অচেনা তুমিঅতিপ্রাকৃত

অচেনা তুমি — পর্ব ২

ইয়াছিন নাইম২০ নভেম্বর ২০২৪৪ মিনিট পড়া

সবার জীবনে একবার প্রেম আসে। লীনার হয়তো আজ এসেছে। হয়তো এক্ষুণি...

লীনা বসে বসে ভাবছিল লোকটার কথা। এই প্রথমবার ফোনে কারোর কণ্ঠ এত ভালো লাগল তার। মনে হচ্ছিল লোকটা কবিতার লাইন গড়গড় করে পড়ে শোনাচ্ছে। আর লীনা মুগ্ধ নয়নে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। আচ্ছা, লোকটা কি কবি? নাহলে এত সুন্দর করে বর্ণনা দিলো কীভাবে! তার গায়ের রং, চোখ, ঠোঁট, কোমড়...

লজ্জা পেলে লীনার চোখের পাপড়ি দ্রুত লাফাতে থাকে। আজ লাফাচ্ছে। শত চেষ্টা করেও স্বাভাবিক করা যাচ্ছে না। লীনা ধীর পায়ে উঠে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মনে মনে ভাবল, যদি এখনি ঝপ করে বৃষ্টি নামত? এখন তো শীতকাল। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে। রাস্তায় টিমটিমে আলো। যেদিকে চোখ যায় শুধু কুয়াশা আর কুয়াশা। তবু মনে হলো ল্যাম্পপোস্টের নিচে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে।

ফোন বাজতেই লীনার বুক কেঁপে উঠল। সেই লোকটা নয়তো! রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে, 'এই শীতের সন্ধ্যায় আমার বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে করছে ভিজতে ভিজতে জোছনা দেখি। সেই জোছনার আলো গায়ে মাখি সারা রাত। কিন্তু শীতকালে বৃষ্টি আসবে কীভাবে?'

লীনা বিস্মিত হলো। একি! লোকটা লীনার মনের কথা জানল কীভাবে! টেলিপ্যাথি নয় তো?

'একদিন মাঝরাতে নীরবে আসব। তুমি তখন চুপটি করে ঘুমিয়ে আছো। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। তবু আমি আসব। চুপচাপ ধীর পায়ে এসে তোমায় কোলে তুলে নেব। তারপর যখন তুমি চোখ খুলবে, চারপাশে অচেনা দেয়াল, অচেনা আসবাবপত্র, পায়ের নিচে অচেনা কার্পেট। তুমি তখন এঘর-ওঘর ছুটতে থাকবে। একসময় যখন সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠবে, দেখবে নির্জন পাহাড়ের চূড়ায় মাথা উঁচু করে একটা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। একলা একটা বাড়ি। যতদূর চোখ যায়, জনমানবের চিহ্ন মাত্র নেই। সেই একলা বাড়ির ছাদে একা একা দাঁড়িয়ে আছো। তুমি তখন চিৎকার দেবে। দূর দূর পর্যন্ত তোমার গলায় আওয়াজ পৌঁছাবে। কিন্তু কেউ সাড়া দেবে না। একটা পাখিও না। আমি তখন তোমার সামনে গিয়ে দাঁড়াব...'

ফোন কেটে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল লীনা। একতরফা কোনো কিছুই তার ভালো লাগে না। হোক তা ভালোবাসা, ঘৃণা বা অন্য কিছু।

আরো একবার ফোন বাজল। লীনা ক্লান্তি ভরা শরীর নিয়ে বিছানায় গিয়ে বসল। রিসিভ করতেই, 'আচ্ছা, তোমার কি মনে হয় না তুমি পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দরী? তোমার কি কখনোই মনে হয়নি, তোমাকে কেউ একজন চুরি করে নিয়ে যাবে? কিংবা, আয়নার সামনে দাঁড়ালে কখনো মনে হয়নি এ অপার সৌন্দর্যে কারোর নজর লেগে যেতে পারে? আচ্ছা, তোমার সৌন্দর্য কি সত্যিকারের পরীদের মতো? না কি তার চেয়েও বেশি?'

লীনা কিছু বলছে না। চুপচাপ শুনছে শুধু।

'বললে না তো, তোমাকে হঠাৎ তুলে নিয়ে গেলে খুশি হবে কিনা?'

লীনা শুধু বলল, 'মোটেও খুশি হব না।'

'তাই? তাহলে দরকার নেই। নেব না। আচ্ছা, তোমার গলায় তাবিজ ঝুলানো দেখলাম। শুনেছি ভূতের ভয় থাকলে অনেকে গলায় তাবিজ ঝুলিয়ে রাখে। তুমি কি ভূতে বিশ্বাস করো?'

