ছোটগল্প

ছোট্ট একটি ছেলে মাটিতে বসে বসে শব্দ করে…

ইয়াছিন নাইম১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬৪ মিনিট পড়া

ছোট্ট একটি ছেলে মাটিতে বসে বসে শব্দ করে হাসছে। তার বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে। রক্ত দেখে আরো শব্দ করে হাসল সে। কনকনে শীতের সকাল। সূর্য এখনও কুয়াশার আড়ালে। রাস্তার বেওয়ারিশ একটি কুকুর ধীর পায়ে এসে ছেলেটির কোল ঘেঁষে বসল। ছেলেটি কুকুরের গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, 'আইছস? তোর তো বাপ-মা আছে। আমার নাই। তুইও তো আমারে কামড় দিয়া চইলা যাবি। দিবি না কামড়?'

মবিন উদ্দিন দ্রুত ছুটে এলেন। ছেলেটিকে কান ধরে টেনে তুললেন। শক্ত লাঠি দিয়ে ছেলেটির পায়ে জোরে আঘাত করতেই সে ব্যথায় 'আঃ' করে শব্দ করল। তিনি এত জোরে কান ধরে টান দিয়েছেন, মনে হচ্ছে কানটা ছিঁড়ে যাবে। ছেলেটি প্রাণপণ চেষ্টা করল সোজা হয়ে দাঁড়াতে। কিন্তু কনকনে ঠান্ডায় লাঠির আঘাতে পা'টা যেন নিস্তেজ হয়ে গেছে। কিছুতেই সোজা হয়ে দাঁড়ানো যাচ্ছে না।

মবিন উদ্দিন কান ছাড়লেন ঠিকই কিন্তু আরো একবার লাঠি দিয়ে তার পায়ে আঘাত করলেন। ব্যথায় কাতর হয়ে ছেলেটি তৎক্ষণাৎ মাটিতে পড়ে গেল। আবার কোনো রকম উঠে দাঁড়িয়ে হাত-পায়ের ধুলো-ময়লা ঝাড়তে লাগল।

মবিন উদ্দিন বললেন, 'ব্যাটা বজ্জাত, আমার এত বড় লস কইরা গাল ফুলায়া বইসা আছস! এত দেমাগ কীসের রে তোর, অ্যা? দুই মিনিট সময় দিলাম। জলদি আয়।'

বলে দ্রুত পায়ে চলে গেলেন তিনি। ছেলেটি তার গায়ের লাল সোয়েটার মুছতে লাগল। তখনই চোখে পড়ল, তার বাঁ হাতের আঙুল থেকে রক্ত পড়ছে। ফোঁটা ফোঁটা তাজা লাল রক্ত। আঙুলটা ব্যথায় টনটন করছে। সে আকাশের দিকে চেয়ে কুটিকুটি হয়ে হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পড়ল। কুকুরটা আবারো তার গা ঘেঁষে বসল। ছোট্ট ছেলেটি আকাশের দিকে চেয়ে শব্দ করে হাসতে লাগল, 'হা হা হা, হা হা হা!'

মবিন উদ্দিন দ্রুত তেড়ে এসে বললেন, 'তুই এখনও বইসা আছস! এত দেমাগ তোর! যা, আইজকা তোর খাওন বন্ধ। খাওনের সময় আইলে ইচ্ছামতো ঠ্যাঙানি দিমু কইয়্যা দিলাম।'

যোহরের আজান দিয়েছে সেই কখন। সকালের খাবার খাওয়া হয়নি। দুপুরের খাবারটা অন্তত...

ছোট্ট ছেলেটি গুটি গুটি পায়ে রেস্তোরাঁর ভিতরে গেল। টেবিলে টেবিলে কাস্টমার। এ সময়টা প্রতিদিন ভীড় থাকে। কাজের লোকদের খাবার সুযোগ নেই। কাজের লোকেরা খায় কাস্টমার কমলে। ততক্ষণে বিকেল হয়ে যায়। কিন্তু আজ তার এক্ষুণি খেতে হবে। সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। পেটে ইঁদুর দৌড়ে বেড়াচ্ছে।

