একটি নতুন দিনের আলো — পর্ব ৭

ইয়াছিন নাইম২৩ মার্চ ২০২৫৬ মিনিট পড়া

সেদিন হঠাৎ এক কান্ড ঘটে গেল। আলেয়া বেগমের ছোটো বোন এবং তার ছেলে আদিল এল। নাদিয়াকে ডাকা হলো। ওঁরা কোনো রকম কথা না বলেই নাদিয়ার হাতে আংটি পরিয়ে দিয়ে গেল। সবকিছু ঘটে গেল ঘোরের মধ্যে। কেউ কিছু আন্দাজ করতে পারলেন না। ওঁরা চলে যাওয়ার পর আলেয়া বেগম বুক চওড়া করে সারা বাড়ি দাপিয়ে বেড়ালেন এবং বললেন, 'এবার আমি নিশ্চিন্ত। আজ থেকে আমার সব দুশ্চিন্তা খতম।' বলে বলে তিনি বারকয়েক হুংকার তুলে হাসলেন। অনেকটা আগের আমলের রাজা বাদশাহদের মতো। আর বাড়ির বাকি লোকেরা অর্থাৎ সাইদুল ইসলাম এবং তার দুই মেয়ে নাদিয়া ও আদিবা হা করে তাকিয়ে দেখল শুধু। তারা যেন দরিদ্র, অসহায়, অত্যাচারে জর্জরিত নিরীহ প্রজা।

রাতে চুপি চুপি নাদিয়ার ঘরে উঁকি দিলো আদিবা। বলল, 'অ্যাই বুদ্ধু, আসব?'

নাদিয়া বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, 'আয়।'

আদিবা দুম করে বিছানায় বসে বলে, 'তুই এত বুদ্ধু কেন রে?'

নাদিয়া জবাব দেয় না। চুপ করে থাকে। তার দৃষ্টি ঘুরন্ত সিলিং ফ্যানের উপর। আদিবা বলে, 'তুই কি ওই খুনিটাকেই বিয়ে করবি?'

'না করে উপায় কী? আজ তো আংটি পরিয়েই গেল।'

'কিন্তু তুই এ-বিয়ে করতে পারিস না, আপু।'

'কেন?'

'কেন? তুই জানিস না কেন?'

'নাহ্।'

'খোকন ভাইয়াকে তুই ভুলে যেতে পারবি?' আদিবা সচকিত প্রশ্ন করে। নাদিয়া জবাব দেয় না। চুপচাপ ছোটো ছোটো নিঃশ্বাস নেয় সে। আদিবা বলে, 'আপু, তুই চাইলে একটা উপায় বাতলে দিতে পারি।'

নাদিয়া মৃদু হেসে ফিরে তাকায়। তার মুখটা কেমন যেন ফোলা ফোলা। চোখের কোলে বিন্দু বিন্দু জল চিকচিক করছে। হয়তো একটু আগে কেঁদেছে সে। এখন হাসছে, এই হাসির মধ্যেও বুকফাটা কান্না লুকিয়ে আছে, তা তার ফ্যাকাশে মুখ দেখেই আন্দাজ করা যায়। আদিবা ছলছল চোখে বলে, 'তুই খোকন ভাইয়ার সাথে পালিয়ে যা।'

নাদিয়া হাসে। কিছু বলে না। নিঃশব্দে হাসতেই থাকে। আদিবা সচকিত প্রশ্ন করে, 'যাবি না?'

নাদিয়া তখনও জবাব দেয় না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে আর হাসে। তার হাসি দেখে আদিবার গা জ্বলে যায়। আদিবা উঠে দাঁড়িয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে, 'তুই, তুই একটা বদ। তুই আস্ত একটা বদের গুদাম। তুই...' আর কথা খুঁজে পায় না আদিবা। রাগে, আক্রোশে গজরাতে গজরাতে বেরিয়ে যায়।

পরদিন দুপুরে সাইদুল ইমলামের অফিসে উপস্থিত হয় আদিবা। সাইদুল ইসলাম ফিসফিস করে বলেন, 'কী রে মা? এখানে কেন?'

'কথা বলতে এসেছি।'

'কথা বাসায় বলতে পারতি। সন্ধ্যার পরেই তো বাসায় চলে যাব।'

'ওসব কথা বাসায় বলবার মতো নয়।'

'তবে কী?'

'সিক্রেট। দু'মিনিট সময় হবে?'

'আলবাত হবে!'

'তা হলে এসো।'

নির্জন রাস্তায় বাপ মেয়ে হাঁটে আর কথা বলে। আদিবা বলে, 'এসব কী হচ্ছে বাবা?'

'কী হচ্ছে?'

'একটা খুনির সাথে আপুর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।'

সাইদুল ইসলাম লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলেন, 'হ্যাঁ।'

'হ্যাঁ? তোমার কিছু বলার নেই?'

'কী বলব?'

