লিলিঅতিপ্রাকৃত

লিলি — পর্ব ৩

ইয়াছিন নাইম৩১ আগস্ট ২০২৫৬ মিনিট পড়া

বিকালে পাখির কিচিরমিচির ততটা তীব্র হয় না যতটা সকালে হয়। আর এমন এক বিকালে নয় তালার ফ্লাটে আবারো আগমন ঘটল লিলির। জে তখন জানলার ধারের সোফাটিতে বসে আছে। খালি গা, পরনে একটি ফুল প্যান্ট; তীব্র রাগান্বিত কিন্তু ভীষণ শান্ত ভঙ্গিতে বসে অন্যমনস্কভাবে জানালার বাইরের দৃশ্য দেখছে। লিলি জানে কম করে হলেও প্রায় চব্বিশ ঘণ্টার জন্য সে অনুপস্থিত ছিল। জে-এর কক্ষে প্রবেশ করে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে লিলি জিজ্ঞেস করল, "আজকের বিকালটা বেশ সুন্দর। চা খাবে?"

জে-এর পক্ষ থেকে কোনো উত্তর না আসায় এবার সে জে-এর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দেখতে পেল জে-এর দৃষ্টি ধারাল। মুখের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে অথচ ভীষণ শান্ত যেমন ঝড়ের আগে পরিবেশ নীরব হয়ে যায়। জে-এর দৃষ্টি লিলির উপর পড়তেই লিলি কিছুটা ঘাবড়ে গেল কিন্তু বাইরে প্রকাশ করতে দিল না। হাসিমুখে বলল, "সাথে কিছু হালকা নাস্তাও নিয়ে আসি, কেমন?"

জে একবার পলক ফেলে লিলির উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জানালার দিকে তাকাল। তারপর ভাবলেশহীন গলায় বলল, "তোমার আমাকে বলা উচিত ছিল।"

লিলির মুখ থেকে হাসিটা অদৃশ্য হয়ে গেল। তারপর কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা। জে-এর তীক্ষ্ণ কণ্ঠ শোনা গেল এবার, "ডোন্ট বি সাইলেন্ট, আনসার মি।"

আবারো কয়েক মুহূর্তের নীরবতা। লিলিকে চুপ থাকতে দেখে নিজের মোবাইল ফোনটা বের করে দেখিয়ে বলল, "৮০ শতাংশ মানুষ নিহত, আর বাকিরা কোনো না কোনো ভাবে আহত।"

"আই ক্যান এক্সপেলেইন, জে।" লিলির স্বরে নম্রতা।

"লাশগুলোর অবস্থা এতই মর্মান্তিক যে সেগুলো শনাক্ত করতে তাদের নিজস্ব আত্মীয়দের পর্যন্ত বেগ পেতে হচ্ছে," জে-এর স্বরে হতাশা।

- জে..

- উই ডোন্ট কিল ইন্আসেন্ট পিপল, লিলি।

- এদের মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী নই, জে। হ্যাঁ মানছি, আমি পরোক্ষভাবে আমি এর সাথে যুক্ত, কিন্তু আগুন ছড়িয়ে পড়ার কাজটি আমি করিনি।

লিলির জবাবে জে-এর চোখ দু'টো সরু হয়ে এল। জে ম্লান গলায় বলল, "বিস্তারিত বল।"

লিলি রাতে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনার বিশদ বিবরণ দিল।

"নতুন জামা-কাপড় কোথায় পেলে?", জে এর প্রশ্ন।

- রাতে তীরে উঠবার পর যেখানে পৌঁছায় সেটা গ্রাম্য এলাকা ছিল বোধ হয়। কাউকে চোখে পড়ল না। কিছুদূর যাওয়ার পর গ্রামের বাজার খুঁজে পেলাম। সাইনবোর্ড দেখে একটা কাপড়ের দোকান খুঁজে বের করলাম। তারপর সেটার তালা ভেঙে শুকনো কাপড়ের সন্ধান পেয়েছি।

- সিসিটিভি ক্যামেরা?

- ছিল না। কোথাও কোনো ক্যামেরা ছিল না, জে।

- হুম...(আফসোসের সুরে বলল) তোমার ওই সোনা পাচারকারী দু'জনকেই শেষ করে দেওয়া উচিত ছিল। না একজন বেঁচে যেত। না এত নিরীহ মানুষদেরকে লাশে পরিণত হতে হত।

- যা ঘটেছে তার জন্য আমার তীব্র অনুশোচনা রয়েছে।

- তুমি আমাকে না বলে কেন গেলে? কী হতো যদি তোমার কিছু হয়ে যেতো?

