যাবে যদি যাওঅতিপ্রাকৃত

যাবে যদি যাও — পর্ব ২

ইয়াছিন নাইম৭ মার্চ ২০২৬৩ মিনিট পড়া

আমি জানি না পৃথিবীতে ম্যাজিক বলতে কিছু আছে কিনা। তবে সেদিনের পর একটা ম্যাজিক হয়ে গেল। মেয়েটির সাথে আমার একরকম সাপে নেউলে সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সেদিনের পর আমরা দু'জনেই কেমন বদলে গেলাম। টানা পাঁচদিন স্কুলে যায়নি সে। ওই পাঁচদিন সকাল বিকেল দু'বেলা তাকে দেখতে গিয়েছি আমি। বাড়ির বাইরে থেকে তাকাতাম। প্রায় সময়ই তাকে দোতলার বেলকনিতে টি-শার্ট পরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত। চোখে চোখ পড়তেই সে ঘরে চলে যেত।

পাঁচদিন পর যখন স্কুলে এল তখন আমিই আগ বাড়িয়ে ওর সাথে কথা বলতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু সে এড়িয়ে গেল। এরপর আর ওর সামনে যাবার সাহস করিনি। একই স্কুলে পড়তাম। একই ক্লাসে। কিন্তু অপরিচিতের মতো থাকতাম। কখনো ভুলে কেউ কারোর সামনে পড়ে গেলে পাস কাটিয়ে চলে যেতাম। আমিও, সেও। কিন্তু প্রায় মাসখানেক পর একদিন সে আমাকে বলল, "কাল আমার জন্মদিন।"

ব্যাস! এইটুকুই। সেই রাতে আমি অনেক ভাবলাম। সে তার জন্মদিনের কথা আমাকে বলল কেন? এর পেছনে কোনো কারণ আছে?

ভেবে পাইনি কিছু। টিফিনের টাকা জমিয়েছিলাম কিছু। সব দিয়ে একটা বেবিডল কিনে উপহার দিয়েছিলাম তাকে। ছোট্ট পুতুলটির পেটে আঙুল দিয়ে চাপ দিলে পুতুলের পেট থেকে আওয়াজ আসত, "হ্যাল্লো আই লাভ ইউ, হ্যাল্লো আই লাভ ইউ, হ্যাল্লো..."

পুতুলের পেটে কয়েকবার চাপ দিয়ে মুচকি হেসে চলে গিয়েছিল সে। এরপর থেকে ধীরে ধীরে আমরা একে অপরের কাছে আসতে শুরু করি। প্রথমে ক্লাসমেট, তারপর বন্ধু, বেস্টফ্রেন্ডের গন্ডি পেরিয়ে প্রেমিক-প্রেমিকার জুটি। তবে আমাদের খুনসুটির, আদর-আহ্লাদের চাইতে ঝগড়ার পরিমাণ ছিল বেশি। এমন একটি দিন ছিল না যেদিন আমরা ঝগড়া করিনি। ঝগড়া হত, অভিমান হত আবার সব ভুলেও যেতাম। যেন আমরা একে অপরের পরিপূরক।

কিন্তু আজ এত বছর পর হুট করে সে এমন কথা বলবে তা আমি কল্পনা করিনি কখনো। তার হাতে বিয়ের কার্ড। তার বিয়ে! মুভ ভার। কণ্ঠ বিষণ্ন। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। সে বলেই যাচ্ছে, "একদম মন খারাপ করবে না। আমি সব সময় তোমার পাশে আছি। তোমার ভাগ্যে আমি ছিলাম না। নিয়তি আমাদের এক হতে দেয়নি..."

প্রায় একঘন্টা একটানা এসবই বলে চলল। তারপর বিয়ের কার্ডটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, "দাওয়াত রইল। এসো। কেমন?"

আমি বিষণ্ন হেসে বলি, "হুঁ!"

তারপর সে যখন চলেই যাবে তখন চট করে হাতটা ধরে ফেলি। বলি, "আমরা চাইলেই কি বিয়েটা ভেঙে দিতে পারি না? চাইলেই কি তোমার পরিবারকে কনভেন্স করতে পারি না?"

"না, সম্ভব নয়।"

"কিন্তু চেষ্টা তো করতে পারি।"

"সম্ভব নয়। আমার ফ্যামিলি, আমি জানি।"

"কিন্তু..."

"না। এই বিয়ে ভাঙা অসম্ভব।"

হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছিল সে। আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকি। সহসা তার কণ্ঠস্বর শুনতে পাই, "এই যে! কার্ডটা খুলে দেখবে তো, না কি?"

