চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক — পর্ব ৪

ইয়াছিন নাইম২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬৫ মিনিট পড়া

শুধুমাত্র গরিব বলে আজ আমাকে অপমানিত হতে হলো। অনুষ্ঠানে আয়রা যখন আমাকে ছোটো করে কথাগুলো বলল, তখন লজ্জায় অপমানে মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছিল।

ঠিক করলাম বড়োলোকের কোনো অনুষ্ঠানেই আর যাব না। বিশেষ করে আয়রার চোখের সামনে তো ভুলেও যাব না। যেই মেয়েকে আমি বিপদের হাত থেকে রক্ষা করলাম। সে আমাকে এভাবে ছোটো করল সবার সামনে! হোক সে সুন্দরী। হোক অনেক টাকার মালিক। তাই বলে কি আমার আত্মসম্মান নিয়ে খেলবে?

মনেমনে দোয়া করলাম ওই মেয়ের সাথে আর কোনোদিন যেন দেখা না হয়। কিন্তু ভাগ্য যে আমার সাথে ভিন্ন খেলা শুরু করেছে তা আমি তখনও টের পাইনি।

রাগে, দুঃখে, কষ্টে আমি আয়রার দেওয়া পাঁচশো টাকার নোটটা পকেট থেকে বের করে রাস্তায় ফেলে দিলাম। আর তখনি আমার চোখে পড়ল একটা বিশেষ জিনিস, যেটা এর আগে খেয়াল করিনি।

টাকার উপর বাংলায় কীসব যেন লেখা। নোটটা রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে দেখি সেখানে লেখা,

"কী ভেবেছ আমি তোমাকে চিনতে পারব না? তুমি আসলেই অনেক বোকা। ১১ নাম্বার রোডে অপেক্ষা করো, আমি আসব।"

লেখাটুকু পড়ে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। আয়রা এটা কেমন খেলা খেলল আমার সাথে? সে আমাকে চিনতে পেরেছে! তারমানে গত রাতের সব কথা তার মনে আছে! তাহলে সেটা মুখে বলল না কেন? টাকায় লিখে দেওয়ার মানে কী?

আমি পড়লাম চিন্তার সাগরে। এখন আমার কী করা উচিত? অপেক্ষা করব তার জন্য? না কি চলে যাব? অনুষ্ঠানে সবার সামনে আমার সাথে যা করল, একা পেলে আরো কী যে করবে কে জানে!

আয়রার সাথে দেখা করব না ঠিক করে হাঁটা শুরু করলাম।

সে তো শুধু একটা মেয়ে নয়, আস্ত একটা আতঙ্ক। না বাবা, এই মেয়ের সাথে আর দেখা করা যাবে না। ওরা বড়োলোক মানুষ। যখন যা খুশি করতে পারে। কিন্তু আমি? আমার চাল নেই চুলো নেই। ওদের সাথে পাল্লা দিতে গেলে মুখ থুবড়ে পড়ব। এরচে' আমি আমার রাস্তায় থাকি সেটাই ভালো হবে।

কিন্তু ১১ নাম্বার রোডের সামনে আসতেই বাঁধলো বিপত্তি। কেন জানি না মনে হলো আমার দাঁড়ানো দরকার। এত পাওয়ারফুল একটা মেয়ে। সে তো শুধুশুধু আমাকে ডেকে সময় নষ্ট করবে না। নিশ্চয়ই তার কোনো মতলব আছে। কিন্তু কী মতলব সেটা আন্দাজ করতে পারছি না। আমাকে একা রাস্তায় অপেক্ষা করতে বলার কারণ কী থাকতে পারে? আমার মতো ছাপোষা একজনের সাথে তার কী এমন কাজ থাকতে পারে?

