ডেথ ডে কাউন্টারঅতিপ্রাকৃত

ডেথ ডে কাউন্টার — পর্ব ৬

ইয়াছিন নাইম২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫৪ মিনিট পড়া

হোলাস প্যালেস। বাইরে থেকে যতটা ঝা-চকচকে মনে হচ্ছিল, ভেতরে ততটাই জীর্ণ-শীর্ণ, ভাঙাচোরা, লন্ডভন্ড। এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে শত শত বুলেটের খোসা। পড়ে আছে তাজা লাশ। কাচা রক্ত। এখানে, ওখানে, মেঝেতে, মাটিতে ভাঙা কাচের টুকরো, ভাঙা চেয়ার, এলোমেলো সব জিনিসপত্র। দেয়ালগুলো বুলেটে বুলেটে ঝাঁজরা হয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে এই একটু আগে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়ে গেল। যার পরবর্তী অবস্থা এই।

এসব দেখতে দেখতে মাথাটা একশো আশি ডিগ্রি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এগোচ্ছিলাম। এরই মধ্যে ক্যামেলিয়া কখন থেমে গেছে খেয়াল করিনি। আমি নিজের মতো করে হাঁটছিলাম। সহসা আমার কানে একটা মিহি কান্নার আওয়াজ ভেসে এল। কে যেন আহত শেয়ালের মতো একেবারে নিচু আওয়াজে গুনগুন করে কাঁদছে। সেই সুরে কী যে ব্যথা! কী যে যন্ত্রণা! শুনতে ভালো লাগছিল বলে চুপটি করে রইলাম। কাঁদুক কে কাঁদে। কখনো সখনো কান্নার আওয়াজও মিষ্টি লাগে। তখন ক্রন্দনরত মানুষটা যদি থেমে যায়, ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে দু'চারটা চাটি বা চিমটি মেরে ফের কাঁদাই। কিন্তু তাতে অপরপক্ষ আমাকে মানুষ কম বাঁদর ভাববে বলে আর করা হয় না।

যাকগে, কান্নার শব্দটা এখনও শুনতে পাচ্ছি। আওয়াজ পেছন থেকে আসছে বলেই আস্তে করে পেছনের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখি ক্যামেলিয়া হাঁটুর উপর ভর করে বসে কাঁদছে। ফুঁপিয়ে গলা কাঁপিয়ে সুর করে কাঁদছে। আমার মায়া হলো কি না জানি না তবে আমি তখনি তার কাছে ছুটে গিয়ে নিজেকে সমর্পণ করে বললাম,

"কী হয়েছে?"

ফোঁস করে ফনা তোলা সাপের মতো তাকাল মেয়েটা। তার রক্তবর্ণ চোখদু'টো আমার চোখের উপর তাক করে কপালে গভীর ভাঁজ ফেলে বলল, "কী হয়েছে দেখতে পাচ্ছেন না? এই ধ্বংসস্তুপ দেখেও কি কিছু আন্দাজ করতে পারছেন না?"

"বোধহয় পারছি। এখানে হয়তো একটু আগে খুব অ্যাকশান হয়েছে।"

ক্যামেলিয়া উঠে দাঁড়াল। তার হাতে একটা ভাঙা রক্তাক্ত চশমা। সেটা হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দিয়ে বলল, "এটা হোলার চশমা। কেউ হোলার আস্তানায় এসে তার সব লোকজনকে মেরে তাকে তুলে নিয়ে গেল! অবিশ্বাস্য! অবিশ্বাস!" বলতে বলতে কী যেন ভেবে প্রচন্ড রাগে আমার কলার চেপে ধরে বলল, "এবার সত্য গোপন করলে একদম গুলি করে দেব! সত্যি করে বলুন কী আছে ওই মেশিনে? কী এমন বিশেষত্ব তার যার জন্য কেউ এত বড়ো রিস্ক নিতে পারে?"

"আপনি আমাকে গুলি করতে পারেন। তবে আমি কোনো সত্য গোপন করিনি। আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি, ওটা ডেথ ডে কাউন্টার মেশিন। ওই মেশিনের কাজ হলো মানুষের মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত কাউন্ট করা। কোন মানুষ আর কতক্ষণ বাঁচবে সেটা বলে দেওয়া। এজন্যই এটার নাম ডেথ ডে কাউন্টার।"

সে আরো জোরে আমার কলার টেনে ধরে বলল, "সত্যিটা বলুন মিস্টার মিরাজ। এই সামান্য জিনিসের জন্য কেউ এত বড়ো রিস্ক নেবে না। তাছাড়া হোলাকে তুলে নিয়ে যেতে পারে এমন মানুষ সাধারণ কেউ হতে পারে না। এর পেছনে নিশ্চয়ই খুব পাওয়ারফুল কারোর হাত আছে। যার মূল উদ্দেশ্য ওই মেশিন। এবার চালাকি না করে বলে ফেলুন, কী এমন আছে ওই মেশিনে? কী তার বিশেষত্ব?"

"আমি যা জানতাম, তা অনেক আগেই বলে দিয়েছি। একটু আগে আবারো বলেছি। এর বাইরে আমি কিছুই জানি না।"

"তার মানে আপনি গুলি খেতে প্রস্তুত?" বলে পিস্তল বের করে আমার কপালের উপর তাক করল। আমি চোখ বন্ধ করে নিলাম। কিছুক্ষণ পর সে পিস্তল নামিয়ে বলল, "এই মেশিন আপনি কার কাছ থেকে কিনেছিলেন?"