লীনা এক টানে গলার তাবিজ ছিঁড়ে টেবিলের উপর রেখে বলল, 'আমার গলায় তাবিজ নেই।'


সেদিনের পর থেকে তিন দিন হতে চলল আতিফের ঘুম নেই। চোখ বন্ধ করলেই সেই লোকটার মুখ ভেসে উঠে। সে বলেছে, আতিফ তার প্রিয়জন হারাতে চলেছে। কিন্তু কাকে হারাতে চলেছে, তা বলে যায়নি। হতে পারে লোকটা মাতাল কিংবা পাগল। কিন্তু লীনার কথা যা বলেছে তা কিন্তু মিথ্যে নয়। সত্যিই লীনার কোমড়ে কাটা দাগ আছে। লীনার কোমড়ের কাটা দাগ লোকটা দেখল কীভাবে! এ কথাটা ভীষণ ভাবাচ্ছে তাকে। ভাবতে ভাবতে একসময় স্থির করল, লোকটার সাথে দেখা করবে। কিন্তু তার ঠিকানা তো আতিফের কাছে নেই। শুধু নাম জানা আছে, তানিম হাসান।

ভারী কাপড় গায়ে দিয়ে রাতেই বেরিয়ে পড়ল আতিফ। যেতে হবে গোরস্থানে। যেখানে লাশ দাফন করা হয়। লোকটাকে খুঁজে বের করার এটাই একমাত্র রাস্তা। সে কবর খুঁড়ে।

নির্জন রাস্তা। আশপাশে বাড়িঘর নেই। আছে শুধু গাছপালা। ঘন জঙ্গল পেরিয়ে গোরস্থানে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল, অন্ধকারে কেউ একজন কোদাল দিয়ে কবর খুঁড়ছে। আতিফ একটু এগিয়ে যেতেই লোকটা আতিফের চোখ বরাবর টর্চ মারল। গর্ত থেকে উঠে এসে বলল, 'এসেছেন? জানতাম আপনি আসবেন।'

আতিফ ভালো করে তাকিয়ে দেখল, সেদিনের সেই লোকটা। মাথায় গামছা। পরনে লুঙ্গি আর পাতলা টি-শার্ট। কনকনে শীতে তার একটুও ঠান্ডা লাগছে না।

আতিফ বলল, 'কবর খুঁড়ছেন কেন?'

'একটা মানুষের জন্য। আজ রাতেই মরবে। তখন তো আমি ঘুমিয়ে পড়ব। তাই আগেভাবে খুঁড়ে রাখছি। আপনি হঠাৎ রাত্রিবেলা এখানে? ভয়ডর নেই নাকি আপনার?'

'লীনার ব্যাপারে জানতে এসেছি।'

লোকটা খিকখিক করে হেসে বলল, 'নিজের বউয়ের কথা অন্য একটা পুরুষের কাছে জানতে এসেছেন! আজব মানুষ তো আপনি!'


তিন দিন হতে চলল, সেই অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আসেনি। গত তিনদিন লীনা এক মুহূর্ত শান্তিতে বসতে পারেনি। ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও সে একই জিনিস স্বপ্নে দেখেছে। দেখেছে, সে উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। তার এক হাতে ঘড়ি। অন্য হাতে হ্যান্ডমাইক। সে চিৎকার দিয়ে ডাকছে, এই যে শুনছেন? কোথায় আপনি? দেখা নেই কেন আপনার? ঘুম ভাঙতেই সে মুচকি হেসেছে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করেছে সত্যি সত্যি ছুটে যেতে তার কাছে। খুব কাছে গিয়ে বলতে, কী হলো, হঠাৎ চুপ করে গেলেন যে?

সন্ধ্যার পর থেকে লীনার অস্থির লাগছে। মনে হচ্ছে এখনই সেই লোকটার কণ্ঠস্বর না শুনতে পেলে সে পাগল হয়ে যাবে। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সে ফোন হাতে নিলো। মনে মনে ভাবল, লেকটাকে আচ্ছা করে বকা দেবে। কিন্তু হলো তার উল্টো। লোকটা ফোন ধরতেই তার রাগ কমে এল। বুক কাঁপতে লাগল। কতকী ভেবে রেখেছিল বলবে বলে। এক মুহূর্তে সব গুলিয়ে ফেলল সে। মুখ দিয়ে শুধু একটি কথাই বেরোল, 'কোথায় ছিলেন এতদিন?'

'যেখানে এতকাল ছিলাম। ভয়ে ফোন দেইনি।'

'কীসের ভয়?'

'একটি প্রশ্ন করে ফেলব। তোমার সেটা ভালো না-ও লাগতে পারে। সেই ভয়ে ফোন দেইনি।'

'কী সেটা?'

'তোমার প্রথম স্বামীর নাম কী?'

লীনা স্তব্ধ হয়ে গেল। এক মুহূর্তে মনের সাতরং অন্ধকারে ঢেকে গেল। এতদিন সে ঘোরের মধ্যে ছিল। আজ প্রথমবার মনে হলো, সে তো অন্য একজনের স্ত্রী। বিবাহিতা নারী পরপুরুষের প্রেমে মত্ত, এতো ভালো লক্ষণ না! সত্যিই কি লীনা অচেনা মানুষটার প্রতি দূর্বল হয়ে পড়েছে? না কি খনিকের মোহ মাত্র? কিন্তু এর আগে যে তার এমন হয়নি কখনো! কখনো কাউকে এতটা কাছের মনে হয়নি। কাউকে এতটা আকুল হয়ে ডাকতে ইচ্ছে করেনি। এতটা মুগ্ধ হয়ে ভাবেনি সে কারোর কথা। এ সবই কি ভুল? সবকিছু থেকেই কি লীনা দূরে সরে যেতে হবে? সব ভালোলাগা চাপা দিতে হবে তার?

(চলবে)

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক : https://www.facebook.com/100054727422264/posts/201885178312395/?app=fbl

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া