একটি নতুন দিনের আলো — পর্ব ৫
ইয়াছিন নাইম১৯ মার্চ ২০২৫৬ মিনিট পড়াসারা রাত খোঁজাখুঁজির পর সকালে খোঁজ পাওয়া যায় নাদিয়ার। সাইদুল ইসলাম উদাস হয়ে বলেন, 'কোথায় ছিলি রে মা সারা রাত?'
নাদিয়া শান্ত গলায় বলে, 'একটা বড়ো গাছের নিচে শুয়ে পড়েছিলাম, বাবা।'
মেয়ের কথা শুনে সাইদুল ইসলামের চোখে জল আসে। তিনি নাদিয়াকে আপন বাহুডোরে ঠাঁই দিয়ে বলেন, 'আর কখনো আমাকে না বলে কোথাও যাবি না।' নাদিয়া মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। তারপর বাপ মেয়ে একসঙ্গে ঘরে ফিরে। এ পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। আলেয়ার সামনে দাঁড়াতেই সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়। বাপ মেয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকেন। দু'জনেই যেন আসামি। আর আলেয়া জজ। তিনি যা অর্ডার করবেন তা-ই আছে কপালে।
আলেয়া বেগম খানিক চুপ থেকে গর্জে উঠেন, 'তুমি জিজ্ঞেস করো, তোমার আদরের মেয়েকে জিজ্ঞেস করো, সারা রাত কোথায় ছিল সে? কার কাছে ছিল সারা রাত? কার ঘরে?'
কথাগুলো শুনে হতভম্ব হতে হয়। সাইদুল ইসলাম এক আকাশ বিস্ময় নিয়ে হা করে তাকিয়ে থাকেন। নাদিয়া ফুঁপিয়ে কাঁদে। আলেয়া বেগম রাগে, ক্ষোভে কেঁপে কেঁপে উঠেন। এবং শরীরের সমস্ত রাগ মিটিয়ে কটুকথা বলেন। বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি সব কথা। জঘন্য সব শব্দ। শুনলেই কানে হাত দিতে হয়।
দিন তিনেক পরে এক বৃষ্টিমুখর বিকেলে শুয়ে শুয়ে গুনগুন করছিল নাদিয়া। খানিক আগে সে বৃষ্টিতে ভিজেছে। যার ফলে আলেয়া বেগম তাকে ইচ্ছেমতো বকাঝকা করেছেন। নাদিয়ার অবশ্য মন খারাপ হয়নি। শুনতে শুনতে এসব গা সওয়া হয়ে গেছে। ঘরে ফিরে গোসল সেরে কাপড় বদলে বিছানায় শুয়েছিল কেবল, তখনই আদিবা এল। তার চোখে-মুখে বিস্ময়। বলল, 'কী হ্যান্ডসাম! কী স্মার্ট!'
কথার আগামাথা না বুঝে নাদিয়া জবাব দেয়, 'কী বলছিস! মাথা ঠিক আছে তো?'
'না রে আপা। মাথা ঠিক নাই। ছেলেটা যা হ্যান্ডসাম, উফ!'
'কোন ছেলে?'
'একটা ছেলে এসেছে। তোর সঙ্গে দেখা করতে চায়। ছেলেটা খুব হ্যান্ডসাম। তবে তার নামটা কেমন যেন। খোকন। এ আবার কেমন নাম, বল তো? খোকন মানে তো খোকা। সে কি সারা জীবন খোকা থাকবে? বুড়ো হবে না? বুড়ো হলেও কি তাকে খোকা ডাকবে লোকে?'
ছেলেটার নাম শুনে নাদিয়া ভাবতে বসে যায়। খোকন নামটা কোথায় যেন শুনেছে। হ্যাঁ! সেদিন রাতের অন্ধকারে যার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তার নামও খোকন ছিল। সেই ছেলেটাই আসেনি তো! নাদিয়া ছুটে যায়। গিয়ে দেখে সেই ছেলেটাই। লম্বা, রোগা। গায়ের চামড়া শ্যামলা বর্ণের। নাকের নিচে হালকা গোঁফ। দাড়ি নেই। পরনে জিন্স আর ফুলহাতা শার্ট। নাদিয়া আচমকা বলে উঠল, 'আপনি!'
'বিরক্ত করলাম?'
'না না, তা কেন! বোসোন।'
'এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম। আপনি সেদিন ঠিকানা বলেছিলেন। সেটা স্পষ্ট মনে আছে। তাই ভাবলাম...'
'ভালোই করেছেন।' নাদিয়া হেসে জবাব দেয়। আলেয়া বেগম ও-ঘর থেকে ডাকেন, 'নাদিয়া, এদিকে একটু এসো তো।'
নাদিয়া দুরুদুরু বুক নিয়ে এগিয়ে যায়। আজ আবার কী হতে চলেছে কে জানে! আলেয়া বেগমের সামনে দাঁড়িয়ে সে চুপ মেরে থাকে।
'ছেলেটা কে?'
