একটি নতুন দিনের আলো — পর্ব ২

ইয়াছিন নাইম১৬ মার্চ ২০২৫৫ মিনিট পড়া

'কিছু বলিসনি, না? কিছুই বলিসনি?' আলেয়া গর্জে উঠেন। রাগে, আক্রোশে ফুঁসতে ফুঁসতে দাঁত কটমট করে বলেন, 'কিছু না বললে ওরা চলে গেল কেন?'

নাদিয়া কিছু বলে না। চুপ করে থাকে। সে বলেছে। তার আগের স্বামী ও সংসারের কথা বলেছে সে। তবে ইচ্ছে করে বলেনি। মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। নাদিয়াকে চুপ থাকতে দেখে আলেয়ার রাগ আরো বেড়ে যায়। তিনি গজরাতে গজরাতে হঠাৎ এক কান্ড করে বসেন। ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়া সাতাশ বছর বয়েসী মেয়েটার মুখে টর্চ লাইট দিয়ে আঘাত করে বসেন। টর্চটা স্টিলের তৈরি। আঘাত পেয়ে আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে নাদিয়া। আলেয়া বেগম হনহন করে চলে যান। যেতে যেতে অনেক কুৎসিত কথাবার্তা বলেন। কথাগুলো শুনলেই কানে হাত দিতে হয়; এমন বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি কথা। বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি শব্দ।

নাদিয়া নিজেকে সামলে নিয়ে উঁবু হয়ে বসে। যন্ত্রণায় ফুলে যাওয়া গালে হাত দিতেই হাতটা ভিজে যায়। সেই ভেজা জবজবা হাতটা চোখের সামনে ধরে রাখে নাদিয়া। চাঁদের আলোয় টকটকে লাল রক্তে ভেজা হাতটা কেমন যেন চিকচিক করছে। লিকলিক করছে।

মার খেয়ে ভয়ে, আর্তনাদে এইটুকু হয়ে যাওয়া সাতাশ বছরের নাদিয়াকে সামলে নেয় তারই ছোটো বোন আবিদা, যার বয়স সেদিন একুশ হলো। দুধের শিশু ওঁয়া ওঁয়া করে কাঁদলে বাচ্চার মা যেমন আঁচল পেতে বাচ্চাটাকে বুকে আগলে নেয়, ঠিক তেমনি আবিদা আগলে নেয় তাকে। আবিদার বুকে মাথা রেখে হুঁ হুঁ করে কেঁদে ওঠে নাদিয়া। আবিদা সান্ত্বনা দিয়ে মাথায় হাত বুলায়। বলে, 'তুই এত বোকা কেন রে? সারা দুনিয়ায় মানুষ মিথ্যে বলে। এমন ভাবে বলে, যেন সত্য বলছে। তোকে তো মিথ্যে বলতেও হবে না। শুধু একটি সত্য চাপা রাখতে হবে। সেই সহজ কাজটাই পারিস না কেন? কেন পারিস না? তুই জানিস, তোকে কাঁদতে দেখলে আমার গায়ে আগুন ধরে যায়। ইচ্ছে হয়, মনের সাধ মিটিয়ে পেটাই তোকে। পিটিয়ে বুঝিয়ে দেই, কান্নাকাটি করে দুর্বলরা। তুই কেন কাঁদবি? তুই কি দুর্বল? কী সুন্দর দেহ তোর। কী সুন্দর চেহারা। কী দারুণ দারুণ দু'টো চোখ। কী ভালো তো গায়ের রং। ইচ্ছে হয়, পিটিয়ে বুঝিয়ে দেই, কতটা সুন্দর তুই। কতটা ভালো তুই।'

