অপয়া — পর্ব ২
ইয়াছিন নাইম৯ জানুয়ারি ২০২৫৪ মিনিট পড়ামা যখন ছ'মাসের অন্তঃসত্ত্বা, লীনার বাবা নিখোঁজ হয়েছিলেন। তারপর আর ফিরে আসেননি। তার লাশ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। লীনা লোকমুখে শুনেছে, শেষ ক'টা দিন মা দুয়ারে বসে ছটফট করত। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বসে থাকত বাবার অপেক্ষায়। বাবা ফিরলেন না। ঝড় বৃষ্টির দিনে অন্ধকার রাতে জন্ম হলো লীনার। সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। তিনদিন পর হঠাৎ মা'র গায়ে জ্বর আসে। সেদিন রাতেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। লীনা হয়ে যায় এতিম। ছোটোচাচা চার দিনের বাচ্চা শিশু লীনাকে কোলে করে নিয়ে আসেন। তিনিই তাকে কোলেপিঠে করে বড় করেছেন। পড়াশোনা করিয়েছেন। খাইয়েছেন, পরিয়েছেন। চাচীও তাকে স্নেহ করতেন। ভালোবাসতেন। চাচাতো ভাই অনিক। সে-ও৷ কিন্তু তার ভালোবাসা ছিল অন্যরকম। লীনা বুঝেনি। বুঝতে পারেনি কখনো। অজান্তেই অনিকের প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ে। যা ছোটোচাচা আন্দাজ করতে পারেন। অনিককে কিছু জিজ্ঞেস না করেই বিয়ে ঠিক করে ফেলেন। বিয়েটা স্বাভাবিক ভাবেই হয়ে যায়। এ পর্যন্ত ঠিক ছিল। তারপর...
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় লীনা।
ততক্ষণে আড্ডার আসর জমেছে। কিছুক্ষণ পর পর লিভিং রুম থেকে ছোটোচাচার হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে। লীনা এগিয়ে যায়। ছোটোচাচার পাশে বসে। চোখ তুলে তাকায়। ওপর পাশে বসে থাকা লোকটার উপর চোখ পড়তেই অস্বস্তি ভর করে। তীব্র হতাশা নিয়ে সে বসে থাকে। লোকটার ডান পাশে একজন ভদ্রমহিলা বসে আছেন। তিনিই আগ বাড়িয়ে বলেন, 'তোমার প্রথম স্বামী কীভাবে মারা গেছে?'
লীনার গা জ্বলে যায়। সে দ্রুত জবাব দেয়, 'মরেনি। বেঁচে আছে। এবং সুস্থ আছে।'
বরপক্ষের সামনে কনের এমন আচরণ দেখে তিনজনেই চমকে উঠে। ছোটোচাচা বর আর ওই ভদ্রমহিলা। লীনা বড় বড় নিঃশ্বাস ছেড়ে চুপচাপ বসে থাকে।
কিছুটা সময় পর ভদ্রমহিলা বলেন, 'তোমার বয়স কত?'
লীনা ফুঁসতে ফুঁসতে বলতে চায়। তার আগেই ছোটোচাচা বলেন, 'পঁচিশ।'
ভদ্রমহিলা কুটিকুটি হয়ে বলে, 'এই দ্যাখো, বরের বয়স পঞ্চাশ কনের পঁচিশ। একদম মিলে যায় দেখছি!'
লীনা চেয়ে দেখে। লোকটার বয়স সত্যি সত্যি পঞ্চাশ তো? একটু বেশিও হতে পারে। তেপ্পান্ন কিংবা পঞ্চান্ন। লোকটা হেলান দিয়ে বসে আছে। গোলগাল ভুঁড়ি শার্টের উপর দিয়ে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। মাথায় চুল নেই বললেই চলে। চোখদু'টো টকটকে লাল। গলায় রুপার চেন। পরনে হলুদ রঙের ফতুয়া। লোকটার চোখে চোখ পড়তেই লীনা ইতস্তত করে দৃষ্টি নিচে নামায়।
ট্রে'তে করে চা নিয়ে আসে রিমি। সবাইকে চা দিয়ে আবার চলে যায়। ভদ্রমহিলা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলেন, 'আমার ভাই'টা খুব ভালো। নম্র, ভদ্র। জায়গা-জমির ব্যবসা করে। মোটা টাকা কামায়। টাকা পয়সার ব্যাপারে আপনাদের মেয়ে সুখেই থাকবে।'
ছোটোচাচা বরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, 'আপনার আগের স্ত্রী কোনো রকম ঝামেলা করবে না তো?'
ভদ্রমহিলা না না করে বলেন, 'কীসের ঝামেলা? ওই বেটিকে লিগ্যালি ডিভোর্স দিয়েছে আমার ভাই। টাকা পয়সা যা পাওনা ছিল মিটিয়ে দিয়েছে...'
ছোটোচাচা ভ্রু কুঁচকান, 'মেয়েটার কি অন্য কারো সাথে...'