"হু!" বলে কার্ড খুলে দেখি। কনের নাম লেখা, পারু ইসলাম (পার্বতী) একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর দিকে তাকাই। সে কপাল কুঁচকে বলে, "কী হলো? সবটা পড়ো।"

আমি বাকিটুকু পড়তে শুরু করি। বরের নাম পড়তে গিয়ে চোখ আটকে যায়। কারণ বরের নামের জায়গায় আমার নাম লেখা! বিস্ময়ে ওর দিকে তাকিয়ে দেখি সে মিটিমিটি হাসছে। হাসতে হাসতে কঠিন স্বরে সে বলে, "কী ভেবেছিলি তুই? এত সহজে আমার থেকে মুক্তি পেয়ে যাবি? অতো সহজ না, বুঝলি? আমি তোর পিছু ছাড়ছি না।"

"কিন্তু..."

"কিন্তু কী? তোমার নাম কীভাবে এল?"

"হুঁ!"

"আমিই বাবাকে রাজি করিয়েছি। আর তোমার ফ্যামিলি তো আমাদের ব্যাপার জানেই। রাজিও আছে। তাই তোমার অনুমতি না নিয়েই কার্ড ছাপা করে ফেলেছি।"

কাছে এসে আমার চোখের জল মুছে দিয়ে বলে, "ওলে! খুব কষ্ট দিয়ে ফেলেছি, না? কী করব বলো? তোমার বউটা একটু পাজি! হিহি!"

আমারও হাসি পেয়ে যায়। উৎসাহে ফের বিয়ের কার্ডে চোখ বুলাতে গিয়ে দেখি, বিয়ের ডেট লেখা দু' হাজার পঁচিশ সালে! এখন দু' হাজার বাইশ। মানে আরো তিন বছর!

প্রশ্নের জবাবে সে বলে, "আব্বুর ট্রান্সফার হয়ে গেছে। আমরা ঢাকায় চলে যাচ্ছি। তুমি কষ্ট পাবে তাই আব্বুকে রাজি করিয়ে বিয়ের কার্ড ছাপা করিয়েছি। আপাতত আঙটি পরিয়ে দিবে। পঁচিশ সালে আমরা বিয়ে করব। কারণ এখনও আমরা ছোটো, কলেজ স্টুডেন্ট। তাই না বলো?"

"কিন্তু আমি তো আঙটি আনিনি!"

"সেই চিন্তা তোমায় করতে হবে না। এসে আমার সাথে।" বলে হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়। কিছু দূরে একটা পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িটার সামনে গিয়ে সে বলে, "আব্বু, আঙটিটা দাও তো।"

পারুর বাবা পুলিশ অফিসার গাড়ির ভেতর থেকে একটি আঙটি এগিয়ে দেন। পারু সেটা আমার হাতে তুলে দিয়ে বলে, "পরিয়ে দাও!"

আঙটি পরিয়ে দিয়ে বলি, "সত্যিই ঢাকায় চলে যাবে?"

"হুম।"

"কবে?"

"আজই।"

"ও! আমার একটি আবদার রাখবে?"

"কী আবদার?"

"একসাথে বৃষ্টিতে ভিজব।"

"তাই!" বলে হাতের ছাতাটা ছেড়ে দেয় সে। সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির জল আমাদের দু'জনকে ভিজিয়ে দেয়।

পুলিশের গাড়িটা যখন চলে যাচ্ছে তখন নিরুপায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি আমি। ওই গাড়িতে করে চলে যাচ্ছে পারু। তিন বছর পর আবার আমাদের দেখা হবে। চলে যাবার সময় তাকে বলে দিয়েছি, "যাবে যাও তবে দিনশেষে তুমি আমারই রবে।"

সে হেসে বলেছে, "রবো। তোমারই রবো।"

সমাপ্ত

মো. ইয়াছিন

(গল্পের বাকিটুকু পাঠকদের হাতে)

পর্ব শেষ
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

সব পর্ব দেখুন

আরও গল্প

এই সিরিজের বাইরে, একই স্বাদের

সব গল্প
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৭

(An Original Story by Yeasin Nayeem) বড়ো হুজুরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে আমি তাঁর সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি আমাকে কত ভালোভালো কথা বলেছেন। আর এখন শুনছি বড়ো হুজুর নেই! তাহলে আমি যার সাথে কথা…

২০ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ফিচার্ড
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৬

আমাদের বাড়ি নিয়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়েছে। এমনিতেই লোকে বলত বাড়িতে নাকি জিন আসে। এখন আরেকটা যুক্ত হয়েছে। আগে অন্তত দিনের বেলা লোকজন এদিকে আসত। এখন সেটাও হয় না। দুপুরের কড়া রোদেও কেউ আসতে চায় না। আব্বার দোকানে মাঝেমাঝে খদ্দেররা আস…

১৯ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া
মিষ্টির দোকান

মিষ্টির দোকান — পর্ব ৫

আমার দিকে ঘুরে তাকালো নূর ইসলাম ভাই। তখনও তার দুই হাতে কাচা গোবর লেগে আছে। জিহ্বা দিয়ে হাত চাটতে চাটতে উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম তার চোখের এমন অস্বাভাবিক রং দেখলাম। আমার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করতে লাগলো। কপাল ভালো আগেভাগে বেড়ার পেছনে নিজেকে…

১৮ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া