কিছুক্ষণের জন্য শান্ত হয় আবিদা। নাদিয়া কথা বলে না। শুধু কাঁদে আর কাঁদে। আবিদা বলে, 'তুই জানিস, এ-গ্রামের সবচে' সুন্দর মেয়ে তুই? আমি বলি, এ-দেশের মধ্যে সবচে' সুন্দর তুই। এমনকি পৃথিবীর সব মেয়েদের যদি এক সারিতে দাঁড় করিয়ে বলা হয়, কে বেশি সুন্দর? আমি তখনও বলব, পৃথিবীর সবচে' সুন্দরী মেয়ে আমার এই বোনটি।'

নাদিয়ার কান্না থামে না। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি ওঠে। আবিদা তাকে দূরে ঠেলে দেয়। বলে, 'কান্না থামাবি না তো? বেশ। তুই থাক। সারা রাত কাঁদ। আমি আর কখনো তোর কাছে আসব না।' এই বলে সে চলে যায়। নাদিয়া অন্ধকার ছাদে দাঁড়িয়ে থাকে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদে। রাত গভীর হয়। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। নাদিয়ার খোঁজ কেউ নিতে আসে না। একসময় সে কাঁদতে কাঁদতে ছাদের উপর ঢলে পড়ে।

সাইদুল ইসলামের বড়ো দুশ্চিন্তা। চিন্তায় চিন্তায় রাতে ঘুম হয় না। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। তার ধারণা, মাথার চুল পেকে যাওয়া এবং কপালের চামড়ায় ভাঁজ পড়ার কারণও এই দুশ্চিন্তা। বয়স আর কত হলো? পঞ্চান্ন? ছাপান্ন? এই বয়সে কারো চুল পাকে? তা-ও সবগুলো! চামড়ায় ভাঁজ পড়ার কথা তো তারও আগে আসে। এত অল্প বয়সে কারো চামড়ায় ভাঁজ পড়ে? পড়েছে কখনো? ভাবতে ভাবতে তিনি গম্ভীর হয়ে যান। সত্যি, তার চিন্তার অন্ত নেই। তবে তার চিন্তার রাজ্য বেশিদূর বিস্তৃত নয়। দিন, রাত, সকালে, দুপুরে ঘুরেফিরে ওই একই চিন্তা, বয়স্ক মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে বিদায় করা। কিন্তু তা কোনো ভাবেই পারছেন না তিনি। মেয়েটার একবার বিয়ে হয়েছিল। যদিও ডিভোর্স হয়ে গেছে। সাইদুল ইসলাম চাইলেই বিবাহিত কোনো সুপুরুষের হাতে নাদিয়াকে তুলে দিতে পারতেন। এমনকি তার স্ত্রী আলেয়াও বলেছেন, 'মেয়ের একবার বিয়ে হয়েছে। এখন তাকে বিবাহিত কারোর হাতে তুলে দিলেই পারো।'

কিন্তু সাইদুল ইসলামের এক কথা, মেয়ে তার বিবাহিত হোক, আর ডিভোর্স প্রাপ্ত হোক, বিবাহিত কোনো লোকের কাছে তিনি মেয়ের বিয়ে দেবেন না। এর একটি শক্ত কারণও আছে। সাইদুল ইসলামের মা'র বিয়ে হয়েছিল, সতিনের ঘরে। বিয়ের এক মাস যেতে না যেতেই তার বাবার রূপ পাল্টে যায়। তিনি আবার বড়ো বউয়ের কথায় উঠবস করতে শুরু করেন। আর ছোটো বউ, অর্থাৎ সাইদুল ইসলামের মায়ের উপর অন্যায়, অত্যাচার শুরু হয়। কখনো বাবা তো কখনো সৎ মা। তারা যেন পালাক্রমে মায়ের উপর নির্যাতন করতেন। এসব দিন সাইদুল ইসলাম নিজ চোখে দেখেছেন। সেকথা মনে হলে, আজও তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। টলটলে জল এসে টলোমলো হয়ে চোখ। তিনি চারকোনা ফ্রেমের চশমাটা নাকের ডগা থেকে নামিয়ে চোখ মুছেন।

