একটি নতুন দিনের আলো — পর্ব ৪
ইয়াছিন নাইম১৮ মার্চ ২০২৫৫ মিনিট পড়ানাদিয়া গত রাতে কিছু খায়নি। সকালে ঘুম থেকে উঠেই পেট গুড়গুড় করছিল। খিদেয় পেটটা জ্বলছিল। চোখের সামনে এত রকমের খাবার পেয়ে গপাগপ করে মুখ পুরল। খাওয়া শেষ করে ঢেকুর তুলে প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মা তাকে নতুন থ্রি-পিস দিয়েছেন। কাচের চুরি, লিপস্টিক, কানের ঝুমকো সহ আরো অনেক কিছু দিয়েছেন। এতদিন পর মায়ের মন ভালো হলো তবে! এই ভেবে নাদিয়া মনে মনে মা'র জন্য দোয়া করল।
পুরোটা সকাল ভালোই কাটল তার। বিপত্তি ঘটল দুপুরে। দু'টো নাগাদ হঠাৎ আলেয়া বেগম উঁকি দেন নাদিয়ার ঘরে। সে তখন বসে বসে গল্পের বইয়ে মনোযোগ দিয়েছে। আলেয়া ধমক দেন, 'এই মেয়ে, এখনও তৈরি হওনি কেন? পুরনো কাপড়চোপড় পরে আছো কেন? তোমাকে না নতুন থ্রি-পিস দিলাম। তাড়াতাড়ি তৈরি হও।'
তৈরি হবার কথা শুনে নাদিয়া বুঝতে পারে, আজও কেউ তাকে দেখতে আসছে। এজন্যই বুঝি এত আয়োজন! এত রান্নাবান্না! এত জিনিস দিয়েছেন মা! কিন্তু নাদিয়া তখনও জানে না, যে তাকে দেখতে আসছে, সে তার খালাতো ভাই আদিল।
সন্ধ্যার পর ছাদে দাঁড়িয়ে তারা গুণছিল নাদিয়া। একটি, দু'টি, তিনটি... হঠাৎ পুরুষালি গন্ধ নাকে যাওয়ায় সে ফিরে তাকায়। তার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে আদিল। মুখে দাড়ি-গোঁফের চিহ্নমাত্র নেই। কপালে বিন্দুমাত্র ভাঁজ পড়ে আছে। চোখদু'টো দূর আকাশে। নাদিয়া চমকে উঠার ভান করে বলে, 'আপনি! কখন এলেন?'
'কিছুক্ষণ আগে।'
এরপর নাদিয়া আর কথা খুঁজে পায় না। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে তার দু'জন। একসময় নির্জনতার অবসান ঘটিয়ে আদিল বলে, 'খালামণি ডেকেছিল। বলেছিল, ছোট্ট একটা অনুষ্ঠান। এসে দেখলাম তেমন কিছুই না। তারপর তিনি আসল কথা বললেন।'
'আসল কথা?' বলে ভ্রু কুঁচকে তাকায় নাদিয়া।
'হুঁ। কিন্তু তুমি আমাকে পছন্দ করো এটা নিজে বললেই পারতে। আমিও তোমাকে মনে মনে পছন্দ করতাম। এখনও করি।' বলে মাথা নিচু করে আদিল।
নাদিয়া থমথমে গলায় বলে, 'কিন্তু আমি তো আপনাকে পছন্দ করি না।'
আদিল সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়, 'পছন্দ করো না?'
'না।'
'খালামণি কি তা হলে মিথ্যে বলেছে?' জিজ্ঞেস করে প্রশ্নের জবাবের অপেক্ষা না করে চলে যায় আদিল। নাদিয়া স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সে জানে, এই এখন একটা বড়োসড়ো ভুল করে ফেলেছে সে। এর মাশুল তাকে দিতেই হবে। কিছুক্ষণ পর আলেয়া বেগম তেড়ে আসবেন। এ কী করবেন, তা-ও সে জানে। মার খাওয়ার জন্য আগাম প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে নাদিয়া। নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করে। আজ সে কাঁদবে না। শত মারলেও কাঁদবে না।
মিনিট পাঁচেক পর একজন এল ঠিকই। কিন্তু আলেয়া বেগম নন। উদ্বিগ্ন আদিবা ছুটে আসে। কৌতূহলী ভঙ্গিতে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে, 'আদিল ভাইকে কী বলেছিস, আপা?'
