চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক — পর্ব ৩
ইয়াছিন নাইম২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬৫ মিনিট পড়ামেয়েটিকে দেখামাত্র আমার পায়ের তলার মাটি সরে গেল।
আমি যেন নিজের চোখকেই অবিশ্বাস করতে শুরু করলাম।
এটাও কি সম্ভব? একদিন আগে যেই মেয়েটা মাতাল হয়ে আমার কাঁধে মাথা রেখেছিল সে আমার সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আর তাকে খুশি করার জন্য উপস্থিত নামিদামি মানুষেরা কী আহ্লাদই না দেখাচ্ছেন!
জন্মদিনের অনুষ্ঠান জমে উঠেছে। জোহরা একটু পরে কেক কাটবে। জোহরার বাবা একটা মাইক নিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করলেন,
"আমরা এখনি অনুষ্ঠান শুরু করব। এতক্ষণ যার জন্য অপেক্ষা করছিলাম তিনি আমার বস মিস আয়রা।"
বলে তিনি মেয়েটিকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সবাই উৎসুক ভঙ্গিতে আয়রার দিকে তাকিয়ে আছেন। আর আয়রা খুবই আত্মবিশ্বাসের সাথে সবার মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়ে। সে এমনিতেই প্রশংসা করার মতো সুন্দরী। তারউপর জমকালো পোশাকে আরো অপরূপ দেখাচ্ছে। একবার তার দিকে তাকালে চোখে ধাঁধা লেগে যায়।
জোহরার বাবা আরো বললেন,
"আয়রা ম্যাডামকে নিয়ে একটি কথা না বললেই নয়, তিনি এত অল্প বয়সে যতটুকু সফলতা অর্জন করেছেন তা হয়তো আমরা সরাজীবনেও পারব না।"
সবাই হাততালি দিতে শুরু করল।
"ম্যাডামের কারণেই আমাদের কোম্পানি বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান পজিশনে আসতে পেরেছে..."
এরকম আরো অনেক কথা বললেন জোহরার বাবা। সবাই হাততালি দিয়ে বাহবা জানাচ্ছে। এদিকে এত মানুষের ভীড়ে আমার দমবন্ধ লাগতে শুরু করেছে। সবাই কত সুন্দর জামাকাপড় পরে এসেছে। একেকজনের দিকে তাকাইলেই বোঝা যায় এটা বড়োলোকের পার্টি। এত পয়সাওলাদের ভীড়ে আমি একজন সামান্য একটা চেকশার্ট, স্যান্ডেল, দেড়শো টাকা দামের ঘড়ি পরা... এখানকার ওয়েটারদের পোশাকও আমার চেয়ে ঢের বেশি সুন্দর।
নিজেকে ভিনগ্রহের প্রাণী মনে হতে লাগলো। ঠিক করলাম চলেই যাব। এত গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের মাঝে আমি একজন আছি না চলে গেছি সেটা কেউ খেয়ালই করবে না।
কিন্তু ওইযে বলে, কপালে থাকলে খণ্ডানো যায় না। আমার কপালেও অন্যকিছু লেখা ছিল। তাইতো চলে যাবার জন্য পা বাড়াতেই ডাক পড়ল। এবং ডাকলো আরকেউ না, এই অনুষ্ঠানের সবচে' গুরুত্বপূর্ণ মানুষ আয়রা।
"এইযে শুনো!"
আমার বুকটা ধুপ করে উঠল। আমি আয়রার দিকে তাকালাম। দেখি সে-ও আমার দিকে চেয়ে। তবে কি সে আমার চিনে ফেলেছে? কাল রাতে আমি তাকে সামান্য একটা মেসঘরের শক্ত বিছানায় ঘুম পাড়িয়েছি এজন্য আমাকে শাস্তি দিবে না তো?
আয়রা আবার বলল, "কী হলো, কথা শুনতে পাওনি?"
"আমাকে বলছেন?"
"হ্যাঁ, তোমাকেই বলছি। এসো এদিকে।"
আমি দুরুদুরু বুক নিয়ে এগিয়ে গেলাম। এদিকে সবাই এখন ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে তাকাচ্ছে। আয়রা ম্যাডাম কেন আমাকে ডেকেছেন সেটা বোঝার চেষ্টা করছেন সবাই। আমার দম আটকে যাওয়ার মতো অবস্থা। এতক্ষণ কেউ আমাকে খেয়াল করছিল না তাই একটু অস্বস্তি লাগলেও মানিয়ে নিচ্ছিলাম। কিন্তু এখন সবার নজর আমার ওপর৷ খেয়াল করলাম আমার হাঁটু কাঁপতে শুরু করেছে। হাঁত কাঁপছে। গলা দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে না। এখন তেমন গরম নেই তাও আমার কপাল ঘামছে। মনেমনে নিজেকেই দোষারোপ করতে শুরু করলাম। কেন যে বড়োলোকের পার্টিতে এসেছি! নিজেকে এখন সার্কাসের বানর মনে হচ্ছে।
আমি ধীরে এগোচ্ছি দেখে আয়রা কিঞ্চিৎ ধমক দিলো, "আরে এখানে এসে বসো।"
বলে মেঝের দিকে ইশারা করল। আমি বুঝে উঠতে পারলাম না আয়রা আমাকে তার পায়ের কাছে বসতে বলছে কেন? তখন আয়রাই সব পরিষ্কার করে দিলো। বলল,
"আমার পা মচকে গেছে। জুতাটা খুলে দাও তো একটু।"
আমার মাথায় যেন বর্জ্রপাত ঘটল। আয়রা আমাকে জুতা খুলে দেওয়ার জন্য ডেকেছে! আমার টাকা না থাকতে পারে, দামি পোশাক না থাকতে পারে কিন্তু তাই বলে কি আত্মসম্মানও নেই?এতজন মানুষের সামনে আমাকে দিয়ে জুতা খুলাবে!
