শেষ বিদায়অতিপ্রাকৃত

শেষ বিদায় — পর্ব ২

ইয়াছিন নাইম৩০ অক্টোবর ২০২৪৪ মিনিট পড়া

নোভা ফারহানকে ভালো-টালো বাসে না। একসময় সে ফারহানের সাথে ইমুশনালি ইনভলভ্ ছিল, তা ঠিক। কিন্তু বিয়ের পর ধীরে ধীরে ফারহানকে ভুলে গেছে। বিয়ের প্রায় এক সপ্তাহের মাথায় নোভা সিদ্ধান্ত নিল এ সম্পর্ক আর টিকিয়ে রাখা যায় না। অন্তত আরাফাতের মুখের দিকে চেয়ে...

কিন্তু ফারহানের পাশে কাউকে দেখলে আজো সে সহ্য করতে পারে না। গা জ্বলে যায়। মাথায় রক্ত চেপে বসে। ভিতরে ভিতরে কান্না পায়। ইচ্ছে করে ফারহানকে কোথাও লুকিয়ে রাখতে। যাতে কেউ আর তার কাছে ঘেঁষতে না পারে। কিন্তু তা কী আর সম্ভব! ফারহানের বাবা অসুখের বাহানায় একটা ছেলের বউ আবদার করেন। ক'দিন পরপর নতুন নতুন মেয়ের সাথে ফারহানের মিটিং ফিক্স করেন। যদিও ফারহান কোনো মেয়েকেই পছন্দ করে না। কারণ একটাই, নোভাকে সে আজো ভালোবাসে। পছন্দ না করলেও দেখা করতে যেতে হয় তো! পাশে বসে কথা বলতে হয় তো! এখানেই নোভার যত সমস্যা। ফারহান যতবার কোনো মেয়েকে দেখতে গিয়েছে, নোভা লুকিয়ে লুকিয়ে গিয়েছে তার পিছু পিছু। আড়াল থেকে দেখেছে সব। আড়ালে থেকেই কেঁদেছে। এই লুকোচুরি খেল আর কত কে জানে! হয়তো একসময় ফারহান বিয়েতে রাজি হয়ে যাবে। সে রাজি হয়ে গেলে তাকে আটকে রাখার শক্তি, সামর্থ, যোগ্যতা কিছুই যে নোভার নেই!

রিংটোনের শব্দে ঘুম ভাংল নোভার। ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে বালিশের নিচ থেকে স্মার্টফোন বের করে আনল। কোনোমতে চোখ মেলে তাকাল। স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ফারহানের নাম ভাসছে। সময় একটা পঞ্চান্ন। পাওয়ার বাটন চেপে স্মার্টফোন বালিশের নিচে রেখে শুয়ে পড়ল নোভা। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়া আর হলো না। আরো একবার ফোন বেজে উঠল। নোভা বিছানা ছেড়ে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াল৷ সে জানে, যতক্ষণ ধরা হবে না, ততক্ষণ ফারহান একের পর এক ফোন দিতেই থাকবে।

তৃতীয় বার কল দেওয়ার পর নোভা রিসিভ করল। ওপাশ থেকে, 'নোভা!' গলাটা ভারী। ভাঙা ভাঙা। আর্তনাদ মেশানো তাতে। বুঝা যাচ্ছে, ফারহান কাঁদছে।

নোভা ধীর গলায় বলল, 'এত রাতে কী মনে করে?'

'তুমি আজ আরাফাতের সাথে ফিজিক্যালি অ্যাংগেজ হয়েছিলে?'

নোভা প্রায় চেঁচিয়ে বলল, 'কীঃ! এ কেমন প্রশ্ন, ফারহান?'

'যা জিজ্ঞেস করেছি উত্তর দাও। অ্যাংগেজ হয়েছিলে তো?'

'না।'

'না? মিথ্যে বলছো কেন? তুমি তো মিথ্যেবাদী ছিলে না!'

'আমি মিথ্যে বলছি না।'

'সত্যিটাও বলছো না।'

'তুমি কি কাঁদছো?'

'শুনো, আজকাল আমার কী কয়েছে মাথামুন্ডু কিছুই বুঝি না। বিশ্বাস করো, আমি আর আগের মতো স্বাভাবিক নই। ধীরে ধীরে দূর্বল হয়ে পড়ছি।'

'জানি।'

'তোমার পাশে আরাফাতকে আমি মানতে পারি না। তুমি আমার হবে এটা আমি কখনোই ভাবি না। কিন্তু তুমি অন্য কারোর হও, এটাও আমি মানতে পারি না। হাস্যকর হলেও এটাই সত্যি। বুঝতে পারছো?'

'হুঁ।'

'এবার বলো।'

'কী বলব?'

'আরাফাতের সাথে অ্যাংগেজ হয়েছো?'

'দেখো, তুমি যতবার এই প্রশ্ন করবে ততবার আমার জবাব হবে "না"। তাছাড়া আরাফাত আমার স্বামী..'

'স্বামী হিসেবে আমি যোগ্য ছিলাম না কেন, নোভা? আরাফাতের মতো অর্থ ছিল না বলে? কিন্তু এখন তো আমার অ্যাকাউন্টে বিশাল অঙ্কের টাকা পড়ে আছে। এখন তো আমি যোগ্য, তাই না?'

