খুনের জাদুকর — পর্ব ২
ইয়াছিন নাইম১১ এপ্রিল ২০২৬৪ মিনিট পড়াসুনসান ফাঁকা বাড়িতে আমি একা থাকলেও সন্ধ্যের পর থেকে একজন বয়স্ক লোক দারোয়ানের দায়িত্ব পালন করে। রাতে কেউ বাড়ির ভেতরে ঢুকতে চাইলে আগে আমাকে ফোন দিয়ে অনুমতি নেয়। আমি সম্মতি দিলে তবেই ভেতরে ঢুকতে দেয়। কিন্তু এই লোকটা এত রাতে অনায়াসে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল কীভাবে? ব্যাপারটা এতক্ষণ মাথায় আসেনি একদম। টেলিভিশনে কোনো এক ধূর্ত খুনি পালিয়ে গেছে সেই খবর দেখতে দেখতে যখন জানতে পারলাম খুনির হাতে হুবহু সেরকমই ট্যাটু আছে যেরকমটা আমার হাতে তখন থেকেই দমবন্ধ লাগছে আমার। তার উপর এত রাতে কেউ আমার বাসায় আশ্রয় নিতে আসা... সব মিলিয়ে এতটাই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম যে, দারোয়ানের কথা মাথায়ই আসেনি। কিন্তু এইবার আমার একটু একটু সন্দেহ হতে লাগল।
বাসার গেট তো ভেতর থেকে লাগানো থাকে। কেউ বাইরে থেকে নক করলে দারোয়ান গেটের ছোট্ট ফাঁক দিয়ে জিজ্ঞেস করে, "কী চাই?"
তারপর আমাকে ফোন দেয়। অমুক আসছে, ভেতরে পাঠাব?আমি যদি হ্যাঁ বলি তবেই কেউ ভেতরে ঢুকতে পারে। অথচ রাতের তিনটা বেজে গেছে। এত রাতে একটা লোক বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল দারোয়ানের কোনো খবর নেই! সে কি আজ ঘুমিয়ে পড়েছে? নাহ্! ঘুমিয়ে পড়লে তো কেউ ভেতরে আসতে পারবে না। কারণ দরজা ভেতর থেকে লাগানো। গেট খোলার কাজ দারোয়ানকেই করতে হবে। তাহলে? ব্যাপারটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াল?
আকাশ-পাতাল ভেবেও কুলকিনারা পাওয়া গেল না। মাথার ভেতর বারবার একইরকম প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল, দারোয়ান আজ অপরিচিত একটা লোককে ভেতরে ঢুকতে দিলো কেন?
নতুন আগন্তুককে একটা ঘর দেখিয়ে দিয়ে করিডোর পেরিয়ে যাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম ওসব। হঠাৎ মনে হলো, আচ্ছা, বৃদ্ধ দারোয়ানটা ঠিক আছে তো?
সহসা বুকের ভেতরটা দপ করে জ্বলে উঠল। আমি স্পষ্ট টের পেলাম, অজান্তেই আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে। পিঠ বেয়ে নেমে যাচ্ছে ঘামের স্রোত। আর একটা তীব্র হাহাকার যেন উথলে উপচে পড়ছে। আচমকা এক তীব্র হাওয়া এসে জানালার কাছের উইন্ডচাইমগুলোয় নাড়া দিয়ে গেল। সেগুলোর টুংটাং শব্দ আমার পুরো দেহে কাঁটা দিয়ে তুলল। কেন জানি মনে হলো, আমার এই একলা বাড়িটা, এই পুরো বাড়িতে অভিসপ্ত কোনো ছায়া পড়েছে। বারবার মনে হতে লাগল, কিছু একটা খারাপ হচ্ছে। খুবই খারাপ হচ্ছে।
ততক্ষণে আমি জানালার একেবারে কাছে চলে গেছি। দোতলায় ছিলাম তাই বাইরের দিকটা আবছা অন্ধকার দেখা যায়। বাইরে প্রচন্ড বাতাস বইছে। ধু ধু হাওয়া যেন পুরো বাড়িটাকে লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে। আশপাশে সামান্য কিছু গাছগাছালি আছে। সেগুলো বাঁকা হতে হতে কোনোরকমে টিকে আছে। আমার দৃষ্টি পড়ল একা দাঁড়িয়ে থাকা আকাশি গাছটার দিকে। সরু এবং লম্বা গাছটা একদিকে বেঁকে একরকম মাটির সাথেই মিশে যাচ্ছে। এতটাই ধুলো উড়ছে যে, মনে হচ্ছে কুয়াশা। এই সবকিছু ডিঙিয়ে আমার দৃষ্টি যখন বাসার মূল গেটের দিকে গেল, তখন আরো একবার কেঁপে উঠলাম আমি। কারণ, ওখানে আমার বাসার দারোয়ান মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে!
