চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক — পর্ব ৭
ইয়াছিন নাইম১ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়াসন্ধ্যার পর টিউশানিতে ছিলাম। হঠাৎ মাহিদ ভাইয়ের কল। রিসিভ করতেই তার উচ্ছসিত কণ্ঠ শোনা গেল,
"আজান কই তুমি?"
"টিউশানিতে আছি ভাই।"
"টিউশানিতে মানে? হাসপাতালে যাওনাই?"
"আমি কেন হাসপাতালে যাব ভাই? আমার তো কিছু হয়নি।"
"আরে মিয়া তুমি কি কিছু জানো না?"
"না তো ভাই, কী হয়েছে?"
"তুমি আসলেই জানো না?"
"ভাই কিছু বলার থাকলে বলেন নাহলে ফোন রাখছি। কয়দিন পরে স্টুডেন্টের পরীক্ষা। পড়ানোতে মন দেই।"
"মিয়া তুমি আছো পড়ানো নিয়া ওইদিকে তোমার নাইকা হাসপাতালে।"
আমার শরীরে যেন চার হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে গেল। হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে গেল প্রায় তিনগুণ। মস্তিষ্কে প্রশ্নের ফুয়ারা বইতে শুরু করল। আমার নাইকা হাসতাপালে মানে! কার কথা বলছেন তিনি!
"মাহিদ ভাই আমি আজান। আপনি কাকে কল দিছেন?"
"তোমারেই কল দিছি। একটু আগে মেসে আসার সময় রাস্তায় দেখি অনেক মানুষের ভীড়। ভীড়ের মাঝখানে একটা দামি গাড়ি এক্সিডেন্ট করে পড়ে আছে। ওইটা সেই গাড়ি যেইটা দিয়া ধনীর দুলালি আইসা তোমার সাথে দেখা করে। মাইনষের মুখে শুনছি গাড়িটা একটা মেয়ে চালাচ্ছিল। তারে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হইছে।"
কথাগুলো শুনে আমি আর দাঁড়িয়ে থাকার মতো অবস্থা ছিল না। মনে হচ্ছিল এখনি বুঝি টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যাব। আমার এহেন অবস্থার কারণ বুঝে উঠার মানসিকতা আপাতত নেই। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, যে মেয়েটির সাথে আমার কোনো সস্পর্ক নেই, কয়দিন আগে যার নাম পর্যন্ত জানতাম না, সেই মেয়েটির দুর্ঘটনার কথা শুনে আমার অবস্থা এত খারাপ হচ্ছে কেন?
কাঁপাকাঁপা গল্প জানতে চাইলাম, "কোন হাসপাতালে আছে ভাই?"
কীভাবে যে তিনতলা থেকে নেমেছি কিচ্ছু জানি না।
মনে হলো যেন উড়ে এসেছি। তারপর রাস্তায় বেরিয়ে রিকশাকে সিগন্যাল দিব সেই ফুসরতও নেই।
স্যান্ডেলটা খুব প্যারা দিচ্ছিল। সেটা হাতে নিয়ে পাগলের মতো ছুটলাম। প্রায় সাড়ে সাত মিনিট টানা দৌড়ের পর হাসপাতালের করিডোরে এসে আয়রার ড্রাইভারের সাথে দেখা হলো। লোকটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। বললাম,
"কীভাবে হলো?"
"আমি বারবার মানা করছি, বলছি ম্যাডাম আমি থাকতে আপনে কষ্ট করবেন ক্যান? আমারে দেন, আমি আপনেরে বাড়ি পৌঁছায় দেই। ম্যাডাম শুনলেন না আমার কথা। আমাকে নামিয়ে দিয়ে নিজেই ড্রাইভ করতে গেলেন। তাতেই.."
বলতে বলতে কাঁদার চেষ্টা করল লোকটা। আমি দায়িত্বরত ডাক্তারের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম, এখন সে বিপদমুক্ত। অনুমতি নিয়ে রুমে গিয়ে দেখি তকতকে পরিষ্কার বিছানায় হেলান দিয়ে বসা আয়রা।
বললাম, "আসব?"
