সন্ধ্যাতারাঅতিপ্রাকৃত

সন্ধ্যাতারা — পর্ব ২

ইয়াছিন নাইম১৪ জানুয়ারি ২০২৫৬ মিনিট পড়া

প্রথম ঘন্টা বাজার আগেই ভান করলাম। এমন ভান করলাম, স্কুল টিচার শেষমেশ ছুটি দিতে এক প্রকার বাধ্য হলেন। কেঁদে কেঁদে চোখ-নাকের পানি এক করে ফেললাম। কথা একটাই, ভীষণ পেট ব্যথা করছে ছুটি লাগবে। হেড টিচার এসে বললেন, 'সকালে কী খেয়েছো? ভাজাপোড়া কিছু খেয়েছো কি?'

আমি বললাম, 'কিছু খাইনি, স্যার। আমি বোধহয় মরে যাব। আমাকে ছুটি দিন। বাসায় যাব।'

তিনি গম্ভীর মুখে ভাবলেন। চোখের চারকোনা চশমা খুলে রেখে মাথার টুপি সরিয়ে চিন্তিত ভাবে বললেন, 'কিন্তু এ অবস্থায় তোমাকে যেতে দেই কীভাবে?'

'যেতে পারব, স্যার। রিকশা নিয়ে চলে যাব। আমি আর পারছি না, স্যার।'

আরো কিছুটা সময় তিনি কী যেন ভাবলেন। তারপর স্কুলের পিয়নকে ডেকে দিলেন। বললেন, আমাকে যেন রিকশায় তুলে দেয়। কিন্তু পিয়ন বেচারা বোধহয় ভালো করে শুনতে পায়নি। আমাকে রিকশার সামনে দাঁড় করিয়েই চলে গেছে। একবার ফিরেও তাকায়নি।

রিকশাঅলাকে বাসার ঠিকানা বলতেই বিশ টাকা দাবি করল। কথা না বাড়িয়ে চট করে উঠে বসলাম। প্যাডেলে প্যাডেলে এগোতে লাগল রিকশার চাকা। বসে বসে স্কুল ব্যাগ খুলে দেখলাম, টাকা আছে কিনা। না থাকলে রিকশা ভাড়া দেব কীভাবে?

নাঃ, আছে। একটা একশো টাকার নোট। দু'টো পাঁচ টাকার কয়েন আর একটা বিশ টাকা। ব্যাগ হাঁটুর উপর রেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম।

স্কুল থেকে বাসা খুব বেশি দূরের পথ নয়। রিকশায় করে আসতে আট-দশ মিনিটের মতো লাগল। রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে দ্রুত বাসায় প্রবেশ করলাম। ডোরবেল বাজাতে যাব ঠিক সেই সময় ভিতর থেকে কাচ ভাঙার শব্দ ভেসে এল। ভয়ে ভয়ে দরজায় হাত রাখলাম। ভেবেছিলাম দরজায় টুকা দেব। কিন্তু তার আর প্রয়োজন হয়নি। দরজায় খিল দেওয়া ছিল না। হাত রাখতেই খুলে গেল।

সতর্ক পা ফেলে এগোতে লাগলাম। এক পা, দু'পা, তিন পা...

ভেতর থেকে সন্ধ্যা অর্থাৎ আমি যার শরীরে আছি তার মায়ের কণ্ঠ ভেসে এল, 'ছুঁবে না, ছুঁবে না আমাকে। দূরে যাও। দূরে যাও বলছি।' কণ্ঠটা ভাঙা ভাঙা। অস্পষ্ট। কাঁদতে কাঁদতে বললে যেমন হয়, ঠিক তেমন।

আরো দু'পা এগিয়ে গেলাম। সেই লোকটার কণ্ঠ শোনা গেল, যাকে সকালে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখেছিলাম, 'আমার কথা তো শোনো সন্ধ্যা..'

'কী কথা শুনব তোমার? শোনার মতো বাকি রেখেছো কী, তুমি?'

'মাথা ঠান্ডা করো। বোসো, বুঝিয়ে বলছি।'

আরো একবার কাচ ভাঙার শব্দ ভেসে এল। সেই সাথে সন্ধ্যার কান্নাভেজা কণ্ঠ, 'কিচ্ছু বুঝাতে হবে না। কিচ্ছু না। তুমি কি আমাকে বাচ্চা মেয়ে পেয়েছো, যে বুঝিয়ে দেবে?'

'আরে এরকম কখন বললাম? শোনো, কাছে এসো।'

'নাঃ, আসবে না কাছে। তোমার মতো লম্পটের কাছে আমি যাব না। তুমি বলো, রাত্রির ছবি তোমার কাছে এল কীভাবে? তা-ও আবার এরকম বাজে ছবি!'

