একটি নতুন দিনের আলো — পর্ব ৬

ইয়াছিন নাইম২১ মার্চ ২০২৫৬ মিনিট পড়া

একদিন কাউকে কিছু না বলেই বেরিয়ে যায় নাদিয়া। খোকনের নাম্বার বন্ধ। লোকটার কী হলো কে জানে! নাদিয়া অনেকটা উদ্বেগের সঙ্গে বেরোয়। রাস্তার কাদাজল, বৃষ্টির পড়ন্ত ফোঁটা কিংবা বখাটেদের বিকৃত শিস সব উপেক্ষা করে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় সে। খোকনের দেওয়া ঠিকানা লক্ষ্য করে যেখানে পৌঁছায়, সেখানে শুধু পুরনো দোচালা ঘর। সেটাই তবে খোকনদের বাড়ি?

নাদিয়া ইতস্ততভাবে দরজায় কাড়া নাড়ে। বাড়িটা নিচু। উঠানে জল জমে আছে। হেঁটে পার হওয়ার জন্য ইট বিছানো। নাদিয়া তাল সামলাতে না পেরে জমে থাকা জলে পা ফেলেছিল। আর তাতেই চপাড় শব্দ করে পা'টা চার আঙুল পানির নিচে চলে গেল। কাদাজলে ভরল শাড়ির খানিকটা। নাদিয়া মুখ বিকৃত করে দরজায় কাড়া নাড়ল।

সাড়া পাওয়া গেল মিনিট দু'-এক বাদে। তিনবার ডাকাডাকির পর খোকন দরজা খুলল। নাদিয়াকে দেখে উদাস ভঙ্গিতে বলল, 'আপনি!'

নাদিয়ার চোখে মুখে অভিমান। সে অভিমানে ফেটে পড়ে বলল, 'কোথায় ছিলেন এতদিন? ফোন বন্ধ কেন?'

খোকন স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বলল, 'আমার মা মারা গেছেন।'

নাদিয়া হতভম্ব গলায় বলল, 'কবে!'

'আপনার সঙ্গে যেদিন শেষবার কথা হয়েছিল, সেদিন রাতে। মা আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু আমাকে অতটা বুঝতে দিতেন না। টাকার অভাবে ডাক্তার দেখানোও হয়নি। সেদিন রাতে আপনাকে মেসেজ করছিলাম। হঠাৎ মা'র ঘর থেকে আওয়াজ এল। ছুটে গিয়ে দেখি, মা খাট থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ে গেছেন। তারপর আমার হাতেই শেষ নিঃশ্বাস ছাড়লেন।' বলে মাথা নিচু করে ফেলল খোকন। তার চোখ থেকে দু'ফোঁটা জল টপটপ করে মেঝেড়ে পড়ল। সে ধরা গলায় বলল, 'দুনিয়ায় আমার আর কেউ নেই।'

হঠাৎ মাথা তুলে বলল, 'চা খাবেন তো আপনি?'

নাদিয়া জবাব দিলো না। খোকন জবাবের অপেক্ষা না করে চা আনতে গেল। সেই ফাঁকে নাদিয়া কিছু না বলেই বেরিয়ে এল। রাস্তায় এসে তার চোখ বেয়ে জলের স্রোত বইতে শুরু করল। টুপটাপ বৃষ্টিতে হঠাৎ ছাতাটা নামিয়ে রেখে ভিজতে ভিজতে হাঁটতে লাগল নাদিয়া। বৃষ্টির জলে চোখের জলে একাকার। সন্ধ্যার পর সড়ক বাতির ঈষৎ আলোয় এগিয়ে চলল সে।

বাসায় ফিরেই আলেয়া বেগমের সামনে পড়ে যায় নাদিয়া। আলেয়া রেগে আগুন। একে তো না বলে সন্ধ্যার পর বাইরে বেরিয়েছে। তার উপর ছাতা হাতে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজেছে। তিনি ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন, 'কোথায় গিয়েছিলে?'

নাদিয়া জবাব দিলো না। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আলেয়া গর্জন করে বললেন, 'এই মেয়ে, কথা কানে যায় না? কোথায় গিয়েছিলে? বৃষ্টিতে ভিজেছ কেন?'

তৃতীয়বার যখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, নাদিয়া কোনো প্রকার জবাব না দিয়েই ভেতরের ঘরে চলে গেল। আলেয়া হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কী হলো মেয়েটার! যে মেয়ে আলেয়ার ছায়া দেখলে ভয়ে মরি মরি করত, আজ সে কিনা এমন করল! তার কথার জবাব না দিয়ে চলে গেল! এটা কি এক রকম অপমান নয়?

