অচিনপুরের রাজকন্যা — পর্ব ৫

ইয়াছিন নাইম৯ ডিসেম্বর ২০২৫৫ মিনিট পড়া

সাদাফকে একটা বিশেষ জায়গায় হাজির করা হয়েছে। এখানে তার অপরাধের শাস্তি দেওয়া হবে। বিচারকের নির্দেশ অনুযায়ী সাদাফের বাঁ হাত কেটে ফেলার পর তাকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

এই জায়গাটা বেশ ফাঁকা। মাথার উপরে কিছুই নেই। পায়ের নিচে হলুদ বালি, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হিরের কণা, স্বর্ণ, রৌপ্য আরো নানান ধাতব পদার্থ। পৃথিবীতে যার জন্য মানুষ পাগল, যেসব জিনিসের আকাশচুম্বী মূল্য, সেইসব মহা মূল্যবান হিরে, সোনা, রুপা সব পায়ের নিচে পড়ে আছে! সেসবের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে সাদাফ!

একমুঠো ওইসব তুলে নিতে বড্ড ইচ্ছে করল সাদাফের!

একটু পরে তার হাতটাই থাকবে না, ওসব সে রাখবে কীসে? সুতরাং হাত বাড়িয়ে একমুঠো সোনা বা হিরে তুলে নেওয়া হলো না।

যে জিনিসটা দিয়ে সাদাফের হাত কাটা হবে সেটাও হিরের তৈরি। সাদাফের বাঁ হাত ধরে রাখা হয়েছে এক টুকরো সোনার পাথরের উপর। হিরের অস্ত্রটা দিয়ে এক কোপে সাদাফের কব্জি দু'ভাগ করে ফেলা হবে এমন সময় একটা অদ্ভুত শব্দ শোনা গেল। অনেকটা সাইরেনের মতো শব্দটা মাথার উপর থেকে আসছে। সাদাফ এবং অন্য সবাই একসঙ্গে মাথা উঁচু করে তাকায়। অনেক উঁচু থেকে ধীরে ধীরে নেমে আসছে একটা বিশাল আকারের মহাকাশযান! সেটা এতই বড়ো যে, মাথাটা এদিক থেকে ওদিক সরিয়েও স্পেসশিপটার শেষ দেখা যাচ্ছে না! সাদাফের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই বিশাল স্পেসশিপটা দেখে আতঙ্কিত গলায় বলে উঠল, "বিপদ! বিপদ!"

পুরো একটি শহরের সমান মহাকাশযানটা বোঁ বোঁ শব্দ করে থেমে গেল। হলদেটে ভূমি থেকে প্রায় পাঁচশো গজ উপরে ভাসছে বিশাল স্পেসশিপটা। ভেতরে অন্তত দু'শো জন সশস্ত্র সেনাসদস্য নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। ওদের হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র, যা আগামী পঞ্চাশ বছরেও পৃথিবীর মানুষ আবিষ্কার করতে পারবে না।

দলপতি অহুওয়ে তার প্রধান সেনা রেওবোর দিকে তাকায়। তার দৃষ্টিতে বিকৃত হাসির ছাপ স্পষ্ট। সে যে মনে মনে কারোর অনিষ্ট করার ফন্দি আঁটছে সেটা তার মুখভঙ্গি দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। তা আন্দাজ করতে পেরে সেনাপ্রধান রেওবো বিস্মিত গলায় বলে, "আপনি কি এই নিরীহ প্রজাতির উপর হামলা করতে চলেছেন মহোদয়?"

অহুওয়ে সরু হেসে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, "তোমার কী মনে হয় রেওবো?"

সেনাপ্রধান রেওবো অতিশয় কোমল গলায় বলে, "আমার মনে হয়, আপনি আবারো খুন খারাবিতে মেতে উঠতে চলেছেন। তবে এ-ব্যাপারে আমার কিছু কথা আছে। এখানকার প্রাণীরা খুবই শান্ত এবং নিরীহ গোছের। ওদেরকে না মেরে ধমক দিলেই ওরা এলাকা ছেড়ে দেবে। আমার মনে হয়, শুধু শুধু ওদেরকে মারলে অস্ত্রের অপব্যবহার করা হবে। এরচে' এদেরকে ধমক দিয়ে এলাকা দখল করে নেওয়াই ভালো হবে।"

"কিন্তু আমার যে খুন খারাবি ভালো লাগে মিস্টার রেওবো? অতি সহজে এই জায়গাটা দখল করে নিলে যে আমি আনন্দ পাব না? তাছাড়া আমার এতসব সৈন্য কি বসিয়ে রাখার জন্য রেখেছি? এরা কীজন্য ট্রেনিং নিয়েছে? কেন এতসব অস্ত্র?"

রেওবো হাল ছেড়ে দিয়ে বলে, "তাহলে আপনি ওদেরকে খুন করতে চলেছেন?"

"খুন কেন বলছো রেওবো? ওরা যুদ্ধ করবে, যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুবরণ করবে। এখানে খুন কোত্থেকে আসলো বলো তো?"

"কিন্তু আমার মনে হয় ওরা যুদ্ধ করবে না। পরাজয় মেনে নিয়ে পালিয়ে যাবে আর নাহয় আমাদের নিকট নিজেদেরকে সমর্পণ করে দেবে।"

"তাতে আমার কিছু আসে যায় না। আমার একটাই নীতি, যুদ্ধে হার মেনে নেওয়া মানে মৃত্যুকে স্বেচ্ছায় বরণ করে নেওয়া। ওরা হারবে মানে মরবে।" বলে পেছনে চলে যায় দলপতি অহুওয়ে। অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলে,

"সৈন্যরা, যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত?"

