ডেথ ডে কাউন্টারঅতিপ্রাকৃত

ডেথ ডে কাউন্টার — পর্ব ৮

ইয়াছিন নাইম২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫৪ মিনিট পড়া

ক্যামেলিয়া এগিয়ে এসে কায়দা করে যখন আমার হাতে সুচ ঢুকিয়ে দিলো, তখনও আমি ঠিকঠাক কিছু আন্দাজ করতে পারিনি। হাতে খোঁচা লেগেছে এমন কিছু টের পেয়েছিলাম বটে তবে সেটা যে ক্যামেলিয়ার কাজ, সে যে ইচ্ছে করেই আমার হাতে সুই মেরেছে সেটা তখনও আমার ধারণার বাইরে ছিল। । কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই যখন চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করেছিলাম তখন চোখের সামনে সব এলোমেলো হয়ে এলেও ক্যামেলিয়া কী করেছে সেটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে আসছিল। তাইতো নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির ন্যায় টেনে টেনে বলেছিলাম, 'কী করেছেন আপনি? আমি ঝাপসা দেখছি কেন?'

তখন ক্যামেলিয়ার মিষ্টি হাসি এক পলক দেখেছি আমি। দেখেছি তার হাতের সুচ। সে বেশ বড়াই করেই বলেছিল, 'আপনাকে ঘুম পাড়ানোর ব্যবস্থা করেছি মিস্টার হ্যান্ডসাম। এখন আপনি আরাম করে ঘুমান। আমি একটু একশান করে আসি।'

আমি প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম; সে দু'হাতে সামলে নিল। আদুরে হাতদু'টো দিয়ে ঝাপটে ধরে আস্তে করে মাটির উপর চিৎ করে শুইয়ে দিয়ে মিহি গলায় কী যেন বলেছিল। পুরোটা শোনার আগেই আমি চোখ বুজেছিলাম। তবে খানিকটা মনে পড়ে। যেমন, 'স্টে সেইফ মিস্টার হেন্ডসাম৷ আই'ল বি ব্যাক।' তার ঠিক পরেই আমি ঘুমিয়ে পড়েছি ভেবে আমার বাঁ গালে; হ্যাঁ বাম গালে আলতো করে চুমু এঁকে দিয়েছিল মেয়েটা। কেন দিয়েছিল আমি জানি না। তবে এটাই যে সত্যি! কী অদ্ভুত মেয়ে, না?

জেগে দেখি সব পরিষ্কার। অন্ধকারে ছিলাম, এখন আলোয় আলোয় ভরা। মাটিতে ছিলাম, পোড়াবাড়িতে ছিলাম। অথচ এখন একটি সুন্দর, সুশ্রী, অতি গোছানো এক ঘরের মোলায়েম বিছানায় পড়ে আছি এবং আমার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন বিশিষ্ট ব্যক্তি যোসেফ। আমি চোখ খুলেছি দেখে তার গম্ভীর ভাব কাটল ঠিক তবে চিন্তার ভাঁজটুকু কপালের চামড়ার ওপর স্পষ্ট হয়েই রইল। তাঁর কাছ থেকে জানতে পারলাম আমি পুরো একদিন পর জেগেছি। এই ঘরটা ক্যামেলিয়ার। তার বিছানায় আমাকে রাখা হয়েছে। সে নিজেই হোলাকে রক্ষা করে ডেথ ডে কাউন্টার মেশিন সহ আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিল। এতটুকু শুনে আমি একটু স্বস্তি পেয়েছিলাম। তবে তা আর বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না, যখন শুনলাম ক্যামেলিয়াকে জোবেন গোষ্ঠীর দলবল তুলে নিয়ে গেছে।

ব্যাপারটা এই, আমাকে অজ্ঞান করে জোবেন গোষ্ঠীর ডেরায় গিয়ে ওদের অনেককে আহত এবং নিহত করে হোলা এবং ডেথ ডে কাউন্টার মেশিন উদ্ধার করে নিয়ে এসেছিল সে। দুর্ভাগ্যবশত ঘটনাস্থল থেকে একজন পালিয়ে যায়। গিয়ে ওদের আসল দলপতি, যে কিনা অন্য কোনো এক আস্তানায় থাকে, তার কাছে গিয়ে সবকিছু বলেছে। সেই দলপতি সব শুনে রাগে ক্ষোভে দলবল নিয়ে এসে এ-বাড়িতে এসে প্রায় দু'ঘন্টা আগে ক্যামেলিয়াকে তুলে নিয়ে গেছে। ওদের একটা নীতি আছে, ওরা যা ভেবে রাখে তা-ই করে। এর বেশিও করে না আবার কমও না৷ এবারও তা-ই হয়েছে। এখানে এসে ওরা চাইলেই হোলাকে, আমাকে, যোসেফকে খুন করতে পারত বা আমাদেরকেও তুলে নিয়ে যেতে পারত। কিন্তু তা করেনি৷ শুধু ক্যামেলিয়াকে...