কিছুতেই যখন কিছু ভেবে পাচ্ছিলাম না তখন ঠিক করলাম অপেক্ষা করব। আরকিছু না হোক অন্তত টাকাটা ফিরিয়ে দিয়ে বলব, "টাকা দিয়ে সবকিছু কেনা যায় না মিস আয়রা। অন্তত আমাকে আপনি কিনতে পারবেন না। তাছাড়া আপনার টাকা আছে বলে যাকে খুশি আপনার জুতা খুলে দিতে বলবেন এটাও ভদ্রতার মধ্যে পড়ে না।"

কিন্তু যখন সত্যিসত্যি আয়রার সাথে দেখা হলো, তখন সেরকম কিছুই বলতে পারলাম না।


অন্ধকার গলিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। তখন রাত প্রায় এগারোটা। এলোমেলো পা ফেলে একজন ছায়ামূর্তি এগিয়ে আসতে দেখা গেল। অবয়ব দেখে বুঝলাম সেটা আয়রা। আজকেও টলছে। তারমানে আজকেও মদ গিলেছে। তবে হয়তো কালকের মতো অতো বেশি খায়নি।

আয়রা যখন আমার সামনে এসে মাতাল চোখে আমার দিকে তাকালো, তখন আমি কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। একটা মানুষ এত সুন্দরী কীভাবে হতে পারে? এবং টু বি অনেস্ট, এই অবস্থায় ওকে দেখে আবারো কিছুটা লজ্জা লাগলো আমার। যেমনটা কাল রাতেও লেগেছিল। আমার বুক কাঁপতে শুরু করেছে। একটা মেয়েমানুষকে এতটা অশালীন লাগতে পারে কীভাবে! আয়রার চোখদু'টোও যেন অশ্লীল কবিতাবাক্য করে বেড়াচ্ছে। যার ফলে আমার নিশ্বাস ঝড়ো হাওয়ার মতো কুণ্ডুলি পাকিয়ে উঠছে বারবার।

আয়রা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল, "জানতাম তুমি অপেক্ষা করবে।"

"আমাকে এখানে অপেক্ষা করানোর মানে কী?"

"মানে খুব সোজা। তুমি আমাকে বাসায় পৌঁছে দিবে।"

"কীহ!"

আয়রা মৃদু হাসলো।

"হ্যাঁ, এটা তোমার ডিউটি। টাকা যত লাগে আমি দেব কোনো সমস্যা নেই।"

"আপনার টাকার পরোয়া আমি করি না।"

"করতে হয়। টাকা ছাড়া জীবন চলে না মিস্টার আজান।"

"আপনি আমার নাম জানলেন কীভাবে?"

"হি-হি... আমি আরো অনেক কিছু জেনেছি। ধরো আমাকে ধরো।"

বলে পড়েই যাচ্ছিল৷ আমি না চাইতেও তাকে জাপটে ধরলাম। তা না হলে রাস্তায় পড়ে হয়তো নাক-মুখ ফেটে যেত। আয়রা আবারো মৃদু হাসলো।

"জানতাম তুমি আমাকে পড়কে দেবে না।"

"এমন করছেন কেন? আপনার গাড়ি কোথায়?"

"গাড়ি বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছি।"

"তাহলে আপনি যাবেন কীভাবে?"

"তুমি নিয়ে যাবে আমাকে।"

"আমি!"

"হ্যাঁ, সেজন্যই তো অপেক্ষা করতে বলেছি।"

"এই আপনার মতলব কী হ্যাঁ? তখন অনুষ্ঠানে এত অপমান করলেন আর এখন বলছেন বাসায় পৌঁছে দিতে। পারব না আমি।"

"আমার মাথা ঘুরছে। বমি করব আমি। ওয়াক... ওয়াক... না না করব না, করব না। আমি কিন্তু কন্ট্রোলের বাইরে চলে যাচ্ছি। এইযে আমার বাসার অ্যাড্রেস এখানে নিয়ে যেও আমাকে।"

বলে আয়রা আমার কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল। তার একটি হাত আমার কোমড়ের সাথে জড়ানো। অন্য একটি হাত দিয়ে আমার কাঁধে এত জোরে ধরেছে, যে আমার কাঁধে তার লম্বা নখ বসে গেছে।

"আরে ছাড়ুন। সোজা হন, কেউ দেখলে কী ভাববে!"

