত। একটা মানুষকে মেরে ফেলেও শান্তি হয়নি।'

'আপনার ভাইকে খুন করা হয়েছিল?'

'হ্যাঁ।'

মারওয়ান কবরের দিকে তাকিয়ে বলল, 'আমার দাদার কোন শত্রু ছিল না। তবুও তিনি খুন হয়েছিলেন। যদিও খুনি এখন জেলে আছে।'

(চলবে)

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক : https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=301959291638316&id=100054727422264

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া