'বলবে না? তোমার মেয়েকে তুমি খুনির হাতে তুলে দেবে?' বলে ঢুক গিলে আবার বলতে শুরু করে আদিবা, 'তুমি বাবা হয়ে এমন অন্যায় মেনে নেবে কেন?'

'এ ছাড়া কী করার আছে বল?'

'প্রতিবাদ করবে। তোমার অনুমতি ব্যতীত আপুর বিয়ে হবে না। হতে পারে না।'

'কিন্তু সবকিছু যে তোর মা করছে। তার কথার বিরুদ্ধে গেলেই যে ঝামেলা বাধবে!'

'ওসব তোমার কথা, বাবা। আমি কিন্তু এ-বিয়ে হতে দেব না।'

সাইদুল ইসলাম মৃদু হেসে বলেন, 'কী করবি?'

'আপুকে নিয়ে যাওয়ার আগেই খুনিটাকে খুন করে ফেলব।'

'কী সাংঘাতিক!'

'রসিকতা নয়। আমি যা বলি, তা-ই করি। এ-কথা তুমিও জানো বাবা।'

'কিন্তু খুন করলে জেলে পচে মরতে হবে যে। সে-কথা জানিস?'

আদিবা মুখ বাঁকা করে বলে, 'আমি কেন খুন করতে যাব? খুন করবে আফিফ।'

'সে আবার কে?'

'আমার নতুন বয়ফ্রেন্ড। গুন্ডা টাইপ। তিন খুনের দায় তার উপর। একবার শুধু বলি, তারপর দেখবে, কীভাবে আদিল ব্যাটাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেয়।'

'সেদিনই তো রাতুলের সাথে ব্রেকআপ করলি। এখন আরেকজন! তা-ও তিন খুনের আসামি! তোকে নিয়ে আমার খুব ভয় রে মা!'

'আমার কথা ভাবতে হবে না। আপুর কথা ভাবো।'

'তার কথা তো সারা দিনই ভাবতে হয়।' বলে খানিক গম্ভীর হয়ে মাথা নিচু করে থাকেন তিনি। হঠাৎ আদিবার দিকে চেয়ে বলেন, 'এখন আমাদের কী করা উচিৎ, বল তো?'

'আপুর বিয়ে দেওয়া উচিৎ।'

'বিয়ে তো হচ্ছেই।'

'উঁহু, আদিলের সঙ্গে নয়। খোকন ভাইয়ার সঙ্গে বিয়ে দেওয়া উচিৎ।'

'তা কী করে হয়! তোর মা সেটা কোনো ভাবেই মেনে নেবে না।'

'কেন মানবে না?'

'কারণ সে চায় বিয়েটা আদিলের সঙ্গেই হোক।'

'কিন্তু যদি আদিলই না থাকে?'

'মানে?'

'মানে যদি আদিলকেই গায়েব করে দেওয়া হয়?'

'সেটা খুব রিস্কি হয়ে যাবে।'

'রিস্কি-ফিস্কি কিচ্ছু হবে না। সময়মতো আদিল গায়েব হয়ে যাবে। দেখে নিও বাবা।'

সেদিন আর কথা হয় না। বাপ মেয়ে যার যার পথ ধরে চলে যায়। আদিবা বাসায়। আর সাইদুল ইসলাম অফিসে। পরদিন বিকেলে আদিবা বেরোয় আফিফের সঙ্গে দেখা করতে। আফিফের বয়স একটু বেশি। তবে তার পেশিবহুল দেহ বয়স ধরতে দেয় না। দেখে মনে হয় তাগড়া যুবক। আদতে আফিফের বয়স হয়েছে খানিকটা। আর তাই আফিফের প্রতি আরো একটু বেশি ভরসা পায় আদিবা।

দেখা করার পর কয়েক মিনিটের মধ্যে সব কথা বলে আদিবা। তার বোন নাদিয়ার বিয়ে ঠিক হয়েছে এক খুনির সঙ্গে। কিন্তু আদিবা চায় না এ-বিয়ে হোক। আর তাই খুনি বরটাকে বিয়ের দিনই গায়েব করতে হবে। আর বরের আসনে বসবে খোকন। সব শুনে আফিফ বাঁকা হেসে বলে, 'এসব কোনো ব্যাপারই না। কিডন্যাপ করতে হবে তো? ওকে ফাইন। তোমার জন্য আমি খুনও করতে পারি।'

আদিবা এক লাফে তিন হাত দূরে গিয়ে বলে, 'না না, খুন নয়। কিডন্যাপ করলেই হবে। খোকন ভাইয়ার সাথে আপুর বিয়ে হয়ে গেলে লোকটাকে ছেড়ে দিও।'

'আচ্ছা, তাই হবে। ইউ ক্যান ট্রাস্ট মি। কবে করতে হবে বোলো। তুমি বললে আজই ব্যাটাকে তুলে নিয়ে আসি।'

'না না, আজ নয়। বিয়ের দিন।'

'কেন? আজ কিডন্যাপ করলে দোষ কী?'

