ডেথ ডে কাউন্টারঅতিপ্রাকৃত

ডেথ ডে কাউন্টার — পর্ব ৭

ইয়াছিন নাইম২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫৪ মিনিট পড়া

বেঁটেমতো চামড়া কুঁচকে যাওয়া কুঁজো এক লোক যোসেফ। চোখে গোলাকার চশমা, পরনে জিন্স আর টি-শার্ট। পায়ে স্যান্ডেল। তবে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, তাঁর মাথার চুল একটিও সাদা নেই। সব কুচকুচে কালো। এত সহজে তাঁর কাছে চলে আসতে পারব ভাবিনি। ক্যামেলিয়ার এক কথায় ভিক্ষু জ্যোতি মিত্র আমাদেরকে এখানে নিয়ে এসেছেন। এখন দেখছি যোসেফও তাকে চেনেন। তবে ক্যামেলিয়ার প্রতি তিনি একটু বিরক্ত বলে মনে হচ্ছে। কারণ আমাদেরকে একসঙ্গে দেখে তিনি প্রথমেই আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন, 'এই মেয়ে তোমার সাথে কী? ইজ দেয়ার এনি ইমুশন্যাল ইনভলভম্যান্ট?'

'নাথিং।' বলে সেই প্রসঙ্গ সেখানেই দফারফা করেছি। এখন যোসেফের হাত আমার কাঁধের উপর। তিনি লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে বিমর্ষ গলায় বললেন, 'কী জিনিস হাতছাড়া করেছ তা কি তুমি জানো?'

'ডেথ ডে কাউন্টার।'

তিনি ফের লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে আমার দিকে তাকালেন। বললেন, 'ইটস্ নট অনলি ডেথ ডে কাউন্টার। ইটস্ অ্যা টাইম মেশিন। তোমার কি মনে হয় টাইম ট্রাভেল ছাড়া ওই মেশিন ভবিষ্যত বলতে পারত? হুম? ইজ ইট পসিবল?'

আমার মুখে চিন্তার ছাপ দেখে তিনি আমাকে ঝাঁকানি দিয়ে বললেন, 'কী ভাবছো?'

'ইয়েব, এজন্যই আপনি বলেছিলেন ডেথ ডে কাইন্টার মেশিন এনে দিলে টাইম ট্রাভেল করাবেন?'

'হ্যাঁ। তবে ওই মেশিনের কিছু কাজ বাকি। ওটার একটা পার্ট আমার কাছে আছে। সেটা লাগিয়ে নিলেই পুরোপুরি কর্মক্ষম হয়ে যাবে। সেই পার্টটা খুব রেয়ার না। যে কেউ ওটা তৈরি করে ফেলতে পারবে। এজন্যই ভয় পাচ্ছি। যে চুরি করল, সে যদি আবার...' বলতে বলতে তিনি মুখ তুলে চেয়ে বললেন, 'যে করেই হোক, মেশিনটা ফিরিয়ে আনো। যত দ্রুত সম্ভব ফিরিয়ে আনো।'

'ওরা আমার বাবাকে রক্তাক্ত করে তুলে নিয়ে গেছে। আই'ল কিল দ্যাম। আই'ল...' ফুঁসতে ফুঁসতে পেছন থেকে বলে উঠল ক্যামেলিয়া। সঙ্গে সঙ্গে যোসেফের কপালে ভাঁজ পড়ে গেল। তিনি আমার কাঁধ শক্ত করে ধরে বললেন, 'হোলাকে ধরে নিয়ে গেছে! এটা জোবেন গোষ্ঠীর কাজ নয় তো!'

'জোবেন গোষ্ঠী?' প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাতেই তিনি বলে উঠলেন, 'এলিয়েন। আজ থেকে বছর কুড়ি আগে পৃথিবীতে এসেছে। এখনও পৃথিবীর মানুষ এদের ব্যাপারে কিছু জানে না। শুধু আমরা ক'জন জানি। এই মেয়েটার বাবাও জোবেন গোষ্ঠীর একজন। মানে এলিয়েন।'

ক্যামেলিয়ার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিতেই সে ইতস্তত করে বলে উঠল, 'আমি এলিয়েন নই। উনি আমাকে পেলেছেন শুধু।'

'আমি কনফিউজড্। যাকগে, এখন এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাব কীভাবে?'

যোসেফ খুঁজে খুঁজে একটা পুরনো ফাইল থেকে হাতে আঁকা ম্যাপ বের করে এনে আমার হাতে তুলে দিলেন। ম্যাপের মাঝখান থেকে কিছুটা ডানে একটা জায়গায় লাল বৃত্ত আঁকা। সেখানে আঙুল রেখে বললেন, 'এই পোড়াবাড়ির ভেতরে একটা সিঁড়ি আছে। সিঁড়িটা উপরে না উঠে নিচের দিকে নেমে গেছে। প্রায় পাঁচ তলা সমান মাটির নিয়ে পায়ে হেঁটে নামলেই জোবেন গোষ্ঠীর ডেরা। তবে সাবধান, ওরা সংখ্যায় কম হলেও খুব ডেনজারাস। ওরা এমনি এমনি কাউকে জানে মারে না। তবে যদি মারতেই হয়, তবে শেকলে বেঁধে পুড়িয়ে মারে। তুমি ধরা পড়লে তোমাকেও...'