'পাগলের মতো কথা বলছো কেন, ফারহান?'

'আমি তো পাগলই। পাগল হয়েছি। সত্যিই পাগল হয়ে গেছি। তুমি আরাফাতের পাশে শুবে না। বুঝতে পেরেছো? তুমি আরাফাতের পাশে শুবে না।'

নোভা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'রাখি?'

টুট টুট শব্দ করে কল কেটে গেল। নোভা দু'হাত দিয়ে চোখের জল মুছে শোবার ঘরের দিকে পা বাড়াল।

জানো, ইদানীং আমি কেমন যেন হয়ে গেছি। এমন হলেই কি লোকে পাগল বলে? কিন্তু পাগল তো নিজেকে পাগল বলে স্বীকার করে না। কিন্তু আমি করছি। তার মানে কি আমি সত্যিকারের পাগল নই?

তোমাকে একটা ঘটনা বলি। গত শুক্রবারে রাস্তা দিয়ে আনমনে হাঁটছিলাম। পড়ন্ত বিকেল৷ ছুটির দিন হওয়ায় বিকেল পড়তেই লোকজন ঘুরতে বেরিয়েছে। কেউ একা। কেউ বন্ধু বান্ধবের সাথে। কেউ স্ত্রী কিংবা প্রেমিকার সাথে। হঠাৎ একজোড়া মানুষের দিকে আমার নজর পড়ল। দু'জনে হাঁটু ভাঁজ করে ঘাসের উপর বসে আছে। পিছনের দিক থেকে ছেলেটাকে চেনা যাচ্ছিল না তবে মেয়েটাকে আমি চিনে ফেললাম। সেটা আর কেউ না, স্বয়ং তুমি। আমার মাথায় রাগ চেপে গেল। এতটাই রাগ চাপল, রাস্তায় পড়ে থাকা ইট হাতে তুলে নিলাম। ছুটে গেলাম তাদের কাছে। একটুর জন্য ছেলেটার মাথায় আঘাত করতাম। কিন্তু মেয়েটি তার আগেই ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। আমি বিস্মিত হলাম। ওটা আসলে তুমি ছিলে না। মেয়েটার গায়ের রং তোমার মতো ফরসা না৷ শ্যামলা বর্ণের। মোটা, খাটো। গাঢ় রঙের জামা পরেছিল। তুমি তো গাঢ় রং পছন্দ করো না। মেয়েটার সাথে তোমার কোনো কিছুই মিল নেই। তবুও কেন তোমাকেই মনে করলাম বলো তো!

নোভা, আমি খুবই দুঃখিত। দুঃখিত এজন্য যে, তোমাকে এমন একটা প্রশ্ন আমি জিজ্ঞেস করেছি। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম তুমি আরাফাতের বিয়ে করা বউ। আরাফাত খুব ভালো মানুষ। স্মার্ট, ভদ্র। তার সাথে আমার কোন শত্রুতা নেই। তবু কেন জানি তাকে আমার হিংসে হয়। খুব হিংসে হয়। জেলাসি, বুঝো তো! হিঃ হি।

জানো, আজ একটা স্টেশনারি দোকান থেকে ডায়েরিটা কিনেছি। ভেবেছিলাম, তোমায় নিয়ে যত ভাবনা সব এই ডায়েরিতে লিখে রাখব। তারপর একসময় ডায়েরিটা তোমার হাতে তুলে দেব। কিন্তু আমি স্যরি। আ'ম রিয়্যেলি রিয়্যেলি স্যরি। স্যরি এজন্য, হয়তো আজকের পর ডায়েরিতে লেখা হবে না৷ হয়তো এই ডায়েরি তোমার হাতে তুলে দেওয়ার সৌভাগ্য আমার হবে না। হয়তো আজকেই আমার জীবনের শেষ রাত। আবারো আমি স্যরি। জানো নোভা, আমি আজ ঘুমের ওষুধ খেয়েছি। তোমাকে আমি বলতাম, ওষুধ আমার পছন্দ না। আমার শরীর ভীষণ খারাপ করলেও আমি ওষুধ খাই না। কিন্তু এই দেখো, শেষমেশ এই ওষুধের সাহায্যে আমি মুক্তি পেতে চলেছি। ক'টা ট্যাবলেট খেয়েছি, তা জানি না। তবে সবগুলো ঘুমের ট্যাবলেট এটা শিওর। নোভা, আমি চোখে ঝাপসা দেখছি। হাত কাঁপছে। পেটের ভেতর কেমন যেন করছে। আর পারছি না৷

ডায়েরিটা ভাঁজ করে টেবিলের উপর রেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল নোভা। চোখের জল গাল বেয়ে টপটপ করে পড়ছে। সামনের সোফায় বসে থাকা পুলিশের পোশাক পরে থাকা লোকটি টিস্যু পেপার এগিয়ে দিয়ে বললেন, 'লাশ ফ্লোরে পড়ে ছিল। ডায়েরিটা টেবিলের উপর৷ ধারণা করা হচ্ছে চেয়ারে বসে লিখতে লিখতেই তিনি চেয়ার সহ পড়ে যান। তারপর...

সমাপ্ত

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক : https://www.facebook.com/107969461087579/posts/174231057794752/

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া