মাইন্ড ট্রাভেলঅতিপ্রাকৃত

মাইন্ড ট্রাভেল — পর্ব ৩

ইয়াছিন নাইম২৬ ডিসেম্বর ২০২৪৫ মিনিট পড়া

দ্বিতীয় দিন।

পৃথিবীর সময়ে কেটে গেছে প্রায় এক ঘন্টা। আর এখানকার সময়ে এক দিন। আর মাত্র তেইশ দিন সময় আছে আমার হাতে। তেইশ দিনের মধ্যে চাবি খুঁজে বের করতে হবে। যদি না পাই, বন্ধ হয়ে যাবে নিঃশ্বাস। আর ফিরে যাওয়া হবে না পৃথিবীতে।

কিন্তু আমার এতসব ইচ্ছে?

বাবাকে কারাগার থেকে মুক্ত করব। মা'কে সরাসরি এক নজর দেখব। পৃথিবীর সতেজ বাতাসে প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নেব। আর একজন গায়ক হব। যাকে সবাই চিনবে, জানবে। এসবের কিছুই যে পূরণ হবে না!

আচ্ছা, আমার দেহটা কি এখনও বাবার ল্যাবে পড়ে আছে? ল্যাবের বাইরে যার পায়ের শব্দ শুনেছিলাম, সে-ই বা কে? চোর, পুলিশ, দাঁড়োয়ান না কি অন্য কেউ? বাবা জেল থেকে পালিয়ে আসেনি তো? যে-ই হোক, ল্যাবে এলে এতক্ষণে হয়তো আমার দেহটা ফ্লোরে পড়ে থাকা অবস্থায় পেয়ে গেছে। কী হচ্ছে এখন আমার সাথে? আমাকে কি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে?

শুনেছিলাম, সময় ও নদীর শ্রোত কারো জন্য থেকে থাকে না। এখনও তাই হচ্ছে। ঘড়ির কাটা আপনমনে টিক টিক করে এগিয়ে চলেছে। তা চলুক, আমি তো নিজের মস্তিষ্কে ঘুরে বেড়াচ্ছি। যা যা ভেবে রেখেছিলাম, তাই তাই হচ্ছে। এখন আমি চাইলেই কি সময় থামিয়ে দিতে পারি না?

বাবা উকিলের পোশাক পরে বেরোতে যাচ্ছিলেন। আমি পথ আটকে দাঁড়ালাম, 'চাবি কোথায় বাবা?'

'আমার বালিশের নিচে রাখা আছে।' বাবা সহজভাবে বললেন।

'উফ, এই চাবি না। টার্ডে ক্যাপসুলের পরবর্তী ধাপ। পৃথিবীতে ফিরে যাবার চাবি। ওটা কোথায় আছে?'

'কী আবুল-তাবুল বলছিস? মাথা গেছে নাকি তোর! যা মুখ ধুয়ে খেতে আয়। টেবিলে খাবার রাখা আছে।'

মুখ ধুয়ে এসে দেখি বাবা নেই। টেবিলে খাবার সাজানো। লম্বা হাই তুলে বললাম, 'চা কোথায় আমার?'

কোনো সাড়া শব্দ পেলাম না। অবশ্য চা আমার একদম ভালো লাগে না। রিয়্যেল লাইফে প্রতিদিন সকালে খেতে হত। বাবা ঘুম থেকে উঠেই চা বানাতেন। নিজের জন্য এক কাপ আর আমার জন্য এক কাপ। সেই থেকে অভ্যেস। ভালো লাগত না, তবুও খেতাম। বাবাকে খুশি করার জন্য। বাবা খুশি হতেন না। তার গম্ভীর ভাব কাটত না কখনো।

