চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক — পর্ব ২

ইয়াছিন নাইম১১ জুলাই ২০১৫২ মিনিট পড়া

আজকে কোটিপতির পার্টিতে যাচ্ছি। পকেটে আছে দু'টো বিশ টাকার নোট আর গতকালের মাতাল মেয়েটির স্মৃতি...

আমি জামাকাপড় পরে রেডি হচ্ছিলাম। আজকে আমার স্টুডেন্ট জোহরার জন্মদিন। আমি সাধারণত কোলাহল পছন্দ করি না। তাই অনুষ্ঠান এড়িয়েই চলি। কিন্তু জোহরা আমাকে বারবার করে বলে দিয়েছে ওর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে আমাকে থাকতেই হবে। নাহলে ও আর আমার কাছে পড়বে না। সুতরাং চাকরি বাঁচানোর জন্য হলেও ওই অনুষ্ঠানে আমাকে থাকতে হবে।

জোহরা কোটিপতির মেয়ে। ওদের অতিথিরাও আসবে সেরকমই। শুধু আমি একজন গরিব, একরকম হতদরিদ্র৷ একটা ভালো পোশাক পরে যাবো সেই সামর্থও আমার নেই। অগত্যা যা আছে তাই দিয়েই রেডি হচ্ছি। একটা নীল চেক শার্ট, জিন্স প্যান্ট আর একজোড়া হাওয়াই স্যান্ডেল। এই শেষ৷ ও হ্যাঁ, গতবছর কেনা আড়াইশো টাকা দামের একটি ঘড়ি।

আমি যখন আয়নায় নিজের চুল দেখছি তখনি আমার ঘরে ঢুকলেন মাহিদ ভাই। এক টুকরো সাদা কাগজ এগিয়ে দিলেন আমার দিকে। আমি বললাম,

"কী এটা?"

"ওইযে মেয়েটাকে তোমার ঘরে জায়গা দিয়েছিলে, যাবার সময় কাগজে নাম্বার লিখে দিয়ে গেছে। বলেছে যোগাযোগ করতে। তোমাকে সাহায্য করবে।"

আমি কাগজটা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেললাম। ভাই প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, "কী করলা আজান! আরে মেয়েটা তোমারে টাকাপয়সা দিয়া সাহায্য করত!"

"লাগবে না ভাই। আমি প্রতিদানের আশায় উপকার করিনি। সে বিপদে ছিল তাই সাহায্য করেছি। এরপর আর তার সাথে দেখা হোক তা আমি চাই না।"

"কেন চাও না? কী সমস্যা তোমার হ্যাঁ?"

আমি কোনো জবাব না দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। একটু পর পার্টি শুরু হয়ে যাবে।


পার্টিতে এসে আমার মাথা ঘুরে গেল। আমি যতটা না ভেবেছিলাম তারচেয়ে অনেক বেশি আয়োজন করা হয়েছে। লাইটিং, বেলুন, মিউজিক, মানুষজন আরো কত কী! বাতাসে হরেক রকম খাবারের গন্ধ। স্টেজে বিশাল সাইজের কেক রাখা। কেকের উপর আবার একটা মেয়ে পুতুল দাঁড়িয়ে আছে। এতবড়ো কেক আর এত বড়ো অনুষ্ঠান আমি জীবনে প্রথম দেখলাম।

অনুষ্ঠানে সবার মধ্যমণি আমার তেরোবছরের স্টুডেন্ট জোহরা। তার চারপাশে আরো কিছু ছেলেমেয়ে। সবাই কেক কাটা দেখার জন্য প্রস্তুত। জোহরা ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কেক কাটছে না। জোহরার বাবা বারবার উদ্বিগ্ন হয়ে প্রবেশ পথের দিকে তাকাচ্ছেন। আমি জোহরার বাবাকে বললাম,

"আঙ্কেল, আপনারা কি কারো জন্য অপেক্ষা করছেন?"

"হ্যাঁ, আসলে আমার বস আজকের পার্টিতে আসার কথা। উনি আসলেই কেকটা কাটব।"

এতটুকু বলতেই গাড়ির হর্ণের আওয়াজ শোনা গেল। জোহরার বাবা ফুলের তোড়া নিয়ে দৌড়ে গেলেন। নিশ্চয়ই জোহরার বাবার বস চলে এসেছেন। আমি ভাবছি জোহরার বাবার এত টাকা, এত ক্ষমতা। তার বস যিনি, তার কত ক্ষমতা হবে! তিনি নিশ্চয়ই আরো অনেক বেশি টাকার মালিক হবেন!

আমার দৃষ্টি পড়ল ভিড়ের দিকে।

গাড়ির দরজা খুলল...সবাই ঝুঁকে পড়ল...আমি পাথর হয়ে গেলাম...

আর সবার কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে যিনি ফুলের তোড়া হাতে এগিয়ে আসছেন, তাকে একজনর দেখলাম আমি। সঙ্গেসঙ্গে আমার বুকের ভেতর কালবৈশাখী ঝড় বয়ে গেল। আমি যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারলাম না।

ঠিক দেখছি তো আমি? না কি কাল সারারাত ঘুম হয়নি বলে ভুলভাল দেখছি? এ যে সেই মেয়ে, যে আমার কাঁধে মাথা রেখেছিল! যাকে আমি কোলে করে, রিকশায় তুলে আমার মেসে একরাত রেখেছিলাম! এই মেয়ে জোহরার বাবার বস!

চলবে...

এরপর কী হতে চলেছে? মেয়েটি আজানকে চিনতে পারবে? না কি অজানাই থেকে যাবে? জানব পরবর্তী পর্বে। কাল রাত ঠিক ৯টায়।

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া