"কারোর কাছ থেকে নয়। ওটা আমার বাবা তৈরি করেছিলেন। তবে আমার জানামতে ওই মেশিনের কাজ এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। কারণ একদিন বাবা নিজেই আমাকে এটা দেখিয়ে ডেথ ডে কাউন্টের কথা বলেছিলেন। এবং এ-ও বলেছিলেন যে, এটার কাজ কমপ্লিট হতে আরো চার-পাঁচদিন সময় লাগবে। অথচ সেদিনই বাবাকে অ্যারেস্ট করা হয়।"

"ফর মাইন্ড ট্রাভেল?"

"হুমম। কারণ ততোদিনে বাবার আবিষ্কৃত টার্ডে নামক ক্যাপসুল খেয়ে মাইন্ড ট্রাভেল করতে গিয়ে অনেক লোক মারা গেছে।"

"আপনিই একমাত্র ব্যক্তি যে কিনা সফলভাবে মস্তিষ্ক ভ্রমণ বা মাইন্ড ট্রাভেল করে ফিরে আসতে পেরেছেন, রাইট?"

"আরো একজন আছে যার কথা কেউ জানে না। আমি তো শুধু একবার মাইন্ড ট্রাভেল করেছি, কিন্তু সে পরপর দু'বার করেছে।"

"রিয়েলি! কে সে?"

"বারিশ।"

"বারিশ?" বলে কৌতূহলী ভঙ্গিতে তাকাল ক্যামেলিয়া।

"হুম। তবে সেসব বিষয়ে কিছু বলছি না।"

"কিন্তু আমার যে মাইন্ড ট্রাভেল, টার্ডে ক্যাপসুল, বারিশ নামের মেয়ে এসব সম্পর্কে জানতে ইচ্ছে করছে?"

"আমি নিরুপায়। সেসব এভাবে বলা যাবে না। যদি একান্তই জানতে হয়, তা হলে "মাইন্ড ট্রাভেল" বইটি কারোর কাছ থেকে ধার নিয়ে পড়ে ফেলুন।"

"ধার নিতে যাব কেন? কিনে ফেলব।"

"সেটা আপনার ইচ্ছে। আমরা বোধহয় মূল প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাচ্ছি। কথা বলছিলাম মেশিন নিয়ে।"

"আপনার বাবা আর কিছু বলেননি ওই মেশিন সম্পর্কে?"

"বলবে বলেছিল। কিন্তু তার আগেই পুলিশ ধরে নিয়ে গেল। আমি একা হয়ে গেলাম। তবে আমার মনে হয় যোসেফ মেশিনটা সম্পর্কে জানে।"

"জোসেফ?" প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে উজ্জ্বল চোখে তাকাল ক্যামেলিয়া। চঞ্চল গলায় বলে উঠল, "কে যোসেফ?"

"বৃদ্ধ সায়েন্টিস্ট। পুরো পৃথিবীর সব অ্যাডভান্সড্ টেকনোলজি তার নখদর্পনে অথচ কেউ তাঁকে জানে না। তিনি কোথায় থাকেন, কী করেন, পুরো নাম কী এসবের কিছুই কারোর জানা নেই। আমাকে বাবা বলেছিল যোসেফের কথা। বাবা উনাকে শিক্ষক মানতেন। গত ক'বছর আমি খুব খুঁজেছি যোসেফকে। কিন্তু পাইনি। শেষে একদিন চিটি পেয়ে গেলাম। স্বয়ং যোসেফের হাতে লেখা চিঠি। সেখানে লেখা,

মিরাজ,

ডি. ডি. সি মেশিন নিয়ে চলে এসো আমার কাছে।

যোসেফ

ডি. ডি. সি মানে ডেথ ডে কাউন্টার। তাই চিঠিতে দেওয়া প্রেরকের ঠিকানা দেখে চট্টগ্রাম চলে এলাম। তারপর বাকিটা আপনি জানেন।"

"তা হলে এক্ষুনি যোসেফের কাছে চলুন।"

"আচ্ছা, যাব। কিন্তু আপনি কাঁদছেন কেন?"

ক্যামেলিয়া অপ্রস্তুত হয়ে চোখ মুছে ধরা গলায় বলল, "হোলা আমার বাবা। তাঁর রক্তাক্ত চশমা এখন আমার হাতে।" বলতে বলতে ভীষণ রাগে দাঁত চিবিয়ে বলে উঠল, "যারা আমার বাবাকে রক্তাক্ত করে তুলে নিয়ে গেছে তাদের সব ক'টাকে খুন করে ফেলব আই সুয়ের!"

"আপনি যে বলেছিলেন হোলার মেয়ে আমাকে পছন্দ করে ফেলবে? সেই মেয়েটা স্বয়ং আপনি?" বলে অবাক হয়ে তাকাতেই সে বিদ্রুপ করে হেসে আমার মুখেমুখি দাঁড়িয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে বলল, "কী মনে হয় আপনার?"

(চলবে)

মো. ইয়াছিন

#ডেথ_ডে_কাউন্টার

গত পর্বের লিংক : https://www.facebook.com/100054727422264/posts/462667232234187/?app=fbl

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া