লারিসাঅতিপ্রাকৃত

লারিসা — পর্ব ৯

ইয়াছিন নাইম৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬৩ মিনিট পড়া

ছেলেটা এসেছিল কাকভেজা হয়ে। বলল তার গায়ে আগুন লেগেছে। কারণ সে নাকি পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিল। ওই পানিই নাকি আগুন! তারপর আবার ধোঁয়া ওঠা টগবগে জল নিজের গায়ে ঢেলে বলতে লাগল, আঃ! কী আরাম! এসব দেখে লারিসা খুবই অবাক হয়েছিল। এবং ভেবেছিল, এমন অদ্ভুত মানুষও পৃথিবীতে আছে!

অথচ, আসল জিনিসটা সে এখনও দেখেইনি। এখনো সে জানে না যে, এই ছেলেটা আসলে লি রি! যে কিনা...

ছেলেটা সেই কখন থেকে ঘুমুচ্ছে। টেবিলের উপর মাথা রেখে একরকম নাক ডেকে সময় কাটাচ্ছে। লারিসার বিরক্ত লাগছিল। সে শপ ক্লোজ করে ঘরে ফিরবে। কিন্তু এই ছেলেটার জন্য পারছে না। একে ভেতরে রেখে কীভাবে শপে তালা দেয় সে? তাছাড়া ছেলেটা যে পরিমাণ অদ্ভুত, বলা তো যায় না, কাল ভোর হবার আগেই পুরো শপের বারোটা বাজিয়ে দিতে পারে।

অগত্যা ঘুমে ঢলোঢলো চোখে নির্বাক চেয়ে রইল লারিসা।

একটু পর ছেলেটার মুখোমুখি চেয়ারে বসে পড়ল সে। সময় গড়িয়ে যেতে যেতে কখন যে তার চোখ লেগে এসেছিল তা সে জানে না। পুরোপুরি ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে যাবার পর, যখন বাস্তব জগত অন্ধকার হয়ে এসেছে, তখন লারিসা একটা বাজে স্বপ্ন দেখে ফেলল। স্বপ্নটা খুবই বাজে এবং জঘন্য। কিন্তু ঘুম ভেঙে যাবার পর তার আর কিছুই মনে রইল না। শুধু সে আবিষ্কার করল, তার ঘুম ভেঙে গেছে এবং সে খুব হাঁপাচ্ছে। বুক উঠানামা করছে খুব। গা ঘেমে গেছে। টাইট অন্তর্বাসের ভেতরে একরকম পানি জমে গেছে বলা যায়। খুলে ফেলতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু সামনে একটা ছেলেমানুষ। সুতরাং তা আর করল না।

এবার লারিসা আবিষ্কার করল, তার চারপাশ পুরোটা অন্ধকার। এতটাই অন্ধকার যে, তার মুখোমুখি চেয়ারে বসে যে ছেলেটা ঘুমুচ্ছে, তাকেও দেখা যাচ্ছে না। ছেলেটা কি এখনও আছে? না কি চলে গেছে? একবার হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখবে?

লারিসা ভেবে পায় না।

অন্ধের মতো হেঁটে যায় ক্যাশ-কাউন্টার পর্যন্ত। উঁচু টেবিলের এক কোণে বড়ো সাইজের ক্যান্ডেল রাখা। সেটাতে আগুন দিতেই মৃদু আলো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। শপটা একেবারে ছোটো। পনেরো বাই বিশ ফিট হবে। তবে পুরোটা লারিসার মনের মতো করে সাজানো। ডিটেইলস্ বলার সময় নেই কারণ এখনি লারিসা এমন কিছুর সম্মুখীন হতে চলেছে, যা তার কল্পনাকেও হার মানায়।

ঢুকঢুক করে পানি খায় লারিসা।

গলা একেবারে শুকিয়ে গেছে। বুকটা এখনও ধড়ফড় করছে। ঠিকমতো নিঃশ্বাস নেওয়া যাচ্ছে না। আরো একটা ব্যাপার হলো, তার চোখে জল!

কী এমন স্বপ্ন দেখেছে সে?

একটা ভুল হয়ে গেছে।

পানি মনে করে লারিসা ড্রিংক করে ফেলেছে। মদ।

সে কখনো ড্রিংক করে না। এক কাস্টমারের জন্য তৈরি করেছিল। সেটা রয়ে গেছে টেবিলে এবং এখন তার গলা দিয়ে পেটের ভেতরে চলে গেছে। ইয়াক! মনে হচ্ছে গলার ভেতর দিয়ে আগুন যাচ্ছে। ভেতরটা জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। ইয়াক!

লারিসা টের পায়, সে হুঁশ হারিয়ে ফেলছে। এখনই হয়তো সেন্সলেস হয়ে পড়বে। মাথা ঘুরছে, চোখ ঝাঁপসা, চারপাশটা কেমন যেন কাঁপছে, চক্কর কাটছে। লারিসা স্থির হয়ে দাঁড়াতে চায়, চোখ খুলে ভালো করে তাকাতে চায়। কিন্তু পেরে উঠে না।

ক্যান্ডেল হাতে নিয়ে কোনোরকমে ওই টেবিলের কাছে পৌঁছায় সে। ক্যান্ডেলটা টেবিলের উপর রেখে চেয়ারে বসে পড়ে। তার ঠিক উল্টো পাশের চেয়ারে বসে টেবিলের উপর মাথা রেখে ঘুমুচ্ছে ছেলেটা। কিন্তু একি!

এক ঝটকায় যেন নেশা কেটে গেল লারিসার।

না কি নেশা করেছে বলেই এমন দেখছে সে?

লারিসা চোখ কচলে আবার তাকায়। ভালো করে চেয়ে দেখে। এবং নিশ্চিত হয়, তার সামনে এমন একজন মানুষ ঘুমুচ্ছে, যার গায়ের লোমগুলো জঙলী পশুর মতো ঘন এবং বড়োবড়ো! হাতের নখগুলো অনেক লম্বা লম্বা। মাথার চুল সিংহের মতো ঘন। আর পিঠে হাতির দাঁতের মতো তিনটি শিং!

শপের মেঝেতে নিজেকে আবিষ্কার করল লারিসা। তার ঠিক সামনে হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে আছে ছেলেটা। লারিসাকে জাগতে দেখে সে শিম্পাঞ্জির মতো মুখ করে বলে, "আপনি মরেননি? আমি ভাবলাম মারা গেছেন।"

লারিসার ঘোর এখনও পুরোপুরি কেটে যায়নি। মাথাটা এখনও ঘুরছে। সে কোনোমতে উঠে বসে তাকায় ছেলেটার দিকে। এই ছেলেটাই তো কাল রাতে... ঘন লোমশ দেহ ছিল তার, হাতের নখ ছিল কুকুরের মতো, পিঠের উপর হাতির দাঁতের মতো শিং...

কিন্তু এখন তো সব স্বাভাবিক। লারিসা ভেবে পায় না, আসলেই কি ছেলেটা এমন হয়ে গিয়েছিল? না কি মদ্যপ অবস্থায় ভ্রম হয়েছিল তার?

চলবে

মো. ইয়াছিন

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া