মুহূর্তের মধ্যে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল পুরো বাড়িটা। একেবারে কুচকুচে কালো অন্ধকার যেন পুরো বাড়িটাকে গিলে ফেলেছে। তীব্র হাওয়ার ঢেউ পুনঃপুন আছড়ে পড়তে লাগল জানালায়, জানালার পরদায়, আমার চেহারায়।
আলোর অভাবে একহাত দূরের কিছু দেখা যায় না, এমন অন্ধকার আমি আজকের আগে কখনো দেখিনি। অন্ধের মতো এগিয়ে চলা সম্ভব নয় অথচ যে করেই হোক দারোয়ানের কাছে পৌঁছুতে হবে। যেকোনোভাবে পৌঁছুতে হবে। দৃষ্টিহীনের মতো এক পা এগিয়ে যেতেই কী একটায় হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে বেঁচে গেলাম। ঠিক তখনই আবিষ্কার করি আমার নতুন কেনা মোবাইল ফোনটা হাতের ভেতরেই আছে। অথচ ফোনটা আমি ওয়্যারড্রোবের উপরে রেখেছিলাম। এখন সেটা হাতে চলে এল কীভাবে? কাকতালীয়? তবে কি প্রকৃতি আমার সঙ্গ দিচ্ছে? গুড সাইন!
ফ্লাশলাইটের আলোয় যতদূর দেখা যায় ততটুকুই আমার ভরসা। সতর্ক পায়ে একরকম তড়িঘড়ি করে এগোতে লাগলাম। লম্বা ফাঁকা করিডোর পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচতলায় নেমে একটানে মূল দরজা খুলে বেরিয়ে পড়তেই একদলা ধুলো উড়ে এসে আমার চোখের ভেতরে ঢুকে গেল।
দু'হাতে চোখ ঢেকে হাঁটু ভাঁজ করে বসে পড়ি। বাইরে এতটাই হাওয়া বইছে যে, মনে হচ্ছে উঠে দাঁড়ালে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। গাছগুলো বাঁকা হতে হতে কোনোরকমে টিকে আছে। এইসবের মাঝে বারকয়েক চোখ খুলার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। প্রতিবারই আমি অবাক হয়ে গেলাম তবে তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। এত বেশি অন্ধকার, এমন নিকষ কালো রাত, এমন ঝড়, এমন উথালপাথাল হাওয়া সবকিছু মিলিয়ে প্রকৃতি যেন কিছু একটা বলতে চাইছে। অশুভ কিছু!
অনেক্ষণ পর যখন হাওয়া কমে এল তখন দারোয়ানের কাছে এসে তার মুখের উপর ঝুঁকে পড়ি। মানুষটা এখনও কাতরাচ্ছে। তার মুখ দিয়ে সাদা ফেনা গড়িয়ে পড়ছে। লোকটার একটি হাত তার বুকের উপর চেপে রাখা। দ্বিতীয় হাতটি সে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো। সেই হাতে একটা ছোট্ট কাচের শিশি। সেটা হাতে নিয়ে দেখি তাতে লেখা, "পয়জন" বিষ!
তার মানে কেউ তাকে বিষ খাইয়ে দিয়েছে!
"কে আপনাকে বিষ দিয়েছে? কে করেছে এই কাজ?" চিৎকার দিয়ে জিজ্ঞেস করি আমি। লোকটা বিড়বিড় করে কী যেন বলতে লাগল। তার গলার স্বর এতটাই ক্ষীণ যে, তার কণ্ঠস্বর আমি শুনতে পারছি না। তাই তার মুখের কাছে কান এনে শোনবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে, মানুষটার কথা পুরোপুরি বুঝে উঠার আগেই সে শান্ত হয়ে গেল। আমি তার নিশ্চল দেহ আন্দোলিত করে বললাম, "এই যে! শুনুন! শুনুন তো! বলুন, কে আপনাকে বিষ দিয়েছে? কে করেছে এই কাজ?"
একসময় ক্লান্ত হয়ে লোকটার মরদেহের কাছে বসে পড়লাম। মৃত মানুষ কখনো কথা বলে না। এই লোকটাও বলবে না। কোনোদিন না।
কিন্তু একে বিষ দিয়ে মারল কে? কেনই বা এমন করল? তার মৃত্যুর রহস্যের পেছনে কে আছে?
চলবে
[থ্রিলার রাইটিং মানেই ডিফিকাল্ট কিছু। লেখার মাধ্যমে পাঠকের মনের ভেতরে আতঙ্কের ইঁদুর ঢুকিয়ে দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। পাঠক পড়তে পড়তে কেঁপে উঠবে, ভাবতে বসে যাবে, অবাক হয়ে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করবে, "এটা ক্যাম্নে সম্ভব?" এতটা নিখাদ লেখা আমি কবে লিখতে পারব জানি না। কখনো আমার দ্বারা হবে কি না তাও ঠিক করে বলতে পারি না। তবে আমার খুব ইচ্ছে এই কঠিন কাজটাকে সহজ করে দেওয়া। মনে মনে ভাবি, যদি এমন একটি গল্প লিখতে পারতাম যা পড়ে পাঠকের দল এতটাই ভয় পেয়ে যেতেন যে... যাকগে। কেমন লাগছে জানাবেন।
সবার জন্য শুভকামনা।]
মো. ইয়াছিন