মিষ্টির দোকান — পর্ব ২
ইয়াছিন নাইম১৬ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়াআমাদের দোকানে যারা রাতে মিষ্টি কিনতে আসেন তাদেরকে আম্মা খুব ভয় পান। উনারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমাকে শক্ত করে ধরে রাখেন।
আব্বা বেচাবিক্রি শেষ করে দোকানের ঝাঁপ নামিয়ে দেন। ধীরেধীরে মিষ্টি গন্ধটা কোথায় যেন মিলিয়ে যায়।
একদিন আম্মা বলেছিলেন, "আমরা এই ব্যবসা উঠিয়ে দিলে পারি না?"
কথাটা শোনা মাত্রই আব্বা ভড়কে গিয়েছিলেন। বোঝা গেল ব্যবসা উঠিয়ে দেওয়া তার হাতে নেই। হয়তো দাদার হাতেও ছিল না।
দাদা বেঁচে থাকতে বলতেন,
"আমার খুব ভয় লাগে। যদি এমন কিছু করে ফেলি যেটা উনারা পছন্দ করেন না, তখন কী হবে?"
তখন আব্বা বলতেন, "তাহলে চলেন না অন্য কোথাও চলে যাই।"
দাদা চমকে উঠতেন।
"কোথায় যাবে? পুরো পৃথিবীতে উনাদের বিচরণ।"
তারপর আব্বা কথা বাড়াতেন না।
আব্বা আমাকে নিজের হাতে গোসল করিয়েছেন। একটা সাদা পাঞ্জাবি পরিয়ে মাথায় টুপি দিচ্ছেন। বললাম,
"উনারা আমাদেরকে কই নিয়ে যাবে, আব্বা? মাহফিলে নাকি?"
আব্বা নরম দৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে। কোনো জবাব দিলেন না। আম্মা তেড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। হাউমাউ করে বলতে লাগলেন,
"আমি এটা হতে দিব না। আপনি আমার ছেলেরে কোথাও নিয়ে যেতে পারবেন না।"
"এমন হয় না আয়েশা। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, আমাদের ছেলের কিচ্ছু হবে না।"
"না না। আপনি গেলে যান। আমার ছেলে যাবে না।"
"আয়েশা, আমার কথা শুনো। উনারা বলেছেন ওকে সাথে নিতে। তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো না? প্রাণ থাকতে আমি আমাদের সন্তানের কোনো ক্ষতি হতে দিব না।"
আম্মা কিছুটা নরম হলেন। আব্বা আমাকে সুগন্ধি আতর মাখিয়ে দিলেন।
রাতে অসংখ্য পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। বুঝলাম উনারা এসেছেন। দলেদলে এসে পা গুলো থামলো ঘরের সামনে। তারপর দরজায় তিনবার টুকা পড়ল। আব্বা আমার হাত ধরলেন।
"উনারা চলে আসছে।"
খেয়াল করলাম আম্মা চোখ মুছছেন। আমার কপালে চুমু দিয়ে বললেন, "সাবধানে যাইস।"
বাইরে বেরিয়ে দেখি অসংখ্য সাদা পোশাকের লোক ভীড় করে আছে। তাদের উচ্চতা অস্বাভাবিক বেশি। সবাই একসঙ্গে সালাম দিলো। সেই মিষ্টি গন্ধটা আবার পেলাম। আব্বা আমার হাত শক্ত করে ধরে চলতে শুরু করলেন।
"আসসালামু আলাইমুক ইয়া আহলাল কুবুর..'
সবাই একসঙ্গে বলে উঠলেন। চেয়ে দেখি কবরের সামনে চলে এসেছি। কবরের বেড়ায় একটা চারকোনা টিন লাগানো। সেটায় সাদা রঙ দিয়ে লেখা,
মরহুম আকবর আলী
পিতা : মরহুম ইজ্জত আলী
সাং : দক্ষিণপাড়া
কবরের চারপাশে অসংখ্য সাদা পোশাকধারী দাঁড়িয়ে। উনাদের একজন আব্বাকে বললেন,
"আজ আপনার বাবার মৃত্যুবার্ষিকী। আমরা সবাই তাঁর জন্য দোয়া করতে এসেছি।"
খেয়াল করলাম উনাদের সাথে আমার বয়সি একটি ছেলেও এসেছে। তার চেহারা ভালোভাবে দেখা যায় না। ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে ছেলেটা বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছে।
দোয়ার সময় সবাই একসঙ্গে হাত তুললেন। একজন জোরেজোরে দোয়া করছেন। সবাই মাঝেমাঝে আমিন বলছেন।
"ইয়া আল্লাহ, তুমি মানুষ এবং আমাদেরকে বানিয়েছ তোমার ইবাদত করার জন্য। আমরা..."
