ডেথ ডে কাউন্টারঅতিপ্রাকৃত

ডেথ ডে কাউন্টার — পর্ব ৫

ইয়াছিন নাইম২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫৪ মিনিট পড়া

'আমি আপনাকে যোসেফের কাছে যাওয়ার পাস দিতে পারব না। পাস চাইলে আগে ডেথ ডে কাউন্টার মেশিনটা দিন।' বলে মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে রইলেন ভিক্ষু জ্যোতি মিত্র। আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম।

'সেটা চুরি হয়ে গেছে। আপনি প্লিজ আমাকে যোসেফের কাছে নিয়ে চলুন। আমি যে করেই হোক মেশিনটা খুঁজে এনে দেব। এখন আপনি আমাকে যোসেফের কাছে নিয়ে চলুন। প্লিজ!'

'অনুরোধ করবেন না। আমি নিরুপায়। আপনি যোসেফের সাথে দেখা করতে চাইলে মেশিন নিয়ে আসুন।'

'সেটা তো চুরি হয়ে গেছে। আপনি বোঝার চেষ্টা করুন!'

'দুঃখিত, আমি আপনাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারছি না।'

ভিক্ষু'র সাথে কথা বলছিলাম। এমন সময় সেই মেয়েটা দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসেছে, যার সাথে বাসে দেখা হয়েছিল। তারপর থেকেই একের পর এক অদ্ভুত কান্ড ঘটছে। মেয়েটা এমন ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে যেন সে খুবই বিরক্ত। তার এলোমেলো চুলগুলো আরো একবার বাতাসে দুলিয়ে নাক ফুলিয়ে ফোঁস করে বলে উঠল, 'বলেছিলাম না পস্তাতে হবে? এবার মেশিনটা হাতছাড়া হলো তো?'

'আপনার পাঠানো লোকটা আমার মেশিন চুরি করেছে। তাকে বলুন এক্ষুনি আমার মেশিন ফেরত দিতে। না হলে এর পরিণাম ভালো হবে না।'

সে বিদ্রুপ করে তাকাল। তাচ্ছিল্য করে বলল, 'আপনার কি মনে হয় আমার লোক মেশিন চুরি করলে আমি এখনও এখানে থাকতাম? হাহ্! মেশিন হাতে পেলে আমি সঙ্গে সঙ্গে ফুরুৎ হয়ে যেতাম৷ এখানে এসে বকবক করতাম না।'

'তা হলে চোরটা কে?'

'অন্য গ্যাংয়ের লোক। চেহারা দেখতে পারিনি। আমার লোকজন তার পিছু নিয়েছিল। গুলিও করেছে। কিন্তু একটাও টার্গেটের গায়ে লাগেনি। মাই ব্যাড লাক। একটা গুলি ওই লোকটার গায়ে বিঁধে গেলে মেশিনটার মালিক হয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু হলো না। এখন আপনি আমার কথামতো চলবেন। আমরা ওই লোকটাকে খুঁজে বের করে মেশিন ছিনিয়ে আনব। এতে আপনি আমাকে সাহায্য করবেন। এবার তিরিংবিরিং করলে সোজা গুলি করে দেব। এখন চলুন আমার সাথে।' বলে চট করে এক হাতে আমার কলার টেনে ধরল মেয়েটা। তার সাহস দেখে অবাক হচ্ছি। একলা একটা মেয়ে এভাবে নির্দ্বিধায় আমার কলার ধরে ফেলল! ধরার আগে একবার ভাবেওনি! বাঙালী মেয়েরা খুব বেশি লাজুক হয় তা জানতাম। কিন্তু এত বেশি সাহসী হয় তা আমার ধারণার বাইরে ছিল।

'কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে?'

'জাহান্নামে।'

এবার গাড়ি চালাচ্ছে অন্য একজন। আমি আর মেয়েটা পেছনের সিটে বসে আছি। মেয়েটা আনমনে পিস্তলে গুলি ভরছিল। আমি বললাম, 'কী নাম আপনার?'

'কেন? বিয়ে করবেন আমাকে?' বলে মুখ তুলে তাকাল মেয়েটা। পরক্ষণেই লম্বা করে হেসে বলল, 'এত অবাক হচ্ছেন কেন? টেনশানে ঘামছিলেন আপনি। তাই চমকে দেওয়ার জন্য বলেছি। এত টেনশান নেওয়ার কিছু নেই। আমি আছি। আমার নাম ক্যামেলিয়া।'

'ক্যামেলিয়া?' বলে কৌতূহল প্রকাশ করতেই সে বলল, 'হ্যাঁ। ফুলের নাম। এই নামটা আমার বাবা দিয়েছিলেন। আসল বাবা নয়। আসল মা-বাবা আমি পাইনি। আমাকে যিনি পেলেপুষে বড়ো করেছেন, সেই বাবা এই নাম দিয়েছিলেন।'

'সুন্দর নাম।'

'ও, রিয়্যেলি? থ্যাংকু মিস্টার হেন্ডসাম।'

'আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি বলবেন কি?'

