চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক — পর্ব ৫

ইয়াছিন নাইম৮ মে ২০২৬৪ মিনিট পড়া

"খাবার কেমন ছিল মিস্টার... আজান?"

আমার মুখোমুখি এসে বসল আয়রা। এখন তার পরনে স্লিভলেস কালো গাউন। ভেজা চুল থেকে শ্যাম্পুর ঘ্রাণ আসছে। এখন অনেক ফ্রেশ লাগছে তাকে। তার চাহনি আর কথা বলার ভঙ্গি এমন, যেন আমরা বহু বছর ধরে পরিচিত। ভোর হতে বেশি দেরি নেই। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।

আয়রা আবার বলল, "খাবার কি পছন্দ হয়নি?"

আমার জবাব দিতে ইচ্ছে করল না। আরে খেলে তো পছন্দ হবে! আমি খাইনি। কেন খাব? যে আমাকে এতগুলো মানুষের সামনে অপমান করল তার দেওয়া খাবার কোন দুঃখে খেতে যাব আমি? এটা ঠিক যে খিদের জ্বালায় অস্থির লাগছে আমার। কিন্তু তারমানে তো এই না যে, যারতার দেওয়া খাবার খেয়ে ফেলব। সে কী ভেবেছে? এত অপমান করে ভালোভালো দু'টো খেতে দিলেই আমি সব ভুলে যাব? এ তো জুতা মেরে গোরু দানের মতো ব্যাপার হয়ে গেল। দরকার হলে না খেয়ে মরে যাব, তবুও ওর কিছু খাব না।

এদিকে বড়োবড়ো দু'টো এসি পাল্লা দিয়ে চলছে। আমার হাড় পর্যন্ত শীতল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আয়রার তেমন কিছুই হচ্ছে না। সবচে' বড়ো কথা, আমার শরীর কাপড়ে ঢাকা। কিন্তু আয়রা যে গাউন পরে আছে তাতে শরীরের অর্ধেক কাপড়ের বাইরে। তাও সে স্বাভাবিকভাবেই বসা। তার চোখ দেখে মনে হচ্ছে আমাকে কাঁচুমাচু হয়ে কাঁপতে দেখে সে খুব মজা পাচ্ছে। তাইতো কৌতূকের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে বারবার। ঠোঁটের কোণে সামান্য মিষ্টি হাসি আছে কি?

"তোমার কি ঠাণ্ডা লাগছে?"

বলে মৃদু হেসে তাকালো আয়রা। তারপর মার্বেলের রাউন্ড শেপ টেবিলের উপর থেকে সাদা রিমোট হাতে তুলে নিলো। রিমোট চাপতেই এসি দু'টো বাতাস করা বন্ধ করে দিলো। তারপর কিছুক্ষণ আমাকে দেখল চুপচাপ। বলল,

"তোমার মনেহয় ঘুম পাচ্ছে। রেস্ট করো তাহলে, গুডনাইট।"

বলে আয়রা চলে গেল। আমি আরকিছু ভাবতে পারছিলাম না। একে তো খিদার জ্বালা তারউপর ঘুম৷ সুতরাং আর দেরি না করে ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্নে দেখলাম আয়রা মাতাল হয়ে আমাকে দৌড়াচ্ছে। আর আমি জুতা হাতে নিয়ে ছুটে পালাচ্ছি।


পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙলো ততক্ষণে সকাল দশটা বেজে গেছে। জানতে পারলাম আয়রা অফিসে চলে গেছে। আমিও মেসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। বারোটায় একটা কৌচিং সেন্টারে ক্লাস করাতে হবে। এরপর আরো দু'টি টিউশানি।


সারাদিন ছাত্র পড়িয়েই কাটলো আমার। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য আয়রার কথা মাথা থেকে সরাতে পারছিলাম না। আয়রার ভেজা চুল, কালো গাউন, কৌতূক মেশানো চোখ, আর ঠোঁটের কোণে আড়াল করা মুচকি হাসি সবকিছু যেন আমার চোখে ছাপা হয়ে গেছে। মাথা থেকে সরাতে পারছিলাম না কিছুতেই।

রাতে যখন মেসে ফিরলাম তখন প্রায় দশটা বাজে। ঘরে ঢুকতেই মাহিদ ভাই উত্তেজিত ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে বললেন,

"ব্যাপার কী কউ তো মিয়া? কাল সারারাত কই ছিলা?"

মাহিদ ভাইকে সত্যিটা বললাম। সব শুনে রীতিমতো গর্ব করে বললেন,

"কী বলো মিয়া! তোমার তো কপাল খুলে গেছে!"

"কীভাবে খুলেছে ভাই? এখানে কপাল খোলার কী আছে?"

"আরে মিয়া তুমি কিন্তু বোকা আছো কিচ্ছু বুঝো না। তোমার জায়গায় আমি থাকলে ঘটনা ঘটায় ফেলতাম।"

কী ঘটনা ঘটাতেন সেটা জানতে চাওয়ার আগেই ঘরে আরেক ছোটোভাই ঢুকল। তার চোখেমুখে কৌতূহল। আমার সামনে এসে বলল,

"ভাই, একটা মেয়ে আপনারে খুঁজতে আসছিল।"

"মেয়ে? কোন মেয়ে? আমার কোনো স্টুডেন্ট?"