হুট করে মবিন উদ্দিন সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার মুখ তো দেখা গেল না, যেটুকু দেখতে পেল শুধু সাদা আর সাদা। সাদা লুঙ্গি, সাদা শার্ট। মবিন উদ্দিন বললেন, 'খিদা লাগছে? খাওনের লাইগা আইছস? যাঃ, যা এইখান থাইকা।'

বলে ধাক্কা দিয়ে রেস্তোরাঁর বাইরে ফেলে দিলেন। ছেলেটি ধাক্কা খেয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল। তবু মন খারাপ হলো না। একটুও কাঁদল না। হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়াল। ফিরে তাকাতেই অদ্ভুত একটা জিনিস চোখে পড়ল। গতকাল সে বিড়াল তাড়ানোর জন্য একটি স্যান্ডেল ছুঁড়ে মেরেছিল। সেটা রোস্তোরাঁর সাইনবোর্ডে ঝুলে আছে। মূলত এটা "বাদল রেস্টুরেন্ট" নামেই পরিচিত। কিন্তু স্যান্ডেলটা একদম "দ" বরাবর ঝুলে আছে। ছেলেটি বানান করে পড়তে লাগল, 'ব আ'কার ল, বাল, হি হি হি, হি হি হি!'

ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত একজন লোক রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করলেন। তার ডান পাশে দু'জন লোক। বাঁ পাশে দু'জন। পিছনে আরো তিনজন। ভিতরে গিয়ে অনেকটা জোরেশোরে বললেন, 'মহাজন সাব, আছেন নাকি?'

মবিন উদ্দিন হাতে হাত বেঁধে তার সামনে এসে দাঁড়ালেন। নিচু স্বরে বললেন, 'আপনি এত কষ্ট করতে গেলেন ক্যান, আমিই আপনার কাছে যাইতাম। আমার আর কিছুদিন সময় লাগব। বাজার খুবই খারাপ। বেশি না, আর কয়েকটা দিন সময় দেন।'

পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত লোক ভড়কে গেলেন। টেবিলে জোরে থাবা বসিয়ে চেঁচিয়ে বললেন, 'মশকরা করো মিয়া আমার লগে? এই নিয়া তিনবার তারিখ করলা মিয়া। লাভ তো দেওই না। মূল টাকাটাও গায়েব! টাকা দিতে না পারলে এই দোকানটা দিয়া দাও। তাইলেই তো হয়!'

ছোট্ট ছেলেটি গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল ভদ্রলোকের সামনে। বলল, 'উনারে ধমকাইতাছেন ক্যান?'

ভদ্রলোক চেঁচিয়ে বললেন, 'টাকার জন্য ধমকাই। তুই দিবি টাকা? তুই দিবি?'

ছেলেটি তার হাফপ্যান্টের পকেট থেকে পাঁচ টাকার ভাঁজ করা নোট বের করে মেলে ধরল।

ভদ্রলোক মুচকি হাসলেন। ছেলেটির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, 'সাড়ে চার লাখ টাকার ঋণ তুই পাঁচ টাকায় শোধ করতে চাস! যা, তোর লাইগা ওরে আরো পনেরো দিন সময় দিলাম।'

বলে বেরিয়ে গেলেন। মবিন উদ্দিন ছেলেটিকে টেবিলে নিয়ে বসালেন। বললেন, 'খুব লাগছে রে? কী করমু ক, চারটা কাপ ভাঙছস আমার। যদিও ইচ্ছা কইরা ভাঙছ নাই তবুওতো আমার ক্ষতি হইছে। বাদ দে। ভাত খাবি?'

ছেলেটি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াল। ভাত দেওয়া হলো তাকে। মবিন উদ্দিন এক দৃষ্টিতে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। ছোট্ট আট-ন' বছরের ছেলেটা। মাথায় এক ঝাকড়া চুল। পরনে ঢিলেঢালা গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট। তবু কী দারুণ দেখতে। কী মায়াময় চেহারা তার!

খাবার শেষ হবার পর মবিন উদ্দিন বললেন, 'কীরে, পেট ভরছে? আর কিছু খাবি?'

ছেলেটি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াতেই মবিন উদ্দিন ভ্রু কুঁচকে বললেন, 'আবার কী খাবি?'