টেবিলে সাজিয়ে রাখা খাবার ফেলে রেখে বাইরে বেরিয়ে এলাম। এক চিলতে রোদ সোজা বারান্দায় এসে পড়েছে। পাখির কিচিরমিচির ডাক শোনা যাচ্ছে। গতকাল অন্ধকারের জন্য ভালো করে দেখতে পারিনি, আজ দেখছি। আমি যেখানটায় দাঁড়িয়ে আছি এরকম আরো অসংখ্য পাহাড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চারদিকে। সবগুলো পাহাড় একা একা দাঁড়িয়ে আছে। বড় নির্জন, শান্ত।

পাহাড়ের ঢাল বেয়ে যখন মূল সড়কে পা রাখলাম, তখনই একদল ছেলে-মেয়ে আমাকে ঘিরে ফেলল। সবাই একসঙ্গে এমনভাবে তাকাচ্ছিল আমার দিকে, মনে হচ্ছিল এলিয়েন দেখছে। একজন জিজ্ঞেস করল, 'আপনি মিরাজ ভাইয়া না?'

আমি কৌতূহলী ভঙ্গিতে বললাম, 'হ্যাঁ, আপনারা আমাকে চেনেন?'

মুহূর্তেই অট্টহাসিতে মেতে উঠল সবাই। আঠারো-উনিশ বছর বয়েসী একটি মেয়ে লাজুক হেসে বলল, 'আপনাকে তো সবাই চেনে।'

অপর একটি মেয়ে বিনীতভাবে বলল, 'একটা গান গেয়ে শুনান ভাইয়া, প্লিজ।'

আমি বললাম, 'আমি তো গান গাইতে পারি না।'

আরো একবার হাসতে লাগল তারা। একজন বলল, 'দেশের নামকরা গায়ক হয়ে বলছেন, গান গাইতে পারেন না! ভাইয়া, আপনি যতই বাহানা করুন, গান না শুনে আমরা আপনাকে ছাড়ছি না।

সবাই একসঙ্গে হ্যাঁ বলে সম্মতি জানাল।

এক পর্যায়ে গিটার সঙ্গে আনিনি বাহানা করে কোনোমতে পালিয়ে এসেছি। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছি, গায়ক হবার ইচ্ছেটাও পূরণ হয়ে গেল। তবে কি সব ইচ্ছেই পূরণ হতে চলেছে?

বাসায় ফিরে এসে টেবিলের ড্রয়ার থেকে এমপি থ্রি ডিভাইস আর হেডসেট নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমার কল্পনার সেই মেয়েটিকে এগুলো ফিরিয়ে দিতে হবে। একবার ভাবলাম, হেডসেট কানে দিয়ে শুনি কী আছে এতে। পরক্ষণেই মনে হলো, কী দরকার অন্যের জিনিস অনুমতি ছাড়া...

পুকুরপারে এসে যখন বসলাম, সূর্য মাথার উপর চলে এসেছে। এভাবেই ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে সময়। অথচ, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। পৃথিবীতে ফিরে যাবার চাবি খুঁজে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। বাবা তো সাফ মানা করে দিয়েছেন, তিনি কিছু জানেন না। তাহলে কে জানে? কার কাছে আছে সেই চাবি? কোথায় রাখা? দেখতে কেমন সেটা?

বসে থাকতে থাকতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। মেয়েটি এল না। আজ আমি প্রস্তুতি নিয়ে এসেছি। ভালো কাপড় পরে, চুল ঠিক করে, তৈরি হয়ে এসেছি। তাই হয়তো সে আসছে না। প্রিয় মানুষরা অসময়ে কেন আসে বলতে পারেন? আমিও জানি না।

মনে মনে ভেবেই নিয়েছিলাম, সে আসবে না। আমার ভাবনা মিথ্যে করে দিয়ে সে এল। ধীর পায়ে এসে চুপটি করে বসল আমার পাশে। বাঁশের মাচায় বসে গতকালের মতো পা ডুবাল পুকুরের জলে। কয়েকবার পা নেড়ে শান্ত জলে ঢেউ তুলে দিয়ে আমার দিকে তাকাল৷ আমি পকেট থেকে এমপি থ্রি ডিভাইস বের করে দিলাম। সে হাতে তুলে নিয়ে বলল, 'সবগুলো গান শুনে ফেলেছেন?'

