অচেনা তুমিঅতিপ্রাকৃত

অচেনা তুমি — পর্ব ৩

ইয়াছিন নাইম২৩ নভেম্বর ২০২৪৪ মিনিট পড়া

মেয়েদের বিয়ের পর বাপের বাড়ি আর নিজের থাকে না। বাপের বাড়ির মানুষেরাও তখন পরিবর্তন হয়ে যায়। লীনার ক্ষেত্রেও তাই হলো। ক'দিন ধরে লীনার মায়ের ব্যবহার অবিশ্বাস্য পরিবর্তন হয়েছে। আজ তো মুখের উপর বলেই দিলেন, 'এখানে বসে আছিস কেন? বিয়ে দিয়েছি এখানে বসিয়ে রাখার জন্য?'

লীনা রাগে, ক্ষোভে ব্যাগ গুছিয়ে চলে এসেছে। আতিফ তাকে দেখে অবাক। একের পর এক প্রশ্ন করেই চলেছে। লীনা জবাব দেয়নি। চুপচাপ মুখ কালো করে হাঁটু ভাঁজ করে বিছানায় বসে আছে। আতিফ বসে আছে তার সামনে। এটা-সেটা জিজ্ঞেস করছে। লীনা জবাব দিচ্ছে না। এতে বিন্দুমাত্র সংকোচ না করে একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছে সে। লীনা হঠাৎ চোখ রাঙিয়ে বলল, 'আপনি সেদিন আমাকে চড় মেরেছিলেন কেন?'

মুহূর্তেই আতিফের মুখ কালো হয়ে গেল। সে আসামির মতো মাথা নিচু করে ধীর স্বরে বলল, 'এখনও রেগে আছো?'

লীনা ঠোঁট ফুলিয়ে বারান্দায় চলে গেল। আতিফ গেল তার পিছু পিছু। সূর্য ডুবি ডুবি করছে। একটু পর অন্ধকার নামবে। বারান্দায় একজোড়া চড়ুই পাখি ছিল। লিনার পায়ের শব্দ পেয়ে উড়ে গেল। উড়ে উড়ে কোথায় যে চলে গেল, লীনা দেখতে পেল না। এদিক-ওদিক তাকিয়ে পিছন ফিরতেই আতিফের সাথে ধাক্কা খেল। আতিফ লীনার কাঁধে হাত রেখে বলল, 'বোসো, বলছি সব।'

লীনা বসল। আতিফ বলতে শুরু করল, 'সেদিন রাতে তোমার কথায় রেগে গিয়েছিলাম। তাই চড় মেরেছি। তুমিই বলো, সদ্য বিয়ে করা বউ যদি সিগারেট খেতে চায় তখন কি কোনো পুরুষের মাথা ঠিক থাকবে?'

লীনা গম্ভীর ভাব নিয়ে বলল, 'কিন্তু আমি তো খাওয়ার জন্য সিগারেট চাইনি। আমি শুধু দেখতে চেয়েছিলাম, আপনি স্মোক করেন কিনা। স্মোক করলে আপনার কাছে সিগারেট থাকত তাই...'

'আমার ভুল হয়ে গেছে। আর কখনো এমন হবে না।'

'প্রথম দিনেই চড় মেরেছেন এখন বলছেন আর হবে না?'

'বিশ্বাস করো, আর কখনো তোমার গায়ে হাত তুলব না। সেদিন তুমি তোমার বাবার বাড়ি গিয়ে আমাকে গালি দিয়েছো, জানোয়ার বলেছো তবুও তো আমি কিছু বলিনি। কই, কিছু বলেছি? কারণ আমি জানি ভুলটা আমারই ছিল...'


'আকাশের লক্ষ-কোটি তারকারা চেয়ে আছে একটি মেয়ের দিকে। পৃথিবীর মাটিতে দোতলা বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি। ফোন কানে লাগিয়ে চুপটি করে কী যেন শুনছে সে।'

সত্যিই তো! লীনা দোতলা বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। লীনা অবাক হয়ে বলল, 'আমি ছাদে আছি আপনি জানলেন কীভাবে?'

'জানি, আমি সব জানি। আমি এ-ও জানি, তুমি এখন একটা কালো শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছো। বাঁ হাতে সিটি গোল্ডের একজোড়া চুড়ি। ডান হাতে ঘড়ি। শীত নিবারনের জন্য একটা চামড়ার জ্যাকেট। তবে জ্যাকেটটা তোমার না। কোনো এক পুরুষ মানুষের।'

'এতকিছু জেনেও ফোন দেন কেন?'

'শোনার জন্য।'

'কী শোনার জন্য?'

'তোমার কণ্ঠস্বর। কী মধুর! যত শুনি, শুধু শুনতেই মন চায়...'

