একটি নতুন দিনের আলো — পর্ব ৮

ইয়াছিন নাইম২৭ মার্চ ২০২৫৬ মিনিট পড়া

খুব স্বাভাবিক ভাবেই বিয়ে হয়ে যায় নাদিয়ার। অনেকটা ঘোরের মতো। আলেয়া বেগম ছাড়া কেউই চাননি বিয়েটা হোক। কিন্তু তবুও নীরবে সবাই মাথা পেতে নিল। নাদিয়া বাচ্চা শিশুর মতো মাথা নিচু করে সব হুকুম পালন করল শুধু। তার কিছু বলার নেই। কওয়ার নেই। বললেও কেউ শুনবে না তার কথা। তাই সে বুকের ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে চুপটি করে বসে রইল। প্রতিবাদ করল না। মাঝে মাঝে যখন অশ্রুজলে দু'চোখ ঘোলাটে হয়ে এল, তখন আড়ালে আড়ালে জলটুকু মুছে নিয়ে দিব্যি নতুন বউয়ের মতো লাজুক হাসতে লাগল।

বিয়ের রাতে যখন আদিল ঘরে এল। এবং নাদিয়ার সাথে এটা ওটা নিয়ে কথা বলল, চাইতে কিংবা না চাইতেও নাদিয়ার গা একবার দু'বার স্পর্শ করল, তখন কোনো এক অজানা কারণে নাদিয়ার বুক ফেটে কান্না চলে এল। কিন্তু তখনও সে বুকের আর্তনাদ, চোখের অশ্রুজল আড়াল করে নিল। এমনকি আদিল যখন নাদিয়াকে পরম সোহাগে আপন করে নিল, তখনও সে প্রতিবাদ করতে পারল না। কাঠের মূর্তির মতো পড়ে থাকল শুধু। আর তার চোখ দিয়ে বয়ে গেল অজস্র অশ্রুজল। তবে সেই অশ্রু পরম নেশায় বিভোর হয়ে থাকা আদিল দেখতে পেল না। সে শুধু দেখল নরম তুলতুলে দেহ। দেখল লজ্জায়, সংকোচে কুঁকড়ে যাওয়া একটি মেয়ে মানুষ। দেখেনি তার আর্তনাদ। দেখেনি তার বুকফাটা কান্না।

আদিল যখন বিছানা ছেড়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ধূমপানে মগ্ন হলো, তখন নাদিয়া নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ছাদে চলে এল। নিঃস্তব্ধ ছাদে চাঁদের আলোয় দু'হাতে মুখ ঢেকে হুহু করে কেঁদে ফেলল সে। এই সময় খোকনের কথা বড্ড মনে পড়ল। নাদিয়ার বিয়ে হয়ে গেছে, এ-কথা খোকন জানে কি? জানলে কী ভাববে? নাদিয়া ধোঁকাবাজ, প্রতারক, ভণ্ড? যা ভাবে ভাবুক, তাতে নাদিয়ার কিচ্ছু আসে যায় না। শুধু মানুষটা ভালো থাকুক। আদৌ কি সে ভালো থাকতে পারবে? ভাবতেই নাদিয়ার বুকটা ফাঁকা হয়ে যায়।

আদিলের হাত একটু বেশিই চলে। কথায় কথায় হাত চালিয়ে সে বোধহয় মজা পায়। সামান্য বিষয় নিয়ে সে নাদিয়ার গায়ে হাত তুলে। একদিন এমন হলো, তরকারিতে লবণ কম দেওয়ায় আদিল রেগে গিয়ে সব তরকারি নাদিয়ার মুখের উপর ছুঁড়ে ফেলল। খানিকটা চোখের ভিতর গিয়েছিল। যার ফলে প্রায় আধা ঘন্টা চোখে পানি ঢেলেছে নাদিয়া। তারপর ধীরে ধীরে ঝাল কেটে গেলেও চোখগুলো ফুলে গিয়েছিল। আর একদিন এমন হলো, ভাতে একটি চুল পাওয়া গেল। যার ফলে মুহূর্তেই ক্ষুদার্ত সিংহের মতো গর্জে উঠল আদিল। নাদিয়ার চুল মুঠোয় ভরে এত জোরে টান দিলো যে, নাদিয়া তাল সামলাতে না পেরে দেয়ালে আঘাত পেল। তারপর মাথা ফেটে টকটকে লাল রক্তে ভেসে গেল পুরো ঘর। নাদিয়া জ্ঞান হারিয়ে পড়ে রইল অনেক্ষণ। আদিল তার দিকে ফিরে তাকালও না। জ্ঞান ফিরার পর নাদিয়া নিজেই ব্যান্ডেজ করে নিল। বিয়ের এক মাস যেতে না যেতেই আদিলের এমন আচরণে নাদিয়া অসহায় হয়ে পড়ল। সে কাউকে বলতে পারে না, প্রতিবাদ করতে পারে না। এমনকি কোথাও চলে যেতেও পারে না। শুধু চুপচাপ সহ্য করে।

