একটি নতুন দিনের আলো — পর্ব ৩
ইয়াছিন নাইম১৭ মার্চ ২০২৫৪ মিনিট পড়া'তুমি কী করে বলতে পারো, আলেয়া? কী করে ভাবতে পারো এসব? তুমি কি নাদিয়ার মা নও? তাকে পেটে ধরোনি?'
একসঙ্গে এতগুলো প্রশ্ন শুনে আলেয়া বেগমের হাসিখুশি ভাবটা কেটে যায়। কপাল কুঁচকে যায়। তিনি মুখ ভার করে বলেন, 'কেন এসব বলছো?'
সাইদুল ইসলাম ঢুক গিলে বলেন, 'তোমার বোনের ছেলে যে একটা খুনি। সে নিজ হাতে তার বউকে খুন করেছে। তার হাতে নিজের মেয়েকে তুলে দেবার কথা ভাবো কী করে তুমি?'
'ঘরে জামাই রেখে অন্য লোকের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবলে যে কেউ তার বউকে খুন করবে। আদিল ভুল করেনি। ঠিক কাজটাই করেছে।'
'কেউ পালিয়ে যাওয়ার প্ল্যান করেনি। সব ছিল ভুল বুঝাবুঝি। সেটা তুমিও জানো, আলেয়া।'
'অত কথা বুঝি না। আদিল ভুল করেছে, ঠিক। কিন্তু ভুল তো মানুষ-ই করে। না কি? তাই বলে কি তাকে আর সুযোগ দেওয়া যায় না? আদিল তো খারাপ ছেলে নয়। নেশা-টেশা করে না। খারাপ ছেলেদের সঙ্গে মিশে না। শুধু মাঝে মাঝে মাথায় রাগ চেপে যায়, এই এক দোষ। সেটা নাদিয়ার সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেলে ঠিক হয়ে যাবে।'
'কিন্তু জেনেশুনে কীভাবে আমার মেয়েকে খুনির হাতে তুলে দেই?'
'খুনি খুনি করবে না তো। আদিল ভালো ছেলে। আমি তাকে আসতে বলেছি। আজ সন্ধ্যায় আসবে। বিয়েশাদির কথা কিছু বলিনি। আমার বিশ্বাস আদিল মনে মনে নাদিয়াকে পছন্দ করে। যদি তাই হয়, তবে শীঘ্রই তাদের বিয়েটা সেরে ফেলা দরকার।' বলে কোনো রকম জবাবের অপেক্ষা না করে বেরিয়ে গেলেন তিনি। সাইদুল ইসলাম মাথা নিচু করে বসে রইলেন। তিনি এক দুঃখী বাবা। যার দুঃখ আছে। অথচ, দুঃখের কথাগুলো শোনার মতো কেউ নেই। তিনি এক অপারগ বাবা। যার জ্ঞান, বুদ্ধি সবই আছে। অথচ, মতামত পোষণ করার যোগ্যতা নেই। এই সংসারে নারীর কৃতিত্ব চলে। সেই নারী হচ্ছেন আলেয়া। এই আলেয়া একজন নারী হয়ে অন্য এক নারীর ক্ষতি করতে চলেছেন। সাইদুল ইসলাম এসব চোখে দেখেও বাধা দিতে পারছেন না। মাঝে মাঝে তার হারিয়ে যেতে ইচ্ছে হয়। যেখানে গেলে কেউ আর তাকে খুঁজে পাবে না। আলেয়াও না। দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা কিছুই না।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ান তিনি। পেছনে হাত বেঁধে নিচে তাকিয়ে এক পা এক পা ফেলে ছোটো মেয়ে আদিবার ঘরে উপস্থিত হন। আদিবা বিছানায় শুয়ে শুয়ে কী যেন ভাবছিল। সাইদুল ইসলামকে দেখে 'আব্বু!' বলে লাফিয়ে উঠল। তাকে জড়িয়ে ধরে বসে রইল বিছানায়। মেয়েটার বয়স হয়েছে। সাইদুল ইসলাম অতটা কাছে যেতে চান না। মেয়ের বয়স হলে বাবার থেকে খানিক দূরত্ব বজায় রাখা সমীচীন। কিন্তু এ মেয়েটা পাগলাটে স্বভাবের। বাপকে পেলেই লাফিয়ে উঠে। জড়িয়ে ধরে রাখে। যেন পাঁচ বছরের ছোট্ট শিশুটি।
আদিবা হঠাৎ ভ্রু কুঁচকে বলে, 'ব্যাপার কী বাবা, তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?'
'কেমন দেখাচ্ছে রে মা?'
আদিবা ভাবনায় ডুবে গিয়ে গুনগুন করে বলে, 'উম্, একটু অন্যরকম লাগছে। বোধহয় তিন-চার দিন শেভ করোনি। তাতে ভালোই লাগছে। আর মনে হচ্ছে।' বলে একটু থামল আদিবা। সাইদুল ইসলাম কৌতূহলী ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলেন। আদিবা আবার বলে, 'মনে হচ্ছে তুমি প্রেমে পড়েছ। এম আই রাইট, বাবা?'
সাইদুল ইসলাম হাসেন। মেয়েটার স্বভাবই এমন। হুটহাট এমন আজগুবি কথা বলে চমকে দেয়। তিনি বলেন, 'আমার কি আর সেই বয়স আছে রে মা?'
