চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক — পর্ব ১০
ইয়াছিন নাইম৩১ মে ২০২৬৫ মিনিট পড়াআয়রা এমন একটা কাজ করল যা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি...
টেবিল থেকে উঠিয়ে রঙিন ঘুড়ি বইটা দেখছিলাম। বইয়ের মলাটে কালো কালিতে লেখা "মন খারাপে যাদের অ্যালার্জি তারা যেন এই বইটি না পড়েন।"
আমার খুব অবাক লাগলো। বইয়ের নাম রঙিন ঘুড়ি অথচ মলাটে লেখা মন খারাপের গল্প। লেখক বোধহয় রঙের ব্যাপারে কিছুই বুঝে না। তা না হলে মন খারাপের গল্প রঙিন ঘুড়ি হবে কেন? হওয়া উচিত কালো মেঘ কিংবা ধূসর ছায়া। কীজানি! আজকাল সাহিত্য জগৎটা যাচ্ছেতাই মানুষে ভরে যাচ্ছে। শব্দ বুঝে না, বাক্য বুঝে না, শিল্পের ব্যাপারে ন্যূনতম ধারণা নেই তারাও আজকাল লেখালিখি করছে। এই রঙিন ঘুড়ি গল্পের লেখকও মনেহয় এমনি একজন। এরাই সাহিত্যের মতো উঁচুদরের বিষয়টাকে সস্তা গালগল্পে একদম মাটিতে টেনে নামাচ্ছে।
বইটা রেখে দিলাম টেবিলে। আর তখনি পেছন থেকে আয়রার আওয়াজ পেলাম।
"রঙিন ঘুড়ি, আমার অন্যতম প্রিয় একটি বই।"
আমি ফিরে তাকালাম। আর সঙ্গেসঙ্গেই চক্ষুলজ্জায় আমার দৃষ্টি নত হয়ে গেল। কাঁপাকাঁপা গলায় বললাম,
"আমি একটা পুরুষ মানুষ। আমার সামনে এ-ধরণের পোশাক না পরলেও পারেন।"
আয়রা হাসে। রিনরিনে গলায় বলে,
"পরেছি আমি, তুমি লজ্জা পাচ্ছো কেন?"
আমি অনেকটা তাড়াহুড়ো করে বলে ফেললাম, "কাউকে ডাকুন প্লিজ।"
"কাকে ডাকব?"
"জানি না। আমি একা আপনার সামনে থাকতে পারব না।"
আয়রা আবারো হাসলো।
"কেন? একা থাকতে অসুবিধা কোথায়?"
"আপনি ইচ্ছে করে আমাকে বিব্রত করছেন। প্লিজ সামনে আসবেন না।"
"এটা আমার বাড়ি আজান। আমার যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাব।"
"তাহলে আমি চলে যাচ্ছি।"
"কীভাবে যাবে? আশেপাশের এক-দেড় কিলোমিটারের মধ্যে কোনো মানুষ কিংবা গাড়ি পাবে না।"
"হেঁটে চলে যাব।"
"হেঁটে এক কিলোমিটার পাহাড়ি রাস্তা পাড়ি দিবে? রাত তিনটা বাজে আজান। তাছাড়া এই জঙ্গলে বাঘ-ভাল্লুক না থাকলেও শেয়াল আছে প্রচুর। এরা অবশ্য মানুষের ক্ষতি করে না। তবে রাতে একা পেলে দশ পনেরোটা শেয়াল কয়েকটা কামড় দিতে পারে তোমাকে। এর বেশি কিছু করবে না।"
বলতে বলতে এগিয়ে এসে একটা জায়গা থেকে বিদেশি মদের বোতল এবং দু'টো গ্লাস এনে টেবিলে রাখল।
"কী সিদ্ধান্ত নিলে? চলে যাবে? তুমি যেতে চাইলে আমি আটকাবো না।"
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। কেমন খারাপ মেয়ে ভাবুন। এভাবে শেয়ালের ভয় দেখিয়ে এখন আবার বলছে চাইলে যেতে পারি। এত সাহস যদি আমার থাকতো... থাক আর না বলি।
আয়রা একটি গ্লাস আমার দিকে এগিয়ে দিলো। বললাম,
"আমি এসব খাই না।"
"গুড। না খাওয়াই ভালো।"
বলতে বলতে নিজের গ্লাসে চুমুক দিলো আয়রা। আমি বললাম,
"আপনি এসব খান কেন?"