- কাজটা আমার একার পক্ষেই সম্ভব ছিল, জে। না হলে আমাকে একাজে নিযুক্ত করা হত না।

- আই ডোন্ট কেয়ার! আমার সবকিছু জানার কথা। তোমার আমাকে জানানোর কথা। আমি এটাই জানি। আর অন্য কিছু জানতে চাচ্ছিনা।

- তুমি ইমোশনাল হয়ে কথা বলছো, জে।

ইমোশনাল শব্দটা শুনে জে যেন আরো রেগে উঠল। লিলি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সাথে সাথে জে-এর ডান হাতটা দু'হাতের মুঠোয় পুরে কাছে টেনে নিল। তারপর বলল, "জে, আ'ম সরি! তোমাকে না জানিয়ে যাওয়াটা আমার ভুল হয়েছে। আর কখনো হবেনা এমন। সরি।"

এতক্ষণে জে-এর তীব্র রাগটা কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছে।

শান্ত ভঙ্গিতে পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে লিলির দু'হাত, মুখ, গলা দেখতে লাগল জে। এতে লিলি কিছুটা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কী করছো?"

"কোথাও ব্যাথা পেয়েছো কি না দেখছি," জে এর সোজা উত্তর।

"আমি ঠিক আছি, জে।" দু'হাতের তালু জে-এর দু'গালে রেখে তাকে আশ্বস্ত করল লিলি।

ছোট্ট করে ওকে বলতে শোনা গেল জে-কে।

"আমি ফ্রেশ হব। চা বানাতে পারবে কষ্ট করে?" লিলির আবদার শোনা গেল যার উত্তরে জে হ্যাঁসূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল।

জে যখন চা বানিয়ে ফিরে এল লিলি তখন বিছানায় বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। জে বিছানায় উঠে তার পাশে বসল। তারপর চায়ের কাপটা তার হাতে দিয়ে বলল, "হালকা নাস্তা হলে ভালো হত, না?"

লিলি নাবোধক ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল, "এটাই যথেষ্ট।"

"একটা জামা গায়ে দাও। খালি গায়ে থাকলে তো ঠাণ্ডা লেগে যাবে তোমার," লিলি শাসনের সুরে বলল।

"ঠাণ্ডা তো তেমন একটা পড়েনি মনে হচ্ছে। তবুও তুমি যখন বলছো.." একটা গেঞ্জি গায়ে চাপিয়ে জে নিজের কাপে নিঃশব্দে চুমুক দিল। লিলিও তার দেখাদেখি চুমুক দিয়েই আবার সাথে সাথে কাপ সরিয়ে নিল।

"কী হয়েছে?", জে-এর কৌতূহলী প্রশ্ন।

- অনেক গরম, কিন্তু তুমি কীভাবে খেলে?

জে আবারো নিজের কাপে চুমুক দিয়ে বুঝল, তার কাছে চায়ের তাপমাত্রা স্বাভাবিকই লাগছে। হঠাৎ কী মনে করে লিলির কাপের চা পান করল জে। দেখল না তাপমাত্রা তো ঠিকঠাক। তাহলে কি লিলির কোনো সমস্যা হল।

লিলির কপালে হাত রেখে জে দেখল জ্বর এসেছে কিনা; কিন্তু নাহ, জ্বর তো নেই। তাহলে কী...

তারপরই লিলিকে নিজের কাপটা এগিয়ে দিয়ে বলল, "এটা দেখোতো।"

লিলি জে-এর কাপে চুমুক স্বচ্ছন্দে চুমুক দিল। বলল, "এটাও তো অনেক গরম।"

জে-এর মনে এবার সন্দেহ জাগল, সে নিজে ঠিক আছে তো। চিন্তায় তার ভ্রুজোড়া কুঁচকে উঠল, কিন্তু লিলির স্পর্শে শীঘ্রই তা উবে গেল। "আর ইউ ফাইন?", লিলির স্বরে কোমলতা।

জে সুন্দরভাবে হাসার চেষ্টা করে প্রসঙ্গ পাল্টানোর ক্ষেত্রে বলল, "আমম্..ভাবছি, তুমি না আমাকে একটা গল্প বলতে চেয়েছিলে যেটা বলতে বলতেও বলোনি সেবার।"

লিলির চোখের মণিজোড়া যেন হঠাৎ কেমন বড় হয়ে উঠল। তারপর জে-এর গালে হাত রেখে বলল, "তুমি কিছুই ভুলে যাওনা, তাইনা?"