"কী হলো? খুলো!"
আমি মাথা নিচু করে বললাম, "আমি ওয়েটার বা এখানকার কর্মচারী নই ম্যাডাম.."
পুরো কথা বলার আগেই আয়রা পাঁচশো টাকার নোট আমার সামনে ধরে বলল,
"বুঝেছি। ধরো এটা রাখো। এবার খুলে দাও।"
"ম্যাডাম আমি এই টাকা নিতে পারব না।"
"কেন পারবে না? আরো বেশি টাকা লাগবে? তোমাকে দেখে তো মনে হয় না এর বেশি পাওয়ার যোগ্যতা আছে।"
আমি হতবাক হয়ে আয়রার দিকে চেয়ে রইলাম।
তখনই পরিস্থিতি সামাল দিকে জোহরার বাবা আমার কানের কাছে এসে বলেন,
"আরে আজান, ম্যাডামের কথা অমান্য করো না। টাকাটা নিয়ে নাও। আর ম্যাডাম যা বলছেন করো। জুতাই তো খুলবা, এটা আর এমন কী কাজ? তাড়াতাড়ি করে দাও, ম্যাডামের পায়ে ব্যথা করছে।"
আমার মনে হলো যেন এই পৃথিবীতে আমার মতো অসহায় আর কেউ নেই। কেন গরিব হয়ে জন্ম নিলাম এটা ভেবে কষ্ট লাগলো খুব। কিন্তু এখন ওদের কথা শোনা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তাই টাকাটা পকেটে রেখে আয়রার পায়ের কাছে বসে পড়লাম। আয়রা আমার হাঁটুর উপর তার পা রাখলো। ততক্ষণে আমার চোখদু'টো ঘোলাটে হতে শুরু করেছে। ঘোলা চোখেই আয়রার পায়ের হাই হিল জুতা খুলতে শুরু করলাম।
"আরেআরে কী করছো!" বলে চেঁচিয়ে উঠল আয়রা।
"একটুর জন্য দিয়েছিলে জুতাটা নষ্ট করে। এই জুতার দাম জানো? তোমাকে বিক্রি করলেও এরকম একজোড়া জুতা কেনা যাবে না।"
কথাগুলো চুপচাপ শোনা ছাড়া আমার আরকিছু করার ছিল না। বিষ খেয়ে হজম করার মতো যন্ত্রণা অনুভব করলাম। কেউ দেখে ফেলার আগেই চোখের জল মুছে নিয়ে খুব যত্ন করে আয়রার জুতা খুলে দিলাম।
তারপর আর এই অনুষ্ঠানে মানায় না। বড়োলোকদের অনুষ্ঠান, তারাই আনন্দ করুক। আমি একটা গরিব অসহায় ছেলে, কোনোমতে টিউশানি করে জীবন চালাই। আমার কপালে কি এত আনন্দ সয়?
চলে আসার সময় আয়রা আবার আমাকে ডাক দিলো।
"এই শুনো!"
আমি ফিরে তাকালাম।
"বলুন ম্যাডাম।"
"লেখাপড়া করোনি?"
"করেছি ম্যাডাম। আমি অনার্স..."
"লেখাপড়া করলে তো জানার কথা কোথায় কীভাবে যেতে হয়। পোশাক সেন্স থাকাটা জরুরি। এখানে এতবড়ো একটা বার্থডে পার্টি চলছে আর তুমি এরকম একটা সস্তা শার্ট আর স্যান্ডেল পরে চলে এসেছ।"
খেয়াল করলাম সবাই আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
আমি আর এক মুহূর্ত দেরি না করে চলতে শুরু করলাম। আয়রা আমাকে পোশাক সেন্সের কথা বলেছে। আরে পোশাক থাকলে তো পরব! একটা শার্ট আর এক প্যান্ট বারবার ধুয়েধুয়ে পরি। পরনের শার্টটা জোহরার বাবা গত ইদে উপহার দিয়েছিলেন। এই কমদামি শার্টই আমার একমাত্র সম্বল। আয়রা তো সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছে। সে কীভাবে বুঝবে আমার কষ্ট? জীবন কতটা কঠিন সেটা জানতে হলে গরিব ঘরে জন্ম নিতে হয়। বই পড়ে আর অট্টালিকায় থেকে কিছু শেখা যায় নাকি? জীবনকে জানতে হলে অভাবে পড়তে হয়। ফাঁকা হাঁড়ির দিকে হা করে চেয়ে থাকতে হয়। বিশটা টাকা বাঁচানোর জন্য প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা হাঁটতে হয়। আয়রা ওসবের কী বুঝবে!
তবে আমি আর কোনোদিন কোনো বড়োলোকের অনুষ্ঠানে যাব না। কোনোদিন আয়রার সামনেও যাব না। সে হয়তো গতকাল রাতের কথা ভুলে গেছে কীভাবে মাতাল হয়ে রাস্তায় ঘুরেবেড়াচ্ছিল। আমি তাকে নিজের ঘরে আশ্রয় দিয়ে সারারাত বাইরে মশার কামড় খেয়েছি। দরকার নেই মনে পড়ার৷ মনে পড়লে, আমাকে চিনতে পারলে হয়তো কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করবে। কিন্তু আমি তো টাকার জন্য সাহায্য করিনি। আয়রার জায়গায় অন্য যেকোনো মেয়ে হলেও আমি সেটাই করতাম।
আমি চাই না আয়রা আমার সম্পর্কে জানুক। চাই না আর কোনোদিন তার সাথে দেখা হোক।
চলবে...
(1k কমেন্ট হলে আজ রাত ১১টায় পরবর্তী অংশ দিব)