'কী বলো, বাবা! বয়স নেই! বয়স আর কত হলো? ফোর্টি? ফোর্টি ওয়ান? আজকাল এই বয়সের পুরুষেরাই প্রেমে পড়ে, বাবা।'
'না রে মা। বয়স অনেক হয়েছে। পঞ্চাশ পেরিয়েছে।'
'তাতে কী!' আদিবা তাচ্ছিল্য করে বলে, 'এখনও তুমি যা হ্যান্ডসাম! আমার বান্ধবীদের মধ্যে অনেকেই তোমাকে দেখে ক্রাশ খায়, জানো সেটা?'
সাইদুল ইসলাম আবার হাসেন। তিনি জানেন, মেয়েটা বানিয়ে বলছে। বানিয়ে বানিয়ে বলে চমকে দেওয়া যে তার স্বভাব! আদিবা বলে, 'একজন তো তোমাকে প্রপোজও করতে চেয়েছিল। আমি সোজা বলে দিয়েছি, দেখ ভাই। যা-ই কর। তোকে আমি মা বলে ডাকতে পারব না। নাম ধরেই ডাকব। এতে যদি রাজি থাকিস, তা হলে আমার হ্যান্ডসাম আব্বুটার গলায় ঝুলে যেতে পারিস।' বলে বাবার থুতনিতে তিন আঙুল স্পর্শ করে আদিবা।
'নাদিয়ার কী হয়েছে, বল তো?'
'কী হয়েছে?' আদিবা পাল্টা প্রশ্ন করে।
'দেখলাম ছাদে শুয়ে আছে।'
'কী বলো! কাল রাতে তা হলে ছাদে শুয়ে পড়েছিল! দাঁড়াও এক্ষুণি নিয়ে আসি।' বলে উঠতে যাচ্ছিল আদিবা। সাইদুল ইসলাম বাধা দিয়ে বলেন, 'থাক। ডাকতে হবে না। ঘুম ভাঙলে সে নিজেই চলে আসবে।' তিনি জানেন, মেয়েটার বড়ো দুঃখ। ঘুমন্ত মানুষকে কখনো দুঃখ, কষ্ট স্পর্শ করতে পারে না। নাদিয়া ঘুমাচ্ছে। যতক্ষণ ঘুমাচ্ছে, ততক্ষণ সে চিন্তাহীন সুখী মানুষ। কী দরকার একটা সুখী মানুষকে অসুখী করে তোলার!
'রাতুল প্রেসার দিচ্ছে বাবা।' আদিবা মুখ গোমড়া করে বলে।
'কে রাতুল?'
'ভুলে গেলে! আবার ভুলে গেলে! রাতুল, আমার বয়ফ্রেন্ড!'
'আস্তে! তোর মা শুনবে!'
আদিবা ভয়ে, লজ্জায় জিহ্বায় কামড় দেয়। বয়ফ্রেন্ডের কথা মা জানে না। মাকে তার ভরসা হয় না। তবে বাবা ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ। একদম বন্ধুর মতো। তাকে চোখ বুজে সব বলা যায়। সাইদুল ইসলাম বলেন, 'মনে পড়েছে। কিন্তু বয়ফ্রেন্ড প্রেসার দেবে কেন?'
আদিবা চোখ বড়ো বড়ো করে বলে, 'দেবে না? পড়াশোনা শেষ করেছে। চাকরি করছে। ফ্যামিলি থেকে কত চাপ। বিয়ে কর। বিয়ে কর। এদিকে সে তো বসে আছে আমার আশায়। আর আমি ঝুলে আছি আপার আশায়। কবে আপার বিয়ে হবে। কবে আমার পালা। কে জানে!' কপালে হাতের তালু ঠেকায় সে।
'তা ঠিক। কিন্তু তুই ওতো ছোটো মানুষ।'
'ছোটো?' বলে ঠোঁট উল্টায় আদিবা। 'একুশ বছর হয়ে গেছে, বাবা। আমি আর ছোটো নই। এদেশে আঠারো বছর হলে বিয়ের আইন আছে।'
চোখে-মুখে পানির ফোঁটা পড়ায় ঘুম ভেঙে গেল নাদিয়ার। সে চোখ কচলে তাকিয়ে দেখে, মা পানি ছিটিয়ে দিচ্ছেন। উঠে বসতেই আলেয়া হাসি মুখে একটি ব্যাগ এগিয়ে দেন। ব্যাগে নতুন থ্রি-পিস। একগাদা কাচের চুড়ি। লিপস্টিক। আরো কী কী যেন আছে। নাদিয়া অবাক হয়ে ব্যাগের ভেতর তাকায়। আবার মায়ের চোখের দিকে তাকায়। মা এতগুলো জিনিস কেন দিচ্ছে? আজ কোনো উৎসব?
আলেয়া বেগম নরম গলায় বলেন, 'তুই তো শাড়ি পছন্দ করিস না। থ্রি-পিস পছন্দ। তাই দিলাম। গোসল করে পরে নিস। ব্যাগে সাবান আছে। নতুন সাবান দিয়ে গোসল করবি। আর হ্যাঁ, নিচে আয়। মুখ-হাত ধুয়ে খাবি। আজ তোর প্রিয় খাবার রান্না করেছি।' বলে চলে যান তিনি। নাদিয়া অবাক হয়ে ভাবে। আকাশ-পাতাল ভেবেও কিছু পায় না। এক রাতে মায়ের এত পরিবর্তন! এতটা বদলে গেল মা! কিন্তু কেন?
চলবে
মো. ইয়াছিন
গত পর্বের লিংক :
https://www.facebook.com/100054727422264/posts/324721996028712/?app=fbl