'চলুন।' পেছন থেকে বলে উঠল ক্যামেলিয়া। আমি ম্যাপ পকেটে রাখতে রাখতে সাফ জানিয়ে দিলাম, 'আপনি কোথাও যাচ্ছেন না।'

কারণ আমি জানি, ক্যামেলিয়ার হাতে বেশি সময় নেই। হয়তো জোবেন গোষ্ঠীর হাতেই তার মৃত্যু লেখা। তবে আমার ধারণা অনুযায়ী আগামী কয়েক ঘন্টা ক্যামেলিয়াকে আটকে রাখতে পারলেই সে বেঁচে যেতে পারে।

'আমি যাব।' বলে পথ আটকে দাঁড়াল ক্যামেলিয়া।

'আপনি যাচ্ছেন না। ব্যাস।'

সে আমার মুখের সামনে এসে দাঁড়িয়ে চোখের উপর চোখ রেখে বলল, 'মিস্টার হ্যান্ডসাম, আপনি ভালো গাইতে পারেন। মেশিন-টেশিন সম্পর্কে আপনার জ্ঞান ধারণা ভালো। তার মানে এই নয় যে আপনি সবকিছুতে পারদর্শী। আমি জানি আপনি মারপিটে লাড্ডু। ওদের সাথে ফাইট না করে মেশিন নিয়ে আসা সম্ভব না। সুতরাং আপনি হাজার মানা করলেও আমি যাচ্ছি।'

অগত্যা যোসেফের দিকে তাকাতে হলো। বললাম, 'এই মেয়েটাকে বেঁধে রাখা সম্ভব?'

সঙ্গে সঙ্গে যোসেফ টেবিলের উপর থেকে কী একটা ছুড়ে দিলেন। রুপার তৈরি শেকলের মতো জিনিসটা। দু'মাথায় গোলাকার বলের মতো কী যেন। সেটা গড়িয়ে গড়িয়ে মাহতার পায়ের কাছে গিয়েই চট করে তার পা পেঁচিয়ে নিল। যোসেফ আস্তে করে মাহতার পিঠে হাত রাখতেই সে ধপাস করে সামনের দিকে পড়ে গেল। যোসেফকে ছোটো করে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

ম্যাপ অনুযায়ী যে জায়গায় এসে পৌঁছেছি, সেখানে ঘন অন্ধকার। জোনাকির মেলা। ঝিঁঝির ডাক। এর বাইরে গভীর শূন্যতা। সামনে মস্ত পোড়াবাড়ি। ভাঙা দেয়াল, অযত্নে বেড়ে উঠা নাম না জানা বৃক্ষ আর... ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে আলো না জ্বালিয়ে এগোচ্ছিলাম তবে আরো কয়েক পা সামনে যেতেই থমকে দাঁড়াতে হলো। হাত দশেক দূরে অন্ধকারে কে যেন চুপটি করে বসে আছে। ভালো করে তাকিয়েও কিছু দেখা যাচ্ছে না বলে আরো এক পা এগোব না কি পিছিয়ে যাব তা-ই ভাবছিলাম এমন সময় অন্ধকারের সেই মানুষটা বলে উঠল, 'ওয়েলকাম মিস্টার মিরাজ।'

পরিচিত কণ্ঠ। আমি খুব বেশি অবাক হইনি। ক্যামেলিয়া যোসেফকে ফাঁকি দিয়ে চলে আসতে পারে এটা আমি গাড়িতে বসে বসে ভেবে নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন নিজের উপর রাগ হচ্ছে। মেয়েটাকে আরো শক্ত করে বেঁধে বাক্সবন্দি করে রেখে আসা উচিৎ ছিল।

'আমাকে আটকে রাখার সাধ্য কারোর নেই মিস্টার মিরাজ।'

'কিন্তু আপনাকে আসতে মানা করেছিলাম।'

'তাতে আমার কিছু আসে যায় না। ওরা আমার বাবাকে... আই'ল ফা-ক দ্যাম। ফা-ক এভরিবাডি।'

'ও, ইউ উইল ফা-ক দ্যাম? রিয়্যেলি? হাউ?'

ক্যামেলিয়া বিচলিত হয়ে বলল, 'আই'ল কিল দ্যাম অল। অল ব্লাডি বিচ।'

(চলবে)

মো. ইয়াছিন

#ডেথ_ডে_কাউন্টার

গত পর্বের লিংক : https://www.facebook.com/100054727422264/posts/463991198768457/?app=fbl

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া