আরো একবার মিথ্যে বললাম, 'হ্যাঁ, সবগুলো শুনেছি। সব ক'টা আমার প্রিয়।'

মেয়েটি আরো একবার পুকুরের জলে পা নেড়ে বলল, 'কিন্তু এই ডিভাইসে কোনো গান নেই।'

মনে মনে বিড়বিড় করে নিজেকে গালি দিতে লাগলাম, 'কেন অযথা মিথ্যে বলতে গেলি? তুই সত্যিই একটা গাধা, আস্ত একটা গাধা।'

'কিছু বললেন?' মেয়েটি উদাসীন ভাবে জিজ্ঞেস করল।

'আপনার নাম কী?'

মেয়েটি আমার প্রশ্ন অগ্রাহ্য করে উঠে দাঁড়াল। চলে যাবার আগে একটি কথাই শুধু বলল, 'আপনি গান গেয়ে বিনোদন দিচ্ছেন। আর আপনার বাবা একের পর এক মানুষ খুনের সাথে জড়িত। ব্যাপারটা কেমন না?'

মানুষ খুন! এমন কিছু তো কল্পনা করিনি। তাহলে?

রাতে খাবার; টেবিলের একপাশে বাবা অপর পাশে আমি। অনেক চেষ্টা করেও মানুষ খুনের ব্যাপারটা বাবাকে জিজ্ঞেস করতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করে ফেললাম অন্য একটা প্রশ্ন, 'বাবা, তোমার ওকালতি কেমন চলছে?'

বাবা কুৎসিত ভঙ্গিতে বললেন, 'আর ওকালতি। আজকাল মক্কেল পাই না রে!'

'মক্কেল কী জিনিস, বাবা?'

'ক্লায়েন্ট।'

'ওঃ! তার মানে একটাও কেস নেই তোমার হাতে?'

'আছে এক সাইকো কেস।'

'সাইকো বলছো কেন বাবা?'

'এক সাইকো কিলার। পাঁচ খুনের অভিযোগে জেলে বন্দি করা হয়েছে। জেলে বসে বসে আরো দু'টো খুন করেছে।'

'জেলে বসে খুন করছে!' আমি চমকে উঠলাম।

'করছে তো। আমার তো মনে হয়, ব্যাটা কালো জাদু রপ্ত করেছে। নাহলে জেলে বসে বসে মানুষ খুন করবে কীভাবে?'

'তুমি তার কেস লড়ছো, বাবা?'

'লড়ছি। এ ছাড়া কী করার আছে? মক্কেল যে একটাও নেই।'

'আচ্ছা, তুই কী যেন একটা চাবির কথা বলছিলি। সেটা খুঁজে পেয়েছিস?' বাবা নিজে থেকে জিজ্ঞেস করলেন।

'পাইনি। হয়তো পাব না।' বলে শোবার ঘরে চলে এলাম। ভাবছি চাবি খুঁজব না কি সাইকো কিলারের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করব? সেই মেয়েটিই বা কী বলে গেল আমাকে? এদিকে চাবিটাও যে খুঁজে পাওয়া খুব দরকার৷ যত সময় যাচ্ছে, বেঁচে থাকার ইচ্ছে ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। শেষমেশ ফিরে যেতে পারব তো পৃথিবীতে?

(চলবে)

মো. ইয়াছিন

[গল্পের পুরো অংশ কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে তুলনা করবেন না। মাইন্ড ট্রাভেল অর্থাৎ মন ভ্রমণ না বলে সরাসরি মস্তিষ্ক ভ্রমণ বলেছি, এরও একটি কারণ আছে।]

গত পর্বের লিংক : https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=226397662527813&id=100054727422264

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া