ভদ্রমহিলা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে পায়ের উপর পা তুলে বলেন, 'তেমন কিছু না। হয়েছে কি, আজকালকার মেয়েরা সম্মান দিতে জানে না। এতকাল আমরা জেনেছি, স্বামী গুরুজন। তাকে সম্মান দিতে হয়। কিছু বললে তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হয়। অথচ এখনকার মেয়েরা সম্মান দেওয়া দূরে থাক, উল্টো অসম্মান করে বসে। আচ্ছা, আপনিই বলুন, আমার ভাইটাকে দেখে কি খারাপ লোক মনে হয়?'
ছোটোচাচা ঠোঁটে আঙুল রেখে আমতা আমতা করেন। ভদ্রমহিলা আবারো বলতে শুরু করে, 'সে মাঝেমধ্যে একটু আধটু নেশাপানি করে। তাও সামান্য একটু। পুরুষ মানুষ। করতেই তো পারে। তাই না?'
ছোটোচাচার অবাক হয়ে বলেন, 'উনি নেশা করে?'
ভদ্রমহিলা বিনিত ভঙ্গিতে বলেন, 'মাঝে মাঝে একটু আধটু পানি গিলে ফেলে। ওই আরকি। তাই বলে তুই তার সামনে থেকে ওসব নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিবি?'
'কে ফেলেছে?' ছোটোচাচা বলেন।
'ওঁর প্রথম বউ। কী জেদি মেয়েরে বাবা!'
'তারপর কী হলো?'
'তারপর আর কী হবে! আমার ভাই বেটির চুল ধরে ঘর থেকে বের করে দিলো। তা-ও কী সাহস। সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ফিরে এসে ব্যাগ গুছাতে শুরু করে। সে নাকি বাপের বাড়ি চলে যাবে!'
'তারপর চলে গেল?'
'শুধু কি গেল? পুলিশ কেসও করেছিল আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে।'
'আপনার ভাই মেয়েটিকে মেরেছিলেন কি?'
ভদ্রমহিলা আমতা আমতা করে বলেন, 'হ্যাঁ, শিক্ষা একটু দিতেই হত...'
ছোটোচাচা লীনার গালে আলতো করে হাত রেখে বলেন, 'আমার লীনার গায়েও হাত তুলবে উনি?'
ভদ্রমহিলা মৃদু হেসে বলেন, 'কী যে বলেন! এমন লক্ষ্মী মেয়ের গায়ে হাত তুলা যায়?'
ছোটোচাচা উঠে দাঁড়ান। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, 'আপনারা আসতে পারেন।'
তারপর ওঁরা চলে যায়। লীনা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। ছোটোচাচা বলেন, 'চিন্তা করিস না, মা। এমন অমানুষের হাতে তোকে তুলে দেব না।'
তারপর কেটে যায় সময়। নেমে আসে রাত। নিঃশ্বাস ভারী হয়। আবারো চোখের কোণে জল জমতে থাকে। মনের গহীনে ভেসে বেড়ায় হাজারো প্রশ্ন। কেন চলে গেল সে? কেন? ভালো যদি না-ই বাসে, বিয়ে করল কেন? বাবাও কি একই কারণে মাকে ছেড়ে গিয়েছিলেন?
লীনার মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি একবার অনিক ফিরে আসত, তার পায়ের কাছে বসে পড়ত সে। বলত, 'কেন ছেড়ে গেলে তুমি? আমি তো কখনো কোনো ভুল করিনি। তাহলে কেন? আর এই পরিবার, এই মানুষজন? তাদের কী ভুল ছিল? আমাকে বের করে দিলেই তো পারতে। তোমার বাবা, মা, বোনকে কষ্ট দেবার মানে হয়? একবার বলে দেখ, আমি চিরদিনের জন্য চলে যাব। হারিয়ে যাব চিরকালের জন্য।'
কিন্তু তা আর হয় না৷ অনিক আসে না। লীনা প্রতিদিন রাতে সুইসাইড নোট লিখে। আত্মহত্যা করতে গিয়েও করে না। মনে হয় এই বুঝি ফিরে আসবে মানুষটা। হঠাৎ এসে চমকে দেবে। লীনা কিছুটা সময় তার বুকের সাথে মিশে থাকবে। তারপর হাজারো প্রশ্ন করবে চোখ-নাকের পানি এক করে। চোখ-নাকের পানি এক হয় ঠিকই। অনিক ফিরে না। তবে আজ লীনা ভুল করবে না। কোনো মতেই না। সুইসাইড নোটের সাথে একটি ব্লেড নিয়েছে। এবং এক পাতা স্লিপিং পিল। প্রথমে ট্যাবলেটগুলো একসাথে খাবে৷ তারপর ব্লেড দিয়ে আলতো করে হাতের শিরা কেটে ফেলবে। তার বিশ্বাস, সে মরে গেলেই অনিক ফিরে আসবে। যখন বুঝতে পারবে তার ভালোবাসা কতখানি খাঁটি ছিল, ডুকরে কেঁদে উঠবে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেড়ি হয়ে যাবে।
(সমাপ্ত)
মো. ইয়াছিন