রাতে আলেয়া বেগম রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সব কথা সাইদুল ইসলামকে বললেন। এবং এ-ও বললেন যে, তার মেয়ে হাঁটুর বয়েসি ছেলের সঙ্গে ফস্টিনস্টি করে বেড়াচ্ছে। তাই তাকে দ্রুত বিয়ে দিতে চান। সাইদুল ইসলাম সব শুনে অসহায়ের মতো বলেন, 'চেষ্টা তো কম করলাম না। আমিওতো চাই বিয়েটা হোক।'

আলেয়া বেগম ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বললেন, তার বোনের ছেলে আদিলের সাথেই নাদিয়ার বিয়ে হবে। আদিল তাদের উপর একটু রেগে আছে ঠিক। তবে ওসব তিনি কথা বলে ম্যানেজ করে নেবেন।

সাইদুল ইসলাম কথা বাড়াননি। মাথা নিচু করে শুনেছেন শুধু। শুনলে কী হবে, আদিলের মতো খুনির কাছে মেয়ের বিয়ে দিতে তার মন সায় দেবে না। এমনিতেই নাদিয়ার প্রথম বিয়েতেই তিনি অনিয়ম করেছেন। পাত্রের ব্যাপারে আরো একটু খোঁজ নেওয়ার দরকার ছিল।

নাদিয়া গোমড়ামুখো। কথা খুব কম বলে। সাইদুল ইসলামের সাথে অতটা ভাব নেই। তাই তিনি সরাসরি নাদিয়ার সঙ্গে এসব কথা বলতে সাহস করলেন না। ছুটে গেলেন আদিবার ঘরে। বললেন, 'কী রে, নাদিয়া নাকি হাঁটুর বয়েসি ছেলের সঙ্গে কী সব করে বেড়াচ্ছে?'

আদিবা ভ্রু কুঁচকে জবাব দেয়, 'খোকন ভাইয়ার কথা বলছো?'

'হ্যাঁ, খোকন না কী যেন নাম।'

'সে তো খুব ভালো, বাবা। আমি খোঁজ নিয়েছি। মানুষ ভালো। তবে খুব নিরীহ। কেউ নেই। বৃদ্ধ মা ছিল। ক'দিন আগে সে-ও পটল তুলেছে।'

'ছেলেটার সাথে নাদিয়ার কীরকম সম্পর্ক?'

'সম্পর্ক?' বলে মুখে টিপে হাসে আদিবা। 'তুমি জানো না কীরকম সম্পর্ক?'

'জানলে কি তোকে জিজ্ঞেস করি?'

আদিবা একরকম ফিসফিস করে বলে, 'আই থিংক, আপু ইন ডিপ লাভ।' বলে আঙুল কামড়ে হাসে। সাইদুল ইসলাম আগ্রহ নিয়ে বলেন, 'উইদ খোকন?'

'ইয়াপ!'

'কিন্তু ছেলেটা যে ছোটো শুনলাম!'

'কোথায় ছোটো? চব্বিশ-পঁচিশ হবে বয়স।'

'নাদিয়ার বয়স যে সাতাশ।'

'তাতে কী?' তাচ্ছিল্য করে বলে আদিবা।

'ছেলেটার ফোন নাম্বার কিংবা বাসার ঠিকানা দিতে পারবি?'

'এখন পারব না। তবে আপুর কাছ থেকে জোগাড় করে দিতে পারি। সময় লাগবে।'

'আচ্ছা। তাই দিস। তবে আমি যে তোর কাছে এসব চেয়েছি, তা যেন নাদিয়া জানতে না পারে।'

আদিবা ফিকফিক করে হেসে বলে, 'তুমি কি আপাকে ভয় পাও বাবা?'

'মেয়েটার জন্য বড়ো ভয় হয় রে মা। তার কপালে কী আছে কে জানে!' বলে সেদিনের মতো চলে যান সাইদুল ইসলাম।

দু'দিন বাদে এক সন্ধ্যায় সাইদুল ইসলাম অন্ধকার ছাদে পায়চারি করছিলেন। আদিবা একরকম হুড়মুড় করে সামনে এসে বলল, 'বাবা, খোকন ভাইয়া এসেছে।'

'কোথায়? কোথায় সে?'

'মা বকাঝকা করে তাড়িয়ে দিয়েছে।'

'আলেয়া ছেলেটাকেও বকেছে?'

'হুঁ।'

'কখন ঘটেছে এসব?'