কিছুটা সময় চুপচাপ কাটল তারপর আবার সন্ধ্যার কণ্ঠ, 'এজন্যই মাঝে মাঝে আমাকে আর আমার ছেলেকে এখানে-ওখানে বেড়াতে পাঠাতে? আর তুমি বলতে রাত্রি তোমার ছোটো বোনের মতো! ছিঃ ছিঃ!'

তারপর শুধু সন্ধ্যার কান্নার আওয়াজ শোনা গেল। লোকটা কিছুই বলল না। এরকম চুপচাপ থাকার মানে কি? ব্যাটা খুন করার মতলব আঁটছে না তো?

সতর্কতার সাথে মাথাটা একটু উঁটু করে বেডরুমে উঁকি দিলাম। সন্ধ্যা ফ্লোরে বসে বসে কাঁদছে। তার স্বামী অর্থাৎ আমি যে ছেলেটির বডিতে আছি, তার বাবা বিছানায় বসে আছে। লোকটার মাথায় হাত।

সন্ধ্যা হঠাৎ বলে উঠল, 'আমি পুলিশে যাব। মামলা করব তোমার নামে। নারী নির্যাতন মামলা। তারপর দেখব কী হয়..'

লোকটা ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'কী বলো সন্ধ্যা! একটা সামান্য ব্যাপারে... তাছাড়া তুমি তো জানো, আমার নামে পুলিশ কেস হলে পুরো ক্যারিয়ার...'

'হোক তোমার ক্যারিয়ার নষ্ট। ক্যারিয়ারের কথা ভাবছো। কিন্তু আমি? আমার জীবন তুমি নষ্ট করেছো। তার কী হবে? আর রাত্রি? রাত্রির কী দোষ ছিল? নষ্টামি করার জন্য আমার বোনটাকেই পেলে তুমি?'

'হুঁ, সব দোষ এখন আমার। তোমার বোন তো দুধে ধোয়ানো তুলসী পাতা, তাই না?'

সন্ধ্যা চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়াল। বলল, 'আমি যাচ্ছি, এখনি যাচ্ছি তোমার নামে মামলা দিতে...'

বলে বেরোতে যাচ্ছিল। লোকটা সন্ধ্যার হাত ধরে এত জোরে টান দিলো, সন্ধ্যা ছিঁটকে পড়ল দেয়ালে। কপালের কিছুটা অংশ কেটে তাজা লাল রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল।

'তুমি, তুমি আমার গায়ে হাত তুললে!' বলে বেরোবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তখনই লোকটা ওয়াড্রোব টান দিয়ে পিস্তল বের করল, 'আর এক পা এগোলে গুলি করে দেব। পাগলামি করো না। আমার কথা শোনো। ওটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট ছিল। এর বেশি কিছুই না...'

সন্ধ্যা লোকটার কথা শুনল না। জেদ করে বেরোতে লাগল। লোকটা চিৎকার করল, 'শোনবে না আমার কথা? এবার কিন্তু সত্যি সত্যি গুলি করে দেব। নিজের ক্যারিয়ারের জন্য আমি সব করতে পারি, এটা তুমি ভালো করেই জানো।'

সন্ধ্যা তখনও শুনল না। একসময় সত্যি সত্যি গুলি চলল। নিঃশব্দে। চোখ দিয়ে দেখা গেলেও শোনা গেল না। কারণ, পিস্তলে সাইলেন্সার আগেই থেকেই লাগানো ছিল। প্রথম গুলি খেয়েই সন্ধ্যা ফ্লোরে পড়ে গেল। বুলেট সরাসরি বুকে বিঁধেছে। তখনও সে বেঁচে আছে। কিন্তু দ্বিতীয়বার গুলি ছুঁড়ার পর সে শান্ত হয়ে শুয়ে পড়ল। এবার বুলেট সরাসরি মাথায় লেগেছে।

আর নিজেকে সামলে রাখা গেল না। ফুঁসতে ফুঁসতে জানোয়ারটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। লোকটা বলল, 'তোর মা আত্মহত্যা করেছে। কেন করেছে বল তো?'

আমি বললাম, 'আত্মহত্যা নয়। তুমি গুলি করেছো।'

লোকটা তাচ্ছিল্য করে বলল, 'তাই নাকি? যদি এমন হয়, যদি সন্ধ্যা তার ছেলেকে খুন করে নিজে আত্মহত্যা করে?'