'আমরা একটা পরিচিত জায়গায় যাচ্ছি। আপনার নয়; আমার পরিচিত। যিনি ডেথ ডে কাউন্টার মেশিনটা পাঁচ কোটি টাকায় কিনতে চেয়েছিলেন, তাঁর আস্তানায় যাচ্ছি। চোরটা মেশিন বিক্রি করতে ওখানেই যাবে।'

'আর ইউ শিওর?'

'ড্যাম শিওর। কিন্তু একটা অসুবিধা আছে।'

'কী অসুবিধা?'

'সেটা বলা যাবে না।'

'বলুন। আমি অনুরোধ করছি।'

'উঁহু, বললে আপনি কখনোই সেখানে যাবেন না।'

'যাব। আপনি বলুন।'

'সত্যি যাবেন তো?'

'হ্যাঁ, যাব। আপনি বলুন।'

মেয়েটা ঢোক গিলে আমার মুখোমুখি হয়ে বসল। মুখোমুখি না বলে একেবারে মুখের উপর বলাটাই ভালো হবে। কারণ তার বসার ভঙ্গি অনেকটা সেরকমই। আমার হাঁসফাঁস লাগছিল। তবুও কৌতূহল মেটানোর জন্য দম খিঁচে বসে রইলাম। সে দ্বিতীয়বার ঢোক গিলে মুখ খুলল, 'আমরা এখন যাচ্ছি বিশিষ্ট টেকনোলজি ব্যবসায়ী কাম চোরাই টেকনোলজি কেনাবেচাকারী হোলা সাহেবের আস্তানায়।'

'হোলা! এটা আবার কেমন নাম?'

ঠোঁট উলটে বলতেই মেয়েটা তীব্র বিরক্তিসূচক কথা ছুড়ে দিলো, 'উফ! এত কথা বলেন কেন! হোলা কেমন নাম আবার? মানুষের নাম। যাকগে, মূল কথায় আসি। হোলার একটি মেয়ে আছে। খুব সুন্দরী। হোলা তাকে নিজের প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। সেই মেয়েটি যা চায়, হোলা তা-ই দেয়। মেয়েটি যদি কোনো পুরুষকে পছন্দ করে সেই খবর হোলার কানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে ওই পুরুষকে নিজের মেয়ের পাশে এনে দাঁড় করাবে। প্রয়োজনে বেঁধে রাখবে। গান পয়েন্টে রেখে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করে ফেলবে। আর কোনোদিন তাকে মুক্তি দেবে না। সেই মানুষটা ইহজীবনে আর হোলার আস্তানা থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে না।'

'এসব আপনি আমাকে বলছেন কেন?'

'আপনি যা হেন্ডসাম। হোলার মেয়ে যদি আপনাকেই...' এতটুকু বলতেই থামিয়ে দিতে হলো। খানিকটা বিরক্ত হওয়ার মতো ভাব করে বললাম, 'বাজে কথা রাখুন।'

'বাজে নয়। সিরিয়াস ম্যাটার। আপনি বুঝতে পারছেন না।'

'সব বুঝেছি। গাড়িটা সোজা হোলার আস্তানায় যাক।'

'আপনি কিছুই বুঝেননি মিস্টার মিরাজ।'

'আর বুঝতে হবে না।'

'কিন্তু সবকিছু জেনে নেওয়া জরুরি। পরে পস্তাবেন।'

'শুনুন।' বলে গম্ভীর ভাব নিয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলাম, 'আমি ওখানে বিয়ে-হানিমুন করতে যাচ্ছি না। আমি যাচ্ছি আমার মেশিন ফিরিয়ে আনতে। সেটা হাতে পেলেই আমি যোসেফের সাথে দেখা করতে পারব। তার সাথে দেখা করাটা খুব ইম্পরট্যান্ট।'

'বুঝেছি। কিন্তু হোলা যদি আপনাকে আসতে না দেয়? যদি সত্যি সত্যি তাঁর মেয়ে আপনাকে পছন্দ করে ফেলে?'

'এর আগে কতজন ছেলেকে এভাবে আটক করেছে?'

প্রশ্ন শুনে মেয়েটার চেহারা কালো মেঘে ঢেকে গেল। সে মুখ ভার করে বলল, 'একটিমাত্র মেয়ে। তার জন্য কয়টা ছেলে আটকে রাখার মানে কী? সে তো একজনকেই পছন্দ করবে। সেই মানুষটিকেই জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেবে। সেই মানুষটি হবেন আপনি।'

'আমিই যে হব সেটা এত নিশ্চিতভাবে বলছেন কী করে? হুম?'

প্রশ্ন শুনে লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নিচু করল মেয়েটা। বুঝলাম না। এই প্রশ্নে সে লজ্জা পেল কেন! তা-ও এতটা! মাথাটা একেবারে নিচে নামিয়ে রেখেছে। একবার চোখ তুলে তাকাচ্ছেও না। আবার আড়ালে আড়ালে মিটিমিটি হাসছে। ব্যাপার কী!

গাড়িটা বিশাল গেট অতিক্রম করে গেল। সামনে বিশাল অট্টালিকা। গেট দিয়ে প্রবেশ করার সময় গেটের উপরে সাইন দেখেছি, "হোলা'স প্যালেস"।

(চলবে)

মো. ইয়াছিন

#ডেথ_ডে_কাউন্টার

গত পর্বের লিংক : https://www.facebook.com/100054727422264/posts/459846775849566/?app=fbl

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া