আলোছায়াঅতিপ্রাকৃত

আলোছায়া — পর্ব ২

ইয়াছিন নাইম২৬ জানুয়ারি ২০২৫৫ মিনিট পড়া

লোকটা সোজা এসে আমার সামনে দাঁড়াল, 'কীরে, কথা কানে যায় না?'

বলেই হাত ধরে ফেলল। সাতপাঁচ না ভেবেই তার গালে চড় বসিয়ে দিলাম। সে আমার হাত ছেড়ে মুখ চেপে ধরল, 'এত বড়ো সাহস? আমাকে চড় মেরেছিস, আমাকে? নে এবার মার দেখি। মার মার।' বলে লোকটা মুখ এগিয়ে দিলো। তার মুখ থেকে বিকট গন্ধ ভেসে এল। বিশ্রি গন্ধে কিছুটা সময়ের জন্য নিঃশ্বাস বন্ধ করে নিতে হলো।

'কীরে, মারবি না? দাঁড়িয়ে আছিস কেন? মার।'

বলতেই আরো একবার চড় বসিয়ে দিলাম। লোকটা ইতস্তত করে বলল, 'সত্যি সত্যি মারলি! আজ তোকে মজা দেখাব। আয়। আয় আমার সাথে।'

বলে টানতে টানতে গাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল তখনই চারপাশ আলোকিত করে একটি মোটরবাইক এল। কালো লেদারের জ্যাকেট পরিহিত একটি ছেলে বাইক থেকে নেমে চেঁচিয়ে বলল, 'কী হচ্ছে এখানে?'

মাঝবয়েসী লোকটা তখনই আমার হাত ছেড়ে দিলো। মাথা নিচু করে সোজা গাড়িতে গিয়ে বসল। ক্যাচক্যাচ শব্দ করে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সাঁই করে চলে গেল।

ছেলেটি আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মাথায় হেলমেট থাকায় মুখ দেখতে না পারলেও এটুকু বলতে পারছি সে অনেক লম্বা এবং ফরসা। আমার উচ্চতা পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি। এক্ষেত্রে ছেলেটা কম হলেও পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি হবে।

'এত রাতে এখানে কী করছিলেন বলুন তো?'

চারপাশে শীতল বাতাস বইছে৷ আমার শরীরে পাতলা সালোয়ার কামিজ। ঠান্ডা লাগছে। জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে বললাম, 'দাঁড়িয়ে ছিলাম।'

'এটা দাঁড়িয়ে থাকার জায়গা? তা-ও আবার এত রাতে? আপনি মানুষ না ভূত?'

'মানুষ।'

'সত্যিই মানুষ? মানুষ হলে তো এত রাতে ভয় পাবার কথা। অথচ আপনার চোখে একটুও ভয় নেই। ভয় পাচ্ছেন না কেন?'

'আমি ভয় পাচ্ছি।'

'অ্যা? ভয় পাচ্ছেন? কই, আমি দেখছি না তো!'

'ভীত মানুষের চোখে ভয় থাকে না।'

'ওঃ, তাই? তাহলে কী থাকে শুনি?'

'বিস্ময়। বিস্ময় থাকে।'

'উমম্, আপনি দেখছি পাগল না।'

'কী বললেন? আমি পাগল?'

'ও-বাবা! সেটা কবে বললাম? আমি বলেছি পাগল না। মানে সুস্থ। একজন সুস্থ মানুষ হয়ে মাঝরাতে এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী করছিলেন?'

ঝপ করে বৃষ্টি নেমে এল। ছেলেটা দৌড়ে গেল যাত্রী ছাউনির নিচে। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল, 'বৃষ্টি পড়ছে তো! এখানে আসুন।'

আমি গিয়ে তার পাশাপাশি দাঁড়ালাম। বললাম, 'বৃষ্টি নামার অপেক্ষা করছিলাম।'

'তাই? বৃষ্টি নামলে কী হয়?'

'বৃষ্টি নামলে আমার মন ভালো হয়ে যায়।'

'মন ভালো হয়েছে?'

'হুঁ।'

'বেশ। এখন কোথায় যাবেন?'