বলেই আমার দিকে বন্দুক তাক করল। কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই গুলি করল। চিৎকার দেবার সময় পর্যন্ত পেলাম না। তাৎক্ষণিক টলে পড়লাম। মুহূর্তেই অন্ধকার হয়ে এল চারপাশ। নিভে গেল সবটুকু আলো।

কথায় আছে, পাপ বাপকেও ছেড়ে দেয় না।

ঘটনার বছরখানেক বাদে অপ্রত্যাশিভাবে দেখা হলো লোকটার সাথে। সেদিন আমি এক পুলিশ অফিসারের শরীরে আছি। একজন আসামির খুঁজ করছিলাম। সতেরো খুনের মামলার আসামি। আরেক অফিসারের মুখে শুনেছি, সে নাকি ভীষণ ধূর্ত। চোখের সামনে থেকে পালিয়ে যায়। হবারই কথা। পাবলিক প্লেসে সবার সামনে দাঁড়িয়ে সতেরো খুন করেছে। একে একে নয়, একসঙ্গে সতেরো খুন। এটা কি কম বড় কথা?

আসামি খুঁজতে খুঁজতে সন্ধ্যা নেমে এল। খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে একটা জলাশয়ের ধারে পৌঁছলাম। তারপর আর রাস্তা নেই। ফিরে আসছিলাম। তখনই একজন টর্চ মেরে বলল, 'স্যার, পানিতে কী একটা দেখা যায়!'

সবাই থমকে দাঁড়ালাম। অন্য একজন বলল, 'স্যার, শালার পুতে পানিতে আশ্রয় নিছে।'

আমি বললাম, 'তাই নাকি? ধরে আনো ব্যাটাকে।'

ময়লা-আবর্জনা ভরা জলাশয়। কচুরিপানার আড়াল থেকে একটা লোককে টেনে টেনে বের করে আনা হলো। লোকটা আবর্জনা ভরতি শরীর নিয়ে কুঁজে হয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'স্যার, বিশ্বাস করেন স্যার, এই মামলার আসামি আমি নই। একজন খুন করা আমার দ্বারা সম্ভব না। সতেরো জন কীভাবে করব?'

কিছুটা সময় তাকিয়েই রইলাম তার দিকে। কী নাদুসনুদুস ছিল লোকটা! কী সুন্দর চেহারা ছিল! অথচ এখন! জীর্ণ শীর্ণ দেহ। চামড়ায় ভাঁজ পড়ে গেছে। কণ্ঠস্বর কেমন যেন ভাঙা ভাঙা।

জানি এ-লোকটা সতেরো খুন করেনি। কারণ, কথায় কথায় আরেক অফিসার বলেই দিয়েছে, চাকরি বাঁচাতে গিয়ে সেই ধূর্ত খুনিকে ধরতে ব্যর্থ হয়ে অন্য একজনকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এ লোকটাই কেন? পৃথিবীতে তো আর কত মানুষ আছে ফাঁসিয়ে দেবার মতো, তাই না?

পত্রিকায় নিউজ এসেছিল, "ছেলেকে গুলি করে খুনি মায়ের আত্মহত্যা"

হেডলাইন দেখে আর পড়তে ইচ্ছে করেনি। পড়িওনি। লোকটা কী চাল চেলেছিল! দু'-দুটো খুন করে অত সহজে বেঁচে যাওয়া!

'স্যার আমাকে ছেড়ে দিন। ওঁরা আমাকে মেরে ফেলবে। স্যার, প্লিজ আমাকে ওঁদের হাতে তুলে দেবেন না।' লোকটা একরকম পায়ে পড়ে গেল।

পুলিশের একজন তাকে টেনে তুলতে তুলতে বলল, 'ওঠ শালার পুত, ওঠ। খুন করার সময় এসব নাটক মনে থাকে না?'

'স্যার, সত্যি আমি খুন করিনি স্যার।' লোকটা তবুও বলল। তার মুখটা আজ ঠিক সেরকম লাগছে, বছখানের আগে সন্ধ্যার কান্নাভেজা মুখ যেমন ছিল। লোকটা আজ ঠিক সেভাবেই আর্তনাদ করছে, সন্ধ্যা যেভাবে আর্তনাদ করেছিল। তফাৎ শুধু এখানে, সন্ধ্যা ভালোবেসে ঠকেছিল আর লোকটা খুন করে।

'আপনাকে দেখা মাত্রই গুলি করার পারমিশন আছে, জানেন সেটা?' আমি জিজ্ঞেস করলাম।

'জানি, স্যার। সব জানি। কিন্তু আমাকে ফাঁসানো হয়েছে, স্যার...'

হাতকড়া পরিয়ে গাড়িতে তোলা হলো। লোকটা কাঁচুমাচু হয়ে বসে মাথা তুলে তাকাল। বলল, 'একটা কঠিন সত্য কী জানেন স্যার?'

ভ্রু কুঁচকালাম, 'কী?'

'পাপ বাপকেও ছাড়ে না।' বলে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল লোকটা। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাইরে দৃষ্টি রাখলাম। পশ্চিম আকাশে জ্বলজ্বল করছে অসংখ্য সন্ধ্যাতারা। সামান্য শব্দ করে সাঁই করে চলতে শুরু করল গাড়িটা।

(সমাপ্ত)

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক : https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=249913500176229&id=100054727422264

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া