মাহিরাঅতিপ্রাকৃত

মাহিরা — পর্ব ৮

ইয়াছিন নাইম২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫৫ মিনিট পড়া

তামিমা বেগম মুখ লুকিয়ে অনেক্ষণ কাঁদলেন। মাহিরা তার পাশে ঝিম মেরে বসে রইল। তারও কান্না পাচ্ছে। তবে এক্ষুণি কেঁদে ফেলার শক্তি নেই। এমনিতেই সে অনেক্ষণ কেঁদেছে। মারওয়ানের পুড়ে যাওয়া লাশ দেখার পর থেকে সে কেন জানি নিজেকে ঠিক রাখতে পারছে না। বারবার মনে হচ্ছে, সে অবচেতনে মারওয়ান নামক ছেলের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সেই দুর্বলতা ভালোবাসা না কি অন্য কিছু তা সে জানে না।

মরা মানুষের প্রতি আবেগ, ভালোবাসা থাকতে নেই। এতে দুঃখ বাড়ে। কষ্ট বাড়ে। মাহিরা মারওয়ানের মুখটা খুব করে ভুলে যেতে চাইছে। কিন্তু যতবার সে ভুলে যাওয়ার কথা ভাবছে, ততবারই মারওয়ানের ঝলসে যাওয়া মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। মাহিরা মনে মনে চিৎকার দিচ্ছে। চেঁচিয়ে কাঁদছে। তবে তার কান্না শোনতে পারে, এমন কেউ নেই। এমনকি সে নিজেও জানে না, এই অশান্তি, নীরব আর্তনাদের বিন্দুমাত্র কারণ। মারওয়ান তো তার কেউ ছিল না। তবে? তবে কেন তার জন্য বুকটা এত হাহাকার করবে? কেন হাউমাউ করে কেঁদে উঠতে চাইবে বারবার?

তামিমা বেগম চোখ-মুখ মুছে পাশ ফিরে তাকিয়ে বললেন, 'আয়, আমরা আজকেই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাই।'

'আজকেই?'

'হ্যাঁ।'

'বাবার কী হবে?'

'সে তার পাপের শাস্তি পাবে।'

'কী বলছো, মা?'

'ঠিকই বলছি।'

'বাবা কী পাপ করেছে?'

মাহিরা প্রশ্ন করে ব্যাকুল হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তামিমা বেগম চোখের জল মুছতে মুছতে বলতে শুরু করলেন, 'তোর বড়ো ভাই উমেদের জন্মের তিন বছর আগে আমাদের আরো একটি সন্তান হবার কথা ছিল। তখন আমরা বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি। বিয়ে করিনি। তোর বাবা বেকার যুবক। আর আমি তার সাথে পালিয়ে আসা অসহায় এক মেয়ে। দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাসায় দু'-চারদিন করে পালিয়ে পালিয়ে থাকি। কখনো এর বাসায়। কখনো ওর বাসায়। এরমধ্যে এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল। তবে আমি বেশ খুশিই হয়েছিলাম। তোর বাবা মোটেও খুশি হয়নি। সে আমার মুখ থেকে কথাটা শুনে আকাশ থেকে পড়েছিল। দূর্ঘটনা হোক বা অন্যকিছু, আমরা না চাইতেও একটা প্রাণ পৃথিবীতে আসতে চাইছিল। কিন্তু তোর বাবা তা মেনে নেয়নি। সে জোর করে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। আমি ছিলাম অসহায়, নিরুপায়, অবিবাহিত একটা মেয়ে। তবুও তোর বাবার হাত-পা জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলাম। তোর বাবা আমার কথা শোনেনি। তাজা একটি প্রাণ সে কেড়ে নিয়েছিল। সে একটা খুনি। একটা খুনি। খুনের শাস্তি তার প্রাপ্য।'

সেদিন রাতেই তারা গ্রাম ছাড়ল। গ্রামের সীমানা পেরিয়ে অন্য গ্রামের বুকের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মহাসড়কের পাশে রাত কাটাল। সকালে ঢাকার বাসে উঠল। যাবার পথে যেখানে নামল, সেই জায়গার নাম রূপগঞ্জ। ঢাকা যাবার পথেই জায়গাটা। গাদাগাদি মিল কারখানা আর তাঁত মিলে ভরপুর। শত, হাজারো, লাখো মানুষের বাস সেখানে। তামিমা বেগম একটা গার্মেন্ট ফ্যাক্ট্রিতে চাকরি নিলেন। শাহেরা আর হুমায়রার পড়াশোনা দমে গেল। তারা মন খারাপ করে ঘরে বসে থাকে। মাহিরার কাজ তাদের দেখাশোনা করা। কিন্তু এভাবে আর ক'দিন?