যোসেফের হাতে ডেথ ডে মেশিনটা চকচক করছে। তিনি সেটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছেন। মাঝে মাঝে কীসব যেন কাগজে লিখে রাখছেন। বিছানার ডান দিকে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন হোলা। তিনি আফসোসের সহিত মুখ দিয়ে চোঁ চোঁ শব্দ করে বিড়বিড় করছিলেন, 'আগুন, আগুনে পোড়াবে ওরা। ইশ! ইশ রে! জলজ্যান্ত মেয়েটা! ইশ!'

'আপনার কি কিছু করার নেই?' বলতে বলতে উঠে বসেছি তখন হোলা চঞ্চল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ফের মাথা নিচু করে বললেন, 'আমি অপারগ। দলপতির সামনে দাঁড়ানোর সাধ্য আমার নেই। ওরা আমার মেয়েকে পুড়িয়ে মেরে ফেলবে। আমি কিচ্ছু করতে পারব না।'

'যদি আমি কিছু করি?'

হোলা বিমর্ষ হলেন ফের তাচ্ছিল্য করে বললেন, 'কেউ ওদের আটকাতে পারবে না। ওরা ক্যামেলিয়াকে পুড়িয়ে মারবেই।'

'এটা ধরো।' ডেথ ডে কাউন্টার এগিয়ে দিলেন যোসেফ। মেশিনে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করেছি বলেই যোসেফের দিকে তাকিয়েছিলাম। তিনি হাত দিয়ে কাঁধ ছুঁয়ে আমাকে আশ্বস্ত করে কানে কানে ফিসফিস করে যা বললেন, তারপর বোধ করি আমার মন খানিকটা হালকা হলো। হোলাকে জিজ্ঞেস করলাম জোবেন গোষ্ঠী এখন কোথায়? এরপর তিনি আমাকে যেখানে নিয়ে এলেন, সেখানটার বর্ণনা দিতে গেলে অনেক লম্বা হয়ে যাবে। আমি কোনোরকম বিরক্তি চাই না। তবে এতটুকু বলতেই হচ্ছে যে, আমরা কোনো এক পুরনো ভাঙা বাড়ির গোপন পথ দিয়ে মাটির নিচে প্রায় দশ তলা সমান নিচে নেমেছি। হোলা চলে গেছেন। তিনি জোবেন গোষ্ঠীর কারোর সামনে যাবেন না। কারণ একসময় তিনিও ওদের দলভুক্ত ছিলেন৷ এবং কোনো এক কারণে, কারণটা এক সুন্দরী মেয়ে, যে কিনা মানুষ। সেই মেয়ে মানুষের প্রেমে পড়েই তিনি স্বজাতিদের সঙ্গ ত্যাগ করে মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন৷ যদিও তিনি ওই রূপবতীকে পাননি। কারণ, যেদিন হোলা সব ছেড়ে মেয়েটির পিছু নিয়েছেন, সেদিন হোলার চোখের সামনে একদল বন্দুকধারী মেয়েটিকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর থেকে হোলা এসব বন্দুক-টন্দুক কেনাবেচা শুরু করেন যাতে করে একদিন অন্তত ওই লোকগুলো তাঁর কাছে আসে এবং তিনি বদলা নিতে পারেন৷

অবশ্য বদলা তিনি নিয়েছেন৷ তবে অন্যভাবে। সেসব কথা থাক। সংক্ষেপে মূল কথাগুলো বলি৷ হোলা ফিরে যাবার পর অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসতে আসতে শেষ সিঁড়িতে পা রাখবার আগেই একজোড়া পাহারাদার জোবেনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পড়ল আমার উপর৷ দু'জনেই, 'এই, কে তুই?' বলে দ্রুত ছুটে এসে আমাকে একরকম বগলদাবা করে টেনে টেনে দলপতির সামনে হাজির হলো। দেখলাম বেজায় অবস্থা। অনেকটা রাজ দরবারের মতো। বিশাল সিংহাসনে বসা দলপতি। তিনি আমাকে দেখে কী কারণে যেন চট করে দাঁড়িয়ে পড়লেন৷ মাথার মুকুট খুলে নিয়ে এক পলকে তরতর করে ছুটে এলেন আমার সামনে। অস্ফুটে আওয়াজে বলে উঠলেন, 'আ-আপনি! আপনি এই অধমের দরবারে! বলুন কী সেবা করতে পারি?'

দলপতির এহেন আচরণে আমি সহ বাকি সবাই থ। বেশ বড়োসড়ো ধাক্কা খেয়ে চুপ মেরে আছি দেখে দলপতি বলে চললেন...

(চলবে)

মো. ইয়াছিন

#ডেথ_ডে_কাউন্টার

গত পর্বের লিংক : https://www.facebook.com/100054727422264/posts/465387465295497/?app=fbl

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া