সকল সৈন্য একসুরে বলে উঠে, "প্রসতুত।"

"বিষাক্ত বুলেটে শত্রুদের বুক ঝাঁজরা করে দিতে প্রস্তুত?"

"প্রসতুত।"

"প্রয়োজনে নিজের জীবন দিতে প্রস্তুত?"

"প্রসতুত।"

"প্রয়োজনে আমাকেও মেরে ফেলতে প্রস্তত?"

"প্রসতুত।"

"রাবিশ! যা-ই হয়ে যাক, কেউ আমার দিকে চোখ তুলে তাকাবে না। প্রয়োজনে নিজের জীবন দিয়ে দিবে, তবুও আমার গায়ে আঁচড় লাগতে দিবে না। কারণ আমি তোমাদের দলপতি। আমিই তোমাদের সব। পরিষ্কার?"

"পরিশকার।"

"যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত?"

"প্রসতুত।"

"আমার নির্দেশে এই গ্রহের হলদে মাটি রক্ত দিয়ে সবুজ করে দিতে প্রস্তুত?"

"প্রসতুত।"

সাদাফ ভাবতেও পারেনি যে এমনটা হবে।

নিজের চোখকে বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে তার।

কিন্তু সেই মানুষটা সামান্য দূরত্বে দাঁড়িয়ে। উজ্বল আলোয় তার চোখমুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। না, সাদাফ ভুল দেখছে না। সত্যিই...

বিশাল মহাকাশযান থেকে একটি গুলি ছোড়া হয়েছে। গুলিটা একজনের বুকে বিঁধতেই সে আর্তনাদ করে মাটিতে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তার গুলিবিদ্ধ বুক থেকে ঝড়ে পড়তে লাগল টকটকে সবুজ রক্ত! চোখের পলকে গুলিবিদ্ধ প্রাণীটার সমস্ত শরীরে বিষ ছড়িয়ে পড়ল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেটা ছটফট করতে করতে অদৃশ্য হয়ে গেল। দৃশ্যটা দেখে বাকি সবাই ভয়ে কাত! আতঙ্কে সবাই মাটি থেকে প্রায় আধহাত উপরে উঠে গেছে। শূন্যে ভাসছে ওরা। সকলে ভয়ার্ত আওয়াজ তুলে বলছে, "বিপদ! বিপদ! প্রচন্ড বিপদ!"

এবার একসাথে কয়েকটা গুলি ছোড়া হলো কিন্তু একটাও কারোর গায়ে লাগেনি। কারণ হুট করে আজব একটা প্রাণী উড়ে এসে সবগুলো বুলেট আটকে দিয়েছে। প্রাণীটা দেখতে অনেকটা বাদুরের মতো। তার গায়ের রং গাঢ় খয়েরী। কানদু'টো বড়ো বড়ো। কণ্ঠস্বর কর্কষ। সবচে' বড়ো কথা হচ্ছে, প্রাণীটা কিছুক্ষণ পরপর রূপ বদলাচ্ছে! কখনো বানরের মতো হয়ে যাচ্ছে, তো কখনো ছোট্ট এলিয়েন তো কখনো আবার ইয়া বড়ো রোবট। সে তার সাধ্যমতো চেষ্টা করছে সবাইকে বাঁচানোর। কিন্তু এরই মধ্যে আরো কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেল। সাদাফ হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে জানে না এই মুহূর্তে তার কী করা উচিৎ।

রূপ বদলানো প্রাণীটা শেষমেশ ছোট্ট রোবটের মতো হলো। তারপর এত জোরে চিৎকার দিলো যে, সেই শব্দে হামলাকারীদের ইয়া বড়ো মহাকাশযানটা প্রায় ফেটেই যাচ্ছিল! বিপদ টের পেয়ে ওরা পালিয়ে যায়। আলাদা আলাদা রূপ পাল্টানো প্রাণীটা এবার মানুষ হয়ে মাটিতে নেমে আসে। এগিয়ে আসতে থাকে সাদাফের দিকে। তাকে দেখে সাদাফ এতটাই বিস্মিত হয় যে, তার মুখ দিয়ে আপনাআপনি বেরিয়ে যায়, "এটা কীভাবে সম্ভব?"

মানুষটা যখন সাদাফের খুব কাছাকাছি চলে আসে, তখন সাদাফের বিভ্রান্তি কেটে যায়। না, ভ্রম নয়, সত্যি সত্যি ওই মানুষটাই এগিয়ে আসছে! তবুও সাদাফের বিশ্বাস হয় না, তবুও সে মেনে নিতে পারে না। মনের মাঝে কেমন যেন খচখচ হতে থাকে। সাদাফ ভেবে পায় না, এই মানুষটা এখানে কীভাবে এল! সত্যিকার জীবনে এই মানুষটা আছে অথচ সাদাফ এতদিন জানতই না!

মানুষটা আরো একটু এগিয়ে এলে সাদাফের কপাল আরো বেশি কুঁচকে যায়। আরো বেশি কৌতূহল নিয়ে সে মানুষটাকে দেখে, বিস্মিত হয় আর ভাবে, এটা কীভাবে সম্ভব? কারণ সাদাফের সামনে যে মানুষটা এসে দাঁড়িয়েছে, সে আর কেউ না, স্বয়ং বেন টেনিসন!

চলবে

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক : https://www.facebook.com/100054727422264/posts/510998720734371/?app=fbl

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া