মাহিরাঅতিপ্রাকৃত

মাহিরা — পর্ব ৭

ইয়াছিন নাইম২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫৪ মিনিট পড়া

'আপনার সঙ্গে বারবার কবরেই কেন দেখা হয়, বলুন তো? আপনি কি দিন-রাত কবরেই পড়ে থাকেন?'

মাহিরা চোখ তুলে তাকাল। ছেলেটার নাম মারওয়ান। সে খুন হওয়া জগলু মাস্টারের নাতি। মাহিরা রিজের পরিচয় দেয়নি। কীভাবে দেবে? কোন মুখে? কী বলবে তাকে? তার বাবা যে জগলু মাস্টারকে খুন করার অপরাধে জেলে বন্দি। এ কথা জানলে, ছেলেটা হয়তো মাহিরাকে ইচ্ছেমতো কথা শোনাত।

'কী হলো, বলুন?' মারওয়ান কৌতূহলী ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল।

'দিনরাত পড়ে থাকি না। মাঝে মাঝে আসি। দেখে যাই, কবরে শুয়ে থাকা ভাইটাকে। বেঁচে থাকতে কেউ তাকে মূল্য দেইনি। এবার যখন সে আমাদের মাঝে নেই, তখন বুঝতে পারছি, আজব এই পৃথিবীতে একজন বড়ো ভাই কতটা দরকার।' মাহিরা এলোমেলো ভাবে কথাগুলো বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

মারওয়ান প্রসঙ্গ পাল্টাল, 'কতদিন হয়ে গেল, অথচ আপনি একটি বারের জন্য আপনার বাবাকে দেখতে যাননি। তিনি যে জেলখানার খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, সে খবর রাখেন?'

মাহিরা মুখ তুলে তাকাল, 'আপনি এসব জানেন?'

'কী জানি?'

'এই যে, আমার বাবা জেলে।'

'জানি তো।'

'আর কী জানেন?'

'আমার দাদাকে খুনের অপরাধে তিনি জেলে আছেন।' মারওয়ান স্বাভাবিক ভাবেই বলল।

মাহিরা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তাকাল মারওয়ানের দিকে, 'কিন্তু আমার বাবা নির্দোষ। তিনি খুন করেননি।'

'আদালত আপনার কথা মানবে?'

'কেন মানবে না?'

'আদালত তো আর মুখের কথায় চলে না। আদালত প্রমাণ চায়। আপনার বাবা নির্দোষ সেটা আপনি প্রমাণ করতে পারবেন?'

মাহিরা অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে নিল, 'যদি পারতাম...'

'আমি পারব।'

'কী?' মাহিরা মুহূর্তেই মারওয়ানের দিকে ফিরে তাকাল।

'আই হ্যাভ অ্যাভিডেন্স।'

'প্রমাণ আছে? কী প্রমাণ আছে আপনার কাছে?'

'সেটা না হয় কাল কোর্টেই দেখা যাবে!'

হারুন দলবল নিয়ে জগলু মাস্টারের বাড়ি ঘেরাও করেছে। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বাড়িটা বড়ো সুনশান, নিঃস্তব্ধ। মশা ডাকলেও ভনভন শব্দ শোনা যায়। শুকনো পাতায় পা পড়লেও মচমচ শব্দ কানে আসে। হারুন ঘুমন্ত বাড়িটায় একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। সে জানে, পুরো বাড়িতে মারওয়ান ব্যতীত কেউ নেই। আগে অবশ্য জগলু মাস্টারের খেদমত করার জন্য ময়না নামক দেহাতি এক মেয়ে ছিল। মাস্টারের মৃত্যুর পর মেয়েটা চলে গেছে। মারওয়ান জোয়ান ছেলে। এই ছেলের সাথে একই বাড়িতে থাকা যাবে না।

হারিস আলী হারুনের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, 'পোলাডার কাছে প্রমাণ আছে, তুই ক্যাম্নে জানলি?'

হারুন বাড়ির ভিতর উঁকি দিয়ে বলল, 'আমি সব জানি, চাচা। ব্যাটা ঢাকা থেইকা আসার সময় ক্যামেরা নিয়া আইছে। যেদিন জগলু মাস্টাররে কুপায়া খতম করছি, সেদিন তার বাড়িতে অনুষ্ঠান ছিল না?'

হারিস আলী কৌতূহল নিয়ে বললেন, 'হ, আছিল।'

'জগলু মাস্টার নাতির আনা ক্যামেরা পাইয়্যা মনের সুখে ভিডিয়ো করতাছিল। আমি খেয়াল করিনাই। ঘরে গিয়া ইচ্ছামতো কোপাইছি। আইজ জানলাম, ক্যামেরাটা নাকি মাস্টারের নাতির কাছে আছে। ওই ব্যাডা কাইল কোর্টে যাইব ক্যামেরা নিয়া।'

হারিস আলী অবাক হয়ে বললেন, 'তাইলে তো তুই ধরা পইড়া যাবি। মান্নানরে ছাইড়া দিব।'

'আপনার কি মনে অয়, সেই সুযোগ আমি তারে দিমু?' হারুন বাঁকা হাসল।

'কী করবি?'