"হুমম।" বলে অনুমতি দিলো। কিন্তু আমার দিকে তাকালো না। আয়রার মাথায় ব্যান্ডেজ। চেহারা অনেকটা মলিন। চোখে নির্লিপ্ত ভঙ্গি। যেন কিছুতেই কিছু যায় আসে না। আমি দু'পা এগোলাম।
"কী ভেবেছেন বলুন তো? আপনি কি কাউকে শান্তিতে থাকতে দেবেন না?"
এরকম প্রশ্নের জন্য হয়তো আয়রা প্রস্তুত ছিল না। সে আমার মুখের দিকে তাকালো। তারপর ধীর স্বরে বলল,
"কী করেছি আমি?"
"কে বলেছিল পাকনামো করে নিজে গাড়ি চালাতে? এখন যদি আরো বড়ো ধরণের এক্সিডেন্ট হত, তাহলে ঘটনা কোথায় যেত বলতে পারেন?"
"কোথায় আবার যেত, আমি মরে যেতাম তাইতো?"
"এত সহজে কথাটা বলে দিলেন? জীবন কি এতই সহজ?"
"সহজ না বুঝি?"
"মোটেই না। মানুষ বাঁচার জন্য কত লড়াই করছে। আর আপনি মরার কথা ভাবছেন। আপনার কিছু হলে বাকিদের কী হবে জানেন?"
"কার কী হবে?"
"কার কী হবে মানে? আপনার জীবনের সাথে আর কত মানুষ কতভাবে জড়িয়ে আছে তা কি আপনি জানেন? আমার তো মন চাচ্ছে ইচ্ছেমতো আপনাকে বকে দেই।"
এইবার আয়রার মুখে হাসি ফুটল। সে শুকনো হেসে বলল,
"তাই?"
"জি হ্যাঁ। আপনি যদি সাধারণ কেউ হতেন তাহলে অবশ্যই বকে দিতাম।"
"নিজের ইচ্ছের কথা তো বললে, আমার কী ইচ্ছে করছে জানতে চাইবে না?"
"কী ইচ্ছে করছে?"
আয়রা মৃদু হাসলো।
"ডাক্তার যখন আমার মাথায় ব্যান্ডেজ করছিল, তখন বলেছিল ব্যথার কথা না ভেবে অন্যকিছু ভাবতে। এতে ব্যথা কম অনুভূত হবে। আমার তখন বাটারস্কচ কোন আইসক্রিমের কথা মাথায় এসেছে।"
আমি এক মুহূর্ত দেরি না করে বেরিয়ে যেতে শরু করলাম।
"আরেআরে কোথায় যাচ্ছো?" বলে হাঁক দিলো আয়রা। আমি থমকে ফিরে তাকালাম। তারপর মৃদু হেসে বেরিয়ে গেলাম।
হাসপাতালের লিফট নয়তলায় ছিল। সেটা পাঁচতলায় নামবে। তারপর সেটাতে করে আমি নিচতলায় যাব এত ধৈর্য আমার ছিল না। আমি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলাম।
হাসপাতাল থেকে বেরোতেই একটা দোকানে গেলাম। সেখানে কোন আইসক্রিম আছে কিন্তু বাটারস্কচ নেই। আশেপাশের দোকানগুলোতেও ভ্যানিলা আছে কিন্তু কোথাও বাটারস্কচ নেই।
পাক্কা এক ঘন্টা খোঁজাখুঁজির পর একটা ছোট্ট দোকানে অবশেষে কাঙ্খিত বাটারস্কচ আইসক্রিম পাওয়া গেল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো যখনি আইসক্রিমটা কিনতে যাব, পকেট হাতড়ে দেখি মোটমাট সাঁইত্রিশ টাকা আছে। শার্ট-প্যান্টের সব পকেট খুঁজে আরো একটি দুই টাকার কয়েন পাওয়া গেল। কিন্তু উনচল্লিশ টাকায় এই আইসক্রিম কেনা যাবে না।
