মিষ্টির দোকানঅতিপ্রাকৃত

মিষ্টির দোকান — পর্ব ১

ইয়াছিন নাইম৮ আগস্ট ২০১৫৪ মিনিট পড়া

আমাদের দোকানে মাঝরাতে কারা যেন মিষ্টি কিনতে আসে।

দরজায় তিনবার টুকা দিলে আব্বা দোকানের ঝাঁপ খুলতে যান।

ওরা যখন আসে, তখন একটা মিষ্টি ঘ্রাণ পাওয়া যায়। শোবার ঘর থেকে ওদের কথা শুনতে পাই। তবে কোনোদিন চোখে দেখিনি।

আব্বা কোনো কারিগর রাখেন না। নিজের হাতে মিষ্টি বানান। বড়োবড়ো সাইজের মিষ্টি। কালোজাম, সন্দেশ, রসগোল্লা। এত বড়ো মিষ্টি সাধারণত হয় না। আব্বা বলেন,

"উনারা বড়ো মিষ্টি পছন্দ করেন।"

দিনে খদ্দের খুব কম থাকে। খুব একটা বিক্রি হয় না। আমাদের সংসার চলে উনাদের টাকায়। যারা রাতের অন্ধকারে মিষ্টি কিনতে আসেন।


আমাদের দোকানটা ঘরের সাথেই। ভেতর দিয়ে একটা দরজা কাটা। রাতে উনারা এলে আব্বা ভেতরের দরজা দিয়ে দোকানে যান। যাবার সময় সুগন্ধি আতর মাখেন। মাথায় সাদা টুপি দেন।

দোকানের ঝাঁপ খোলার শব্দ হতেই বাইরে থেকে অনেকজন একসাথে সালাম দেওয়ার আওয়াজ শোনা যায়। আব্বা অভ্যাসবসত সালামের উত্তর দেন। তখন পুরো দোকানে অন্যরকম সুবাস ছড়িয়ে পড়ে। সেই সুবাস আমাদের নাকেও আসে।

একবার আম্মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "উনারা শুধু রাতেই আসেন কেন?"

আম্মা বলেছিলেন, "দিনে উনাদের চলাচল করতে অসুবিধা হয়।"


ব্যবসাটা চালাতেন আমার দাদা। তখন বেচাবিক্রি আরো বেশি হত। শুনেছি দাদার সাথে উনাদের সম্পর্ক ভালো ছিল।

দাদা মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে আব্বাকে শিখিয়েছিলেন সবটা। কোথায় চিনি কতটুকু দিতে হবে, দুধের পরিমাপ কেমন, জাল কতক্ষণ দিতে হয় সব। মৃত্যুর আগের রাতে দাদা আব্বাকে নিয়ে দোকানে বসে ছিলেন সারারাত।

শেষরাতে শতশত পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। দাদা ডেকোরেশনের দোকান থেকে দুইশো চেয়ার এনে বিছিয়ে রেখেছিলে দোকানে ও রাস্তায়। হয়তো তিনি আগে থেকে জানতেন সেদিন ভীড় বেশি হবে।

সেই রাতে প্রথমবার আব্বার সাথে সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পরদিন সকালে দাদা আর ঘুম থেকে উঠলেন না।


দাদার জানাজা হয়েছিল দুবার। দিনে হয়েছিল মসজিদের সামনের ছোটো মাঠে। তখন আমিও ছিলাম। রাতে আবার জানাজা হয় আমাদের ফসলি জমিতে। তখন আব্বা একা গিয়েছিলেন।

দুই বিঘা জমি। সেখানেও নাকি জায়গা হচ্ছিল না। জানাজার পর আব্বা যখন বাড়িতে আসেন, তখন তার সাথে অসংখ্য পায়ের আওয়াজ আসে। সেই রাতে আতরের মিষ্টি ঘ্রাণে ভরে গিয়েছিল পুরো বাড়ি। অসংখ্য লোকের গুণগুণ করে কান্নার আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলাম।

আব্বা ঘরে এসে বলেছিলেন,

"মেহমানদের মিষ্টি দিতে হবে।"

মিষ্টি বানানো হয়েছিল দশ হাজার। আব্বা একা এত মিষ্টি বাইরে নিয়ে দিতে পারছিলেন না। তখন আম্মা আমাকে নিয়ে ভেতরের ঘরে চলে যান। দরজাটা লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভেতর থেকে। অসংখ্য পায়ের আওয়াজ আমাদের ঘরের ভেতর দিয়ে রান্নাঘরে বিচরণ করতে শুনতে পাই।

তখনও অনেকে গুণগুণ করে কাঁদছিল। শুনতে পাই মিষ্টির বড়োবড়ো পাতিল তুলে বাইরে নিয়ে যাওয়ার শব্দ। সকালে শুধু পাতিলগুলো পড়ে ছিল বাইরে। ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে রাখা।


সেই থেকে বছরখানেক হলো আব্বা এই ব্যবসা চালাচ্ছেন।

অনেক রাতে উনারা মিষ্টি কিনতে আসেন। আম্মা আমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকেন।

একদিন দেখি আব্বা দোকানে গেছেন। আম্মা গভীর ঘুমে। আমার অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল উনাদেরকে দেখব। চুপিচুপি আম্মার হাতটা সরিয়ে দিয়ে নেমে গেলাম বিছানা থেকে।

দোকানে গিয়ে দেখি কয়েকজন সাদা পাঞ্জাবি পরা লোক।

তারা দেখতে অস্বাভাবিক লম্বা। চেহারা ভালোভাবে বোঝা যায় না। উনাদের একজন আমাকে দেখে বলে উঠলেন,

"সে কি আপনার ছেলে?"