'যা করতে আইছি।'

হারিস আলী একটু দমে গেলেন। বললেন, 'তুই যে হারে খুন করতে শুরু করছোস, কোনদিন না আমারেই...'

'কী যে কন চাচা! আপনারে কেন মারুম? আপনি কখনো আমার কাজে বাধা দিছেন? আপনি কখনো আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেওয়ার কথা ভাবছেন?'

হারিস আলী কিছু বললেন না। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। এই প্রথম তার মনে হলো, হারুনকে এতটা প্রশ্রয় দেওয়া তার ঠিক হয়নি। তার অন্যায় কাজে সঙ্গ দেওয়া মোটেও উচিৎ হয়নি। এতদিন তিনি কেবলই ভুল করে গেছেন। যার মাশুল হয়তো এ জীবনে দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।

হারুন এগিয়ে গিয়ে ঘরের চারপাশে কেরোসিন ঢেলে দিলো। দেশলাই জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেবার আগে হারিস আলী তার পাশাপাশি দাঁড়ালেন। থমথমে গলায় বললেন, 'ঘুমন্ত মানুষটারে পুড়ায়া মারা কি ঠিক হইতাছে?'

'পৃথিবীতে কোনো কিছুই ঠিক না, চাচা। এই যে আপনি এখনো বাঁইচা আছেন। এইটাও কি ঠিক? আপনি তো যখন তখন আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে পারেন। আমারে বিপদে ফালাইতে পারেন। তারপরও আপনারে বাঁচায়া রাখন কি ঠিক হইতাছে, চাচা?'

হারুন এগিয়ে গিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিলো। দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। রাতের অন্ধকারে আগুনের পুড়ল জগলু মাস্টারের বাড়ি। সেই আগুনের উত্তাপে জ্বলজ্বল করে উঠল কয়েক জোড়া চোখ। আরিস আলী নীরবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তিনি জানেন, এই এখন বাধা না দিলে হারুন আরো অন্যায় করবে। আরো অত্যাচারী হয়ে উঠবে। হয়তো আরো খুন করবে সে। কিন্তু সব জেনেও চুপ থাকা ছাড়া আর কিছু করতে পারলেন না। না পারাব ব্যথা কতটা যন্ত্রণাদায়ক তা কেবল তিনিই জানেন।

জগলু মাস্টারের নাতি ঘুমন্ত অবস্থায় পুড়ে মরেছে। এই খবর পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। দূর দূর থেকে মানুষ গিয়েছিল মাস্টারের নাতির লাশ দেখতে। মাহিরাও গিয়েছিল। মরা বাড়ির চারপাশে হারুনের বাহিনী ঘুরঘুর করছিল। তা দেখে তার সন্দেহ হলো। সে ঘরে এসে ভাবল সারা দিন। সন্ধ্যার পর মা'র কাছে বলল, 'মা, তোমার কী মনে হয়? ওটা কি অ্যাক্সিডেন্ট ছিল?'

এ ক'দিনে তামিমা বেগম অনেকটা বুড়িয়ে গেছেন। অনেকটা এলোমেলো, অন্যমনস্ক হয়ে গেছেন। তিনি কাঁথার ভেতর থেকে মাথা বের করে উৎসুক ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলেন। মাহিরা বলল, 'গতকাল মাস্টারের নাতি আমাকে বলেছিল, তার কাছে প্রমাণ আছে। সে আজ প্রমাণ নিয়ে কোর্টে হাজির হাবার কথা ছিল। কিন্তু দেখ, আজ ভোর হবার আগেই সে আগুনে পুড়ে মরল।'

তামিমা বেগম তখনও কিছু বললেন না। কাঁথার ভেতর থেকে মাথা বের করে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলেন শুধু। মাহিরা বলল, 'ওরা আমাদেরকেও বাঁচতে দেবে না, মা। চলো আমরা পালিয়ে যাই। দূরে, অনেক দূরে। যেখানে হারুনের মতো মানুষ থাকবে না।'

তামিমা বেগম বিড়বিড় করে বললেন, 'পালিয়ে যাবি? কোথায় যাবি?'

'যেখানে ইচ্ছে।'

'আর তোর বাবা? সে যে খুনের দায় নিয়ে জেল খাটছে। তার কী হবে? একবারও কি ভেবে দেখেছিস, যদি কখনো মানুষটা জেলখানা থেকে মুক্তি পায়, তখন কার কাছে যাবে? সে তো এখানেই ফিরে আসবে। এসে যদি আমাদের না পায়?'

'কিন্তু বাবার জন্য আমরা সবাই বিপদে পড়তে পারি না, মা! শাহেরা, হুমায়রাকে বিপদে ফেলতে পারি না।'

তামিমা বেগমের চোখ ভরে জল এল। তিনি একবার চোখের জল মুছলেন। সঙ্গে সঙ্গে আবারো চোখদু'টো জলে ভরে গেল। গাল বেয়ে দু'ফোঁটা অশ্রুজল বালিশ স্পর্শ করল৷ সঙ্গে সঙ্গে তিনি অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।।

(চলবে)

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক : https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=305209154646663&id=100054727422264

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া