সাইদুল ইসলাম চেষ্টা করেননি এমন নয়। নাদিয়ার আগের বিয়ের কথা চেপে রেখে ভালো ছেলে দেখে নাদিয়ার বিয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন। একবার নয়; বহুবার। কিন্তু নাদিয়াই গন্ডগোল পাকিয়ে দেয়। সাইদুল ইসলাম প্রথম প্রথম ভাবতেন, নাদিয়া বোধহয় ভুল করে তার আগের বিয়ের কথা বলে ফেলে। কিন্তু ইদানীং তার মনে অন্য একটি বিষয় উঁকি দিতে শুরু করেছে। তার মনে হচ্ছে, নাদিয়া ইচ্ছে করেই বিয়ে ভেঙে দেয়। হয়তো সে চাইছে না, তার বিয়ে হোক। আর এই বিয়ে ভাঙার সন্দেহের ঘ্রাণ শুঁকতে শুঁকতে অন্য একটি ঘ্রাণ নাকে আসে। তিনি ভাবতে বসে যান, নাদিয়া আর কাউকে ভালোবাসে না তো!

সাইদুল ইসলাম প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করতে করতে ছাদে উঠে আসেন। দশ থেকে পনেরো মিনিট ছাদের উপর হাঁটাহাঁটি করেন। এটা তার নিত্যদিনের অভ্যাসের মধ্যে অন্যতম। আজও তিনি প্রতিদিনের মতো ছাদে এলেন। ছাদে পা রেখেই হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন। ছাদে গুটিসুটি মেরে পড়ে আছে তার বড়ো মেয়ে নাদিয়া। ওড়নাটা খানিক দূরে পড়ে আছে। ওড়না বিহীন পড়ে থাকা নাদিয়ার দিকে চোখ যেতেই তিনি এপাশ, ওপাশ চেয়ে দেখেন। কেউ দেখছে না তো? নাঃ, কেউ নেই। তিনি দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে ওড়নাটা আস্তে করে নাদিয়ার গায়ের উপর রেখে দেন। অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। তিনি হাঁটাহাঁটির কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে সিঁড়ি বেয়ে চলে যান নিজের ঘরে। আলেয়া বিছানায় বসে বসে যেন তারই অপেক্ষা করছিলেন। তিনি ঘরে পা রাখতেই আলেয়া ব্যাকুল হয়ে এগিয়ে এলেন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে বললেন, 'আমার ছোটো বোনের ছেলেটার কাছে নাদিয়াকে দিয়ে দিলে হয় না?'

সাইদুল ইসলাম কথা বলেন না। গম্ভীর ভাব নিয়ে বিছানায় বসেন। তিনি জানেন, আলেয়া কার কথা বলছেন। সে আগেও তিনি এ-কথা বলেছেন। সাইদুল ইসলাম রাজি হননি। কীভাবে রাজি হবেন তিনি? কোনো বাবা পারবে তার মেয়েকে একটা খুনির হাতে তুলে দিতে? তা-ও যে খুনি তার নিজের বউকে গলা টিপে মেরেছে!

আলেয়া গায়ের সাথে গা মিলিয়ে বসে বলেন, 'কার কথা বলছি বুঝতে পারছো? আমার বোনের ছেলেটা। আদিল।'

সাইদুল ইসলামের মনে ভয় জমা হয়। আলেয়া যদি সত্যি সত্যি নাদিয়াকে আদিলের কাছে বিয়ে দিয়ে দেয়! ভাবনায় ডুবে যান তিনি। তার আদরের মেয়েকে দড়ি বেঁধে অত্যাচার করছে আদিল। নাদিয়া চোখ-নাকের জল এক করে আকুতির সুরে ডাকছে, 'বাবা, কোথায় তুমি? এ কার হাতে তুলে দিলে আমায়?'

চলবে

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক :

https://www.facebook.com/100054727422264/posts/324049706095941/?app=fbl

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া