দি অ্যানিমেল — পর্ব ১১
ইয়াছিন নাইম৩০ নভেম্বর ২০২৫৪ মিনিট পড়াইতোমধ্যে প্রাণীগুলো দরজার কাছে চলে এসেছে। ভারী লোহার দরজাটা শক্ত করাঘাতে বারবার কেঁপে উঠছে। সেটা আর কতক্ষণ টিকে আছে বলা মুশকিল। মনিটরে দেখা যাচ্ছে, আরো অসংখ্য প্রাণী লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটে আসছে এদিকে। একটু পর সবকয়টা মিলে একসঙ্গে দরজায় আঘাত করবে। চোখের সামনে নিশ্চিত বিপদ দেখে ক্যাপ্টেন আসিফের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করে অফিসার হাবিব, "স্যার, যা অবস্থা দেখছি, পুরো একটা ব্যাটালিয়ন নিয়ে আসলেও ওদের থামানো সম্ভব হবে না। তাহলে কি আমরা এখানেই হার মেনে নেব?"
হাবিবের কণ্ঠস্বরে কাঁপন টের পেয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেন ক্যাপ্টেন আসিফ, "তোমার কি ভয় লাগছে হাবিব?"
ক্যাপ্টেন মারুফ একটা অত্যাধুনিক অস্ত্র হাবিবের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, "ধরো, এতদিন ট্রেনিং নিয়েছ। এখন সেটা প্রয়োগ করার সময় এসেছে।"
"স্যার!" বলে অস্ত্রটা হাতে তুলে নেয় অফিসার হাবিব। তার হাত কাঁপছে দেখে ক্যাপ্টেন আসিফ প্রশ্ন করেন, "তুমি কি ভয় পাচ্ছো হাবিব?"
হাবিব পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে বলে, "নো স্যার। কয়েক বছর আগে মৃত্যুকে জীবনসঙ্গী করে আর্মিতে জয়েন করেছিলাম। এরপর আর কোনোদিন মৃত্যুভয় আমাকে ছুঁতে পারেনি।" কথা শেষ হলে ঢোক গিলল হাবিব। কাঁপা হাতে কপালের ঘাম মুছে নিয়ে অত্যাধুনিক রাইফেলটা দু'হাতে ধরে কাঁধের সাথে তাক করে রাখল। এতক্ষণে দরজাটা অনেকখানি দুর্বল হয়ে পড়েছে। যেকোনো সময় প্রাণীগুলো ভেতরে চলে আসতে পারে। এ-নিয়ে হাবিবের ভয় নেই। নিজের জীবন বাজি রেখে দেশের তরে নিজেকে সপে দিয়েছিল সে। এখন তার উপর কত দায়িত্ব! কত কত মানুষ শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে তার মতো আর্মি অফিসারের জন্য! পুরো দেশটাকেই সে নিরাপত্তা দিচ্ছে। 'রিয়েল লাইফ হিরো' বলতে সাধারণত তার মতো মানুষকেই তো বোঝায়! এসব ভাবতে গিয়েই হাবিবের রক্ত গরম হয়ে যায়। নিজ দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং দায়িত্বশীলতা একসাথে উথলে উপচে পড়তে শুরু করে।
জীবনের পরোয়া হাবিব কখনোই করে না। নিজের জন্য তার ভয় নেই। কিন্তু তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আছে, স্ত্রীর গর্ভে জমজ কন্যাশিশু ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে। হাবিব ইতোমধ্যে মেয়েদের নামও ঠিক করে ফেলেছে। এক মেয়ের নাম ইনু অন্য মেয়ের নাম রিনু। এটা সে এখনও কাউকে বলেনি। মেয়েদের জন্মের পর কথাটা প্রকাশ করবে বলে ভেবে রেখেছিল হাবিব। বাড়িতে রেখে আসা স্ত্রী-সন্তানের কথা ভাবতেই হাবিবের বুকের ভেতর শীতল হয়ে যায় তার। সহসা মনের গভীরে একটা অচিন ঢেউ ফুলে ফেঁপে উঠে। তবে কি শেষবার ওদেরকে চোখের দেখা দেখতে পারবে না সে? কে জানে!
জানালা ভেঙে কয়েকটা প্রাণী ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল। ক্যাপ্টেন আসিফ ধুমধাম কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে এদিকটা সামলে নিলেন। কিন্তু দরজাটা যদি একবার ভেঙে ফেলা হয়, তাহলে আর নিস্তার নেই। চোখের পলকে শত শত জন্তু ভেতরে চলে আসবে। তারপর যা ঘটবে, তা হতে চলেছে ইতিহাসের সবচে' ভয়ঙ্কর ঘটনা।
ব্যাপারটা বুঝতে পেরে অফিসার হাবিব একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়। বিশাল বড়ো এই ঘরটায় অতি বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। সেই গ্যাস এতটাই শক্তিশালী যে, নিঃশ্বাস নেওয়ার মাত্র তিন সেকেন্ডের মধ্যে যে কেউ ধপাস করে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে বাধ্য। কারণ এই গ্যাস নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণ করতেই দেহে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। মাত্র তিন সেকেন্ডের মধ্যে গ্যাস গ্রহণকারী, হোক সে মানুষ কিংবা পশু, শুধুমাত্র তিন সেকেন্ডের মধ্যে প্যারালাইসড্ হয়ে পড়ে। এবং এক মিনিটের মধ্যে সে মারা যায়।
সেই অতি ভয়ঙ্কর গ্যাস ছড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় অফিসার হাবিব। এতে করে প্রাণীরা যদি এ-ঘরে চলে আসে, তাহলে আক্রমণ করা তো দূর, তিন সেকেন্ডের বেশি টিকে থাকতে পারবে না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এ-ঘরে অক্সিজেন সিলিন্ডার আছে মাত্র দু'টো। তারা মানুষ তিনজন। দু'টো সিলিন্ডার নাহয় ক্যাপ্টেন আসিফ আর ক্যাপ্টেন মারুফ ব্যবহার করলেন। কিন্তু তৃতীয় ব্যক্তি অর্থাৎ হাবিবের কী হবে?
