মাইন্ড ট্রাভেলঅতিপ্রাকৃত

মাইন্ড ট্রাভেল — পর্ব ৭

ইয়াছিন নাইম২ জানুয়ারি ২০২৫৪ মিনিট পড়া

এত বড় প্রাসাদ!

সূর্যের আলো নিভে ধীরে ধীরে অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। এই মুহূর্তে আমার চিৎকার শুনে উড়ে গেল এক ঝাঁক পাখি। বিশাল প্রাসাদের ফটকে খুদাই করে লেখা, দি মাইন্ড ট্রাভেলার।

'হ্যালো, এনিবাডি হোওম?' চারপাশের দেয়ালে বাধা পেয়ে ছড়িয়ে পড়ল কথাটা।

'টিক টিক টিক' একটা টিকটিকি বলল। যাক, একটা টিকটিকি আছে অন্তত! কাঠের দরজায় হাত রাখদেই খচখচ শব্দ করে খুলে গেল। মাথার উপর দিয়ে আরো এক ঝাঁক পাখি উড়ে গেল। এতক্ষণে বাইরের অন্ধকার গাঢ় হয়ে এসেছে। প্রাসাদের ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। টর্চ মেরে যতদূর বুঝলাম, পুরো প্রাসাদ মাকড়সার দখলে। দু'পা এগিয়ে যেতেই মাকড়সার জাল মুখে পেঁচিয়ে গেল। চোখ বন্ধ করে মুখ থেকে মাকড়সার জাল সরাচ্ছিলাম। খচখচ শব্দ শুনে পেছনে তাকিয়ে দেখি প্রাসাদের দরজা আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমি ছুটে গেলাম। কিন্তু দরজার সামনে পৌঁছার আগেই দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। ধাক্কা দিলাম, লাথি মারলাম, শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে টানলাম। কিন্তু না। দরজা খুলা সম্ভব হলো না। অবশেষে ক্লান্ত দেহ নিয়ে মাটিতে বসে পড়লাম। এবার কী হবে!

'হেল্প।' জোরে চিৎকার দিতেই প্রাসাদের ভেতরে আলো জ্বলে উঠল। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, আশপাশে কোথাও বাতি দেখছি না। অথচ ঝলমলে আলোয় আলোকিত চারপাশ। এ কোথায় এলাম আমি? আচ্ছা, প্রাসাদটা কি আমার কথা শুনছে? নাহলে সাহায্য চাইতেই আলো জ্বেলে দিলো কেন?

উঠে দাঁড়িয়ে এক পা এগোতেই পুরো প্রাসাদ জুড়ে শব্দ ভেসে এল, 'ইউ আর ট্রাভেলিং অন ইয়োর মাইন্ড।'

আমি বিস্মিত হলাম। প্রাসাদ কথা বলছে! যখন আরো একটু এগিয়ে গেলাম, মাকড়সার জাল অদৃশ্য হয়ে যেতে লাগল। ধুলো জমা সব আসবাবপত্র পরিষ্কার হয়ে যেতে লাগল। যতই এগোচ্ছি ততই পরিষ্কার হচ্ছে। চারপাশের আসবাবপত্র নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে যেন।

'আউচ!'

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছি। একজন ডাক্তার আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। কিছুটা দূর থেকে একজন পুলিশ অফিসার আমার দিকে তাকাচ্ছেন। আমাকে অক্সিজেন দেওয়া হয়েছে।

এক মিনিট! একটু আগে পৃথিবীতে ফিরেছিলাম কি?

আরো ভালো করে মনে করার চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ, ঠিকই। হ্যান্ডকাপ লাগিয়ে বিছানায় শুইয়ে রাখা হয়েছে আমাকে। তবে একটা ভুল। আমাকে যে ঘরে রাখা হয়েছে সেখানে ডাক্তার নেই। একজন নার্স দাঁড়িয়ে আছে।

কিন্তু আমি পৃথিবীতে ফিরে গেলাম কীভাবে?

পায়ের কাছে ছেঁড়া বৈদ্যুতিক তার পড়ে আছে। ওখানেই পা রেখেছিলাম কি? ইয়েস, ইয়েস। তার মানে বৈদ্যুতিক শক খেয়ে পৃথিবীতে ফিরেছিলাম। আরেকবার ওটা স্পর্শ করব কি? না না। প্রাণ যেতে পারে। কোনো রকম ভুল করা যাবে না। এগিয়ে যেতে যেতে থমকে দাঁড়ালাম। একটা বুক শেলফ। বিশাল বড়। তাকে তাকে বই রাখা। জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত যতগুলো বই পড়েছি, সব রাখা আছে এখানে। এমনকি পত্রিকা, ম্যাগাজিন সব ভাঁজ করে রাখা আছে। সবগুলো আমি পড়েছি। তবে বইগুলোর কিছু কিছু পৃষ্ঠা নেই। বুঝতে কিছুটা সময় লাগল, যেসব পৃষ্ঠা পড়িনি, সেগুলো নেই।

দেখতে দেখতে বাঁ দিকে ফিরে তাকিয়ে দেখি, অচেনা সেই মেয়েটি পিটপিট করে আমাকে দেখছে। আমি চমকে উঠে বললাম, 'আপনি এখানে!'