'কেন, কী হয়েছে?'
'কী হয়নি তাই বল। আদিল ভাই খুব চেঁচামেচি করেছে। আম্মুর মুখের উপর অনেক কথা বলে গেছে। প্রতারক, মিথ্যেবাদী এসবও বলেছে। আম্মু কান্নাকাটি করছে। সব দোষ নাকি তোর। আজ তোর কপালে খারাপি আছে। পালিয়ে যা, আপা। পালিয়ে যা।'
'কোথায় পালাব?' অসহায়ের মতো প্রশ্ন করে নাদিয়া।
আদিবা আকাশ-পাতাল ভেবেও পায় না, তার বোনকে কোথায় পালিয়ে যেতে বলবে। কোথায় পালালে সে বাঁচতে পারবে। শুধু হাত কচলাতে কচলাতে বলে, 'তোর কপালে মাইর আছে রে। আজ তোর কী হবে কে জানে! আব্বুটাও নেই। কোথায় যেন বেরিয়ে গেছে। এখন কী হবে বল তো?'
'কী হবে আবার? সব সময় যা হয় তাই হবে।'
'মুখ বুজে মার সহ্য করবি? কিন্তু আর কতদিন?'
'যতদিন কপালে আছে।' বলে উদাস হয়ে যায় নাদিয়া।
'তোর এসব দেখতে দেখতে আমার আর ভালো লাগছে না রে আপা। আমি আর পারছি না। একদিন দেখবি, হুট করে পালিয়ে যাব। তখন আর তোর এসব দেখতে হবে না।'
'কার সাথে পালাবি? রাতুলের সাথে?' বলে একগাল হাসে নাদিয়া। আদিবা ধমকের সুরে বলে, 'এমন কঠিন সময়ের হাসিস কীভাবে বল তো?'
আসলে নাদিয়া মোটেও হাসছে না। হাসার চেষ্টা করছে মাত্র। তার মুখে শুকনো হাসি। চোখে জল। বুকটা দুরুদুরু করছে। কখন কী হয় কে জানে! আলেয়া বেগম শক্ত মানুষ। কাঁদা তো দূর, কখনো মন খারাপ হয় না তার। অথচ, আজ কেঁদেছেন। সত্যি বলতে, তার ছোটো বোন এবং বোনের ছেলেটাকে একটু বেশিই ভালোবাসেন তিনি। আর তাই হয়তো আদিল অপমান করায় তিনি কান্না আটকাতে পারেননি। কিন্তু নাদিয়া ভেবে পায় না, বোন আর বোনের ছেলের জন্য এত ভালোবাসা। অথচ নিজের স্বামী সন্তানের জন্য একটুও ভালোবাসা, স্নেহ, মমতা নেই কেন?
আলেয়া বেগম ছাদে এলেন ঠিকই কিন্তু নাদিয়াকে মারলেন না। সোজা এসে নাদিয়ার ঘার ধরে ঠেলে নিয়ে যেতে লাগলেন। ঠেলে ঠেলে দরজার বাইরে বের করে দিলেন, 'দূর হয়ে যা। তোর মতো মেয়ে আমার দরকার নেই।' বলেই তিনি দুম করে দরজা বন্ধ করে দেন। রাতের অন্ধকারে একা একটা মেয়ে। কোথায় যাবে? কী করবে? আদিবা আটকাতে যাচ্ছিল। পারল না। মায়ের কড়া ধমকের কাছে হার মানতে হলো শেষমেশ।
নাদিয়া সোজা রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল। প্রায় বিশ মিনিট হাঁটার পর একটি নির্জন জায়গায় দাঁড়ায় সে। অন্ধকারে একটি গাছের নিচে বসে বিশ্রাম নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বসার পর বুঝতে পারে, তার পাশে কেউ একজন বসে আছে। অন্ধকারে দেখা যায়নি। তারা দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠল, 'কে?'