দরজাটা প্রায় ভেঙে ফেলা হয়েছে।
শেষ শব্দটা এত জোরে হলো যে, হাবিবের মনে হয়েছিল, এবার বুঝি প্রাণীগুলো পিঁপড়ের মতো দলবদ্ধ হয়ে ঘরে ঢুকে গেল! কিন্তু না, এখনও তা হয়নি।
শেষবার স্ত্রী-সন্তানকে স্মরণ করে নেয় অফিসার হাবিব। চোখ বন্ধ করে সহধর্মিণী রাবেয়ার মুখটা শেষবারের মতো দেখে নেওয়ার চেষ্টা করে সে। রাবেয়া হাসছে, গায়ের উপর ঢলে পড়ে বলছে, "তুমি এত ভীতু! আর্মি অফিসার হয়ে নিজের বউকে এতটা ভয় পাও সেটা শুনলে লোকে কী বলবে শুনি?"
কল্পনা করতে গিয়ে একবুক দুঃখ নিয়েও শুকনো হাসল হাবিব। সময় নষ্ট না করে দ্রুত অক্সিজেনের সিলিন্ডার দু'টো টেনে এনে ক্যাপ্টেন আসিফ আর ক্যাপ্টেন মারুফের কাছে এগিয়ে দিলো। কান্ড দেখে দু'জনেই প্রশ্ন করলেন, "কী করছো হাবিব? অক্সিজেন দিয়ে কী হবে?"
হাবিব বিষণ্ন হেসে বলে, "অক্সিজেন মাস্কটা পরে নিন স্যার।"
বিস্মিত চোখে তাকিয়ে দু'জনেই অক্সিজেন মাস্ক মুখে লাগিয়ে নেন। সঙ্গে সঙ্গে হাবিব ছুটে যায় সুইচবোর্ডের কাছে। কালো বড়ো সুইচটা নিচের দিকে নামিয়ে দিতেই শি-শি-শ্ শব্দ করে বিষাক্ত গ্যাস বেরিয়ে চোখের পলকে পুরো ঘরে মিলিয়ে যেতে লাগল। মাত্র তিন সেকেন্ডের মধ্যে অফিসার হাবিব মেঝেতে ঢলে পড়ল। আসিফ ও মারুফ দু'জনে একসঙ্গে দৌড়ে এসে হাবিবের সামনে বসে পড়লেন। হাবিব তখনও চেয়ে আছে। তার চোখদু'টো ঝাঁপসা। ঠোঁটদু'টো কাঁপছে।
"দ-দ-দেশটাকে আপনাদের হাতে তুলে দিয়ে গেলাম স্যার।" শেষ কথাটা বলেই নীরব হয়ে গেল অফিসার হাবিব। এই একটু সময়ে তার পুরো দেহ নীলবর্ণ হয়ে গেছে। মুখটা ফ্যাকাশে। মৃত চোখদু'টো কেমন যেন দেখাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে দু'জন এক্স মিলিটারি, ক্যাপ্টেন আসিফ ও ক্যাপ্টেন মারুফ দু'জনেই দু'ফোঁটা চোখের জল ফেললেন।
ধুম করে একটা শব্দ হলো। তারপর পাঁচ, দশ, কুড়ি, ত্রিশ এভাবে অসংখ্য প্রাণী ঢুকতে লাগল। কিন্তু একটাও আসিফ কিংবা মারুফের ধারেকাছে পৌঁছুতে পারল না। তার আগেই ধপাস ধপাস করে মেঝের উপর ঝড়ে পড়ে যেতে লাগল।
বিশাল বড়ো এই ঘরটায় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে অন্তত দেড়শো প্রাণী এসে জড়ো হলো। বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে সবগুলো মরে গেছে। সব।
ক্যাপ্টেন আসিফ ও মারুফ দু'জনে বুক উঁচু করে দাঁড়ালেন। চোখের জল মুছে হাবিবের লাশের সামনে দাঁড়িয়ে স্যালুট করলেন। তারপর ভাঙা ভাঙা গলায় বললেন, "তোমার এই ত্যাগ পুরো দেশ, পুরো জাতি কখনো ভুলবে না। মরে গিয়ে অমর হয়ে যাওয়া তোমার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা। আমরা তোমাকে সম্মান জানাই।"
চলবে
মো. ইয়াছিন
[প্রিয় পাঠক, আমার দু'টো বই এখন রকমারিতে এভেইলেবল৷ আপনারা চাইলে সেখান থেকে আমার বই সংগ্রহ করতে পারেন। কিংবা আদর্শ প্রকাশনীর পেজ থেকেও বইদু'টো সংগ্রহ করা যেতে পারে। সবার জন্য শুভকামনা।]
গত পর্বের লিংক :
https://www.facebook.com/100054727422264/posts/504420578058852/?app=fbl