'এইতো এখনি।'

এখনি ঘটেছে শুনে সাইদুল ইসলাম তাড়াহুড়ো করে নিচে নামলেন। এখনি খোকনকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তার মানে সে বেশিদূর যায়নি। সাইদুল ইসলাম পেয়েও গেলেন তাকে। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে এটা সেটা জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। বাসায় কে কে আছে? কোথায় থাকে? কী করে? এইসব। খোকনও বোকার মতো একটা অপরিচিত লোককে সব বলে দিতে লাগল। একসময় সাইদুল ইসলাম জিজ্ঞেস করলেন, 'গার্লফ্রেন্ড আছে?'

বাবার বয়েসি একজন অপরিচিত লোক এমন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করায় খোকন একটু ইতস্তত করল ঠিক। কিন্তু খানিক মুচকি হেসেই সে মাথা নেড়ে জবাব দিলো, 'আছে।'

'কী নাম তার?'

খোকন কোনোকিছু না ভেবেই বলল, 'নাদিয়া।'

এর পরই সাইদুল ইসলাম বললেন, 'আমি নাদিয়ার বাবা।'

খোকন লজ্জা পেল কি না কে জানে! হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল অনেক্ষণ। আঁকুপাঁকু করেও কথা খুঁজে পেল না। একসময় সাইদুল ইসলাম গলা ঝেড়ে বললেন, 'নাদিয়ার একবার বিয়ে হয়েছিল, জানো তো?'

খোকন মাথা নিচু করে জবাব দেয়, 'জানি।'

'নাদিয়া বয়সে তোমার থেকে তিন-চার বছরের বড়ো হবে।'

খোকন মাথা তুলে জবাব দেয়, 'পাঁচ বছরের বড়ো।'

'এতে তোমার কোনো আপত্তি নেই?'

'আপত্তি থাকবে কেন?'

'এই যে, নাদিয়া বয়সে তোমার বড়ো। এজন্য।'

খোকন মৃদু হেসে বলে, 'বয়সে বড়ো একজনকে পেয়েছি, এ-তো আমার ভাগ্য। বউ হিসেবে করুক আর বড়ো হিসেবে, আদর, যত্ন করতে কিপ্টেমি করবে না।' বলে টিপ্পনী কাটে খোকন।

'শুনেছিলাম তুমি বোকাসোকা মানুষ। এখন দেখছি তা না।'

'ক্ষমা করবেন। আমি একটু নার্ভাস। তাই স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করছি।'

'তুমি কিন্তু অনেক দূর পর্যন্ত চলে গিয়েছো।'

'মানে?'

'কিছুক্ষণ আগে নাদিয়াকে বউ বললে। বউ মানে বোঝো তো?'

'বুঝি।'

'কী বুঝো?'

'বউ মানে ঘরের রানী।'

'এত সহজে বললে হবে না।'

'আমি বোকাসোকা মানুষ...' বলে মাথাটা আরো নিচু করে খোকন।

'অতোটা বোকা তুমি নও। সে যাই হোক। শুনেছি তুমি বেকার। নিজেই চলতে পারো না। বিয়ের পর তো নাদিয়ার দায়িত্বও তোমার উপর পড়বে। তখন কী করবে?'

'বেকার ছিলাম। এখন আর নেই। ছোটোখাটো একটি চাকরি পেয়েছি। বেতন আপাতত বিশ হাজার। খবরটা দিতেই আপনাদের বাসায় গিয়েছিলাম। আন্টি কিছু না শুনেই অপমান করে বের করে দিলেন।' বলে ফ্যাকাশে মুখে হাসির রেখা ফোটাতে চায় খোকন। পারে না। সে সবার আগে খুশির খবরটা নাদিয়ার কানো পৌঁছাতে চেয়েছিল। পারেনি। এই না পারার কারণেই হয়তো বুকে চিনচিনে ব্যথা করছে। নয়তো নাদিয়ার মায়ের অপমান সে মেনে নিতে পারছে না।

'প্রতি মাসে বিশ হাজার?' সাইদুল ইসলাম প্রশ্ন করেন।

'জি। তাই দিয়ে আমাদের দু'জনের কোনোমতে চলে যাবে।'

'দু'জনের মানে?'

'আমার আর নাদিয়ার।'

এতক্ষণে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন সাইদুল ইসলাম। খোকনের কথায় ভরসা আছে। হয়তো এজন্যই নাদিয়া তাকে পছন্দ করেছে। সাইদুল ইসলাম মনে মনে ঠিক করে নেন, সংসারে যত অশান্তিই হোক, আলেয়া বেগম যত বাধাই দিক, তিনি নাদিয়ার বিয়ে এই ছেলের সঙ্গেই দেবেন। এই ভেবে তিনি চলে আসেন। আসতে আসতে ফিরে ফিরে তাকান। খোকন ছেলেটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

চলবে

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক :

https://www.facebook.com/100054727422264/posts/326867262480852/?app=fbl

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া