অবশেষে হাতের মোবাইল বন্ধক রেখে আইসক্রিমটা কিনে নিলাম। দোকানি ভূত দেখার মতো তাকিয়ে রইল। সামান্য একটা আইসক্রিমের জন্য কেউ তার মোবাইল বন্ধক রেখে দিবে এটা হয়তো সে কল্পনাও করেনি কোনোদিন।
হাসপাতালে পৌঁছুতে প্রায় সাড়ে চার মিনিট সময় লাগলো। ঘামে ভিজে যখন পাঁচতলায় উঠলাম তখন আমার মুখে তৃপ্তির হাসি। আইসক্রিম গলতে শুরু করার আগেই চলে আসতে পেরেছি।
আয়রার রুমে ঢুকতেই যাব, দেখি ভেতরে সেই ছেলেটা; যে আজ আয়রাকে নিতে গিয়েছিল। আয়রা বিছানায় আগের মতোই বসা। ছেলেটা তার কাছ ঘেঁষে বসেছে। তার হাতে লাল গোলাপের তোড়া। সেটা আয়রার কোলের উপর রেখেছে ছেলেটা। তারপর নিজের একটি হাত আয়রার হাতের উপর রেখে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছে। আয়রা চুপচাপ শুনে যাচ্ছে।
আর আমি দাঁড়িয়ে আছি ঠিক দরজার সামনে। আমার হাতদু'টো পেছনে। হাতে আছে মাত্র ষাট টাকা দামের কোন আইসক্রিম। যেটা এখন টপটপ করে গলে পড়ছে। পড়ুক। এই সামান্য আইসক্রিমের তুলনায় ওই ফুলের তোড়া অনেক বেশি দামি। সামনে দামি জিনিস থাকতে কমদামি জিনিসের কথা কে ভাবে? আমি নাহয় একঘন্টা যুদ্ধ করে আইসক্রিমটা এনেছি। তাতে কী? এটার দাম তো ষাটই, তাই না?
রাতে ঘুমাতে পারছিলাম না।
কেন জানি না এলোমেলো লাগছিল সবকিছু।
এপাশ-ওপাশ করতে করতে বিছানাটাকেও যেন বিরক্ত লাগতে শুরু করেছিল। আর থাকতে না পেরে উঠে মাহিদ ভাইয়ের রুমে নক করলাম।
"ভাই আসব?"
"আসো। দরজা খোলা আছে।"
ঢুকে দেখি ভাই বই হাতে বসা। উনি এমনই। রাত দুইটা তিনটা পর্যন্ত বইপত্র পড়েন। হাতের বইটা ভাঁজ করে রাখতে রাখতে বললেন,
"বিকেলের মৃত্যু পড়ছিলাম। এই নিয়া চারবার পড়া হবে, বুঝছো? ববি রয়রে এত ভাল্লাগে আমার কী যে বলব! অ্যাই তুমি পড়ছো তো বইটা?"
বলতে বলতে হঠাৎ থেমে চেয়ে দেখলেন আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি।
"কী হইছে আজান? কোনো সমস্যা?"
আমি উনার কাছে বসলাম। কিন্তু কিছু বলতে পারলাম না। মাহিদ ভাই বুদ্ধিমান মানুষ। তিনি হয়তো আমার সমস্যা ধরতে পেরেই বললেন,
"শুনো ভাই, জীবনে মাঝেমাঝে কাকতালীয় অনেক কিছুই ঘটে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আমরা কেউ বাস্তবতার বাইরে যাইতে পারব না। আমরা তো সিনেমায়ও অনেক নাইকা দেখি। তুমি ধরে নাও তোমার নাইকাও সিনেমার। যারে দেইখা ভালোলাগা হয়, কিন্তু ভালোবাসতে যাইয়ো না।"
চলবে...
(আজ থেকে নতুন রুটিনে গল্প দিব। এটা প্রতিদিন দুপুর ১টায়। আর চোরনির পাঠকরা গত দু'বছর আমাকে অনেক জ্বালিয়েছেন। আপনাদের জন্য সুখবর অবশেষে চোরনি আসছে। প্রতিদিন রাত ৯টায় চোরনি পোস্ট করা হবে।)