ডেথ ডে কাউন্টারঅতিপ্রাকৃত

ডেথ ডে কাউন্টার — পর্ব ৪

ইয়াছিন নাইম২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫৪ মিনিট পড়া

মেয়েটার আত্মবিশ্বাস দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। কিন্তু সে বা তার টিম আমাকে ফলো করছে না দেখে আমার বিস্ময় চিন্তায় রূপ নিল। আমি অনেক ভেবেছি। অনেক। কিন্তু কোনো কুলকিনারা পাইনি। তারা যাতে লোকেশন ট্র্যাক করতে না পারে তাই মেয়েটার গাড়ি মাঝরাস্তায় ফেলে এসেছি। তারপর পায়ে হেঁটে, লোকাল বাসে চড়ে বৌদ্ধ মন্দিরে আসতে আসতে বেলা পড়ে এল। নিস্তেজ সূর্য প্রায় ডুবে গিয়েছে; এমন সময় মন্দিরে প্রবেশ করেছি আমি। এখানকার একজন ভিক্ষু (বৌদ্ধদের পুরোহিত) আমাকে দেখে সপ্রভিত হেসে এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে বললেন, 'তুমি মিরাজ?'

'জি।' সংক্ষেপে জবাব দিলাম আমি। তিনি ফিসফিস করে বললেন, 'আমি জ্যোতি মিত্র বড়ুয়া। জোসেফের বাল্যকালের বন্ধু। তাই মন্দিরের পবিত্র ভিক্ষু হওয়া সত্ত্বেও কখনো সখনো আমাকে তার কু-কাজ করতে হয়। কিছু বিষয় খুন খারাবি পর্যন্ত গড়ায়। যোসেফের সাথে যারা দেখা করতে আসে তারা হয় খুবই ভালো আর নাহয় খুবই খারাপ। তুমি কোন দলের লোক?'

'সেটা আপনার বন্ধুর কাছ থেকেই জেনে নেবেন।'

'প্রশ্ন এড়িয়ে যেও না। আমি না চাইলে তুমি কখনোই যোসেফের সাথে দেখা করতে পারবে না। তাই যা জিজ্ঞেস করি সোজাসাপটা জবাব দাও।'

'আমি একটা জিনিস নিয়ে যেতে এসেছি। একটা...'

হাত উঁচু করে থামিয়ে দিলেন তিনি। বললেন, 'ক্রয়-বিক্রয়?'

'হুম।'

'বুঝেছি। কিন্তু যোসেফকে আমি আজ অবধি বিজ্ঞানী হিসেবে মানি না। ও আমার সাথে বড়ো হয়েছে। আমি ওকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমরা দু'জনে ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়েছিলাম। সংগ্রামের বছর আমাদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেল।'

'সংগ্রাম? মানে মুক্তিযুদ্ধ?'

'হ্যাঁ, একাত্তরের যুদ্ধ। সেই সময় আমার বয়স এগারো বছর। যোসেফের বারো। দেশে যুদ্ধ শুরু হলো। পড়াশোনা বন্ধ করে বসে আছি আমরা। সংগ্রামের একেবারে শেষের দিকে যুদ্ধে নেমেছিলাম। তবে মাঠে নেমে যুদ্ধ করিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছি। দেশ স্বাধীনের পরেই যোসেফ নিঁখোজ হয়ে যায়। সে কোথায় গেছে, কেন গেছে, বেঁচে আছে কি নেই সেইসব কেউ জানে না। তার মা-বাবাও না। স্বাধীনতার সাঁইত্রিশ বছর পর একদিন আমি ধ্যানমগ্ন ছিলাম। মুখভরতি দাড়ি-গোঁফওয়ালা একটা লোক এসে বলল, কী রে জ্যোতি, শেষমেশ সন্ন্যাসী হয়ে গেলি? আমি তাকে চিনতে পারিনি। পরে বলল, শালা আমি যোসেফ। তোর বাপ। সেদিনই সে এই এলাকায় আস্তানা গেড়েছে। এরপর থেকে এখানে। মাঝখানের ত্রিশটা বছর সে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেরিয়েছে। নামী-দামি সব পন্ডিত, মাথাওয়ালা আর বিজ্ঞানীদের পেছন পেছন ঘুরেছে। অনেকের বাড়ির টয়লেট পর্যন্ত সাফ করেছে শুধুমাত্র নলেজ বাড়ানোর জন্য। এখানে আসার পর সে নিজের একটা ল্যাব করেছে। প্রথম দিকে একটি ভাঙা টেবিল আর কাঠের চেয়ার দিয়ে শুরু করলেও এখন তার ল্যাবে পৃথিবীর সবচে' দামি জিনিসে ভরতি। যত বিস্ময়কর যন্ত্রপাতি সব জোগাড় করে রেখেছে সে। ক'দিন পরপর এটা-ওটা আবিষ্কার করে আর বেচে। এখন তোমার কাছে কী বেচবে তা-ই দেখাব বিষয়। তুমি হয়তো ভাবছো, আমি এত কথা বলছি কেন? অতিরিক্ত বলা আমার অভ্যেস নয়। আসলে কথা বলার মতো কাউকে পাই না তো, তাই তোমাকে পেয়ে সব বকবক করছি। এজন্য তুমি এটা ভেবে বসে থেক না, আমি তোমার প্রতি সদয় হয়েছি।'

'আপনি কি দয়া করে আমাকে যোসেফের কাছে নিয়ে যাবেন?'