আদিবা মুচকি হেসে বলে, 'তা হলে সব পন্ড হয়ে যাবে। আমি আর বাবা প্ল্যান করেছি। বিয়ের আসর থেকে বর গায়েব হয়ে যাবে। আর তখনই খোকন ভাইয়ার এন্ট্রি হবে। উফ্, কী যে এক্সাইটিং হবে ব্যাপারটা!'

'ওকে। কবে করতে হবে বলো।'

আদিবা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথাটা বলে। আগামী মাসের বারো তারিখ। শুক্রবার। কথা শুনে আফিফের মুখে চিন্তার রেখা ফোটে। সে খানিক ভেবে হঠাৎ পকেট থেকে স্মার্টফোন বের করে। তারপর ডানে বাঁয়ে মাথা নেড়ে বলে, 'না না, আগামী মাসের বারো তারিখ সম্ভব নয়। ওইদিন আমার এক বন্ধুর বিয়ে। বন্ধুটা এমন, আমি না গেলে সে বিয়েই করবে না। তার বিয়ের দিন আমি অন্য কাজে ব্যস্ত থাকতে পারি না। কিছুতেই না।'

কথা শুনে খানিক মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আদিবা। হঠাৎ তার মাথায় বুদ্ধি খেলে যায়। সে জ্বলজ্বল চোখে তাকিয়ে বলে, 'বিয়ের তো অনেক দেড়ি। তোমার বন্ধুকে বলো বিয়েটা আরো এক সপ্তাহ পিছিয়ে দিতে।'

আফিফ কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে থাকে। তারপর বিড়বিড় করে বলে, 'আমি বললে বিয়েটা পিছিয়ে দেবে। কিন্তু এটা কি ঠিক হবে?'

'কেন ঠিক হবে না? আমার জন্য তুমি এটুকু করতে পারবে না?' দ্রুত জবাব দেয় আদিবা।

'আচ্ছা, আমি তা হলে বলে দিচ্ছি। আমার বন্ধুর বিয়ে এক সপ্তাহ পরেই হবে। আগে তোমার কাজ।'

খুশিতে আত্মহারা আদিবা হঠাৎ এক কান্ড করে বসে। উত্তেজিত হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েই আফিফের গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। তারপর দ্রুত সেখান থেকে চলে আসে। আসতে আসতে লজ্জায় লাল হয়ে ফিরে ফিরে তাকায়। আফিফ হতভম্ব হয়ে চেয়ে আছে। মুখে রা নেই। তার চোখে-মুখে বিস্ময়। এতটা হতবাক হয়ে কী ভাবছে সে?

পুরোটা রাস্তা এইসব ভেবে আর লজ্জাবতী লতার মতো কখনো এদিকে তো কখনো এদিকে ঢুলেঢুলে চলে আদিবা। তার মনে জাগে কল্পনার রং। সে রং রংধনুর সাত রঙের চেয়েও চোখ জোড়ানো। আদিবা ভাবে আর কাঁপে। বারবার পুলকিত হয়। আর ভাবে, কী করে এসেছে সে! রাস্তায় দাঁড়িয়ে এমন উদ্ভট কাজ করা কি ঠিক হয়েছে?

কিন্তু এইসব শুভ্র চিন্তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। যখন সে বাসায় এসে জানতে পারে, নাদিয়ার বিয়ে আরো এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, তখন বিনা শব্দেই বর্জ্রাঘাত হয় তার মাথায়। সে যে আফিফকে বলে এসেছে, আফিফের বন্ধুর বিয়ে এক সপ্তাহ পিছিয়ে দিতে। এদিকে নাদিয়ার বিয়েও এক সপ্তাহ পিছিয়ে গেল। সবকিছু কেমন যেন দুইয়ে দুইয়ে চার হয়ে যাচ্ছে। তা হলে কি ওই খুনি আদিলটাই আফিফের বন্ধু? এমন হলে তো বিপদ। মহা বিপদ।

আদিবা দ্রুত আফিফকে ফোন করে। বলে, 'তোমার বন্ধুর নাম কী?'

হঠাৎ এমন প্রশ্নের জবাব আফিফ দেয় না। উল্টো প্রশ্ন করে, 'কেন? হঠাৎ আমার বন্ধুুর নাম...'

আদিবা অধৈর্য হয়ে বলে, 'তোমার বন্ধুর নাম জানতে চেয়েছি।'

অবশেষে আফিফ তার বন্ধুর নাম বলে। তার বন্ধু আর কেউ না, স্বয়ং আদিল। তা শুনে আদিবার ভেতর শুকিয়ে যায়। সে কিছুক্ষণ আগে আফিফকে সব প্ল্যান বলে এসেছে। এসব যদি জানাজানি হয়, যে যা-ই করুক, আলেয়া বেগম তাকে মেরেই ফেলবেন।

চলবে

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক :

https://www.facebook.com/100054727422264/posts/331287962038782/?app=fbl

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া