'চকলেট খামু। লাল, সবুজ, হলুদ তিন রঙের চকলেট। দুই টাকা আছে? থাকলে দেও।'

'তোর কাছে তো পাঁচ টাকা আছে। ওইটা দিয়া খা।'

'এমা! ওইটা দিয়া খাইলে তোমারে বাঁচামু কেমনে? শুনলা না লোকটা কইল আবার আইব।'

'আবার বাঁচাবি! আইচ্ছা নে।' বলে বুক পকেট থেকে দু'টাকার কয়েন বের করে দিলেন ছেলেটির হাতে। ছেলেটি ছুটতে যাচ্ছিল তখনই খপ করে হাত ধরে বললেন, 'তাড়াতাড়ি আসবি। টেবিল পরিষ্কার করতে হইব।'

'আইচ্ছা।' বলে ছুটে গেল ছেলেটি।

মবিন উদ্দিন ক্যাশে বসতে যাচ্ছিলেন। তখনই বিকট শব্দ শুনে দৌড়ে বেরিয়ে এলেন। ছোট্ট ছেলেটি রাস্তার পাশে পড়ে আছে। তিনি দৌড়ে গেলেন। তড়িঘড়ি করে ছেলেটিকে কোলে তুলে নিলেন। লোকজন বলাবলি করতে লাগল, মাইক্রোবাস ধাক্কা দিয়ে ফেলে গেছে। ছেলেটি তখনও নিঃশ্বাস নিচ্ছে। রক্তে মবিন উদ্দিনের সাদা শার্ট লাল হয়ে গেল। তার হাতে ছেলেটি ছোটো ছেটো হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে কাঁপতে কাঁপতে একসময় শান্ত হয়ে গেল। বয়োবৃদ্ধ একজন লোক কাতর গলায় বললেন, 'বাচ্চা পুলাডা মইরা গেল!'

মবিন উদ্দিন ছেলেটিকে কোল থেকে নামিয়ে দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন৷ হাতের মুঠো খুলে দেখলেন, পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার আগে তার হাতে তুলে দিয়ে গেছে সেই ভাঁজ করা পাঁচ টাকার নোট। যা দিয়ে বাঁচাবে বলেছিল আবার। সে কি মরতে মরতে কথা রেখে গেছে?

পাঁচ টাকার নোট

মো. ইয়াছিন

সমাপ্ত
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

আরও গল্প

এমন আরও কিছু

সব গল্প
ছোটগল্প

কালকে এক রিকশাওয়ালা মামা বলতেছে

কালকে এক রিকশাওয়ালা মামা বলতেছে, "মামা, বিয়া করছেন?" বললাম, "না।" আমার দিকে অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকালো। "বিয়া করেন নাই? তাইলে তাড়াহুড়া কইরা বাসায় যাইয়া কী করবেন?" "বউ ছাড়া কোনো কাজ থাকতে পারে না?" "কী যে কন না মামা! বউয়ের চাইতে বড়ো…

১৫ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিট পড়া
ছোটগল্প

একটা লোক আমার স্ত্রীর নাম্বারে প্রতিদিন…

একটা লোক আমার স্ত্রীর নাম্বারে প্রতিদিন ফোন দেয়। ফোনটা সাইলেন্ট করা থাকে। যাতে আমি টের না পাই। আমার মনে হয় মেহেরজান রাতে ঘুমায় না। চোখ বন্ধ করে কল আসার অপেক্ষা করতে থাকে। এত রাতে সে কার সাথে কথা বলে? আর ওই নাম্বার "বাবা" নামে সেইভ করা…

১৩ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ছোটগল্প

আমাদের বাড়িতে একটা দোষী পুকুর আছে

আমাদের বাড়িতে একটা দোষী পুকুর আছে। সেটার ভয়ে বাবা আমাদেরকে নিয়ে ঢাকায় চলে এসেছিলেন। এখন আবার সেখানে ফিরে যেতে হচ্ছে। বাবা যদি জানতে পারেন তাহলে ঘর থেকেই বেরোতে দিবেন না। তাই মিথ্যে বলে যাচ্ছি। বাবা জানে কক্সবাজার যাব। কিন্তু যাচ্ছি আমাদের গ্রামে। যে…

১২ অক্টোবর ২০২৬৮ মিনিট পড়া