তবে কয়েকবার সে ভেবেছিল, বাপের বাড়ি চলে যাবে। পরক্ষণে আবার ভেঙে পড়েছে। ওখানে গেলেই আলেয়া বেগম মুখ কালো করে বলবেন, 'স্বামী মেরেছে তাই বাপের বাড়ি চলে আসতে হবে? সব পরিবারেই তো এরকম একটু আধটু ঝামেলা হয়!' তারপর আবার আদিলের কাছি পাঠিয়ে দেবেন। আদিল জেদ মিটাতে ইচ্ছেমতো মারবে। নাদিয়া প্রতিবাদ করতে পারবে না। এমনকি কাঁদতেও পারবে না। কাঁদলে শাস্তি দ্বিগুণ হয়।

এক বিকেলে খোকন এল নাদিয়ার বাসায়। নাদিয়া তাকে দেখে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মানুষটা আর আগের মতো নেই। মুখের দাড়ি-গোঁফ অসম্ভব রকমের বেড়ে গেছে। মাথার ইয়া বড়ো বড়ো চুল এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। চোখের নিচে কালো দাগ। মুখে মলিন হাসি। বলল, 'এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম, ভাবলাম আপনাকে দেখে যাই।'

নাদিয়া খুশি হয়ে কুশল বিনিময় করল। এটা ওটা জিজ্ঞেস করল। এরপর নাদিয়ার ঠিকানা সে কীভাবে জেনেছে সেটাও জিজ্ঞেস করল। খোকন মৃদু হাসল শুধু। জবাব দিলো না। এরপর বাইরে থেকেই চলে গেল সে। নাদিয়া খানিক নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সবকিছু দূর থেকে দেখল আদিল। সঙ্গে সঙ্গে কিছু বলল না। রাতে সামান্য ছুতো ধরে নাদিয়াকে মারধর করল। একসময় বলেই ফেলল, 'আমি সামনে এলেই ঢং। প্রেমিক যখন আসে তখন ঢং কোথায় যায় শুনি? তখন তো খুব হাসতে পারো। কই, আমার সামনে তো কোনোদিন এভাবে হাসো না!'

কথাগুলো শুনে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল নাদিয়া। প্রতিবাদ করল না। প্রতিবাদ করলে শাস্তি দ্বিগুণ। এরচে' চুপচাপ মেনে নেওয়াই ভালো। তবে কেন জানি সবকিছু সে মেনে নিতে পারল না। বিড়বিড় করে বলল, 'খোকন আমার প্রেমিক নয়।'

এ-কথা শুনে আদিল আরো কয়েক ঘা বসিয়ে দিলো নাদিয়া গালে, পিঠে।

একদিন সাইদুল ইসলাম এলেন। নাদিয়ার ফোলা ফোলা গাল, ফাটা ঠোঁট দেখে বুঝতে পারলেন মেয়েটা কেমন আছে। তবুও জিজ্ঞেস করলেন, 'কেমন আছিস রে মা?'

নাদিয়া ফ্যালফ্যাল করে জবাব দেয়, 'ভালো।'

আরো কথা হয়। টুকটাক এটা সেটা। একসময় সাইদুল ইসলাম বলেন, 'খোকন প্রায়ই আমার কাছে আসে।'

এ-কথাটা ঝট করে ধরতে পারে না নাদিয়া। হঠাৎ চমকে উঠে বলে, 'কে আসে?'

'খোকন। ছেলেটা বড়ো ভালো। তবে সেও আমার মতো নিরীহ। তোর কথা বলে আর চোখের জলে বুক ভাসায়। তার সাথে অন্যায় হয়েছে রে মা। তার সাথে অন্যায় হয়েছে।' বলে আফসোস করতে করতে মাথা নাড়েন তিনি। নাদিয়া অন্য কথা বলে। মা'র কথা জিজ্ঞেস করে। বোন আদিবার কথা জিজ্ঞেস করে। সাইদুল ইসলাম গলা ঝেড়ে বলেন, 'ভালো, ওঁরা সবাই ভালো।'

এক রাতে সামান্য ছুতো ধরে নাদিয়াকে বেধড়ক মারধর করে আদিল। মার খেয়ে খানিক স্তব্ধ হয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকে নাদিয়া। একসময় এক পা এক পা ফেলে জর্জরিত দেহ নিয়ে ছাদে উঠে আসে। তারপর কী যেন ভেবে খোকনকে ফোন দেয়। কাঁদোকাঁদো গলায় বলে, 'আমাকে মুক্তি দিন। এই অভিসাপ থেকে মুক্তি দিন আমায়।'

খোকন ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, 'আপনার জন্য আমার দরজা সব সময় উন্মুক্ত।'

'কিন্তু আমি যে বয়সে আপনার অনেক বড়ো!'

'তাতে কী?'

'কিন্তু আমার যে বিয়ে হয়েছে! একবার নয়, দু'বার।'

খোকন খানিক চুপ থেকে বলে, 'আমি আপনার ভালো চাই। আমার ভালো চাই। আর আমি ভালো তখনই থাকব, যখন আপনি...'