'হ্যাঁ, যাব। তার আগে বিচ্ছুগুলোকে তাড়াতে হবে। না হলে যোসেফ আমাকে বকবে।'

'বিচ্ছুগুলো?' কৌতূহল প্রকাশ করতেই তিনি বিড়বিড় করে বললেন, 'তুমি এখানে আসার প্রায় কুড়ি মিনিট আগে থেকে মন্দিরের পাশে একটা মেয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে। তার সাথে জনা তিনেক লোক। আমার ধারণা ওরা তোমাকে মেরে তোমার সবকিছু লুট করতে এসেছে। যাই, ওদেরকে তাড়িয়ে দিয়ে আসি।'

'ওদের কাছে পিস্তল আছে।'

'আমার মন্দিরে এসে আমারই উপর গুলি চালায় এমন সাধ্য কারোর নেই।' বলে বাঁকা হাসি দিয়ে চলে গেলেন তিনি। আমি এখন বুঝতে পারছি, মেয়েটা কেন আমাকে ফলো করেনি। তাকে তো আমি কাগজে লেখা ঠিকানা দেখিয়েছিলাম। সে জানত, আমি এই মন্দিরে আসব। তাই অযথা আমার পিছু না করে আগেভাবে এখানে চলে এসেছে।

প্রায় দু'মিনিট ভিক্ষু জ্যোতি'র অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় মন্দিরের ভেতরের দিক থেকে ভিক্ষুর পোশাক পরিহিত একজন এসে বললেন, 'নমস্কার।'

আমি আলতো হেসে সম্মান জানালাম। তিনি বিনীত ভঙ্গিতে বললেন, 'কাউকে খুঁজছেন?'

'না। আমি জ্যোতি মিত্র বড়ুয়ার কাছে এসেছি।'

'আমিই জ্যোতি মিত্র বড়ুয়া। বলুন, কীভাবে আপনার সেবা করতে পারি?'

বিস্ময়ে তাঁর দিকে চেয়ে বললাম, 'আপনি জ্যোতি মিত্র বড়ুয়া হলে উনি কে?'

'কার কথা বলছেন?'

'যে একটু আগে বেরিয়ে গেছেন। এখানকার পুরোহিত। জ্যোতি মিত্র বড়ুয়া।'

তিনি এবারও বিনীত ভঙ্গিতে বললেন, 'আপনি হয়তো ভুল করছেন। এখানে এই নামে আর কেউ নেই।'

এতক্ষণে ভাবনার জগতে তলিয়ে গেছি আমি। আগের লোকটা যদি জ্যোতি মিত্র না-ই হয়, তা হলে এত অভিনয় করল কেন? এত কথা বানিয়ে বলল কী কারণে?

ভাবতে ভাবতে পকেটে হাত দিয়ে ব্যাপারটা পরিষ্কার হলো। ভুল পরিচয় দেওয়া লোকটা কথা বলতে বলতে আমার পকেট থেকে ডেথ ডে কাউন্টার মেশিনটা চুরি করে নিয়ে গেছে। কী সাংঘাতিক ব্যাপার! কথা বলতে বলতে আমার পকেট থেকে মেশিনটা নিয়ে গেল আর আমি টেরই পেলাম না!

'আপনি কি মিরাজ?'

ভিক্ষুর প্রশ্নে আমার ঘোর কাটল। বললাম, 'জি।'

'যোসফ আমাকে আপনার কথা বলেছে। আপনি ডেথ ডে কাউন্টার মেশিনটা দিলেই যেন আমি আপনাকে যোসেফের কাছে যাওয়ার পাস দেই।'

'কিন্তু সেটা তো একটু আগে একজন চুরি করে নিয়ে গেছে।'

'কী বলছেন? কে চুরি করেছে?'

'জ্যোতি মিত্র বড়ুয়া।'

'কিন্তু জ্যোতি মিত্র বড়ুয়া তো আমি!'

(চলবে)

মো. ইয়াছিন

#ডেথ_ডে_কাউন্টার

গত পর্বের লিংক : https://www.facebook.com/100054727422264/posts/459572715876972/?app=fbl

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া