নীলচে আলোর খুনিঅতিপ্রাকৃত

নীলচে আলোর খুনি — পর্ব ২

ইয়াছিন নাইম৬ নভেম্বর ২০১৪৪ মিনিট পড়া

আতঙ্কে কপালে ঘাম জমে যায় সাহারার। বুক কাঁপতে থাকে খুব। শব্দ না করে নিঃশব্দে চলে আসে সে। টেলিফোন তুলে নিয়ে দারোয়ানকে ফোন করে। দুবার ফোন করার পরও দারোয়ান ফোন রিসিভ করে না। তৃতীয়বার যখন ফোন দেবে তখনই মনে হয় সাহারার পেছন দিক দিয়ে কে যেন হাঁটছে! সাহারা দ্রুত পেছনে তাকায়। কিন্তু কেউ নেই। একবুক আতঙ্ক নিয়ে এগিয়ে যায় সে। গিয়ে যা দেখে, তাতে গলা শুকিয়ে যায় তার। একফোঁটা ঘাম কপাল বেয়ে নেমে যায়। বুকের শ্বাস যেন ভারী হয়ে আসে ক্রমশ। চোখদু'টো কৌতূহলে সরু হয়ে আসে। বিস্মিত দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে থাকে বাথরুমের খোলা দরজার দিকে। ভেতরে যে মানুষটা ছিল সে নেই! সাহারা দেখতে পায়, বাথরুমের ভেতরে দু'টো চাকু, একটি রিভলবার, কিছু ব্যান্ডেজ, আর একটা পুরনো বাক্স পড়ে আছে। সেগুলোর দিকে তাকিয়েই ছিল সে ঠিক তখনই পেছন থেকে পায়ে হাঁটার আওয়াজ আসে। সাহারা পেছনে ফিরে তাকাবে তার আগেই একটা শক্ত হাত তার মুখ চেপে ধরে। ধস্তধস্তি করে কোনোমতে মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায় সাহারা। কারণ তার মুখ চেপে ধরে আছে তারই বাসার দারোয়ান লতিফ!

লতিফ ভয় পাওয়া গলায় বলে, "চিল্লাবেন না ম্যাডাম। আপনি বিপদে আছেন দেখে মালিকের বাসা থেকে চাবি এনে ঘরে ঢুকেছি। আততায়ী নিশ্চয়ই আপনার ঘরের মধ্যেই আছে।"

লকিফের কথা শুনে শান্ত হয়ে যায় সাহারা। লতিফও মুখ ছেড়ে দেয়। সাহারা বাথরুমের দিকে দেখিয়ে বলে, "দ্যাখুন কত অস্ত্র! বাথরুমের ভেতরেই কেউ একজন লুকিয়ে ছিল। আমি আপনাকে টেলিফোন করে এসে দেখি নেই।"

লতিফ বলে, "কী সাংঘাতিক! আমি এগুলা সরিয়ে রাখি। আপনি কোথাও যাবেন না। আততায়ী আপনার ঘরেই আছে। সাবধান।"

সাহারা নড়ে না। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই টেলিফোন বাজে। সাহারা হেঁটে গিয়ে রিসিভ করতেই এই বিল্ডিংয়ের মালিক বলে উঠেন, "হ্যালো, আপনার অ্যাপার্টমেন্টে নাকি কী একটা ঝামেলা হয়েছে? প্রথম গেটের দারোয়ান রফিক আপনার অ্যাপার্টমেন্টের ডুপলিকেট চাবি নিতে এসেছে। আমি কি চাবি দিয়ে দিব?"

জবাব না দিয়েই টেলিফোনটা নামিয়ে রাখে সে। একটা কথাই তার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে, প্রথম গেটের দারোয়ান যদি এখন ডুপলিকেট চাবি আনতে যায় তবে দ্বিতীয় গেটের দারোয়ান কেন বলল সে মালিকের বাসা থেকে চাবি নিয়ে এসেছে? তবে কি দারোয়ান লতিফ মিথ্যে বলেছে? তবে কি লতিফই সেই খুনি?

আতঙ্কে দ্রুত টেলিফোন তুলে নিতে চাইছিল সাহারা। ঠিক তখনই লতিফ সামনে এসে দাঁড়াল। বলল, "কী করছেন ম্যাডাম?"

"ক-কিছু না। তুমি কেন এসেছ?"

"আমি আপনাকে বাঁচাতে এসেছি ম্যাডাম।" বলেই বিকৃত হাসি দেয় সে। এবং সঙ্গে সঙ্গে ছুরিটা সাহারার গলায় ঠেকিয়ে বলে, "একদম নড়বি না। একটা শব্দও করবি না। চুপচাপ চেয়ারে বোস।"

সাহারা কথামতো চেয়ারে বসে পড়ে। লতিফ সাহারার হাত, মুখ, পা সবকিছু চেয়ারের সাথে বসে অন্য একটি চেয়ার নিয়ে সাহারার মুখোমুখি বসে। বলে, "ওইদিন তোর বান্ধবী আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছিল। তাকে উপরে পাঠিয়ে দিয়েছি। সেদিন আবার তুই ব্যবহার খারাপ করলি। কেন রে? আমি দারোয়ান বলে কি মানুষ না? হ্যাঁ? আমি কি চোর, ডাকাত না সন্ত্রাসী যে তোরা আমার সাথে এমন ব্যবহার করবি? হালাল ইনকাম কইরা খাই। একটু ভালো ব্যবহার করলে কী হয় তগো? হ্যাঁ?"