'যখন আমি?' নাদিয়া সচকিত প্রশ্ন করে।

'যখন আপনি ভালো থাকবেন। যখন আমি চাইলেই আপনাকে চোখে দেখতে পারব। ছুঁয়ে দেখতে পারব। মাথায় হাত দিয়ে সান্ত্বনা দিতে পারব। আর ইচ্ছে হলেই আপনাকে বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখতে পারব।' খোকনের গলাটা ধরে এল। সে কাঁদছে কি? নাদিয়া আলতো করে গালের কাছে ফোন ধরে রাখল। তখন অনেক রাত। চারপাশ স্তব্ধ। খোকনের ফোঁপানোর শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেল নাদিয়া। সান্ত্বনা দিলো না। কিছু বলল না। চুপচাপ খোকনের কান্নার শব্দ শুনল অনেক রাত পর্যন্ত। একসময় বলল, 'আপনিও আমার বাবার মতো।'

খোকন নাক টেনে বলল, 'আপনার বাবা কেমন?'

'শান্ত, নিরীহ।'

'ও।'

আবার খানিক চুপ থাকল দু'জন। হঠাৎ খোকন বলল, 'আমার সে যোগ্যতা নেই। নয়তো কবেই আপনাকে নিয়ে আসতাম! আর আপনার বিয়ে!' বলে খানিক হাসল সে। 'আপনার বিয়ে আমি কখনোই হতে দিতাম না।'

ফোন কানে লাগিয়ে শুনছিল নাদিয়া। হঠাৎ আদিল সামনে এসে দাঁড়াতেই তার আপাদমস্তক কেঁপে উঠল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে আদিল দানবের মতো হুড়মুড় করে নাদিয়ার হাত থেকে ফোন কেড়ে নিল। সেটা আছাড় মেরে নাদিয়ার চুল মুষ্টিবদ্ধ করে গজরাতে গজরাতে বলল, 'কার সাথে কথা বলছিলি? কার সাথে?'

নাদিয়া ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদে। নীরবে চোখের জল ফেলে কাঁদে। জবাব দেয় না। আদিল তাকে ইচ্ছেমতো পেটায়। গালে চড় মেরে যখন শান্তি পায় না তখন পিঠে মারে। লাথি মেরে ফেলে দেয় দেয়ালে। যতক্ষণ নাদিয়া অজ্ঞান হয় না ততক্ষণ মারে৷ নাদিয়া অজ্ঞান হয়ে গেলে সে তার ঘরে চলে যায়। সারা রাত পড়ে থাকে নাদিয়া। সকালে ঘুম ভাঙতেই উঠে দাঁড়াতে কষ্ট হয়। সারা শরীরে ব্যথা। বাঁ হাতের কনুই ছিলে গেছে। ঠোঁট কেটে গেছে। আরো কী কী যেন হয়েছে। নাদিয়া সহসা আন্দাজ করে নিতে পারে না। দেয়াল ধরে কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে ওড়না গায়ে দেয়। তারপর রান্নাঘরে যায়। সে আর আদিল এ-বাড়িতে থাকে। আর কেউ নেই। আদিল সকাল ন'টার মধ্যে বেরিয়ে যায়। তাই নাস্তাটা দ্রুত তৈরি করে ফেলতে হবে। না হলে আবার শাস্তি পেতে হবে। নাদিয়া এক পলক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে আটটা দশ মিনিট। এতক্ষণে হয়তো আদিলের ঘুম ভেঙে গেছে। ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে খাবার না পেলে...

কোনোকিছু ভেবে পায় না নাদিয়া। দ্রুত নাস্তা বানায়। আর ভাবে, ক'দিন? ক'দিন চলবে এ-জীবন? এভাবে তিলে তিলে না মেরে আগের বউয়ের মতো নাদিয়াকেও মেরে ফেলে না কেন? এ-কথা আদিলকে জিজ্ঞেস করবে বলে অনেকবার ভেবেছে নাদিয়া। তবে আদিলের সামনে গেলেই তার পুরো সাহস ফুঁশ করে নাই হয়ে যায়। মুখ দিয়ে কথা বেরোয় না।

আদিল নানান ছুতোয় সুযোগ পেলেই নাদিয়ার গায়ে হাত তুলে। নাদিয়া মুখ বুজে সহ্য করে। নীরবে চোখের জল ফেলে কাঁদে। আর মাঝে মাঝে খুব মন খারাপ হলে লুকিয়ে লুকিয়ে খোকনকে ফোন দেয়। আর অপেক্ষা করে। একদিন নাদিয়ারও ভালো সময় আসবে। তখন থাকবে না কোনো দুঃখ-বিষাদ। থাকবে না কোনো অশান্তি। থাকবে না কোনো দীর্ঘশ্বাস। নাদিয়া সর্বদা অপেক্ষা করে সেই সময়ের। আর গুনগুন করে গায়, 'অপেক্ষার প্রহর হয় না যে ভোর! তবুও পথ চেয়ে থাকা...'

(সমাপ্ত)

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক : https://www.facebook.com/100054727422264/posts/332539815246930/?app=fbl

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া