দোয়া চলতে থাকে। আমার মাথায় হঠাৎ প্রশ্ন খেলে যায়। মানুষ এবং উনারা মানে? দোয়ার মাঝখানেই বলে উঠি,
"আপনারা কি মানুষ না?"
এক মুহূর্তের ব্যবধানে পরিস্থিতি স্তব্ধ হয়ে যায়। দেখি দোয়া থামিয়ে সবাই নিজেদের দিকে চাওয়াচাওয়ি করছেন।
আব্বা তাড়াহুড়ো করে আমাকে কোলে তুলে নিলেন। দোয়া যিনি পড়ছিলেন তিনি বলে উঠেন,
"ছেলেটাকে আমার কাছে দিন।"
আব্বা দুই পা পিছিয়ে গেলেন। কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন,
"বাচ্চা মানুষ বুঝতে পারেনাই। আর এমন হবে না।"
"দেন আমার কাছে।"
বলে একরকম কেড়ে নিয়ে যান। তার হাতটা আমার মাথায় রাখতেই অস্বস্তি হতে শুরু হয়। কারো হাত যে এত ঠাণ্ডা হতে পারে? আগে জানা ছিল না।
তিনি দোয়া করে দিয়ে বললেন, "ছেলেটাকে সাবধানে রাখবেন।"
তখনও তাদের সাথে আসা ছোটো ছেলেটা আমাকে দেখছিল। আর আমি দেখছিলাম তাকে। এরকম একটা খেলার সাথী হলে মন্দ হত না।
পরদিন দুপুরবেলা বাড়ির পেছনে খেলছিলাম।
সূর্য তখন মাথার ওপর। হঠাৎ একটা বাচ্চা সাপ এসে আমার পায়ে লাগে।
আমার চিৎকারে আম্মা ছুটে আসেন। একটা মোটা লাঠি দিয়ে সাপের বাচ্চাটাকে পিটিয়ে মেরে ফেলেন। তারপর আর তেমন কিছু হয়নি।
হলো রাতে।
আব্বা যখন মিষ্টি দিতে গেলেন, তখন আমি কান খাড়া করে শুনছি। একজন বলছেন,
"আজকে মিষ্টি নিতে আসিনি ভাইজান।"
আব্বা বলছেন, "তাহলে?"
"একটা খারাপ সংবাদ আছে। এক মহিলা আমার ছেলেকে..."
বলতে বলতে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন। এরকম আকাশ কাঁপানো কান্না আমি জীবনে কোনোদিন শুনিনি।
"আমার ছেলেকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে।"
"ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। এটা তো খুব দুঃখের সংবাদ।"
"কিছুক্ষণ পর জানাজা ভাইজান। আপনাকে নিতে এসেছি।"
"একটু দাঁড়ান। আমি ছেলের মাকে বলে আসি।"
দোকানের ঝাঁপ নামানোর শব্দ হলো। আম্মার দিকে তাকিয়ে দেখি উঠে বসে ঠকঠক করে কাঁপছেন। আব্বা ঘরে আসতেই লাফিয়ে বিছানা থেকে নেমে আব্বার হাত চেপে ধরলেন।
"আমি আপনাকে যেতে দিব না।"
"কী বলো আয়েশা? উনারা আব্বার জানাজার সময় ছিলেন। কাল রাতেও কবর জিয়ারত করেছেন। আর আমি উনাদের সময় যাবো না। এটা তো বেইনসাফি।"
"না না, আপনার যেতে হবে না। আমি আপনার পায়ে ধরি। যাবেন না দয়া করে।"
"আয়েশা, কেন এমন করছো? পাগলামি করো না। আমি জানাজা পড়েই চলে আসব।"
"না... না! আপনি জানেন না। আমি আপনাকে যেতে দিব না।"
বাইরে থেকে আওয়াজ এলো,
"ভাইজান, আসছেন?"
আম্মার হাত ছাড়িয়ে আব্বা বেরিয়ে গেলেন।
আমি কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
আম্মা জায়নামাজ বিছিয়ে দুরাকাত নামাজ পড়লেন। মাঘমাসের শীতে বস্ত্রহীন বৃদ্ধ যেমন কাঁপে, তেমনি ঠকঠক করে কাঁপছিলেন।
মোনাজাতে বসে দুই হাত তুলে হাউমাউ করে বলতে লাগলেন,
"ইয়া আল্লাহ, এটা আমি কী করলাম! না জেনে এত বড়ো পাপ আমার হাত দিয়ে হয়ে গেল! এখন কী হবে মাবুদ?"
চলবে।