অপরিচিত ছেলেটা এবং আদিবা দু'জনেই বিস্মিত। খানিক বাদে আবার দু'জনে একসঙ্গে বলল, 'আপনি এখানে কেন এসেছেন?' আবার বলল, 'মা মেরে বের করে দিয়েছেন।' দু'টো মানুষের একই সমস্যা। মা মেরে বের করে দিয়েছেন। তারা দু'জনে বসার জন্য একই জায়গা নির্বাচন করেছিল। এমনকি তাদের বলা তিনটি কথাই দু'জনে একসঙ্গে বলল। যেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে কেউ একজন। অপরজন তারই প্রতিবিম্ব। তারা দু'জনেই একসঙ্গে হেসে ফেলল। তারপর অনেক কথা হলো। ছেলেটার নাম খোকন। একই এলাকায় থাকে। চাকরির আশায় ঘুরতে ঘুরতে জুতোর তলা ক্ষয় করায় এবং শেষ সম্বল মাটির ব্যাঙ্কে জমিয়ে রাখা টাকাগুলো খরচ করে ফেলায় খোকনের মা ক্ষেপে গিয়ে মেরে বের করে দিয়েছেন। খোকনের সাথে নাদিয়ার অনেক কিছু মিলে যায়। অনেক কিছু মিলে না। এই যেমন, নাদিয়ার বাবা আছে, বোন আছে। খোকনের তা নেই। আছে বলতে শুধু বৃদ্ধ মা। তবে তারা দু'জনেই একটু বোকা। একটু ভিতু। একটু বিষণ্ণ।
রাত যত বাড়ে, তাদের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ততই প্রখর হয়। ভীত দু'টো মানুষ সিদ্ধান্ত নেয়, তারা ফিরে যাবে যার যার ঘরে। তারপর যা হবার হোক। তারা মার খাবে, অপমান সহ্য করবে তবুও ফিরে যাবে। এবং তা-ই হয়। ভয়ে জর্জরিত দু'টো মানুষ ভিন্ন দু'টি পথ ধরে চলতে শুরু করে। নাদিয়া এক দিকে। খোকন অন্য দিকে। এই খনিকের পরিচয়ে দু'জনের মধ্যেই একটু সাহসের সঞ্চার হয়েছে। আঁধারে ঢেকে যাওয়া জীবনে এক বিন্দু আলো এসে পড়েছে। সেই বিন্দুমাত্র আলোয় পথ চলে দু'জন। হঠাৎ দু'জনে একসঙ্গে ফিরে তাকায়। একসঙ্গে হেসে ফেলে। তারপর যার যার পথ ধরে হাঁটতে থাকে। এক পা, দু' পা...
এরপর আর কখনো তাদের দেখা হবে? কথা হবে? কখনো একই পথ ধরে চলা হবে? না৷ এমন তো হবার কথা নয়। তবুও নাদিয়ার কেন জানি মনে হয়, খোকন ছেলেটার সঙ্গে তার আবারো দেখা হবে। কথা হবে। একসঙ্গে দীর্ঘ পথ চলা হবে। এইসব শুভ্র চিন্তার মাঝে হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়ে। ফিরে গেলে ঘরে জায়গা হবে তো? মা আবার তাড়িয়ে দেবে না? ভাবতে ভাবতে নাদিয়া থমকে দাঁড়ায়। এখনি ফিরে যাওয়া ঠিক হবে না।
চলবে
মো. ইয়াছিন
গত পর্বের লিংক :
https://www.facebook.com/100054727422264/posts/325436259290619/?app=fbl