"হুমম... হুমমমম.."

আয়রা আর স্বাভাবিক নেই। তার শরীরের পুরো ভর এখন আমার ওপর। আয়রার মুখের লালা পড়ে আমার কাঁধ পুরো আঠালো হয়ে গেছে। এদিকে প্রায় পঞ্চান্ন কেজি ওজনের প্রায় বাইশ বছরের মেয়েটিকে সামলাতে আমি একরকম হাঁপিয়ে উঠছি। সে যে কেন এমন করছে কিছুই বুঝতে পারছি না। নিজের গাড়ি থাকতে আমার মতো একজনকে বিপদে ফেলার কোনো মানে হয়?

ঠিকানামতো যখন পৌঁছালাম তখন আমার চোখ কপালে উঠার মতো অবস্থা। এতবড়ো বাড়ি এতদিন শুধু স্বপ্নেই দেখেছি। এই প্রথম সরাসরি ভেতরে ঢুকার সুযোগ হলো।

একজন বয়স্ক লোক এসে আমাদেরকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। কিন্তু তিনি আয়রাকে স্পর্শ করেননি। আমিই ধরেধরে বিছানা পর্যন্ত নিয়ে গেলাম। মেয়েটা পড়েপড়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। বয়স্ক উনি চাদর দিয়ে আয়রার শরীর ঢেকে দিলেন। এতটুকু পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু চলে আসতে চাইলেই বাঁধলো আসল বিপত্তি। বৃদ্ধ লোকটা একরকম না না করে উঠে বললেন,

"এখনি যেতে পারবেন না। ম্যাডামের ঘুম ভাঙুক তারপর যাবেন।"

কেন যেতে পারব না জানতে চাইলে তিনি বললেন,

"ম্যাডামের সাথে এসেছেন, যদি কিছু মিসিং থাকে!"

আমার মাথায় আরো একবার বর্জ্রাঘাত হলো। আমি উপকার করেছি, কই আমাকে ধন্যবাদ দিবে তা না করে উল্টো আমাকে চোর বানিয়ে দিচ্ছে! আরে ওর ম্যাডামের সাথে কী এমন আছে যে আমি চুরি করব? তাছাড়া আমাকে কি চোরের মতো লাগে দেখতে?


অনেক জোরাজুরি করেও বৃদ্ধ লোকটার সাথে পেরে উঠলাম না। উনি একরকম আমাকে বন্দি করে রেখে দিলেন। এখন আমার সামনে কমসেকম বিশ পদের খাবার রাখা। গোরুর গোশত ভুনা, বড়ো মাছের মাথা, গলদা চিংড়ি, পোলাও, মাছের রোস্ট সহ কত রকমের মিষ্টান্ন আমি বলে শেষ করতে পারব না। এতকিছু নাকি আমার জন্য! আমি এতকিছু খেতে পারব নাকি!

পোলাও থেকে ধোঁয়া উড়ছে অনবরত। ভাজা ইলিশের ঘ্রাণে ঘর ভরে গেছে। এত খাবার সামনে রেখে আমি বসে আছি। কারণ এখনও আয়রার মতলব বুঝে উঠতে পারছি না। সে কী কারণে আমাকে এখানে আসতে বাধ্য করেছে? মতলব কী তার? আমি একজন ছাপোষা মানুষ। আমার সাথে কী কাজ থাকতে পারে তার?

বসেবসে আকাশ-পাতাল ভাবছি এমন সময় বৃদ্ধ এসে বললেন,

"ম্যাডাম ডেকেছেন আপনাকে। খাওয়া শেষ করে আসুন।"

চলবে...

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া