জে চোখের ইশারায় লিলির কথায় সায় জানাল।

লিলি বলতে শুরু করল, "উম..কাহিনীটা বেশ পুরনো। সেসময় মেয়েদেরকে স্কুলে পাঠানো হত না। কিন্তু একটা মেয়ে ছিল যার স্কুলে যাওয়ার জন্য পাগল ছিল। তারপর একদিন মেয়েটা কী করলো জানো? মেয়েটা একটা ছেলের ছদ্মবেশ নিল যাতে সে স্কুলে যেতে পারে এবং সে স্কুলে যেতে শুরু করল। তারপর স্কুলে নিয়মিত যেতে যেতে সে একটা ছেলেকে ভালোবেসে ফেললো। ছেলেটা ছিল তার সহপাঠী। এখন সমস্যা এসে দাড়াল, মেয়েটা ছেলেটাকে ভালোবাসে কিন্তু ছেলেটা তো জানেনা যে মেয়েটা ছেলে নয় বরং ছেলের মত করে সেজে তার সাথে স্কুলে যাচ্ছে। তাই একদিন মেয়েটা ভাবল ছেলেটাকে ব্যাপারটা বলার ব্যাপারে। কিন্তু মেয়েটা সোজাসুজি বলতে সংকোচ বোধ করছিল। সেজন্য সে চেষ্টা করল ছেলেটাকে অন্যভাবে ঘুরিয়ে বোঝানোর। তাতে বিশেষ কাজ হল না কারণ ছেলেটা ছিল একটা গাধা। যদিও তোমার মত বুদ্ধিমান হলে অনেক আগেই বুঝে ফেলতো... হা হা। তারপর শোনো.. তারপর একসময় মেয়েটার বিয়ে ঠিক করে তার বাবা। তখন মেয়েটাকে চোখে চোখে রাখা হয় যাতে সে ঘরের বাইরে না যেতে পারে। পরবর্তীতে সেই ছেলেটা জানতে পারে যে তার সহপাঠী আসলে ছেলের ছদ্মবেশধারী একটি মেয়ে ছিল। সে আফসোস বোধ করে এবং কিছু দিন পরেই তার কঠিন একটা রোগ হয়। সেসময় চিকিৎসাখাতেরও তেমন উন্নতি হয়নি। অবশেষে মারা গেল ছেলেটা। এরপর মেয়েটা শীতের রাতে ছেলেটার কবরের কাছে এসে কাঁদতে থাকে। হঠাৎ কনক্রিটে বাঁধানো কবরটা দরজার মত খুলে যায় এবং মেয়েটা তাতে লাফ দেয়।"

এ পর্যন্ত বলে লিলি থামল।

"এটাই কী শেষ। নাকি এরপর কিছু আছে?" জে-এর জিজ্ঞাসা।

- শেষ। দ্যা এন্ড। সমাপ্ত।

- শেষ?

- আরে না না। মজা করছি, জে। হা হা হা... তারপর হঠাৎ দু'টো প্রজাপতি উড়তে দেখা যায়, একসাথে। একটা প্রজাপতি ছিল ওই ছেলেটা আর অন্য প্রজাপতি ছিল ওই মেয়েটা। তখন মেয়েটা ছেলেটাকে বলল, "আমাদের এখন আর আলাদা হওয়ার কোনো ভয় নেই।" তারপর তারা কোনো অজানা দেশে হারিয়ে গেল।

জে মৃদু হাসল।

"কাহিনীটা সুন্দর ছিল, না?", লিলির উচ্ছ্বাসিত প্রশ্ন।

- হুম, অনেক সুন্দর ছিল।

- ওয়েট। একটা সারপ্রাইজ আছে তোমার জন্য।

- কী সেটা?

লিলি প্রায় লাফিয়ে বিছানা থেকে নেমে অন্য কক্ষে চলে গেল। পরক্ষণেই আবার ফিরে এল। তার হাতে একটা ভায়োলিন।

"ভায়োলিন কোথায় পেলে?", জে প্রশ্ন করল।

- সাথে নিয়ে এসেছিলাম, বলেনি তোমাকে ইচ্ছা করে। এখন ব্যাপারটা হচ্ছে, তোমাকে যে কাহিনীটা কেবল শুনিয়েছি সেটার পুরো কাহিনীটাই ভায়োলিনে বাজানো সম্ভব। তোমাকে শোনাচ্ছি। ইউ উইল লাভ ইট, জে।

"আই লাভ এভরিথিং অ্যাবাওট ইউ," এতই ক্ষীণ স্বরে জে বলল যে লিলি শুনতে পেল না।

"কিছু বললে, জে?", লিলির প্রশ্ন।

"নাহ্, একদকম না। আমি তো শোনার জন্য বসে আছি," জে বলল।

লিলি কোমলভাবে হাসল এবং সকল মনোযোগ বাদ্যযন্ত্রটিতে আবিষ্ট করল। সন্ধ্যার বিদায়ে হল রাতের আগমন। চাঁদের সাথে দূর আকাশের মিটিমিটি তারাগুলোও যেন জে-এর সাথে এই আয়োজনে দর্শক হিসেবে যোগ দিল।

(চলবে...)

লেখক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।

গত পর্বের লিংক:

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=440839841083593&id=100054727422264&sfnsn=mo

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া