'কোথায় যাব? তা তো জানি না!'

'মানে! সারা রাত এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবেন নাকি?'

'হুঁ।'

'হুঁ? বড়ো অদ্ভুৎ মানুষ আপনি। অন্য কোনো মেয়ে হলে ভয়ে থরথর করে কাঁপত। বাই দি বাই, আমি বাদল। আপনি?'

'নিতু। ডাকনাম ঝিনুক।'

'নিতু? বেশ সুন্দর নাম তো! বাদল এলে নিতুর মন ভালো হয়ে যায়।'

'আপনি এলে আমার মন ভালো হবে কেন?'

'আমার কথা কবে বললাম? আমি তো বলেছি বাদল এলে আই মিন বৃষ্টি এলে নিতুর মন ভালো হয়ে যায়।'

'নিতু বলছেন কেন? আপু বলবেন। বয়সে আমি আপনার বড়ো হব।'

'যদি আপু না বলি? নাম ধরে ডাকলে কী করবেন?'

আমি চুপ করে রইলাম। ছেলেটি আগ বাড়িয়ে বলল, 'আসুন আপনাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসি। একা একটা মেয়েকে বিপদের মুখে ফেলে রেখে যেতে আমার মন সায় দেবে না।'

'প্রয়োজন নেই। আমি যেতে পারব।'

'পারবেন? গুড। ভেরি গুড।' বলে বাইকে চড়ে বসল। ততক্ষণে বৃষ্টি থেমে গেছে। ছেলেটি বাইক স্টার্ট দিয়ে বলল, 'আপনি চাইলে আমার বাসায় থেকে যেতে পারেন৷ সকালে চলে যাবেন। কথা দিচ্ছি, আপনার কোনো অসুবিধা হবে না। এমনিতেও মেয়ে মানুষকে আমি কখনো অসম্মান করি না।'

'দরকার নেই। এরচে' আমাকে ফুপুর বাসায় নিয়ে চলুন।'

'আমি তো আপনার ফুপুর বাসা চিনি না।'

'আমি চিনিয়ে দেব।'

'আচ্ছা ঠিক আছে আসুন।'

অনেক্ষণ ডোরবেল বাজানোর পর ফুপু দরজা খুললেন। এত বছর পর মাঝরাতে হঠাৎ আমি এসে পড়ব এটা হয়তো তিনি ভাবেননি। তাই আমাকে দেখেই অবাক হয়ে বললেন, 'ঝিনুক তুই?'

'ফুপু, আমি কয়েকটা দিন তোমার বাসায় থাকব।'

'এত রাতে কোথা থেকে এলি? তোর বর কোথায়?'

'বলব। সব পরে বলব। আগে আমাকে একটু ঘুমাতে দাও। আমি আর তাকিয়ে থাকতে পারছি না।'

'অন্য সময় এলে ঠিক একটা ব্যবস্থা করতাম। এখন তো মাঝরাত। তোর বাবাকে ফোন দিলে সে রিসিভ করবে না। তার অনুমতি না নিয়ে তোকে কীভাবে আমার বাসায় রাখি বল তো?'

'বাবা তো কখনোই অনুমতি দেবে না। তুমি তাকে ভালো করেই চেন। একবার তিনি কারোর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে আর কখনো ফিরে তাকান না।'

'কিন্তু তাকে না বলে তোকে জায়গা দিলে শেষে আমার সাথেও সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দেবে। তাই না, বল?'

'কিন্তু ফুপু, একটা রাতের জন্য অন্তত... কাল সকালেই চলে যাব।'

'তুই তোর বাবাকে ফোন দে। তিনি অনুমতি দিলে একদিন কেন, এক সপ্তাহের জন্য থাকবি আমার বাসায়। কোনো সমস্যা হবে না।'

সময় নষ্ট না করে চলে এলাম। ফুপু একবারও ডাকেননি। দুম করে দরজা লাগিয়ে দিয়েছেন।

বাড়ির বাইরে এসে রিতিমতো শক খেলাম। সেই ছেলেটি এখনও বসে আছে। আমাকে দেখেই বলল, 'কী হলো, ফিরে এলেন যে?'

