দি অ্যানিমেলঅতিপ্রাকৃত

দি অ্যানিমেল — পর্ব ১০

ইয়াছিন নাইম২৬ নভেম্বর ২০২৫৪ মিনিট পড়া

সেই রাতে একই এলাকা থেকে তিনটি মানুষকে তুলে নিয়ে যাওয়ায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। এরপর মাত্র বারো ঘন্টার মধ্যে অধিকাংশ পরিবার প্রাণ হাতে নিয়ে বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেল। যারা রইল, তারাও শীঘ্রই চলে যাবে। আমি পুরোপুরি ঠিক হতে পারিনি বলে কোথাও যাইনি। আজ আবার কী হয় এই ভেবে আতঙ্কে ছিলাম। কিন্তু এতোটা ভয়ঙ্কর কিছু ঘটে যাবে তা আমার ভাবনার বাইরে ছিল।

তখন রাতের কয়টা তা ঠিক জানি না। ভরা আতঙ্কে রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে আমার। অনেকটা সময় চোখ বন্ধ রেখেও ঘুম না আসায় একরকম বিরক্তি নিয়ে শুয়ে ছিলাম। ধীরে ধীরে একটু তন্দ্রার ভাব চলে এসেছিল। এমন সময় একটা ধারালো আওয়াজ আমার ঘোর কাটিয়ে দিলো। কেমন একটা গড়গড় আওয়াজ। এমন শব্দ আমি আগেও শুনেছি, যখন প্রথমবার অদ্ভুত প্রাণী আমার সামনে এসেছিল।

আওয়াজটা যখন আরো একটু তীব্র হলো, তখন আর বুঝতে বাকি রইল না যে, এটা ওই প্রাণীরই আওয়াজ! তার মানে ওরা এখানে চলে এসেছে! লাফ দিয়ে উঠে বসার আগেই দরজা ভাঙার শব্দ পাই। মুহূর্তের মধ্যে মৃদু আর্তনাদের শব্দ শোনা গেল। তারপরই মনে হলো যে, বিপদটা হাওয়ার বেগে ভাঙা দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেছে!

দ্রুত ছুটে গিয়ে দেখি ভদ্রলোকের বিছানা ফাঁকা। মেঝেতে ফিনকি দিয়ে পড়া রক্ত! ফোঁটা ফোঁটা রক্ত দরজার দিকে চলে গেছে!

আমি দৌড়ে বাইরে যাই, ছুটে যাই সেই খাল বা নদীর সামনে। গিয়ে যা দেখি, তাতে আমার গায়ে কাঁপন ধরে যায়। অতি বিস্মিত গোল গোল চোখে দেখি, প্রায় ন' ফুট লম্বা একটা প্রাণী হাতের থাবায় একটা মানুষ নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নদী পার হয়ে যাচ্ছে! যন্তুটার হাতে সেই ভদ্রলোক, যিনি আমাকে তাঁর বাসায় আশ্রয় দিয়েছেন।

প্রাণীটা ও-পারে উঠে গিয়ে কেন জানি থেমে গেল। তারপর কী একটা মনে পড়তেই যেন পেছনে ফিরে আমার চোখ বরাবর তাকাল। দূর থেকেও প্রাণীটার চোখ-মুখ আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম। আজকের আগে এত ভয়ঙ্কর চেহারা আমি জীবনে দেখিনি! চোখে চোখ পড়তেই আমি দৃষ্টি নামিয়ে ফেলি। তখনই সেটা লাফিয়ে লাফিয়ে অন্ধকারে হারিয়ে যায়।

ভেবেছিলাম আজকের আতঙ্ক এখানেই শেষ। কিন্তু যাকে ধরে নিয়ে গেছে তাঁর মেয়ে, যে মেয়েটির বয়স এখনও আঠারো বছর হয়নি, সেই পুঁচকে মেয়েটাই আমাকে অবাক করে দিয়ে চোখের জল মুছে শক্ত গলায় বলল, "আব্বুকে ফিরিয়ে আনতে হবে।"

আমি হতভম্ব হয়ে বলি, "আজব প্রাণী ধরে নিয়ে গেছে। তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত।"

"তবুও আমি যাব। আব্বু আমার একমাত্র আপনজন। তাঁকে আমার লাগবেই।"

"কিন্তু..."

মেয়েটি কথা শুনল না। ভাবলেশহীনভাবে সরু হাসি দিয়ে বলল, "আপনার ভয় লাগলে এখানেই থাকুন। আমি যাচ্ছি। আব্বুকে নিয়ে তবেই ফিরব।" বলেই হেঁটে হেঁটে জলে নেমে গেল মেয়েটি! মুহূর্তেই গভীর রাতের টলটলে জলের ভেতরে প্রবেশ করল সে। পায়ে হেঁটে বুক অবধি ডুবে গেল। একসময় গলা। তারপর তার পুরো দেহটাই জলের নিচে চলে গেল। অগত্যা পেছন থেকে বিক্ষিপ্ত আওয়াজ দেই, "দাঁড়ান! আমি আসছি।"

দ্রুত ছুটে নেমে যাই জলে। তারপর মেয়েটির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাঁতরাতে থাকি। সামনে মৃত্যু অনিবার্য জেনেও আমরা এগিয়ে চলি। জানি, ওপারে হাজার হাজার প্রাণী আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। একবার মানুষের অস্তিত্ব টের পেলেই...