'খোকন।'
'তা তো জানি। কিন্তু এখানে কেন?'
'আমার পরিচিত, মা। এদিকেই যাচ্ছিল, তাই দেখা করতে এসেছে।'
'তোমার বন্ধু?'
নাদিয়া কিছু বলে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। আলেয়া বেগম বলেন, 'হাঁটুর বয়েসি ছেলে তোমার বন্ধু?'
নাদিয়া তখনও চুপ থাকে। খোকনের বয়স একটু কম ঠিকই। তবে হাঁটুর বয়েসি বলা যায় না। যতটা অনুমান করা যায়, বাইশ কি তেইশ বছর হবে ছেলেটার বয়স।
'কী হলো, চুপ করে আছো কেন?'
'সে আমার বন্ধু না, মা। শুধুমাত্র পরিচিত।'
'তা হলে যাও। চা খাইয়ে বিদেয় করো। আর কখনো যাতে এদিকে না আসে।'
নাদিয়ার কোনো বান্ধবী এ বাড়িতে এসে এক গ্লাস পানি পর্যন্ত পায়নি। খোকন চা পেয়েছে। এটা নিতান্ত কম নয়। সে যখন চলে যাচ্ছিল, নাদিয়া তাকে ঘরের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলো। এবং বিদায় বেলা অতি কষ্টে একটি কথা বলল। কথাটা এরকম, 'আপনি আর কখনো আমাদের বাড়িতে আসবেন না।'
খোকন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। চোখের ভাষায় কী যেন বলে। তারপর নিঃশব্দে প্রস্থান করে। চোখের ভাষাটা ঠিক আন্দাজ করতে পারে না নাদিয়া। সেদিন খোকন চলে যায় ঠিকই। তবে যাবার আগে চায়ের কাপের নিচে এক টুকরো কাগজ রেখে যায়। কাগজে তার ফোন নাম্বার লিখা। নাম্বারটা নাদিয়া সযত্নে রাখল এবং পরদিনই মেসেজ করল, 'নাদিয়া বলছি।'
এরপর তাদের কথা বলা শুরু হলো। প্রতিদিন। সকালে, বিকেলে, রাতে। কথা বলাটা যেন অভ্যাসে পরিণত হলো। তবে ফোনে নয়, মেসেজে। দিন রাত মেসেজিং করতে করতে স্বপ্নের রাজ্যে ভেসে বেড়াতে লাগল দু'জন। তবে বাধভাঙা মুক্ত স্বপ্ন নয়। মুঠোয় ভরতি স্বপ্ন। একদিন রাত তিনটে নাগাদ তারা মেসেজিং করছিল। খোকন বলল, 'আপনার ঘুম আসে না?'
'আসে তো।'
'তা হলে ঘুমিয়ে পড়ুন।'
'প্রতিদিন-ই তো ঘুমাই। আজকের রাতটা নাহয় জেগে থাকলাম।'
'ছাই ঘুমান। শেষরাতে বিছানায় গিয়ে সকাল সাতটায় উঠে পড়েন। একে ঘুম বলে?'
'নয়তো কী?'
'শুনুন, ঘুমের একটি নিয়ম আছে। আপনার বয়েসি একজন মানুষের দৈনিক ছয় থেকে সাত ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন।'
'কিন্তু আমি যে পারি না!'
'পারতে হবে।'
'কিন্তু কীভাবে?'
'আমি যেভাবে ঘুমাই, সেভাবে।'
'আপনি কীভাবে ঘুমান?'
'তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে থাকি...'
