চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক — পর্ব ৬

ইয়াছিন নাইম৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬৩ মিনিট পড়া

মেসে ফিরে দেখি একগাদা ফুলের সাথে একটি চিরকুট। আয়রা লিখেছে,

"এত অস্থির কেন আজান? কেন এত ছটফট করো বলো তো। তোমাকে এত অস্থির মানায় না। তুমি শান্ত, নীরব, কোমল। তুমি যেমন, তেমনি সই।"

লেখাটুকু পড়ে রাগে নিজের মাথা নিজেই ফাটাতে ইচ্ছে করল। কেমন খারাপ মেয়ে দেখুন তো। এতদিন ঠিকই আমার উপর নজর রেখেছে। আমি যে ছটফট করছি সেসব জেনেও একটাবার সামনে আসেনি। আমাকে কষ্ট দিয়ে খুব মজা লাগে তাই না? সময় আসুক, আমিও দেখাব মিস আয়রা। একবার সুযোগ পাই। তারপর আমিও দেখাব প্রতিশোধ কীভাবে নিতে হয়। নিজে একটু সুন্দরী আর পয়সাওলা বলে ভেবেছে যেভাবে খুশি আমাকে কষ্ট দিতে পারবে তাই না?


প্রায় আটদিন পর আয়রার দেখা পেলাম।

একটা সস্তা টং দোকানের সামনে কমসেকম পঞ্চাশজন লোক ভীড় করে দাঁড়িয়ে আছে। এলাকার সবাই হা করে তাকিয়ে দেখছে, একটি অতি সুন্দরী মেয়ে প্রায় দশ কোটি টাকা দামের গাড়িতে করে এসে দশ টাকা দামের চা খাচ্ছে। তার মুখোমুখি বসে আমি।

আয়রা আজকে শাড়ি পরেছে। গাঢ় হলুদ শাড়ি। হলুদ রং আমার একদমই পছন্দ ছিল না। এটাকে আমি গু কালার বলে উপহাস করতাম। কিন্তু আজ আয়রার পরনে হলুদ দেখে এই রঙের প্রতি আমার ধারণা পাল্টে গেছে। আজ থেকে আমার প্রিয় রং হলুদ।

"তোমার কি অস্বস্তি লাগছে?" বলে কপাল কুঁচকে তাকালো আয়রা। তারপর বলল, "এজন্যই বলেছিলাম একটা ভালো রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসি। কিন্তু তুমি শুনলে না। এখন দ্যাখো, মানুষ কেমন তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে।"

"আমি ভাবিনি এমন কিছু হবে।"

"ভাবতে হবে আজান। তুমি বুদ্ধিমান ছেলে। বুদ্ধি কাজে লাগাতে হবে।"

"কে বলেছে আমি বুদ্ধিমান?"

"আমি বলেছি। আয়রা কখনো ভুল কথা বলে না। তোমার ইগো ঠাণ্ডা হলে চলো অন্য কোথাও গিয়ে বসি। কিছু জরুরি কথা বলার আছে।"

কিন্তু কোথাও যেতে হলো না। তার আগেই আরেকটা কোটি টাকা দামের গাড়ি এসে থামলো। গাড়িটা দেখে আয়রার মুখের হাসি যেন নিমিষেই উবে গেল। চট করে উঠে দাঁড়ালো সে। তার চোখে অবিশ্বাস আর ভয়। কিছুটা চমকে উঠেছে সে।

গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল একটা অতি সুদর্শন পুরুষ। মাটিতে পা রেখে চোখের সানগ্লাস সরিয়ে অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে তাকালো সে৷ তারপর এগিয়ে এসে নিচু আওয়াজে বলল,

"তুমি এখানে কী করছো?"

আয়রা পাল্টা প্রশ্ন করল, "তুমি না লন্ডনে থাকার কথা? দেশে আসলে কবে?"

"আজই এসেছি। ভেবেছিলাম তোমাকে সারপ্রাইজ দেব। তুমি নিজেই আমাকে সারপ্রাইজড করে দিয়েছ।"

"কি...কিন্তু তুমি দেশে এসেছ কেন?"

"তার আগে বলো তুমি এখানে কী করছো?"

আয়রা কিছুটা থতোমতো খেয়ে বলল, "একটা জরুরি কাজে এসেছিলাম।"

"জরুরি কাজ? এই বস্তিতে?" বলে ব্যাঙ্গ করে তাকালো ছেলেটা। উপহাস করে বলল, "কী এমন জরুরি কাজ শুনি?" তারপর আমার দিকে আঙুলের ইশারা করে বলল, "এটা কে, দেখে তো তোমার কোনো কর্মচারীও মনে হচ্ছে না। এসব থার্ডক্লাস নাগরিকদের সাথে কী কাজ তোমার?"

"এভাবে বলছো কেন?"

"বলব না? এদের দিকে তাকাও তো। আশপাশে যারা আছে তাদের সাথে কি তোমার যায়? তুমি থাকবে ফাইভ স্টার হোটেলে। তা না বস্তিতে এসেছ। আর এসব চা কে খায়? ময়লা পানিতে দুধ চিনি মেশালেই সেটা চা হয়ে যায় নাকি?"

ভীড়ের মাঝখান থেকে একজন বলে উঠল, "ও স্যার, চা নিয়া কোনো কথা কইবেন না। আপনেরা নামিদামি হোটেলে গিয়া যা মন চায় খাইতে পারেন। কিন্তু আমাগো লাইগা চা-ই সব।"

"শাট আপ। তোমাকে কথা বলতে কে বলেছে ইতর কোথাকার!"

"ও স্যার গালি দিতাছেন ক্যান?"

আয়রা বলল, "কী করছো তুমি!"

"আমি কিছু করছি না। আমি তো তোমাকে নিতে এসেছি। চলো।"

"কোথায়?"

"ফার্মহাউসে।"

"আমি এখন যেতে পারব না।"

"ফার্মহাউসে যেতে পারবে না। বস্তিতে তো ঠিকই বসে আছো।"

"বিহেইভ ইয়োর সেল্ফ। আমি বিনা কারণে আসিনি। নিজের প্রয়োজনে এসেছি। আর এখন তোমার সাথে ফার্মহাউসে যেতে পারব না।"

বলে নিজের গাড়িতে করে চলে গেল আয়রা। ছেলেটা রাগে গজগজ করতে করতে নিজের গাড়ি করে চলে গেল। আমি বোকার মতো চেয়ে থাকলাম শুধু। কেন জানি না ছেলেটাকে দেখার পর থেকে অস্বস্তি লাগছে। সহ্য করতে পারছি না। ছেলেটা যখন আয়রার সাথে জোরে কথা বলছিল, ইচ্ছে করছিল দেই ঠাস করে বসিয়ে। মেয়েমানুষের সাথে কীভাবে আচরণ করতে হয় দেখিয়ে দেই একেবারে।

চলবে...

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া