ক্যাপ্টেন শাওনের আকস্মিক মৃত্যুটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তাঁর দুই সহচর ক্যাপ্টেন আসিফ ও ক্যাপ্টেন মারুফ। দু'জনেই একগাদা মনিটরে কীসব দেখছিলেন। গত চব্বিশ ঘন্টায় তাঁরা দু'জনে মিলে কিছু ক্লু বের করেছেন। তাঁদের ধারণা, অবিশ্বাস্য হলেও খুব শীঘ্রই এই জটিল রহস্যের সমাধান করে ফেলবেন তাঁরা। যদিও রহস্য প্রায় খোলাসা হয়েই গেছে। সমস্যা অন্য জায়গায়। প্রভলেম সলভ্ করতে গিয়ে বেগ পেতে হবে তাঁদের। কারণ তাঁরা মাত্র দু'জন। আর প্রতিপক্ষ হাজার হাজার।

গত ক'দিন আগে তাঁরা তিনজন মিলে সিক্রেট অ্যাজেন্সির একটা মিশন কমপ্লিট করে দিয়েছিলেন। বিনিময়ে কিছুই নেননি। তবে আজ বিনিময় হিসেবে কিছু অ্যাডভান্সড্ টেকনোলজি আর বিশেষ কিছু অস্ত্র যা পৃথিবীতে খুব কমই আছে, সেইসব নিয়ে এসেছেন। প্ল্যান অনুযায়ী আজ রাতেই তারা ফাইন্যাল মিশনে নামার কথা। শেষ প্রস্তুতি চলছে। হঠাৎ অফিসার হাবিব এই বিশাল ঘরটায় পা রেখে বুক উঁচু করে স্যালুট দিয়ে বলল, "স্যার!" উই গট অ্যা ভেরি ব্যাড নিউজ।"

আসিফ এবং মারুফ একসঙ্গে অফিসার হাবিবের দিকে তাকালেন। আসিফ বললেন, "ব্যাড নিউজ? হুয়াট?"

"স্যার, ওই অদ্ভুত প্রাণীগুলো এতদিন একটি করে মানুষ চাইত। ডিমান্ড অনুযায়ী প্রতিদিন একটি মানুষ দিতে স্থানীয় সরকার বাধ্য। নাহলে ওরা শহরে তান্ডব চালাবে, নিরীহ মানুষ খুন করবে। তাই এতদিন জেলখানার আসামিদের মধ্যে থেকে প্রতিদিন একজন করে ওই প্রাণীদের কাছে পাঠানো হত। একটি মানুষ পেলে তারা আর কাউকে ডিস্টার্ব করত না। কিন্তু গতকাল রাতে ওই প্রাণীগুলো কী কারণে যেন পুরো জেলখানায় যতজন লোক ছিল সবাইকে খুব বাজেভাবে খুন করেছে। এমনকি শহরের বাইরে থেকেও লোকজনকে তুলে নিয়ে গেছে। আজ রাতে আবার কী হতে চলেছে বুঝতে পারছি না। সুতরাং আমার মনে হয় খুব দ্রুত কিছু একটা করতে হবে, স্যার। কারণ গতকাল থেকে ওই প্রাণীগুলো উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়েছে। কেন এরকমটা হচ্ছে বুঝতে পারছি না স্যার।"

ক্যাপ্টেন আসিফ ও মারুফ দু'জনেই মুখচাওয়াচাওয়ি করলেন। তবে কিছু বললেন না। কারণ তারা জানেন, প্রাণীগুলো কেন এমন করছে। এই সবকিছু হচ্ছে ক্যাপ্টেন শাওনের জন্য। শাওন গতরাতে এলোপাথাড়ি গুলি করেছেন। কিছু গুলি হয়তো প্রাণীগুলোর গায়েও লেগেছে!

হঠাৎ কী মনে করে যেন ক্যাপ্টেন মারুফ উঠে দাঁড়ালেন। তারপর অফিসার হাবিবকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "উই গট অ্যা নিউ ব্যাড নিউজ।"

"হুয়াট, স্যার?" বলল অফিসার হাবিব।

মারুফ একটি মনিটরের দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করে বললেন, "সি।"

"এটা তো এই বিল্ডিংয়ের সিসিটিভি ফুটেজ স্যার। লাইভ চলছে।"

"তা তো আমিও জানি। তুমি এখানে দ্যাখো, লিফটের কাছে।"

অফিসার হাবিব মনিটরের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে ফেটে পড়ল, "অদ্ভুত একটা প্রাণী এই বিল্ডিংয়ে চলে এসেছে, স্যার!"

"এক্সাক্টলি।"

কথা শুনে ক্যাপ্টেন আসিফও মনিটরে মনোযোগ দিলেন। হঠাৎ অন্য মনিটরে তাঁর চোখ পড়তেই তিনি বললেন, "একটা নয়, অনেকগুলো প্রাণী দেখা যাচ্ছে। এই দ্যাখো।"

আসিফের দেখানো মনিটরে চোখ রেখে আরো একবার আঁতকে উঠে হাবিব। ভরাট গলায় বলে, "স্যার, প্রাণীগুলো তো এদিকেই আসছে! লিফটে অনেকগুলোকে দেখা যাচ্ছে। সিঁড়ি বেয়ে আরো অসংখ্য প্রাণী ছুটে আসছে! এখন কী হবে স্যার?"

চলবে

মো. ইয়াছিন

[প্রিয় পাঠক, আমার দু'টো বই এখন রকমারিতে এভেইলেবল৷ আপনারা চাইলে সেখান থেকে আমার বই সংগ্রহ করতে পারেন। কিংবা আদর্শ প্রকাশনীর পেজ থেকেও বইদু'টো সংগ্রহ করা যেতে পারে। সবার জন্য শুভকামনা।]

গত পর্বের লিংক :

https://www.facebook.com/100054727422264/posts/503143521519891/?app=fbl

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া