এক মাসের মাথায় মাহিরা রূপগঞ্জ ছেড়ে ঢাকার পথে পা বাড়াল। তামিমা বেগম অবশ্য প্রথম প্রথম বাধা দিলেন। কিন্তু মাহিরার জোরাজোরির কাছে শেষমেশ হার মানতেই হলো। মাহিরাকে গাড়িতে তুলে দেবার সময় তিনি অসহায় ভঙ্গিতে বললেন, 'যেতে চাচ্ছিস, যা। তোকে আমি মুক্ত করে দিলাম। তবে মনে রাখিস, পাখিরা যেমন বৃষ্টি এলে বেঁধে আসা গাছের ডালের ছোট্ট বাসায় ফিরে যায়, ঠিক তেমনি সন্তানরাও বিপদে পড়লে দুঃসময়ে তার মায়ের কাছে ছুটে যায়। তখন তাদের বোধশক্তি জাগ্রত হয়। তারা বুঝতে পারে, পৃথিবীতে মায়ের চেয়ে আপন কেউ নেই। সবাই কেবল পথ চলার সঙ্গী। তুইও বুঝবি। তুইও ফিরে আসবি আমার কাছে। সেই সময়ের অপেক্ষায় রইলাম। ভালো থাকিস।'

তামিমা বেগম বাস থেকে নেমে দু'হাত দিয়ে চোখের জল মুছতে লাগলেন। মাহিরা বাসের জানালায় উঁকি দিয়ে দেখল, মা কাঁদছেন। তার হঠাৎ বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল। মনে হলো, খুব দামি একটা জিনিস তার কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।

মাহিরার চাকরি হলো রিসিপশনিস্ট হিসেবে। একটি নতুন ব্রডব্যান্ড কোম্প্যানি। নতুন কোম্প্যানি হিসেবে মাহিরাকে চাকরিতে নিয়েছে। বেতনও কম দেবে। না হলে কেবলমাত্র ইন্টারমিডিয়েট পাস করা মেয়ের চাকরি!

রিসিপশনেই পরিচয় আনোয়ারের সঙ্গে। প্রথম দিনই তাদের সামান্য একটা বিষয় নিয়ে খুব ঝগড়া হলো। যদিও শেষমেশ আনোয়ার বেচারা স্যরি বলেছিল। সে এক কোম্প্যানির ইন্টারনেট প্যাকেজ ব্যবহার করে। অথচ অসুবিধের কথা বলতে চলে গেল অন্য কোম্প্যানিতে। মাহিরা কথাবার্তায়ই বুঝেছিল, লোকটার কোথাও একটা মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং হচ্ছে। কিন্তু আনোয়ার মানতে নারাজ। সে সবাইকে দেখে ছাড়বে। কে অতো বাজে সার্ভিস দেয়। কেন তার রাউটার বারবার অটো রিসেট হয়ে যায়!

ভুল জায়গায় এসে ভুল মানুষকে যাচ্ছেতাই বলেছে, সেটা বুঝতে পেরে আনোয়ার লজ্জায় লাল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল অনেক্ষণ। মাহিরা উত্তেজিত হয়ে আনোয়ারকে মারার জন্য পায়ের জুতো খুলে হাতে নিয়েছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরে সে-ও একটু লজ্জা পেল। তার পরই আনোয়ার তাকে চায়ের অফার করল। মাহিরা মানা করেনি।

সেদিন বাইরে এসে অনেক্ষণ হাসল তারা। তারপর অনেক কথা হলো। গল্প হলো। আর এভাবেই তাদের পরিচয়। মাহিরা অতীতের সব ব্যথা ভুলে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল সবে। নতুন বাসাও নিয়েছিল। এর মধ্যে আনোয়ারের সঙ্গে তার বিয়েও ঠিক হয়ে গেছে। আর তখনই মারওয়ান নামক লোকটার আবির্ভাব। মাহিরা তাকে দেখে হতবাক। অনেক আগে আগুনে পুড়ে মরে যাওয়া লোকটা আবার জীবিত হয়ে ফিরে এসেছে! এ-ও কি সম্ভব? সত্যি কি এমন হয়?

আনোয়ার সেদিন রাতে মাহিরার কাছে ছুটে গেল। গিয়ে দেখল, মাহিরা কাঁচুমাচু হয়ে বসে বসে কাঁপছে। ভয়ে ভয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলছে। তার ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়া অবস্থা দেখে আনোয়ার অনেকটা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেদিন পুরো ঘর খুঁজে কাউকে পাওয়া যায়নি।

আনোয়ারের এক পরিচিত সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন। আনোয়ার মাহিরাকে সেই সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গেল। তিনি টানা অনেক দিন মাহিরাকে দেখলেন। এটা সেটা জিজ্ঞেস করলেন। তারপর একদিন নিজে থেকে সবকিছু বললেন। তার কথাগুলো ছিল এরকম, মাহিরার অতীতে এমন কিছু ঘটেছে যা সে ভুলতে পারছে না। আর সেই ভয়ঙ্কর কোনো এক অতীতই তার আজকের এই অবস্থার কারণ।

আনোয়ার উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করেছিল, 'এমন কোনো চিকিৎসা নেই যার মাধ্যমে মাহিরা সেই অতীত ভুলে যেতে পারে?'

সাইকিয়াট্রিস্ট মৃদু হেসে বলেছিলেন, 'আমাদের জীবনে এমন অনেক কিছু ঘটে যায়, যা আমরা চাইলেও ভুলে যেতে পারি না। ভুলতে না পারা অতীতগুলো মাঝে মাঝেই জেগে উঠে। অসহ্য যন্ত্রণায় ভোগায়। আবার হাওয়া হয়ে যায়। সত্যি বলতে, মানুষ অতীত নিয়েই বাঁচে। যদিও বেঁচে থাকার সেই সম্বলটুকু আমাদের খুব পীড়া দেয়। তবুও সেই পীড়াদায়ক জিনিসগুলোই আমাদের প্রিয়।'

(সমাপ্ত)

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক :

https://www.facebook.com/100054727422264/posts/306458304521748/?app=fbl

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া