'অসভ্য!' বলে ফোন সুইচড্ অফ করে রেখে দেয় নাদিয়া। ছেলেটা তুমি পর্যন্ত চলে এসেছে। এতটা বাড়াবাড়ি কি ঠিক? এরপর একদিন যায়, দু'দিন যায়, তিন দিন চলে যায়। নাদিয়া ফোন অন করে না। এতদিনে তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এবং দু'জন দু'জনের প্রতি এক অদৃশ্য টান অনুভব করতে শুরু করেছে। ফোন বন্ধ রেখে, কথা না বলে নাদিয়া ভালো ছিল, এমন নয়। সে একটুও ভালো ছিল না। প্রতি রাতে সে বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদেছে। ফুঁপিয়ে কেঁদেছে। চোখ-মুখের জল মুছে ভেবেছে, কেন এই কান্না? কোনও মানে হয়? সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আর কখনো ছেলেটার কথা ভাববে না। কাঁদবে না। কিন্তু পরদিন আবার কেঁদেছে। ভেবেছে।
চতুর্থ দিনও নাদিয়ার ফোন বন্ধ। খোকন ছেলেটাও ভালো নেই নিশ্চয়ই? সে-ও খুব কাঁদবে। ভাববে। ফোনও করে থাকবে বহুবার। এতদিনে হয়তো শত শত মেসেজ জমা পড়েছে। কিন্তু এসব কিছুই নাদিয়াকে স্পর্শ করে না। সে আর কখনো খোকনের সঙ্গে যোগাযোগ করবে না।
নাদিয়া কয়েকটি ফুলের টব আনিয়েছে। ওগুলোর যত্ন করছিল। হঠাৎ মনে হলো, খোকন ফোনে না পেয়ে যদি বাসায় চলে আসে? বুকটা সহসা কেঁপে উঠে। সে দৌড়ে গিয়ে ফোন অন করে। কিন্তু কী আশ্চর্য, একটি মাত্র মেসেজও আসেনি! একটিও না। লাস্ট মেসেজ নাদিয়ার লেখা, 'অসভ্য!' এরপর আর কোনো মেসেজ নেই। নাদিয়ার চিন্তা দ্বিগুণ বেড়ে যায়। এমন তো হবার কথা নয়! তা হলে কি... একবার নাদিয়া ভাবে, ছেলেটা বোধহয় নিজের ভুল বুঝতে পেরে লজ্জা পেয়েছে। আরেকবার ভাবে, ছেলেটার কোনো বিপদ হলো না তো? না হলে এত কথা মানুষ হঠাৎ একদম চুপ!
খোকনের ঠিকানা নাদিয়া জানে। সে হাজির হলো আলেয়া বেগমের সামনে। কোনো প্রকার ভনিতা ছাড়াই বলল, 'মা, আমাকে একটু বেরোতে হবে।'
আলেয়া বেগম ভ্রু কুঁচকান, 'তুই আবার কোথায় যাবি?'
'আমার এক বান্ধবীর বাসায়। তার খুব অসুখ। দেখতে যাব।'
'এখন যাওয়া যাবে না।'
'কিন্তু সে খুব অসুস্থ, মা। যেতে আমাকে হবেই।'
'তুমি গেলে অসুখ সেরে যাবে?'
'না। কিন্তু চোখের দেখা দেখতে পারব তো!'
'কোনো দরকার নেই। যাও, ঘরে যাও।'
'কিন্তু...'
'ঘরে যেতে বলেছি না? যাও, নিজের ঘরে যাও।'
ধমক শুনে অগত্যা নিজের ঘরে চলে যায় নাদিয়া। বালিশে মুখ গুঁজে অনেক্ষণ কেঁদে যখন মাথা তুলে, তখন পাশে আদিবা উদাসীন ভঙ্গিতে বসে আছে। নাদিয়া অশ্রুজল আড়াল করে বলে, 'কী রে, কখন এলি?'
'এখন।' আদিবা উদাসীন ভাবেই জবাব দেয়।
'কী খবর তোর?'
'ভালো।'
'আর রাতুলের?'
'ভালো।'
'তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন?'
'এমনি।'
'সত্যি করে বল।'
আদিবা দ্রুত নাদিয়ার হাত ধরে ফেলে। করুণ গলায় বলে, 'তুই আর কখনো রাতুলের কথা জিজ্ঞেস করিস না, আপা।'
'কেন রে?'
'ওঁর সাথে আমার ব্রেকআপ হয়ে গেছে।'
'কী বলিস!'
'যা সত্যি, তাই বললাম।'
'কিন্তু! ব্রেকআপ হয়ে গেলে তোর কী হবে? রাতুলের কী হবে?'
'রাতুলের কিছু হবে না। সে আমার থেকে আরো ভালো, আরো সুন্দর কাউকে পেয়ে গেছে। আগামী মাসে তাদের বিয়ে। সব মিলিয়ে সে ভালোই আছে।'
'আর তুই?'
'আমি? আমিও ভালোই আছি। তার ভালো থাকা-ই আমার ভালো থাকা।' বলে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয় আদিবা। হঠাৎ লক্ষ্য করে, নাদিয়া চোখের জল ফেলে কাঁদছে। আদিবা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, 'ব্রেকআপ হলো আমার আর তুই কাঁদছিস! আচ্ছা পাগল তো!'
কিছুক্ষণ পর আবার জিজ্ঞেস করে, 'হ্যাঁ রে, তুই আবার কারোর প্রেমে-টেমে পরিসনি তো?'
নাদিয়া জবাব দেয় না। চোখের জল ফেলে নীরবে কাঁদে।
চলবে
মো. ইয়াছিন
গত পর্বের লিংক :
https://www.facebook.com/100054727422264/posts/326369605863951/?app=fbl