"না ভাই, স্টুডেন্ট না। অনেক সুন্দরী মেয়ে। খুব দামি একটা গাড়ি নিয়ে আসছিল। তোমার নাম্বার চাইছে।"

"তুই আমার নাম্বার দিছিস?"

"হ্যাঁ ভাই। আমারে পাঁচশো টাকা বকশিস দিছে।"

"তোরে কে বলছে আমার নাম্বার দিতে?"

"ওমা! এত সুন্দর একটা মেয়ে চাইলো আর আমি দিমু না?"

বলে কতকটা অবাক হয়েই চলে গেল ছেলেটা। মাহিদ ভাই আবারো উত্তেজিত হয়ে বললেন,

"দ্যাখছো মিয়া? কইছিলাম না তোমার কপাল খুলছে? আমাগোরে ভুইলা যাইয়ো না কিন্তু।"

এসব কথার মাথামুণ্ডু কিছুই আমার বোধগম্য হলো না। আমি গোসল করতে চলে গেলাম৷


এরপর কেটে গেছে সাতটি দিন।

আয়রার সাথে একটাবারও দেখা হয়নি।

আয়রাও আমার কোনো খোঁজ নেয়নি।

প্রথম প্রথম আমি তেমন ভাবিনি এসব নিয়ে। তবে মাঝেমাঝে যখন টিউশানি শেষে রাস্তায় এসে দাঁড়াতাম তখন মনে হত যেন এখনি আয়রা ঢুলতে ঢুলতে এসে আমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমঘুম কণ্ঠে বলবে,

"অ্যাই আমাকে বাসায় নিয়ে চলো... নিয়ে চলো না প্লিজ..."

কিন্তু কোনোদিনই এমনটা হয়নি। মাঝে কয়েকদিন ইচ্ছে করেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেছি। তবে তাই বলে ভাববেন না আমি আয়রার জন্য দাঁড়িয়েছি। ওর প্রতি আমার কোনো ফিলিং নেই। আমি এমনি দাঁড়িয়েছি। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছিল, প্রাকৃতিক হাওয়া আমার মনকে প্রশান্তি দিচ্ছিল।

আজও সেরকমই দাঁড়িয়ে থাকা।

তবে আজ মনেহয় একটু বেশি সময়ই হয়ে গেছে।

এখানে এসে দাঁড়িয়েছিলাম রাত ৯টায়। এখন বাজে ১২টা। মেসের বড়োভাই কয়েকবার ফোন দিয়ে তাগদা দিয়েছেন। ইতোমধ্যে মেসের গেটে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে একটা লোক আমার পাশ দিয়ে হেঁটে গেছে। আমি তাকে আয়রা ভেবে ভুল করেছিলাম।

রাত যখন আরো বাড়ল তখন ঠিক করলাম আয়রার বাসায় যাব। হতে পারে মেয়েটা অসুস্থ। এটা ঠিক সে আমাকে বিনা দোষে অপমান করেছে। কিন্তু তাই বলে কি একজন অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকবে আর আমি তাকে দেখতে যাব না? এতটা সেলফিশ আমি নই।


আয়রার বাসার বৃদ্ধ লোকটা আমাকে চিনতে পারল। ঘুমঘুম চোখে আমার দিকে চেয়ে বলল,

"কী চাই?"

"আপনাদের ম্যাডাম কোথায়?"

"ম্যাডাম বাড়িতে নাই।"

"কখন আসবে?"

"তা তো বলে যায়নাই। একসপ্তাহ আগে যে গেছে এরপর আর যোগাযোগ হয়নাই।"

"এক সপ্তাহ ধরে বাসায় ফিরেনি! কী বলেন! তো এতদিন ধরে আপনারা কী করছেন? খোঁজার চেষ্টা করেননি? পুলিশে খবর দেননি?"

"পুলিশে খবর দিব কেন? ম্যাডাম নিজেই তো গেছে।"

"আরে কোথায় গেছে, কবে আসবে কিচ্ছু জানেন না তাও এইভাবে বসে আছেন। আপনারা কি মানুষ? তার যদি কোনো বিপদ হয়ে থাকে?"

"বিপদ হবে কেন?"

"আশ্চর্য! একটা মেয়ে এক সপ্তাহ ধরে বাড়ি ফেরেনি আর আপনি বলছেন বিপদ হবে কেন!"

"আরে যান তো বিরক্ত কইরেন না। যান যান।"

বলে লোকটা আমার মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলো। সারাটা রাত এখানেই দাঁড়িয়ে থাকলাম আমি৷ চিন্তায় চিন্তায় আমার ঘুম উবে গেছে। সকালে টিউশানির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ঠিক করলাম টিউশানি শেষে ফেরার পথে থানায় যাব৷ আরকিছু না হোক, অন্তত মিসিং কেস তো করতেই হবে। জলজ্যান্ত একটা মেয়েমানুষ হঠাৎ উধাও হয়ে যাবে এটা তো হতে দিতে পারি না!

কিন্তু কলটা আসলো টিউশানি শেষ হওয়ার আগেই। মেসের এক ছোটোভাই কলে জানালো,

"কই ভাই তুমি? এক সুন্দরী তোমার জন্য একগাদা ফুল দিয়ে গেছে।"

চলবে...

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া