'আপনি যাননি এখনও?'

'না, যাইনি। আমার মনে হচ্ছিল, আপনি ফিরে আসবেন। এবং সেটাই সত্যি হলো।'

'আপনি কী চান, বলুন তো?'

'আমি? আমি আপনাকে হেল্প করতে চাই।'

'এতে আপনার কী লাভ?'

'সেটা আপনি না জানলেও চলবে।'

'অচেনা মানুষের সাথে আমি কোথাও যাই না।'

'কে বলল অচেনা? আমি বাদল। আর আপনি নিতু। কিছুক্ষণ আগেই তো পরিচিত হলাম।'

'তাই বলে...' কিছু একটা বলতে গিয়েও থমকে গেলাম।

'তাই বলে কী? বলুন বলুন। এবার বলবেন আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। এই তো?'

'তা নয়...'

'কেন নয়? বিশ্বাস করতে না পারাটাই স্বাভাবিক। এত রাতে অপরিচিত একটা ছেলেকে কোনো মেয়েই বিশ্বাস করতে পারবে না। এমনকি আমিও আপনাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। এখনও সন্দেহ হচ্ছে,আপনি সত্যিই মানুষ না কি ভূত?'

'ভূত মনে হবে কেন? আমি দেখতে কি খুব খারাপ?'

'না। তবে এত রাতে স্বাভাবিক কোনো মেয়ে এভাবে ঘুরে বেড়াবে না। আমি শুনেছি, পিশাচীরা রাতে মানুষের বেশে শিকার করতে বের হয়। আপনাকেও তা-ই মনে হচ্ছে।'

'আপনি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?'

'যদি বলি, হ্যাঁ?'

'আমি ওসবে ভয় পাই না।'

'তা তো দেখতেই পারছি। কিন্তু ভয় পাচ্ছেন না কেন? কী এমন ঘটেছে আপনার সাথে, যার জন্য আপনার ভয়-ভীতি সব একযোগে পালিয়েছে?'

'আমার বর আমাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে।'

'সো স্যাড! আপনার বর অন্য কারো সাথে...'

'হুঁ।'

'ভালোই গল্প বানাতে পারেন দেখছি! তা লেখালিখি করছেন না কেন? লেখক হয়ে যেতে পারতেন।'

'গল্প নয়, সত্যি বলছি। আমার একটি মেয়েও আছে।'

'হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনি যা বলেন তা-ই। সব বিশ্বাস করি। এবার আসুন, প্লিজ। ঘুম পেয়েছে। বাসায় গিয়ে একটু ঘুমাবো।'

সুনসান রাতের অন্ধকারে ছেলেটির চোখজোড়া বড়ো মায়াবী লেগেছে। শুধু চোখ না, ছেলেটির প্রতিই মায়া পড়ে গেছে। আজকাল এরকম পরোপকারী ছেলে মানুষ পাওয়া যায়? আবার একটু ভয়ও হলো। তার যদি কোনো অসৎ উদ্দেশ্য থাকে? কিন্তু আর যে কিছু করার নেই। তাকে ফিরিয়ে দিলে অন্ধকারে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।

নিরুপায় হয়ে ছেলেটির পেছনে গিয়ে বসলাম। সে বাইক স্টার্ট দিলো। চলতে চলতে একটা দোতলা বাড়ির সামনে থামল। দু'বার হর্ণ বাজাতেই একজন দৌড়ে এসে গেইট খুলে দিলো। বাঁকা হেসে ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে বলল, 'আজকে আরেকজন! আপনি পারেনও। কপাল একখান!'

ছেলেটি তার কথা শুনতে পেলেও জবাবে কিছু বলেনি। হাঁ হুঁ কিছুই না৷ যেন ইচ্ছে করেই কথা চেপে গেছে। একটু একটু ভয় লাগছে। কী হতে যাচ্ছে আমার সাথে? বড়ো কোনো দূর্ঘটনা নয় তো?

(চলবে)

মো. ইয়াছিন

গত পর্বের লিংক :

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=263943438773235&id=100054727422264

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া