আব্বা পেছনে ফিরে তাকালেন। আমাকে দেখে তার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। পেছনে এসে শক্ত করে আমার হাত ধরলেন। টের পেলাম আব্বার হাত কাঁপছে।

আব্বা বললেন, "আজ এত বেশি মিষ্টি নিচ্ছেন যে? কোনো অনুষ্ঠান আছে?"

উনাদের একজন বললেন, "একটা মাহফিল আছে। বিশেষ একজন অতিথি আসবেন। তিনি মিষ্টি বেশি পছন্দ করেন।"

আমি বললাম, "আমাকে নিবেন মাহফিলে?"

সঙ্গেসঙ্গে দোকানের পরিবেশ কেমন যেন পাল্টে গেল। উনারা একজন আরেকজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন। আব্বা তাড়াহুড়ো করে আমাকে কোলে তুলে নিলেন। দোকানের নিভুনিভু আলোয় স্পষ্ট দেখলাম আব্বার কপাল ঘামছে।

উনাদের একজন বললেন, "তুমি যাবে আমাদের সাথে?"

আব্বা আমাকে শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন,

"ছোটোমানুষ বুঝতে পারেনাই। আপনারা ওর কথায় কিছু মনে কইরেন না।"


পরদিন সকালে আব্বার খুব জ্বর হলো।

ডাক্তারি কবিরাজি কোনো ওষুধে কাজ হয় না।

উনারা রাতে এসে বাইরে থেকে বলতেন,

"ভাইজান, অসুখ কমেছে?"

আব্বা শরীরের অবস্থা জানালে উনারা আফসোস করতে করতে চলে যেতেন।

দিন পনেরো পর আব্বা কিছুটা সুস্থ হলেন। মিষ্টি বানানোর সময় আম্মাকে সাবধান করে দিলেন, আর কোনোদিন যেন আমি দোকানে যেতে না পারি। তারপর থেকে রাতে ঘুমানোর সময় আমার একটি হাত খাটের সাথে বেঁধে রাখা হয়।

আমি শুয়েশুনে উনাদের গলার আওয়াজ শুনি।


এক রাতে আব্বা মিষ্টি দিতে গিয়েছেন।

আমি কান খাড়া করে শুনছি সব। স্বাভাবিক কথাবার্তার মাঝখানে হঠাৎ উনাদের একজন বলে উঠলেন,

"আপনার ছেলে কেমন আছে?"

ঘরের ভেতর শুয়ে আব্বার গলার কাঁপন টের পেলাম। বললেন,

"ভালো আছে।"

"কাল আপনার ছেলেকে নিয়ে তৈরি থাকবেন।"

আম্মা আমার পাশে শুয়ে ছিলেন। লাফিয়ে উঠে বসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। দোকান থেকে আব্বার কণ্ঠ শোনা গেল,

"কেন? আমার ছেলের কথায় কি আপনারা কষ্ট পেয়েছেন?"

"সেরকম কিছু না। কাল আপনাদেরকে নিয়ে একটা জায়গায় যাব।"

চলবে?

মিষ্টির দোকান

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক

চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক — পর্ব ১৪

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলেছে। নিস্তেজ হয়ে আসা সূর্যের আলো হেলে পড়েছে একপাশে। কিছুক্ষণ আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। ভেজা রাস্তার ওপাশে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে। আয়রার প্রিয় ব্র্যান্ডের গাড়ি; মার্সিডিজ। আজ সাদা ড্রেস পরেছে আয়রা। কালো গাড়ির সামনে সাদা ড্রেসটাই…

৭ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক

চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক — পর্ব ১৩

টিউশানি শেষে মেসে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। ক্লান্ত হয়ে বিছানায় পড়েছি সবে। মাহিদ ভাই দরজায় নক করলেন, "আজান, আসব?" তারপর জবাবের অপেক্ষা না করেই ঢুকে পড়লেন। মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি তার চেহারায় স্পষ্ট বিরক্ত। দপ করে সামনে বসে বললেন,…

৬ অক্টোবর ২০২৬৬ মিনিট পড়া
চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক

চাঁদের গায়ে ধূসর কলঙ্ক — পর্ব ১১

রায়ানের কল দেখে বিচলিত হয়ে পড়ে আয়রা। তার ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ পুরো ঘরময় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কলটা যখন আপনাআপনি কেটে যায় তখনও কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে চেয়ে থাকে। তারপর আচমকা বোতল উলটে মুখের সাথে লাগিয়ে নেয়। "আরেআরে কী করছেন! এত খাবেন…

৫ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া