আয়রা একটা চেয়ার টেনে বসল আমার সামনে। তার পরনে সাদা ফুলহাতা শার্ট। সেটার উপরের দু'টো খোলার বোতামের ফাঁক থেকে উঁকি দিচ্ছে কুচকুচে কালো বক্ষবন্ধনী। খোলা চুল থেকে এখনও শ্যাম্পুর ঘ্রাণ আসছে। চোখে ঘুম স্পষ্ট। কিংবা কিছুটা মাদকদতা। আয়রা আমাকে এখানে কেন নিয়ে এসেছে জানি না। তবে এই মেয়ের মতিগতি আমার একদমই ভালো লাগে না। সেই প্রথমদিন থেকেই ওর আচরণে আমি বিরক্ত। এবং অনেকটা হতবাকও। ওর সামনে যতক্ষণ থাকি ভয়েভয়েই থাকি। কারণ এই মেয়ে কখন কী করে তার কোনো ঠিক নেই।
আয়রা কয়েক ঢোক তরল গিলে আমার দিকে ঝুঁকে বসল। তারপর বলতে শুরু করল,
"কেন এসব খাই জানতে চাও?"
আমি চুপ করে রইলাম।
"খাই কারণ আমি দুঃখ ভুলতে চাই।"
"দুঃখ? আপনার?" বলে কপাল কুঁচকে আয়রার দিকে তাকালাম। তার আধোভেজা চেহারা আমাকে আরো একবার লজ্জায় ফেলে দিলো। আয়রা মৃদু হেসে বলল,
"তোমাকে যতটা সহজ সরল ভেবেছিলাম তুমি ততটাও সরল নও দেখছি।"
"আপনি কী চাচ্ছেন বলুন তো? প্রথমে এরকম একটা জনমানুষহীন জায়গায় আমাকে নিয়ে আসলেন। এখন আবার এসব বলছেন।"
"আমি কী চাচ্ছি সেটা পরে বুঝতে পারবে।"
বলে আবারো মিটিমিটি হাসতে শুরু করল। তার হাসির কারণ কী সেটা আমি বুঝে উঠতে পারলাম না। ভদ্রতার খাতিরে বললাম,
"শার্টের বোতামদু'টো লাগিয়ে নিতে পারেন।"
"তাই?"
"হ্যাঁ।"
"তুমি লাগিয়ে দাও।"
বলে আমার দিকে কিছুটা অগ্রসর হলো আয়রা। আমি বৈদ্যুতিক শক খাওয়ার মতো ছিটকে দু' পা পিছিয়ে গেলাম। এই মেয়ের মাথায় নিশ্চিত ছিট আছে। তা না হলে কেউ এমন করে?
কেন জানি খুব গরম লাগছে। দরদর করে ঘামছে পুরো শরীর। বিশেষ করে কপাল আর পিঠ। আয়রা রঙিন ঘুড়ি বইটা হাতে তুলে নিলো। বলল,
"তুমি চাইলে বইটা পড়তে পারো।"
"আমি এসব আজেবাজে বই পড়ি না।"
"কে বলেছে এটা বাজে বই?"
"আমি জানি। মলাট দেখেই বোঝা যাচ্ছে সস্তা প্রেমের গল্প থাকবে।"
"প্রেম বুঝি সস্তা জিনিস?"
"হ্যাঁ।"
আয়রা হাসতে শুরু করল।
"তুমি বোধহয় কোনোদিন প্রেম করোনি তাই এমন বলছো।"
"করিনি। কোনোদিন করবও না।"
"আর ইউ শিয়োর আজান?"
"হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিয়োর।"
"প্রেমের প্রতি এত বিদ্বেষ কেন তোমার?"