তুই একটা সাইকো। বলতে যাচ্ছিল সাহারা। কিন্তু তার মুখ বাঁধা। লতিফ ফের বলতে শুরু করে, "তোর স্কুটিতে নাহয় ভুলে একটা দাগ ফালাই দিছিলাম তাই বইলা এমনে গালি দিবি? বাপ মা তুইলা গালি দিছোস তাই আমি মাগি কইছি৷ সমানে সমান। কিন্তু আমি দারোয়ান বইলা তুই আমারে চড় মারলি আর সবাই তোরে সাপোর্ট করল? ক্যান রে? দারোয়ানরা কি মানুষ না? এখন কই তোর সাপোর্টাররা? ডাক দে ওগো। ক তোরে যেন আইসা বাঁচায়। আইবো কেউ?" বলতে বলকে সাহারার সুখ চেপে ধরে বলে, "এই মাগি, আবার গালি দিলাম অহন চড় দে তো। দেহি তোর কত বড়ো কলিজা। দেহি তোরে কে সাপোর্ট করে? দে, চড় দে। দে কইছি!"

সাহারা ধস্তাধস্তি করছিল। লতিফ সাহারার মুখের বাঁধন খুলে দিয়ে বলে, "কিছু কইবি?"

সাহারা ঘনঘন শ্বাস নিতে নিতে বলে, "তুই, তুই একটা সাইকো।"

সঙ্গে সঙ্গে ঠাস করে চড় মেরে চেয়ার সহ মাটিতে ফেলে দেয় লতিফ। চুল ধরে টেনে তুলে বসিয়ে বলে, "অহন তোরে খুন করুম, যেই হাত দিয়া চড় দিছোস, সেই হাত কাটুম, গালি দিছোস তাই জিহ্বা কাটুম। দেখি তোরে কে বাঁচায়।"

বলতে বলতে মেঝেতে রাখা চাকু হাতে তুলে নেয় লতিফ। এদিকে সাহারা যখন টেলিফোনের মাধ্যমে জানতে পেরেছিল দারোয়ান চাবি আনতে গেছে তখনই সে একটা নতুন ব্লেড নিজের হাতের ভেতরে রেখে দিয়েছিল। এতক্ষণ লতিফ এটাসেটা বলছে আর এদিকে আস্তে আস্তে হাতের বাঁধন কেটে ফেলেছে সাহারা। সে খুব দ্রুত লতিফের গাল বরাবর ব্লেড চালিয়ে দেয়। লতিফ কিছু বুঝে উঠার আগেই তার হাতে লাথি মারে। ফলে ছুরিটা পড়ে যায়। সাহারা এক লাফে ছুরি তুলে নেয় এবং বিলম্ব না করে আস্ত ছুরি লতিফের পেটে ঢুকিয়ে দেয়।

রক্তে টাইলস ভরে গেছে। লতিফ মেঝেতে পড়ে পড়ে শেষ নিঃশ্বাস ছাড়ছে। হঠাৎ ডোরবেল বেজে উঠল। সাহারা লতিফকে ঠেলে খাটের নিচে লুকিয়ে কাপড় দিয়ে ফ্লোরের রক্ত মুছে নিল। তারপর ছুটে গেল দরজার দিকে।

দরজা খুলে দেখে দারোয়ান রফিক দাঁড়িয়ে। তাকে দেখে স্বস্তি পায় সাহারা। বলে, "একটা ঘটনা ঘটে গেছে। এতদিন ধরে এই বিল্ডিংয়ে যে খুনগুলো হয়েছে সেগুলো আপনার সহকর্মী, প্রথম গেটের দারোয়ান লতিফ করেছে।"

"কী বলেন ম্যাডাম!" কৌতূহলে ফেটে পড়ে রফিক।

"সত্যি বলছি। সে আমাকে খুন করতে এসেছিল৷ আমি তাকে ছুরি মেরেছি।"

"কী বলেন ম্যাডাম!"

"আরে সত্যি বলছি। বিশ্বাস না হয় নিজের চোখে দেখবে চলো।"

বলে রফিককে নিয়ে ভেতরের ঘরে আসে সাহারা। তখন তার চোখের একটা অদ্ভুত জিনিস ধরা দেয়। সে দেখতে পায়, দারোয়ান রফিকের প্যান্টের পেছনের পকেটে লাইটারের মতো কী একটা রাখা। সেটা থেকে নীল নীল আলো বেরিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে৷ এই আলোটাই তো... তবে কি রফিকও এই খুনোখুনির সাথে যুক্ত আছে?

আতঙ্কে সাহারার ভেতর হিম হয়ে যায়। সে দেখে, রফিক তার দিকে চেয়ে মুচকি হাসছে!

সমাপ্ত

এই গল্প আমি ধোঁআশাই ছেড়ে দিলাম। বাকিটুকু পাঠকরা পূরণ করে নেবেন। সবার জন্য শুভকামনা।

মো. ইয়াছিন

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া