মেয়েটি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, 'আমি এখানেই থাকি।'

'তাই নাকি! এত বড় প্রাসাধে থাকেন এটা আগে বলেননি কেন?' আমি জিজ্ঞেস করলাম।

'কারণ এর আগে আপনার সাথে দেখা হয়নি।'

'হা-হা-হা! রসিকতা করছেন?'

'আমি রসিকতা করি না।'

'আপনি বলছেন, এতদিন যার সাথে আমার দেখা হয়েছে সেটা আপনি নন। রাইট?'

'হ্যাঁ।'

'তাহলে আপনি কে?'

'আপনি যদি কাউকে ভালোবাসেন, সেটা আমি। যদি কাউকে বিয়ে করেন, সেটাও আমিই হব।'

'ওমা তাই নাকি!'

'হ্যাঁ। আমি আপনার মস্তিষ্কে থাকা সেই মেয়ে। পৃথিবীতে থাকাকালীন আপনি যাকে কল্পনা করতেন।'

'তাহলে এতদিন যে মেয়েটির সাথে আমার দেখা হয়েছে, সে কে?' আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

'জানি না।'

'আচ্ছা, আপনিই তো আমার কল্পনায় থাকা সেই মেয়েটি। তাই না?'

'হ্যাঁ।'

'তাহলে তো আমার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানার কথা।'

'যতটুকু জানার প্রয়োজন, ততটুকু জানি।'

'টার্ডে ক্যাপসুল খেয়ে মস্তিষ্কে ঘুরছি। সেটা জানেন তো?'

'হ্যাঁ, জানি।'

'মাইন্ড ট্রাভেলারের চাবি কোথায়, জানেন?'

'না।' মেয়েটি নিতান্ত সহজ গলায় বলল।

'প্রয়োজনের জিনিসটাই জানেন না! আচ্ছা, এটা বলুন, এই প্রাসাধটা তো আমি দেখিনি কখনো। কল্পনাও করিনি। তাহলে আমার মস্তিষ্কে এই প্রাসাদ এল কীভাবে?'

'এই প্রাসাদটাকে আপনার মস্তিষ্কের স্টোর রুম ধরে নিতে পারেন।'

'মস্তিষ্কের আবার স্টোর রুম আছে!' আমি তাচ্ছিল্য করে বললাম।

মেয়েটি সহজভাবে বলল, 'আছে।'

'এবার বলুন, গত ক'দিন আমার সাথে যে মেয়েটির দেখা হয়েছে, দেখতে হুবহু আপনার মতো। সেই মেয়েটি এখন কোথায় আছে?'

'আপনার বাসায়।'

'কীঃ! আমার বাসায় কী করছে?'

'জানি না।'

'কী জানেন তাহলে?'

'সেই মেয়েটি খুন হতে চলেছে।'

'মানে! ওঁকে কে খুন করবে?'

'আপনার বাবা। আপনার বাবা কিছুক্ষণের মধ্যেই মেয়েটিকে খুন করে ফেলবেন। মেয়েটির হাতে খুব বেশি সময় নেই। চব্বিশ, তেইশ, বাইশ...'

'হেই, স্টপ স্টপ। থামুন।'

'আমি থেমে গেলেও আপনার বাবা থামবেন না।' রোবটের মতো দাঁড়িয়ে থেকে নিতান্ত সহজ গলায় বলল কথাটা।

'একটা মেয়ে খুন হতে চলেছে অথচ আপনি এত সহজ ভাবে বলছেন! আপনি মানুষ না পাষাণ?'

'এসবের কিছুই না। আমি আপনার কল্পনার এক চরিত্র মাত্র।'

'সেই মেয়েটিকে কীভাবে বাঁচাতে পারি?'

'জানি না।'

'সেই মেয়েটিকে বাঁচাতে চাই। আপনি কি আমাকে সাহায্য করতে পারবেন?'

'না।'

আমি দৌড়ে বেরোতে যাচ্ছিলাম। তখনই মেয়েটি বলল, 'দাঁড়ান। আপনি ওই মেয়েটিকে বাঁচাতে পারবেন না। ওদিকে গেলে আপনিও খুন হতে পারেন। এরচে' আপনি মাইন্ড ট্রাভেলারের চাবি খুঁজুন। কাজে লাগবে।'

মেয়েটির কথা উপেক্ষা করে ছুটে এলাম। বন্ধ দরজার সামনে এসে 'ওপেন দ্য ডোর!' বলতেই দরজা খুলে গেল। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে না থেকে বেরিয়ে এলাম। প্রাসাদের দরজা খচখচ শব্দ করে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মেয়েটি প্রাসাদের ভেতর থেকে বলছে, 'এভাবে চলতে থাকলে চাবি পাবেন না..'

(চলবে)

মো. ইয়াছিন

[গল্পের পুরো অংশ কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে তুলনা করবেন না। মাইন্ড ট্রাভেল অর্থাৎ মন ভ্রমণ না বলে সরাসরি মস্তিষ্ক ভ্রমণ বলেছি, এরও একটি কারণ আছে।]

গত পর্বের লিংক :

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=230807222086857&id=100054727422264

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া