"বললে আপনি বিশ্বাস করবেন না।"
"করব তুমি বলো।"
"না থাক।"
"আরে বলো।"
আমি একটু দম নিলাম। আয়রা আবার বলল, "বলো আমাকে। আমি শুনব।"
"আমার এক ভাই ছিলেন। আপন না হলেও আপনের মতোই স্নেহ করতেন আমাকে। ভাই পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলেন। গরিব ছিলেন যদিও। টিউশানি করে অর্ধেক টাকায় নিজের পড়াশোনা চালাতেন আর অর্ধেকটা নিজের পরিবারকে পাঠাতেন। তার স্বপ্ন ছিল শিক্ষক হবেন। তবে যেকোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক না, উনি যে কলেজে পড়াশোনা করেছেন সেই কলেজের শিক্ষক হবেন। এজন্য ভাই প্রচুর পড়তেনও। আর বলতেন, দেখিস একদিন আমি আমার কলেজে যাব। তবে ছাত্র হিসেবে নয়, শিক্ষক হিসেবে।"
বলতে বলতে থামলাম আমি। আয়রা একদৃষ্টে আমার দিকে চেয়ে শুনছিল। আমি থামতেই বলে উঠল, "থামলে কেন, বলো!"
"একদিন ভাইয়ের জীবনে একটা মেয়ে এলো। অনেক বড়ো পয়সাওয়ালার মেয়ে। অনেক সুন্দরী। অনেক ছেলে তাকে পছন্দ করত। কিন্তু সে পছন্দ করে বসল আমার সেই গরিব, সাধারণ ভাইকে। কারণ জানতে চাইলে সে নাকি বলত, সবাই তার পিছনে ঘুরলেও একমাত্র ভাই-ই তেমন আগ্রহ দেখাতেন না। এজন্যই নাকি ভাইকে তার ভালো লেগেছিল।"
"তারপর?"
"তারপর আর কী। ভাই তার মিষ্টি কথায় বাস্তবতা ভুলে গিয়ে প্রেমের ফাঁদে পা দিলেন। মেয়েটা তিন বছর টানা প্রেম করল। দিন নেই রাত নেই যখন খুশি ভাইয়ের কাছে চলে আসত। আমরাও তাকে ভাবি ডাকতাম। ভাইও তাকে অনেক বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। আর সেটাই ছিল তার জীবনের সবচে' বড়ো ভুল।"
"কেন? ভুল কেন হবে?"
"একদিন মেয়েটা এসে আমাদের সামনেই ভাইয়ের হাতে নিজের বিয়ের কার্ড ধরিয়ে দিলো। যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে সেও অনেক পয়সার মালিক। অনেক ক্ষমতা। আর এদিকে ভাই ভাঙাচোরা মেসে থাকেন। টিউশনের টাকা পেলে খান নাহলে খালি পেটে থাকেন এরকম অবস্থা। ভাই অনেক চেষ্টা করেছিলেন বিয়েটা ঠেকাতে। কিন্তু পারেননি।"
"পারেননি?" বলে উত্তেজিত প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো আয়রা।
"হ্যাঁ। পরেরদিন সকালে ভাইকে ঘুমন্ত অবস্থায় ফ্লোরে পাওয়া গেল। তার দেহের পাশেই একপাতা ঘুমের ট্যাবলেটের খোসা। এর কিছুদিন পর একটা চিঠির মাধ্যমে জানতে পারি ভাইয়ের চাকরিটা হয়ে গেছে। সেই চাকরি যেটার জন্য ভাই স্বপ্ন দেখতেন। স্বপ্নের চাকরি আছে, সেই কলেজও আছে। সেই মেয়েটাও এখন সুখের সংসার করছে। নেই শুধু আমাদের সহজ সরল ভাইটি।"
বলতে বলতে খেয়াল করলাম আমার চোখদু'টো ভিজে গেছে। আয়রা বিস্ফারিত চোখে আমার দিকে চেয়ে আছে। তার চোখও টলমল করছে। ঘড়ির ডংডং শব্দে বুঝলাম চারটা বেজে গেছে। টেবিলের উপরে রাখা আয়রার ফোনে ইনকামিং কল আসছে। স্ক্রিনে ভাসছে রায়ানের নাম।
চলবে...
(অংশেষে আমার আইডি সম্পূর্ণ ঠিক হয়েছে। এখন থেকে নিয়মিত গল্প পাবেন আশা করছি। এই পর্ব কেমন লাগলো জানাতে ভুলবেন না যেন। সবার জন্য শুভকামনা)