'কে আপনি?'

'তোমার ছায়া। আচ্ছা, একটা জিনিস খেয়াল করেছো?'

'কী?'

'রেগে থাকলে তোমাকে যতটা সুন্দর দেখায়, কান্না করলে দ্বিগুণ সুন্দর দেখায়। আজ যখন কান্না করছিলে, ইচ্ছে করছিল তাকিয়েই থাকি তোমার দিকে...'

'আজ কেঁদেছি তাও জানেন!'

'বললাম তো সব জানি।'

লীনা আমতা আমতা করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তখনই ওপাশ থেকে, 'আর কতক্ষণ ছাদে দাঁড়িয়ে থাকবে? নিচে এসো। খাবার রেডি।'

লীনা চেঁচিয়ে বলল, 'কী!'

তার মানে অচেনা নাম্বারে এতদিন যার সাথে কথা বলেছে সে আর কেউ না আতিফ নিজেই ছিল! গোপনে গোপনে এতবার সে আতিফের প্রেমে পড়েছে! এতবার যাকে ভেবেছে, সে আতিফ!

লীনা ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। টেবিলে খাবার সাজিয়ে বসে আছে আতিফ। লীনাকে দেখে বলল, 'বোসো।'

লীনা বসতে বসতে বলল, 'এতদিন আপনিই আমাকে ফোন দিয়েছেন?'

আতিফ লীনার প্লেটে ভাত দিতে দিতে বলল, 'কেন, আমি ফোন দিতে পারি না?'


বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে এক দৃষ্টিতে লীনার দিকে তাকিয়ে আছে আতিফ। তার সামনে ঘুমের ভান ধরে শুয়ে আছে লীনা। সে মাঝে মাঝে চোখ টিপে চেয়ে দেখছে আতিফের মুখ। হঠাৎ উঠে বসে বলল, 'একটা কথা বলি?'

আতিফ খানিকটা ইতস্তত করল। হুট করে লীনা উঠে বসবে, তা হয়তো ভাবেনি সে। কিছুক্ষণ পর বলল, 'একটা কেন, হাজারটা বলো।'

'তার আগে কথা দিন, কখনো আমাকে ছেড়ে যাবেন না৷'

'আচ্ছা, কথা দিলাম।'

লীনা ভয়ে ভয়ে বলল, 'এর আগে আমার একবার বিয়ে হয়েছিল...'

আতিফ তাচ্ছিল্য করে বলল, 'ওঃ, এই কথা! আমি জানি তো।'

লীনা ভ্রু কুঁচকে বলল, 'আপনি জানেন! কীভাবে জানেন?'

'তানিম আমাকে সব বলেছে। বেচারা নিজের দোষে ব্যবসায় লস করে তোমার উপর দায় চাপাচ্ছে। এ যুগে কেউ এসব কুসংস্কার বিশ্বাস করে? হা হা হা!'

লীনা বিছানা ছেড়ে নামল। ধীর পায়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। আতিফ লীনার গায়ে জ্যাকেট পরিয়ে দিয়ে বলল, 'কী শীত পড়েছে বাবা! ঠান্ডা লাগতে এক মুহূর্ত লাগবে না৷'

লীনা চুপচাপ হেঁটে বেরিয়ে গেল। আতিফ কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর লীনাকে খুঁজতে খুঁজতে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠল। দেখল, ছাদের রেলিংয়ে বসে আছে লীনা। একটু এদিক-সেদিক হলেই ছিটকে পড়বে। আতিফ দ্রুত এগিয়ে যাবার জন্য পা বাড়াচ্ছিল, তখনই লীনা বলল, 'এগোবে না। আর এক পা এগোলে ছাদ থেকে ফেলে দেব।'

আতিফ বলল, 'কী বলছো লীনা! কাকে ফেলে দেবে?'

লীনা রেলিংয়ে বসে পা দোলাতে দোলাতে বলল, 'তোমার বউকে। সে এখন আমার কাছে বন্দী।'

'আমার বউকে ফেলে দেবে মানে! কে তুমি?'

'আমি ভূত।' বলে নেমে এলো লীনা। আতিফের সামনে এসে ফিক করে হেসে ফেলল। বলল, 'ভয় পেয়েছেন? হি হি হি!'

আতিফ লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, 'এমনিতে আমি ভূতে বিশ্বাস করি না। তবে এখন মনে হচ্ছিল, চোখের সামনে ভূত দেখছি। ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে, উফ!'

লীনা আতিফের চোখের দিকে চেয়ে বলল, 'ভেবেছিলাম আপনি খুব সাহসী। কিন্তু আপনি তো... হি হি হি!'

(সমাপ্ত)

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক :

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=202540418246871&id=100054727422264

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া